
কিছু মানুষের ভীষণ সাহস। আমার অতটা সাহস কোথায়! হয়তো আগে কিছু ছিল, এখন একদম শূন্য। ফেসবুকে দেখি হাসপাতালে গিয়ে লোকজন নল লাগানো ছবি পোস্ট করেন। ইমার্জেন্সিতে আমিও কম যাইনি, কিন্তু সেখানে গেলেই মনে হয় এক পা কবরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। এমন ভয়ংকর আতঙ্কের মাঝেও যারা হাসপাতালের গাউন পরে কিংবা হাতে-পায়ে নল ঠোকানো ছবি পোস্ট করেন, তাদের সাহসের কদর করতেই হয়।
স্কারবোরো গ্রেস হাসপাতাল অনেকটা নিজেদের হাসপাতালের মতো হয়ে গেছে। বহুবার আমাকে যেতে হয়েছে সেখানে। গেল সোমবারও ইমার্জেন্সি থেকে ঘুরে এলাম। অল্প বয়সে যাওয়া আর পরন্ত বয়সে হাসপাতালে যাওয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য। ফলে দু’বার ব্লাড টেস্ট করল, দু’বার ইসিজি, কিছুক্ষণ পরপর ব্লাড প্রেসার মাপতে লাগল। একবার এক্স-রে করতে পাঠাল এবং একবার সিটি স্ক্যান। সব মিলিয়ে প্রায় ছয়-সাত ঘণ্টা ইমার্জেন্সিতে শুয়ে-বসে ছিলাম। খারাপ কিছুর সন্দেহ যখন প্রবল হতে লাগল, কিছুটা ভয় পেয়েই ইমার্জেন্সিতে বসা অবস্থায় আগের দিনে তোলা পারিবারিক দুটি ছবি পোস্ট করে লিখেছিলাম: ‘বোনাস সুখ টিকে থাকুক বহু দূর’।
অনেকে হয়তো মনে করেছেন সুখে গদগদ হয়ে পারিবারিক ছবি পোস্ট করে এমন কথা লিখেছি। আসলে ভয়ে কাতর হয়েই ওভাবে লিখেছিলাম। যাক, সেটা কিন্তু ভিন্ন অভিজ্ঞতা – ৩ নয়। এতক্ষণ লিখলাম আজকের বিষয়বস্তুর ভূমিকা। এবার আসল কথায় আসি।
আমাদের পারিবারিক ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু স্কারবোরো হাসপাতালে বহু বছর কাজ করেছেন। তাঁর বলা একটি ঘটনাই আজকের ভিন্ন অভিজ্ঞতা।
এক সময় হাসপাতালটির ডিরেক্টর বা প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন একজন রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। ভদ্রমহিলার নামের আগে কর্নেল উপাধি ছিল। তিনি নিজস্ব গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে আসতেন। গাড়িটার দিকে একবার নজর না দিয়ে কেউ যেতে পারত না। এর কারণ গাড়ির সৌন্দর্য নয়, বরং এর বেহাল দশা। প্রায়ই সিকিউরিটিকে ডেকে আনা হতো ব্যাটারি বুস্ট করার জন্য। শীতকালে তো বটেই, গরমকালেও মাঝে মাঝে স্টার্ট করার জন্য লোক ডাকতে হতো।
আমার বন্ধুর সদা কৌতূহলী মন। নতুন কিছু জানার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। ঘটনার পেছনের ঘটনা তাঁকে বেশি আকর্ষণ করে। তিনি চিন্তা করলেন, এত বড় হাসপাতালের হেড এই কর্নেল, বিয়ে-সাদি করেননি, কাজেই সন্তান-স্বামী কিছুই নেই। বাঁচবেন আর কতদিন! এত কিপটে হলেন কেন? দামী না হোক, একটা আধা-নতুন গাড়ি তো কিনতেই পারেন।
একদিন তিনি সুযোগ পেয়ে তাঁর ডিরেক্টরকে জিজ্ঞেস করে বসলেন এই লক্কর-ঝক্কর গাড়ি চালানোর কারণ কী?
ভদ্রমহিলা উত্তর দিলেন, “শুধু শুধু টাকা খরচ করে লাভ কী? চলে তো যাচ্ছে।”
বন্ধুটি বলল, “ম্যাডাম, এত টাকা আপনার, এসব কী কাজে লাগবে?”
তিনি উত্তর দিলেন, “কোথায় টাকা-পয়সা? আমি তো সব দান করে দিই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাসপাতালে যতটুকু সম্ভব ডোনেশন পাঠাই।”
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ?”
আমার বন্ধু উত্তর দিলেন, “বাংলাদেশ।”
ভদ্রমহিলা হাসিমুখে বললেন, “ওহ, তুমি বাংলাদেশের লোক! তোমাদের দেশে একটা কলেরা হাসপাতাল আছে না, ঢাকায়? আমি সেখানেও নিয়মিত ডোনেশন দিই।”
এরপর আর কী কথা থাকে!
জীবনের অভিজ্ঞতার কোনো শেষ নেই।
স্কারবোরো, কানাডা

