
বাদুড়ের সংস্পর্শে আসার ঘটনাকে কখনোই হালকাভাবে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কানাডার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা। তাদের সতর্কবার্তা, বাদুড়ের কামড় বা আঁচড় চোখে না পড়লেও জলাতঙ্ক (রেবিস) ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই এমন কোনো ঘটনা ঘটলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সোমবার প্রকাশিত কানাডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জার্নাল-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রায় দুই বছর আগে জলাতঙ্কে মারা যাওয়া ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মর্মান্তিক ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
প্রতিবেদনটির জ্যেষ্ঠ লেখক এবং হ্যামিল্টনের ম্যাকমাস্টার চিলড্রেন’স হসপিটালের শিশু সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রায়ান হামেল বলেন, এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জলাতঙ্কের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষার জন্য বাদুড়ের সংস্পর্শে আসার পর কী করণীয়, সে বিষয়ে সবার পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে উত্তর অন্টারিওর একটি কটেজে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছিল ১১ বছর বয়সী এক বালক। এক রাতে ঘুম থেকে জেগে সে দেখতে পায়, একটি বাদুড় তার নাক ও মুখের ওপর বসে আছে। আতঙ্কিত হয়ে সে হাত দিয়ে বাদুড়টিকে সরিয়ে দেয়। পরে তার বাবা একটি পাত্রের মধ্যে বাদুড়টিকে ধরে বাইরে ছেড়ে দেন। ঘটনার পর শিশুটির মুখে বা শরীরে কোনো দৃশ্যমান কামড় বা আঁচড়ের দাগ খুঁজে পাননি তার বাবা-মা। ফলে তারা মনে করেছিলেন, বাদুড়টি কোনো ক্ষতি করেনি। এ কারণে শিশুটিকে সম্ভাব্য জলাতঙ্ক সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও তারা অনুভব করেননি।
ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর শিশুটির মুখের ডান পাশে ঝিনঝিন অনুভূতি, অবশভাব এবং ফোলা দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে একটি জরুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে চিকিৎসক প্রথমে ধারণা করেন, এটি সম্ভবত বেল’স পালসি। এটি সাধারণত ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে মুখের এক পাশ সাময়িকভাবে অবশ হয়ে যাওয়ার একটি রোগ। সেই অনুযায়ী শিশুটিকে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। মুখের ডান পাশ আরও দুর্বল হয়ে যায়, কথা জড়িয়ে যেতে শুরু করে এবং স্নায়বিক জটিলতা বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠায় তাকে ম্যাকমাস্টার চিলড্রেন’স হসপিটালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তার স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত বিকল হতে থাকে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় তার ব্রেন স্টেমের সব রিফ্লেক্স বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়ার পর শিশুটির মৃত্যু হয়।
ডা. ব্রায়ান হামেলের ভাষায়, জলাতঙ্ক এমন একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যার উপসর্গ একবার প্রকাশ পেলে কার্যকর চিকিৎসা প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তিনি জানান, ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করার পর দীর্ঘ সময় কোনো লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ, আবার কখনও কয়েক মাস পর্যন্ত এটি সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। কিন্তু একবার যখন স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়ে উপসর্গ শুরু হয়, তখন রোগীকে বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাদুড়ের সংস্পর্শে এলে কামড় বা আঁচড় স্পষ্ট দেখা না গেলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তি ঘুম থেকে উঠে নিজের শরীরে বাদুড় দেখতে পান, ছোট শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি বা অচেতন অবস্থায় থাকা কেউ বাদুড়ের সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে সম্ভাব্য জলাতঙ্ক সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস বা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা শুরু করলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই সন্দেহজনক কোনো ঘটনা ঘটলে অপেক্ষা না করে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
বাদুড় মানুষের জন্য সবসময় হুমকি নয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে বন্য প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা অবহেলা না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, এই শিশুর মৃত্যু একটি দুঃখজনক ঘটনা হলেও এটি সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। জলাতঙ্ক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

