জীবনটা যেনো এক টাইপরাইটার...
লুৎফর রহমান রিটন
অ+ অ-প্রিন্ট
আমাদের ওয়ারির তিনতলা বাড়িটা একসময় টিনশেডের ছিলো। এখনও বাড়ির একটা অংশে টিনশেডই বহাল আছে। এর কারণ--কনস্ট্রাকশনের সময় ওই টিনশেড অংশেই আমরা পুরো পরিবার থাকতাম গাদাগাদি করে। এবং সেই গাদাগাদি পরিস্থিতিতেও গ্রাম থেকে আত্মীয়-স্বজনরা আসতেন, থাকতেন দিনের পর দিন। বিল্ডিং নির্মাণ হয়ে গেলে আমরা সবাই উঠে গেলাম পাকা দালানে কিন্তু ওই টিনশেডটাকে আর পাকা করা হলো না। ভাড়াটে পরিবার এসে উঠে পড়লেন তড়িঘড়ি। ব্যাস, সিস্টেমের ফাঁকে পড়ে গেলো বেচারা টিনের ঘরটা।

যখন আমাদের বাড়িটা 'পাকা' হয়নি, অর্থাৎ কিনা যখন আমাদের পুরো বাড়িটাই টিনশেডের তখন আমাদের বাড়িতে একজন লজিং টিচার ছিলেন। ছোটখাটো শরীরের মোটামুটি সুদর্শন এক তরুণ। অতিশয় ভদ্র এবং সজ্জন মানুষ। কথা বলতেন খুবই অনুচ্চ স্বরে। খুব কাছে না থাকলে শোনাই যায় না এমন নিম্নকণ্ঠে তিনি কথা বলতেন মাটির দিকে তাকিয়ে। মাসের পর মাস আমাদের বাড়িতেই আছেন কিন্তু কখনোই অন্দর মহলে প্রবেশ করেননি কিংবা সামান্য উঁকিও দেননি। আমাদের বাড়িতে লজিং থাকা অবস্থাতেই তিনি এমএ ডিগ্রি হাসিল করলেন। অতঃপর চাকরি খোঁজা পর্বেও তিনি থাকলেন আমাদের পরিবারের সঙ্গেই। বিনয়ী এবং ভদ্র হাসিখুশি এই মানুষটা আমার জীবনে দেখা অদ্ভুৎ এক চরিত্র।

আমাদের টিনশেড আমলের এক দুপুরে ঘটলো একটা দুর্ঘটনা। বালিকা বয়েসী কাজের মেয়েটা এক ডেকচি গরম পানি আমার কিশোরী বড় বোনটার গায়ে ঢেলে দিলো। বোনটার শরীরের একটা অংশ গেলো ঝলসে। ওর চিৎকারে আমরা হতচকিত। বাবা অফিসে। কী করি কী করি! কাজের মেয়েটার ওপর বিপুল নিপীড়ন করা হলো। সন্দেহ করা হলো--সে ইচ্ছে করেই গরম পানি ঢেলে দিয়েছে বোনটার গায়ে। কিন্তু মেয়েটা কিরা-কসম কেটে কাঁদতে কাঁদতে দাবি করতে থাকলো--এটা ইচ্ছাকৃত নয়।(এটা ইচ্ছাকৃতও হয়ে থাকতে পারে। কেনো না কাজের মেয়ের ওপর নির্যাতন আমাদের পরিবারের রেগুলার প্র্যাক্টিস ছিলো। নিয়মিত নির্যাতনের শিকার বাচ্চা একটা মেয়ে হঠাৎ প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠতেই পারে।)

আমাদের লজিং টিচার নাদের ভাই অনুচ্চ কণ্ঠে উদ্বেগ নিয়ে জানতে চাইলেন--কী হয়েছে?

গরম পানিতে বোনটার শরীর ঝলসে গেছে শুনেই ভদ্রলোক দ্রুত বেড়িয়ে গেলেন। ফিরলেনও খুব দ্রুত। ডিসপেন্সারি থেকে একটা 'বার্নল' ক্রিম এনে আমাদের হাতে দিয়ে বললেন--এটা এক্ষুণি ঝলসে যাওয়া অংশে লাগিয়ে দিতে হবে।

