সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়েছে যে বাস্তব
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
এই সেই রেলস্টেশন যেখান থেকে হারিয়ে গিয়েছিল শিশু রাহুল
অনেক দিন আগে ভারতের রাজধানী দিল্লির লাহোর গেইট এলাকা থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো ৩ বছরের এক শিশু। দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ তাকে খুঁজে বের করতে বহু চেষ্টা চালিয়েছিল। মাইকিং পোস্টারিং কিছুই বাদ যায়নি। এমনকি তার জন্য ৫০ হাজার টাকার পুরস্কার পর‌্যন্ত র্ঘোষণা করেছিল তার পরিবার। কিন্তু ছেলেটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। কোনোভাবেই তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। এরপর দীর্ঘ ৬ বছর কেটে গেছে। এতদিন পর হঠাৎ করেই খোঁজ পাওয়া গেছে সেই ছেলেটির। আর তাকে খুঁজে পাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি যেন বাস্তব নয়, কোনো বলিউড ছবির দৃশ্যায়ন। চলুন তাহলে শুনে নেয়া পুরো ঘটনাটি।

যেভাবে হারিয়ে গিয়েছিল শিশুটি

ধরা যাক ছেলেটির নাম রাহুল। থাকতো ভারতের রাজধানী দিল্লির লাহোর গেইট এলাকার ডিআরপি লেন সংলগ্ন বস্তিতে। ২০১২ সালের ২১ মে। রোজকার মত রেললাইনের পাশে খেলতে গিয়েছিল সে। কিন্তু এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা দিল্লি পুলিশকে ঘটনাটা জানায়। পুলিশ গোটা দিল্লি শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছেলেটিকে উদ্ধার করতে পারেনি। তারা আশপাশের প্রদেশগুলোতেও অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু এতেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, হয়তো খেলতে খেলতে কোনো ট্রেনে উঠে গিয়েছিল শিশুটি। এরপর আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। যাই হউক এক পর্যায়ে এই মামলাটি ক্লোজ করে দেয় দিল্লি পুলিশ।

একটি রহস্যময় ফোন

ইতিমধ্যে ৬ বছর কেটে গেছে। ছেলেকে ফিরে পাবার আশা ত্যাগ করেছেন রাহুলের বাবা-মা। গত বুধবার (২০ জুন) একটি ফোন পায় দিল্লি পুলিশ। ফোনে এক লোক তাদের জানায়, নিখোঁজ রাহুলের মত দেখতে একটি ছেলে তাদের কাছে রয়েছে। তার বয়স ৯ বছর। তারা থাকে পাঞ্জাবের কাপুরথালা জেলার হুসেইনপুর শহরে। খবর পেয়ে ওইদিনই ছেলের বাবাকে নিয়ে পাঞ্জাবের উদ্দেশে রওয়ানা হয় দিল্লি পুলিশের একটি দল। ৬ বছর একটি শিশুর জন্য বড় দীর্ঘ সময়। এতদিনে তার চেহারা আর আচার আচরণ পুরাই বদলে যায়। তাই ছেলেকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেননি রাহুলের বাবাও। কিন্তু তার কপালের কাটা দাগ আর ফেইসকাটিং দেখেই নিশ্চিত হন, এটাই তার হারিয়ে যাওয়া সন্তান।

যেভাবে পাঞ্জাব গিয়েছিল রাহুল

দুই বছর আগে স্ত্রী আর দুই ছেলেকে নিয়ে রেলে ভ্রমণ করছিলেন বিহারের বাসিন্দা সঞ্জয়। তারা বিহারের কিউল রেলস্টেশনে রাহুলকে দেখতে পায়। ৭ বছরের শিশুটি তখন একা একাই রেলস্টেশনে ঘুরাঘুরি করছিলো। ছেলেটিকে দেখে সঞ্জেয় ও তার স্ত্রীর খুব মায়া হয়। তারা তাকে খাবার দেয় এবং তার বাড়িঘর ও পরিবার সম্পর্কে জানতে চায়। রাহুল তাদের জানায়, তার এই দুনিয়ায় কেউ নেই। সে একাই থাকে, এই রেলস্টেশনই তার ঘরবাড়ি। তখন তারা ছেলেটিকে বলে: তুমি কি আমাদের সঙ্গে যাবে, আমাদর কাছেই থাকবে। নিজের ছেলের মতই রাখবো তোমাকে। এতদিন আমার ছিল দুই ছেলে। তোমাকে নিয়ে তিন ছেলে হবে আমার।’

এক কথায় রাজি হয়ে যায় রাহুল। সঞ্জয়ের সঙ্গে তার বাড়িতে চলে আসে। বিহারে এক মাস থাকার পর সপরিবারে পাঞ্জাবের হোসেনপুর চলে আসেন সঞ্জয়। সেখানে তিনি এক কারখানায় কাজ করেন। রাহুলও তাদের সঙ্গে পাঞ্জাব চলে যায়। অবশ্য পাঞ্জাব আসার আগে রাহুলকে তার পরিবারের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন সঞ্জয়। কিন্তু তার সে চেষ্টা সফল হয়নি। রাহুল তো তার বাড়িঘরের কথা কিছুই বলতে পারে না। এখন সঞ্জয়ের পরিবারই তার পরিবার। একেবারে নিজ সন্তানের মতই রাহুলকে রেখেছিল এই পরিবারটি।

সঞ্চয়ের প্রতিবেশী মিন্তা দেবী (৫৫) এ মাসেই দিল্লিতে আসেন। এসময় নয়াদিল্লির রেলওয়ে স্টেশনের দেয়ালের গায়ে সাঁটানো কিছু পুরনো পোস্টার তার নজরে আসে। সে পোস্টারগুলো ছিল শিশু রাহুলের নিখোঁজ সংবাদ। গত ৬ বছর ধরে ঝুলছে পুরনো পোস্টারগুলো। পোস্টারের ছেলেটার সঙ্গে রাহুলের চেহার বেশ মিল আছে দেখে মিন্তা দেবী তার মোবাইলে পোস্টারের ছবি তুলে নেন। পাঞ্জাবে ফিরে তিনি সেটা সঞ্জয়কে দেখান। এরপরই দিল্লি পুলিশকে ফোন করের সঞ্জয়।

কিছুই মনে নেই নেই রাহুলের

হারিয়ে যাওয়ার ৪ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬ সালে রাহুলকে খুঁজে পেয়েছিলেন সঞ্জয়ের পরিবার। এরপর প্রায় দু বছর ধরে তাদের সঙ্গেই থাকছে সে। কিন্তু এর আগে ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত কোথায় ছিল, কার কাছে ছিল, বিহার আসলো কীভাবে কিংবা কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল সে? এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। কেননা ওই ৪ বছরের কোনো কথাই মনে করতে পারছে না রাহুল। এখন সে অধীর আগ্রহে কেবল বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছে। কিছু আনুষ্ঠানিকতা  শেষ করার পরই রাহুলকে চাইল্ড ফেয়ার কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে পুলিশ। রাহুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়ার কাজটি করবে এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার সুখআমেজে বিভোর রাহুলের বাবা-মা।

সূত্র: এনডিটিভি

 

২৩ জুন, ২০১৮ ১২:১৮:৩৬