অগ্নিঝরা মার্চ : স্বাধীনতার ঊষালগ্নে
তোফায়েল আহমেদ
অ+ অ-প্রিন্ট
১৯৭১-এর ২৪ মার্চ, লাগাতার চলা অসহযোগ আন্দোলনের ২৩তম দিবসটি ছিল বুধবার। গতকাল বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধীনতার সোনালি পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে সমগ্র বাঙালি জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ। একটি জাতির শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে সব মানুষের এমন অভূতপূর্ব ঐক্য নজিরবিহীন। প্রতিবাদে প্রতিরোধে ভাস্বর বাঙালি আজ স্বাধীনতা অর্জনে যে কোনো পরিস্থিতিতে বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দিতে প্রস্তুত। আজ পাকিস্তান সেনাবাহিনী রংপুর, সৈয়দপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিলের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। সৈয়দপুরে সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে ১৫ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। সংবাদ পেয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রংপুরের জেলা প্রশাসক দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তিনি শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানালে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা তা উপেক্ষা করে এবং রংপুরে সান্ধ্য আইন জারি করে। রংপুরের ঘটনার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় একাধিক প্রতিবাদ মিছিল বের করে। সৈয়দপুরের ঘটনার পরপরই ঢাকার মিরপুরে অবাঙালিরা বাঙালিদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালায়। বিনা উস্কানিতে নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদ জানিয়ে ধানমণ্ডিস্থ ৩২ নং বাসভবনে সমবেত বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, `সৈয়দপুর, রংপুর, চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুরে সেনাবাহিনীর কার্যকলাপে আমি শোকাহত। সাধারণ মানুষের ওপর নৃশংসভাবে ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকেও পাওয়া গেছে গুলিবর্ষণ ও হতাহতের সংবাদ। ঢাকায় প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি সত্ত্বেও ঘটছে এ সমস্ত ঘটনা। আমি অবিলম্বে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রেসিডেন্টকে আদেশ প্রদানের আহ্বান জানাচ্ছি।’

আলোচনার নামে পাকিস্তানি শাসকচক্রের হীন ষড়যন্ত্র ও দুরভিসন্ধিমূলক মতলব সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তার ফল ভালো হবে না। বাংলার জনগণ তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। কোনো শর্তেই আমরা কোনো প্রকার আপস করব না।’ সব বাধা ডিঙিয়ে স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনার অদম্য মনোবল নিয়ে দৃপ্ত শপথে সংগ্রামী জনতাকে উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, ‘আমার মাথা কেনার শক্তি কারও নেই। বাংলার মানুষের সঙ্গে, শহীদের রক্তের সঙ্গে আমি বেইমানি করব না। কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা রক্ত দিয়েছি, প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব। আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না।’

আজ বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার মধ্যে কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। তবে প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে প্রায় দু`ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন এবং ইয়াহিয়ার পক্ষে বিচারপতি এআর কর্নেলিয়াস, এমএম আহমেদ, লে. জেনারেল পীরজাদা ও কর্নেল হাসান অংশগ্রহণ করেন। উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকের পর তাজউদ্দীন আহমদ অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধানে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের কাছে যে মূলনীতি উত্থাপন করেছেন, প্রেসিডেন্ট নীতিগতভাবে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। এখন এ স্বীকৃত মূলনীতি কার্যকর না করলে দেশ এক গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে। আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করতে ইচ্ছুক নয়।’

এর পর রাতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, `আজকের এ বৈঠকে আওয়ামী লীগের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে পেশ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আর কোনো বৈঠকের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আলোচনা অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে দেওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলার আর কিছুই নাই। বল এখন প্রেসিডেন্টের কোর্টে। যা বলার তারাই বলবেন। এখন প্রেসিডেন্টকেই তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে হবে।` আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমান বোঝাই করে বিপুল সংখ্যক সৈন্য আর অস্ত্র আনা হয়। এরই অংশ হিসেবে অস্ত্রের সবচেয়ে বড় চালানটি আসে `এমভি সোয়াত` নামক জাহাজে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নং জেটিতে নোঙর করা অস্ত্রবোঝাই জাহাজ সোয়াত থেকে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র খালাস করতে গেলে প্রথমে শ্রমিকরা অস্ত্র খালাসে অস্বীকৃত হয় ও বাধা প্রদান করে। এতে সেনাবাহিনী গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই ১৪ জন শ্রমিক নিহত হন। এর পর সেনা সদস্যরা কিছু অস্ত্র খালাস করে ১২টি ট্রাকে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথরোধ করেন। এ সময় সেনাবাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে কমপক্ষে ২৫০ জন শ্রমিক নিহত হন। চট্টগ্রামের এ ঘটনায় সারাদেশের মানুষ বিক্ষুুব্ধ হয়ে ওঠে। মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। স্রোতের মতো মিছিল রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান প্রদক্ষিণ করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে এসে সমবেত হয়। এদিকে জুলফিকার আলি ভুট্টো আজ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ২৫ মিনিটের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, `তিনি একনিষ্ঠভাবে বাংলাদেশের জনসাধারণের সেবা করেছেন এবং বাংলার বঞ্চিত মানুষের জন্য তিনি আগে থেকেই সোচ্চার।` গণহত্যার মাধ্যমে বাঙালি নিধনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলনকে কবরস্থ করার সার্বিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করে প্রকাশ্যে ভুট্টো এসব মায়াকান্না প্রদর্শনে লিপ্ত।

