যাত্রাবাড়ীতে নারী খুন: তিন সম্পর্কের উত্তর খুঁজছে পুলিশ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম
অ+ অ-প্রিন্ট
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় বাসায় সালমা (৩৮) নামে এক নারীকে খুন করা হয়েছে। গতকাল রোববার রাত ৮টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। একই বাসা থেকে রাবেয়া নামে এক নারীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে তার  চিকিৎসা চলছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেফাজতে থাকা রাবেয়া নামের ওই নারী যে নিহত সালামার ননদ নন, তা স্বীকার করেছেন। বলছেন, গৃহকর্মী ফোরকানই খুন করেছে। কিন্তু কেন সে বিষয়ে রাবেয়া কোনো কথা বলছেন না। এছাড়া যাকে সালামার স্বামী বলা হচ্ছে সেই ‘আবুল কালাম’ও সালমার স্বামী নন, সে বিষয়েও নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। তাই এই তিন জনের সর্ম্পক ঘিরেই খুনের ঘটনার উত্তরে খুঁজছে পুলিশ।

প্রসঙ্গত, গত রোববার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ীর উত্তর কুতুবখালীর স্কুল রোডের ২২/বি’তে নিজ বাসায় সালমা নামে (৩৫) এক নারীকে খুনের করা হয়। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় আহত রাবেয়া (৩০) নামের অপর এক নারীকে উদ্ধার করে এবং রক্তাক্ত অবস্থায় সালমার মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে।

হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) জুলফিকার আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার খবর পেয়ে আমরা আয়েশা নামের এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছি। এসময় ওই বাসা থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাবেয়া নামে অপর এক নারীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী বলছে, ফোরকান নামের বাসার কাজের ছেলে সালমাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে খুন করেছে। এসময় বাধা দিতে গেলে তাকেও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে ঘরে আটকে রেখে পালিয়ে যায় ফোরকান।’

পুলিশের হেফাজতে থাকা ওই নারী এর বাইরে কোনো তথ্য দিতে রাজি হচ্ছে না বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তা। এছাড়া ওই নারী যে পরিচয় দিয়েছিলেন সেটিও ভুয়া, যে কারণে তাকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহ পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।

বাড়ির মালিক জানান, সালমা নামের নিহত ওই নারী বছর দুয়েক আগে আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তিতে স্বামী পরিচয়ে ওই বাসা ভাড়া নেয়। ভাড়া নেওয়ার পর দু’মাসের জন্য তারা অন্যত্র থাকলেও গত পাঁচ মাস তারা ওই বাসা ৮ হাজার টাকার চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করে। এর কিছুদিন পর ওই বাসায় রাবেয়া নামের এক নারী এবং ফোরকান নামের এক তরুণ এখানে বসবাস শুরু করে। রাবেয়াকে নিহত সালমার ননদ এবং ফোরকানকে তাদের গৃহকর্মী বলে জানতেন তিনি।

বাড়ির মালিকের ছেলে ওমর ফারুক বলেন, ‘ঘটনার দিন বিকেল পাঁচটার দিকে বাড়ির অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে শুনি, ওই ফ্ল্যাটে একজন নারী চিৎকার করছে। ছুটে গিয়ে বাইর থেকে বিষয়টা জানতে চাইলে, রাবেয়া নামের ওই মহিলা ভেতর থেকে বলেন আমাদের কাজের ছেলে আমার ভাবিকে খুন করে আমার মাথা ফাটিয়ে দরজা লাগিয়ে পালিয়ে গেছে। তখন আমি পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে তালা ভেঙে ওই নারীকে থানায় নিয়ে যায় এবং লাশ মর্গে নেয়।’

‘রাবেয়া হচ্ছে নিহত সালমার ননদ, আর সালমা হচ্ছে আবুল কালামের স্ত্রী। সে কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়িতে গেছে। এ ঘটনার পর সে এখনও বাড়িতে আসেনি’, বলেন ওমর ফারুক।

যাত্রাবাড়ী থানার দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আবুল কালাম নিহত সালমার কথিত স্বামী, এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এমনকি রাবেয়াও তার বোন নয়। যে কারণে তাকে আটক রাখা হয়েছে। পুলিশ আবুল কালামকেও খুঁজছে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে।’

তবে নিহত সালমার ‘কথিত’ স্বামী আবুল কালামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সকালে দেশের বাড়ি মাদারীপুরে আসছি। এ খুন কাজের ছেলে ফোরকান করছে। তাকে আমি অত বেশি চিনি না। তার সঙ্গে আমার কয়েকমাস আগে সদরঘাটে পরিচয়। সেখানে আমার ছোটখাট একটা পট্টির ব্যবসা আছে। সে সেগুলো দেখাশুনা করে, পাশাপাশি বাসার কাজকাম থাকলে সেগুলোও দেখে। তার বাড়ি ভোলায় এটুকু জানি। কিন্তু এটা জানি যে ওর অভিভাবক যে নানা, তিনি থাকেন কুমিল্লা আর মা থাকে চট্টগ্রাম।’

বোনে রাবেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাবেয়া আমার দূর সম্পর্কের বোন। আমার বাসায় বছর দুয়েক আগে থেকে মাঝে মাঝে আসতো। তারপর থেকে ভাই-বোন হিসেবে পরিচয়। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী পার হয়ে শানুয়া এলাকার ভেতরে।’

তবে আটক রাবেয়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে, তার গ্রামের বাড়ি বরিশালে নয়, শরীয়তপুরে এবং তারা ভাই-বোনও নয়। তাই তাদের সঙ্গে কি সম্পর্ক ছিল এবং কেনো এ হত্যাকাণ্ড এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গৃহকর্মী ওই তরুণের কি সম্পর্ক সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

এদিকে, হত্যার ঘটনায় নিহত সালমার মামা জাহাঙ্গীর হোসেন যাত্রাবাড়ী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। সালমার কথিত স্বামী আবুল কালামকে প্রধান এবং ফোরকান ও রাবেয়াকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় আসামি হিসেবে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ মামলা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানায় পুলিশ।

মামা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আবুল কালাম নাকি আমার ভাগ্নিকে গোপনে বিয়ে করেছে। কিন্তু আমরা এটার কিছু জানি না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি আমার ভাগ্নিকে আবুল কালাম খুন করিয়েছে ফোরকান ছেলেটারে দিয়ে, এর বাইরে আর কিছু জানি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাবেয়া নামের মেয়েটাকেও আমরা চিনি না। ঘটনা শোনার পর আমার মেরাদিয়া বাসা থেকে সেখানে ছুটে যায়। কিন্তু ঘটনাস্থলে থাকা রাবেয়ার সঙ্গে কোনো কথা বলতে দেয়নি পুলিশ। হয়তো তার সঙ্গে কথা বললে বিষয়টা সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানতে পারতাম। আমরা যেহেতু কিছুই জানতে পারিনি, তাই পুলিশ এখন ভরসা’, বলেন তিনি।

 

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা (ওসি) ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘এ ঘটনায় আটক নারী বলছে গৃহকর্মী ওই তরুণ হত্যা করেছে, কিন্তু কেনো সে এমন করেছে সে বিষয়ে কোনো কিছু বলতে রাজি হচ্ছেন না ওই নারী। তাই তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরইমধ্যে আমরা বেশ কিছু রহস্যজনক তথ্য পেয়েছি যা তদন্তের স্বার্থে এখনই বলা সম্ভব নয়।’

যাত্রাবাড়ী বিভাগের পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) মো. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। তাই এখনই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।’

 

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৩:০২:০৪