ভালোবাসা আর দয়া এক নয়
আশা নাজনীন
অ+ অ-প্রিন্ট


মাত্র ফ্লাইট থেকে নেমে ইতালিতে ইমিগ্রেশন পার হচ্ছি। হঠাৎ পেছনে কেমন একটা অস্বাভাবিক কিছু ফিল করতে লাগলাম। দেখি আমার পেছনে দাঁড়ানো লোকটা তার প্যান্টের জিপার খুলে আমার গায়ের সঙ্গে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি চিৎকার করে একটা লাফ দিয়ে লাইনের বাইরে চলে এলাম। আমার সামনে দাঁড়িয়ে শুভ (আমার স্বামী) একটা ফরম পূরণ করছিল, সেসহ লাইনে দাঁড়ানো আচমকা সব লোক ওই লোকের দিকে তাকাল। লোকটা জিপার সঙ্গে সঙ্গে আটকে ফেলল।

একটা ফরাসি ভদ্রলোক (উচ্চারণ শুনে মনে হল) বলল, সিকিউরিটিকে ইনফর্ম করতে যাচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে লোকটা এসে শুভর পায়ে ধরল, কান্নাকাটি করতে লাগল।

এরই মধ্যে সিকিউরিটির লোক চলে এল। শুভ বলে, ‘আশা মাফ করে দাও, লোকটা বাংলাদেশি, জমিজমা বিক্রি করে ইতালিতে ঢুকছে লেবার হিসেবে। কত গরিব দেখেই তো বুঝছ, যদি জেলে ঢুকে, এক যুগের আগে বের হতে পারবে না।’

‘দেশে এর বাবা, মা না খেয়ে মরবে। অন্য সময় হলে তাও একটা কথা ছিল। কিন্তু আমাদের একটা বেবি হবে। কাউকে শাস্তি দেব, পরে হয়তো আমাদের খারাপ লাগবে ওর পরিবারের কথা ভেবে। বাচ্চার দিকে তাকায়া দয়া কর লোকটাকে, প্লিজ …।’



-‘না, অ্যাকশনে যাব, এভাবে এদের ছেড়ে দিলে এদের কোনোদিন শিক্ষা হবে না।’

—“কিন্তু কালকে তো খবরের কাগজে শিরোনাম হবে, ‘প্রেগন্যান্টনারীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার’। দেশ থেকে লেবার আসা বন্ধ হয়ে যাবে, ব্লা ব্লা ...।”

এয়ারপোর্ট সিকিউরিটিকে বললাম, আসলে ‘মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং' হয়েছে, আশপাশের সবগুলো লোক বিরক্ত ও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। আমার দিকে করুণ চাহনি নিয়ে তাকিয়ে থাকা ফ্রেঞ্চ লোকটার চেহারা আমি আজ পর্যন্ত ভুলিনি।

ইমিগ্রেশন পার হয়ে একটা ওয়াশ রুমে গেলাম, আমি বের হয়ে লাগেজ এর কাছে দাঁড়িয়ে, তখন আবার শুভ ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকছে। এই সময় আমার সামনে দিয়ে জিভ বের করে ঠোঁট চাটতে চাটতে ওই বাংলাদেশি লোকটা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল। আর তাঁর নিম্নাঙ্গ আরেকবার দেখানোর চেষ্টা করল।

এত কুৎসিত সেই অভিজ্ঞতা। কষ্টে এইবার আমি আর কোন টু শব্দ করতে পারিনি। শুভ বের হয়ে দেখে হাউমাউ করে আমি কাঁদছি।

প্রায়ই কয়েক বছর আগের পুরানো এই ঘটনার কথা মনে পড়ে। ভাবি প্রেগন্যান্ট না থাকলে ওইদিন এক দৌঁড়ে গিয়ে ওর কলার চেপে ধরে ওই মুহূর্তে জেলের ভাত খাওয়াতাম।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রেগন্যান্ট ছিলাম না, এমন বহুদিন অবস্থায় এই ধরনের হ্যরাসমেনটের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেইনি।

প্রতিবারই নানারকম- মানবিক দিক হাজির হয় অপরাধীর। মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাবে, বাবা মা না খেয়ে থাকবে। অভিযোগ করলে চাকরি চলে যাবে, বিনা চিকিৎসায় মেয়ে মরে যাবে। আর আমরা (আমি) ক্ষমা করে দেই।

ওইদিন গরিব বাঙালি বলে দয়া পাওয়া লোকটা যদি ভাবে আমি ভালোবেসে লোকটাকে জেলের ভাত খাওয়াইনি, তবে এটা হচ্ছে ‘ফ্যান্টাসি’।

আর আমার এই ক্ষমা বা দয়া করাকে যদি আপনারা কোনোদিন এসে প্রতিষ্ঠিত করেন ওই লোকের প্রতি ‘ভালোবাসা’ হিসেবে, এটা হচ্ছে এক ধরনের ম্যনিউপুলেশন, মিস ইন্টারপ্রিটেশন। এটা বরং মানুষ হিসেবে আমাদের দুর্বলতা।

আমরা দুইজনে মিলে বহুবার এই একই ভুল বা ‘দয়া’ করেছি, করে যাচ্ছি। তবু আবারো বলছি, love আর Mercy এক জিনিস না।

‘লাভ’ হচ্ছে আমি একজনের জন্য জীবন দিয়ে দিতে রাজি। আর দয়া হচ্ছে- ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় বিপদগ্রস্ত লোকদের উদ্দেশ্যে সহায়তার হাত বাড়ানো। কিংবা সে যেই রেসপন্স ডিজার্ভ করে না, তাঁর প্রতি সেটা করা।

এই দয়াকে যদি ভালোবাসা বলেন, তবে মেয়েদের যৌন হয়রানি করাকেই পুরুষ লোক ‘ভালোবাসা’ বুঝতে শিখবে। লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি

সূত্র: লেখকের ফেসবুক স্ট্যাটাস

 


০৬ জুন, ২০১৮ ১৯:৪৪:০৩