বিকেল ৪টায় কাপ্তানবাজার এলাকা থেকে এক নারী অঝোর কান্নায় বিলাপ করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বুকের ওপর আছড়ে পড়েন। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, `বাবা, আমার কামাল-জামালকে ফিরিয়ে দাও। মিলিটারিরা কাল রাতে ওদের গুলি করে মেরেছে। অনেক দুঃখ-কষ্টে দুই ছেলেকে বড় করেছিলাম। আমার বুক ভেঙে গেছে।` সন্তানহারা নারীর কান্নায় উপস্থিত সবার চোখে পানি। বঙ্গবন্ধু গর্জে উঠে তৎক্ষণাৎ তাজউদ্দীন আহমদকে নির্দেশ দিলেন প্রেসিডেন্ট ভবনে টেলিফোন করতে। তাজউদ্দীন সাহেব ফোন করলেন। অপর প্রান্তে ফোন ধরলেন প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল পীরজাদা। তাজউদ্দীন সাহেব বললেন, `বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চান।` উত্তরে পীরজাদা বলেন, `প্রেসিডেন্ট তার খাস কামরায় বিশ্রামে আছেন। জরুরি কিছু হলে আমাকে বলতে পারেন।` জবাবে তাজউদ্দীন সাহেব বলেন, `আপনার সঙ্গে নয়; বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের সঙ্গেই কথা বলবেন।` এর পর বঙ্গবন্ধু রিসিভার হাতে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, `মি. প্রেসিডেন্ট, ইউ টোল্ড মি দ্যাট দেয়ার উইল বি নো মোর কিলিং। ইউ হ্যাভ অর্ডার দ্য আর্মি নট টু কিল এনি ওয়ান, নট এ সিঙ্গেল ফায়ার। বাট দ্য আর্মি ইজ কিলিং মাই পিপল এভরিহোয়্যার। লাস্ট নাইট দে কিল্ড টু ব্রাদার্স অ্যাট কাপ্তানবাজার এরিয়া। দিস ইজ ভেরি স্যাড। আই কনডেম দিস কিলিং।`

অপর প্রান্তের কথা শোনার পর বঙ্গবন্ধু পুনরায় বলেন, `দিস ইজ এ গ্রস ব্রিচ অব আওয়ার ডিসকাশন, গ্রস ব্রিচ অব ইউর কমিটমেন্ট। দ্য আর্মি ইজ কিলিং মাই পিপল্‌ অ্যাট ইউর প্রেজেন্স ইন ঢাকা। পিপল উইল নট বি এ সাইলেন্স স্পেক্টেটর। প্লিজ, স্টপ দিস কিলিং।` টেলিফোন রেখে দেওয়ার পরও বঙ্গবন্ধুর চোখে-মুখে আগুন ঝরে পড়ছিল। তার সারা শরীর যেন কাঁপছে। বহুক্ষণ তিনি কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। কেমন উত্তেজিত আর উন্মনা হয়ে পড়েছিলেন! সবাই নীরব-নিথর; পিনপতন নিস্তব্ধতা। বেশ কিছুক্ষণ পর বলে উঠলেন, `এখনও ওরা আমার মানুষকে মারছে। কত রক্ত চায় ওরা? এভাবে আমার লোকদের হত্যা না করে ওরা আমাকেই মেরে ফেলে না কেন? ওদের বলো- আমার রক্ত নিয়ে ওরা যদি খুশি হতে চায়, তবে তাই করুক। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।` এ সময় তিনি শিশুর মতো কেঁদে ওঠেন। দেশবাসীর জন্য এ রকমই ছিল তার দরদ আর অপরিসীম ভালোবাসা। সাগর বা মহাসাগরের গভীরতা পরিমাপ করা সম্ভব কিন্তু বাংলার মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর যে দরদ আর ভালোবাসা, তা অপরিমেয়। এদিকে রাত ৮টায় ভুট্টোর প্রধান সহচর গোলাম মোস্তফা খার ভুট্টোর সর্বশেষ একটি বার্তা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন এবং বঙ্গবন্ধু এর চূড়ান্ত জবাব দেন। ভুট্টোর এ প্রস্তাবে পুরনো ফর্মুলাই পেশ করা হয়েছিল। অর্থাৎ কেন্দ্রে পিপলস্‌ পার্টির সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি তথা কোয়ালিশন সরকার গঠন। সারাদিনের বিভিন্ন ঘটনায় বঙ্গবন্ধু চড়া মেজাজে থাকলেও বেশ সংযত ও দৃঢ় কণ্ঠে গোলাম মোস্তফাকে বলেন, `দিস ইজ নট অ্যান্ড উইল নেভার অ্যাক্সেপটেবল টু আস। প্লিজ, টেল ইউর লিডার কিলিং দ্য পিপল বাই দ্য আর্মি ইজ নট এ গুড থিং অ্যান্ড আই হ্যাভ নাথিং মোর।` মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে ভুট্টো সাহেবের দূতকে মতামত জানিয়ে তিনি বিদায় দেন।

এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আলোচনা করতে আসা জাতীয় পরিষদে সংখ্যালঘু দলগুলোর নেতারা আজ করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট নিরসনে এসব দলের নেতারা খোলা মন নিয়ে উদ্ভূূত পরিস্থিতি নিরসনের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে একরকম ভগ্নহৃদয়ে করাচি প্রত্যাবর্তন করেন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের উদ্দেশে কাউন্সিল মুসলিম লীগ সভাপতি মিয়া মমতাজ মোহাম্মদ দৌলতানা বলেন, `আমরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে যাচ্ছি।` প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর মিলিত ষড়যন্ত্রে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার জন্য সবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা নিষ্ফম্ফল হয় এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রক্তাক্ত সূর্যোদয় তথা নবপ্রভাতের উন্মেষলগ্ন সূচিত হয়।

 

২৪ মার্চ, ২০১৯ ১১:৩৭:৩১