ঠাকুরগাঁওয়ে বিজিবির গুলি: কারণ নিয়ে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
বিজিবির গুলীতে নিহতদের মরদেহ ঘিরে গ্রামবাসীদের বিক্ষোভ। (ফেসবুক থেকে)।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় গরু আটক করাকে ঘিরে সংঘর্ষের সময় সীমান্তরাক্ষী বাহিনী বিজিবির গুলিতে একজন এসএসসি পরিক্ষার্থীসহ তিনজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এই ঘটনায় আরও অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু সংঘর্ষের কারণ ও পটভূমি সম্পর্কে পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় পুলিশ ও বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী গ্রামে আজ হাটের দিনে কয়েকটি ভারতীয় চোরাই গরু আটক করা হলে 'সশস্ত্র চোরাকারবারিরা' বিজিবির সদস্যদের ওপর হামলা চালালে তখন তারা বাধ্য হয়ে গুলি চালায়। অন্যদিকে, গ্রামবাসী বলেছে, গৃহস্হের বাড়িতে পালিত গরু আটক করা হলে সংঘর্ষ বাঁধে এবং তখন গ্রামের হাটে আসা শত শত মানুষের ওপর বিজিবি উপর্যপুরি গুলি চালায়। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনা তদন্ত করার কথা বলছে। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার দুপুরের দিকে হরিপুর উপজেলার গফুয়া ইউনিয়নের বহরমপুর গ্রামে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা সেখানে গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তখন মরদেহগুলোকে নিয়ে সেখানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বহরমপুর গ্রামে মঙ্গলবার গরু এবং বিভিন্ন পণ্যের বেচা কেনার সাপ্তাহিক হাটের দিন ছিল। উত্তরে ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী এই গ্রামটির হাটে দুপুরে যখন জমে উঠতে শুরু করেছে, তখন গরু আটক করা নিয়ে সংঘর্ষে বিজিবির গুলিতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ঠাকুরগাঁও জেলার পুলিশ সুপার মো: মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, বিজিবির সদস্যরা ভারতীয় গরু আটক করলে চোরাকারবারিরা সশস্ত্র হয়ে হামলা চালায়, তখন বিজিবি বাধ্য হয়ে গুলি চালালে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

"এখানে জাদুরানী নামে একটি হাট ছিল। এই হাটে অনেক সময় চোরাই গরু আসে। সেজন্য বিজিবি চেকপোস্ট বসিয়ে কয়েকটি ভারতীয় গরু চোরাই সন্দেহে আটক করে। আটক করে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার পথে সংঘবদ্ধ গরু চোরাকারবারী কয়েকশ মানুষ ইট-পাটকেল, রামদা নিয়ে বিজিবি সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে। তখন বিজিবি এই আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য বিজিবি গুলি চালায়।"

"এতে ঘটনাস্থলেই দু'জন মারা যায়, আরেকজনকে হাসপাতালে নেয়ার পতে তার মৃত্যু হয়।"

সংঘর্ষের খবর পেয়ে জেলা এবং পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে গিয়েছিলেন। সে সময় ঘটনাস্থলে দু'জনের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়েছিল। গ্রামের মানুষ তখনও মৃতদেহ ঘিরে বিক্ষোভ করছিল। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তারা সেখানে স্থানীয়দের সাথে আলোচনা করেছেন এবং ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বিজিবির কর্মকর্তারাও বলেছেন, ভারতীয় গরু আটকের পর বিজিবির সদস্যদের ওপর চোরাকারবারি হামলা করলে তাদের শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে তারা বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছে। তবে ঐ গ্রামের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো: জহিরুল ইসলাম বলছিলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর বিজিবি উপর্যপুরি গুলি চালালে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীও নিহত হয়।

"কেনা গরু, হয়তো বাড়িতে পালতেছে, এর পারমিট দেখায়। কিন্তু তারা পারমিট মানবে না। ওরা বলতেছে কেনা হলেও এগুলো আমরা নিয়ে যাবো। এগুলো কেনা না। হাটের দিন, এটা প্রধান রাস্তা। এই রাস্তা দিয়ে বহুলোক আবার চলে আসছে। জনগণ যে হাটে যাচ্ছে, এই সময় ওরা এলোপাথাড়ি গুলি করছে। আসলে যে ঘটনাটা ঘটেছে, এটা কিন্তু অমানবিক।"

গ্রামবাসীর অভিযোগ কেনা গরুর চালান দেখানোর পরও বিজিবি সদস্যরা আটক করলে লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গ্রামবাসী বলছিলেন, "গ্রাম থেকেই গরু নিয়ে যাচ্ছিল বিক্রি করতে। একজোড়া গরু। দেশী গরুর মতো। সেটা আটক করলে ঝামেলা হয়।"

সীমান্তবর্তী গ্রামটিতে মাঝে মাঝে গরু চোরাকারবারির বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অনেকদিন পর মঙ্গলবার সেখানে হাটের জায়গা ঘিরে বিজিবি কয়েকটি তল্লাশি চৌকি বসিয়ে ব্যাপক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়েছিল বলে গ্রামবাসীদের অনেকে বলছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের বিজিবি'র সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল তুহিন মো: মাসুদ বলছিলেন, ভারত সীমান্তে চোরাকারবারিদের নিহত হওয়ার যেসব ঘটনা ঘটছে, তা কমিয়ে আনতে সীমান্তবর্তী ঐ অঞ্চলে তারা চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছেন। তিনি বলছিলেন, "কিছুদিন ধরেই সীমান্তে চোরাকারবারি বন্ধের জন্য অভিযান চলছে। এখানে যারা অপরাধী বা দোষী হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে।"

"এতে করে এই চক্রের সাথে জড়িত অনেকে সুবিধাভোগী আছেন, তারা বিজিবির বিরুদ্ধে কিছু একটা করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন বলে আমরা ধারণা করছি।এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে আজকে এই সংঘবদ্ধ তাদের এই আক্রমণ। তারা আমাদেরকে যেভাবে আক্রমণ করেছে,আমাদের যদি গুলি না করতো, তাহলে আমাদের সদস্যরা লাশ হয়ে ফিরে আসত।"

এদিকে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রামটিতে থমথমে পরিবেশ থাকলেও পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। -বিবিসি বাংলা

 

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:২৭:৩৮