মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে কার্নির গভীর সম্পর্ক

মার্কিন অর্থনীতির সঙ্গে কার্নির গভীর সম্পর্ক - the Bengali Times
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে মার্ক কার্নি বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্রুকফিল্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, কর্পোরেট সংযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচকরা নানা প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার গভীর সম্পৃক্ততা এবং বর্তমান সরকারের বাণিজ্যনীতি বিশ্লেষণ করে অনেকেই মনে করছেন, কার্নির অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ উত্তর আমেরিকান কর্পোরেট কাঠামোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে মার্ক কার্নি বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্রুকফিল্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি টরন্টো থেকে নিউ ইয়র্কে সদরদপ্তর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং একটি বড় কৌশলগত বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সদরদপ্তর নিউ ইয়র্কে স্থানান্তর করার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক করতে চেয়েছে। কারণ নিউ ইয়র্ক বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান আর্থিক কেন্দ্র এবং সেখান থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা সহজ হয়। তবে সমালোচকদের একটি অংশের মতে, একজন ব্যক্তি যিনি পরে কানাডার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তার নেতৃত্বে একটি কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের যুক্তরাষ্ট্রমুখী পুনর্বিন্যাস জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

- Advertisement -

ব্রুকফিল্ড ছাড়াও কার্নি যুক্ত ছিলেন নিউ ইয়র্কভিত্তিক ব্লুমবার্গ ফিল্যান্থপিজ এবং সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক ফিনটেক কোম্পানি স্ট্রাইপের বোর্ডের সঙ্গে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক আর্থিক প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কর্পোরেট নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কার্নির এই আন্তর্জাতিক কর্পোরেট সংযোগ তাকে বৈশ্বিক অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এই সম্পর্কগুলো কি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে? বিশেষ করে কানাডার অভ্যন্তরীণ শিল্পনীতি, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট স্বার্থের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কার্নি তার বিনিয়োগ সম্পদ একটি স্বাধীন ট্রাস্টির হাতে তুলে দেন, যা রাজনৈতিক স্বচ্ছতার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি স্বাভাবিক এবং প্রচলিত প্রক্রিয়া। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার বিনিয়োগের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিতে কেন্দ্রীভূত। তথ্য অনুযায়ী, তার বিনিয়োগ তালিকায় থাকা ৫৬৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র তিনটি কানাডিয়ান কোম্পানি। বিপরীতে প্রায় ৯১ শতাংশ বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিতে রয়েছে। শুধু তাই নয়, আইরিশ, ব্রিটিশ এবং ডাচ প্রতিষ্ঠানে তার বিনিয়োগের পরিমাণও কানাডার তুলনায় বেশি। এই তথ্য সামনে আসার পর বিরোধী মহল প্রশ্ন তুলেছে কানাডার অর্থনীতি ও জাতীয় শিল্পের প্রতি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বাস্তবতায় কেন কানাডিয়ান কোম্পানির উপস্থিতি এত সীমিত? অনেকের মতে, একজন প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কোথায় বিনিয়োগ করবেন তা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত হলেও, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সেই বিনিয়োগের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক চরিত্র রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।

নির্বাচনী প্রচারণা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বক্তব্যে মার্ক কার্নি একাধিকবার কানাডার জাতীয় স্বার্থ এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিষয়টি সামনে এনেছেন। এমনকি তিনি ঐতিহাসিক ১৮১২ সালের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে কানাডার স্বাধীন অবস্থান ও জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, তার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। একদিকে জাতীয়তাবাদী আবেগের আহ্বান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিনিয়োগ ও কর্পোরেট সম্পৃক্ততা এই দুই অবস্থানকে অনেকেই পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখছেন। অবশ্য কার্নির সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ কাঠামোর বাইরে থাকা প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সম্পৃক্ততা থাকা মানেই জাতীয় স্বার্থবিরোধী অবস্থান নয়।

২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্রুকফিল্ডের সদরদপ্তর নিউ ইয়র্কে স্থানান্তরের পর কোম্পানির শেয়ারের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে কার্নির ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডিংয়ের মূল্য প্রায় ৬৮ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছায় বলে জানা যায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাস্তবতা কার্নির ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ব্রুকফিল্ডের প্রবৃদ্ধি যত বাড়বে, তার আর্থিক সুবিধাও তত বাড়তে পারে। এখানেই মূল রাজনৈতিক প্রশ্নটি সামনে এসেছে একজন প্রধানমন্ত্রী যার আর্থিক স্বার্থ উল্লেখযোগ্যভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত, তিনি কতটা নিরপেক্ষভাবে কানাডার অভ্যন্তরীণ শিল্পনীতি পরিচালনা করতে পারবেন?

ক্ষমতায় আসার পরপরই কার্নি তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের উদ্দেশ্যে পাঠানো নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তিকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি বলেছিলেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভালোভাবে চেনেন এবং তার সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করে কানাডার জন্য লাভজনক চুক্তি আনতে সক্ষম হবেন। তবে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, অতিরিক্ত যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বাণিজ্যনীতি কানাডার কিছু ঐতিহ্যবাহী শিল্পখাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

কানাডার অটো, স্টিল এবং লাম্বার শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। নতুন বাণিজ্যচুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক চাপ বৃদ্ধি পেলে এসব খাতে উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানি সীমাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থান সংকট দেখা দিতে পারে। শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের শিল্পকে রক্ষায় আরও সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ করে, তাহলে কানাডার উৎপাদনশীল খাতগুলোতে ছাঁটাই বাড়তে পারে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ভর্তুকিনির্ভর নীতির কারণে কানাডিয়ান উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মার্ক কার্নির সমর্থকরা তাকে একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেখেন, যিনি বৈশ্বিক আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাঠামো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। তাদের মতে, বর্তমান অস্থির বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এমন অভিজ্ঞ নেতৃত্ব কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমালোচকদের দাবি, তার কর্পোরেট অতীত এবং বর্তমান নীতিগত অবস্থানের মধ্যে সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

মার্ক কার্নির নেতৃত্বে কানাডার অর্থনৈতিক নীতি কোন পথে এগোচ্ছে, সেটি এখন দেশটির রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যেমন শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তেমনি তার বিনিয়োগ বাস্তবতা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যকার সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব আগামী দিনে কানাডার রাজনীতিতে আরও বড় বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles