নদী ভাঙন: চোখের সামনেই বিলীন হয়ে গেল তিনতলা এই বাড়িটি
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
বাংলাদেশে পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙ্গনে তীরবর্তী নড়িয়া উপজেলায় শত শত ঘরবাড়ি ও বড় বড় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর ফলে চার হাজারেরও বেশি পরিবার সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েছে। সেখানে মুহূর্তে তিন তলা একটি ভবন ভেঙে পদ্মায় বিলীন হওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। শরীয়তপুর জেলায় প্রায় আড়াই লাখ মানুষের এই উপজেলাটিই এখন নদী ভাঙ্গনের কারণে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে বলে স্থানীয় লোকজন বলছেন। গত আড়াই মাস ধরে চলা নদী ভাঙ্গন পুরো উপজেলার মানুষের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করেছে। তারা অভিযোগ করেছেন,বছরের পর বছর নদী শাসন বা খনন না করায় এবার পদ্মা নদীর ভাঙ্গন অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক দেরিতে নদী শাসনের প্রকল্প অনুমোদনের পর এর কাজ শুরু করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন নদীর স্রোত কমা বা ভাঙ্গন বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। কয়েকদিন আগে সবার চোখের সামনে তিন তলা নীল একটি ভবন পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এই ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নে। ভবনটিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি ক্লিনিক ছিল। ভবনটির মালিকের ছেলে সোহেল হোসেন দেওয়ান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, দুই মাস আগে তাদের বসবাসের দোতলা বাড়ি প্রথমে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। তখন তারা নদী থেকে তিনশো মিটার দূরে তাদেরই একটি তিনতলা ভবনে উঠেছিলেন। সেটিও কয়েকদিন আগে নদীতে চলে যায়। সর্বশেষ তাদের ক্লিনিকের ভবনটিও নদীগর্ভে বিলীন হলো।

মি: দেওয়ান বলেন, এলাকায় তারা ছিলেন মোটামুটি অবস্থাপন্ন একটি পরিবার। কিন্তু নদী তাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।

"এখন তো আমাদের যে পরিস্থিতি,আগে আমরা দুই ডলা-ভাত ভালভাবেই খেতাম। এখন আমাদের খাওয়া দাওয়াই মুশকিল হয়ে যাবে। পথের ভিখারি হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের।"

নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বে চারতলা বাড়ি করে তাতে বার বছর ধরে বসবাস করছিল একটি পরিবার। সেই পরিবারের রোকসানা বেগম বলছিলেন, নদীগর্ভে বাড়ি হারিয়ে এখন তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

"বাড়ি ঘর যা ছিল সব শ্যাষ। আমার চারতলা বাড়ি ছিল,তাও শ্যাষ। অনেক কষ্ট করে বাড়ি ঘর করছিলাম। এখন আমার কিছুই নাই। থাকার কোনো রাস্তা নাই। অনেক কষ্ট এখন।"

নদী ভাঙ্গনের কথা বলতে গিয়ে রোকসানা বেগম আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। নড়িয়া উপজেলার বসবাসকারী বেশিরভাগ পরিবারের পুরুষ সদস্য বা কর্তারা কাজের জন্য ইটালি থাকেন বা থাকতেন।

তাদের পাঠানো অর্থে পরিবারগুলো তিন বা চারতলা বাড়ি করেছে। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেখানে এই পরিবর্তন হয়েছে। এমন অনেক বাড়ি নদী গর্ভে বিলীন হওয়ায় সেসব পরিবারের জায়গা হয়েছে রাস্তার ধারে। তাদের একজন আকলিমা বেগম বলছিলেন, এক রাতেই তাদের বসত নদীতে চলে যায়। এখন তারা রাস্তার ধারে টিনের ছাপড়া করে রয়েছেন।

আরেকজন নারী জোবেদা বেগম বলেছেন, তিনি তার ঘরের কোনো জিনিসপত্র সরানোর সুযোগ পাননি। চোখের সামনে এক দশকের বসত নদীতে বিলীন হওয়ার দৃশ্য তিনি ভুলতে পারেন না। শুধু বাড়ি ঘর নয়, স্কুল ভবন,বাজারসহ অনেক স্থাপনাই পদ্মায় হারিয়ে গেছে। এখন পুরো উপজেলাটিই হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

নড়িয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও সানজিদা ইয়াসমিন বলছিলেন,"আমাদের উপজেলার পৌরসভার একটা অংশ তো নদীগর্ভে চলেই গেছে। এখন আমাদের খাদ্য গুদামেরও খুব কাছে নদী। আমার হেডকোয়ার্টার থেকে আধা কিলোমিটারের মধ্যে নদী। মূলফৎগঞ্জ নামের একটি বাজার আছে,এই বাজারের একাংশে এখন নদী। সেখানেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।"

স্থানীয়ভাবে নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সেই আন্দোলনের আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ বলছিলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জেরে নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করছে বলে তারা ধারণা করছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সেকারণে এ বছর ভাঙ্গন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

"অনেক আগে যখন ভাঙছে, একবার ভাঙলে, তিন চার বছর আর ভাঙ্গে নাই। কিন্তু এবার যে ভাঙতেছে, সেটা হচ্ছে, শিমুলিয়াতে এখন একটা ডকইয়ার্ড করেছে। সেখানে আগে পুরোপুরি নদী ছিল। পদ্মা সেতুর জন্য ভরাট করে ঐ ডকইয়ার্ডটা করেছে। সেজন্য ভাটির দিকে চর পড়েছে। ফলে নদী তার গতি পরিবর্তন করে নড়িয়া এবং জাজিরার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।"

তবে এমন বক্তব্য মানতে রাজী নন পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় এবং ঢাকার কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, ঐ অঞ্চলে ভাঙ্গন রোধে নদী শাসনের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন পেতে দুই বছর সময় লেগেছে।

এখন তাৎক্ষণিকভাবে বালুর বস্তা ফেলে নদীর ভাঙ্গন কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আর প্রকল্পের কাজ শুরু করার জন্য তারা ভাঙ্গন বন্ধ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন। -বিবিসি বাংলা

০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:০৪:১৬