এবং সত্যি সত্যি ম্যাজিকের মতো কাজ করলো ক্রিমটা। কমলা রঙের ক্রিমটা শরীরের জ্বলে যাওয়া অংশে ব্যাবহারের পর বোনটা বললো, জ্বলুনি কমেছে। অনেক ঠান্ডা-শীতল একটা প্রলেপ মাখিয়ে দিয়েছে যেনো ক্রমটা। সেই থেকে আমাদের পরিবারে 'বার্নল' ক্রিমটা একটা জরুরি মেডিসিন হিশেবে রাখা শুরু হয়েছিলো।

এবং এই ঘটনার পর, অন্দর মহলে প্রবেশ না করা আমাদের লজিং টিচারের মর্যাদাও অনেক বৃদ্ধি পেলো। একদিন শুনলাম, খুব বিনয়ের সঙ্গে নাদের ভাই বাবাকে বলছেন, আজ দুপুরে একটা চিঠি এসেছে। গ্রামের বাড়ি থেকে আব্বা আসতে চান আমাকে দেখতে। দু'দিন থাকবেন তিনি। আপনাদের অসুবিধে হবে জানি। তারপরেও আপনারা রাজি থাকলে আমি চিঠি লিখে জানাবো আব্বাকে।

আমার বাবা সানন্দে রাজি হলেন, বলেন আপনার আব্বাকে চলে আসতে। কোনো অসুবিধে হবে না আমাদের। তিনি আমাদের অতিথি হবেন এটা তো আনন্দের কথা।

এক বিকেলে আমাদের লজিং টিচারের বাবা এলেন। লম্বা শুভ্র দাঁড়ি আর টুপি শোভিত লোকটা দেখতে অনেকটা হুজুরদের মতো। শাদা লম্বা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরা অতি সজ্জন সেই ভদ্রলোক আমাদের জন্যে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন বিশাল সাইজের এক ডজন সাগর কলা। সত্যি বলতে কি এতো বড় সাইজের সাগর কলা আমি জীবনেও দেখিনি। আর এনেছেন বেশ অনেকগুলো বড় সাইজের চিংড়ি। এতো বড় চিংড়ি এর আগে আমাদের বাড়িতে কখনোই কেনা হয়নি। অর্থাৎ আমাদের ঠাটারি বাজারেও এতো বড় চিংড়ি পাওয়া যেতো না।

সেই চিংড়ি ভাজা হলো। পুরো বাড়ি চিংড়ি ভাজার গন্ধে একেবারে মাতোয়ারা হয়ে উঠলো। রাতে খাওয়ার সময় আমার পাতে জুটলো ডাঁসা একপিস মাথা। ভাজা মাথাটা আমিই পছন্দ করে নিয়েছি। মা জিজ্ঞেস করেছিলো কোনটা চাই, মাথা নাকি বাকি অংশ? আমি বেছে নিয়েছি মাথাকে। ওই মাথার মধ্যে ছিলো মগজ ঠাঁসা। আহা কী যে অপূর্ব স্বাদ সেই মগজের! প্লেটের পুরো ভাত কেমন রঙিন হয়ে উঠেছিলো! ওই স্বাদ আজো লেগে আছে স্মৃতির জিহবায়। পরবর্তী জীবনে পৃথিবীর নানা দেশে এতো এতো লবস্টার খেলাম কিন্তু হোমনা বাজার থেকে লজিং টিচারের বাবার আনা চিংড়ির সেই স্বাদ এখনো অপরাজিত চ্যাম্পিয়নের শিরোপা ধারণ করে আছে!

লজিং টিচারের বাবার আমন্ত্রণে এরপর আমরা পুরো পরিবার তাঁদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতেও গিয়েছি। এক ধরণের আত্মীয়ই হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা। অনেক পরে আমাদের লজিং টিচারের বিয়েতেও আমরা পুরো পরিবার আমন্ত্রিত হয়েছিলাম গ্রামের বাড়ির বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতায়। আহা কী অসাধারণই না ছিলো সেই বিয়ের উৎসবের নিয়ম কানুন আর খানাখাদ্যি! সব ছাপিয়ে সেই আনুষ্ঠানিকতায় নানান ধরণের অচেনা পিঠা আর মিষ্টি খাওয়ার স্মৃতিই আমার মধ্যে জাগরুক হয়ে আছে আজও।

লজিং টিচারের বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁর স্ত্রী আমাদের ভগ্নি হয়ে উঠলো। তিনি হলেন আমাদের দুলাভাই। আমার বাবা সম্ভবত উকিল শশুরের পদমর্যাদায় অভিসিক্ত হয়েছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। এরপর থেকে লজিং টিচার নাদের ভাই আমাদের দুলাভাই হয়ে গেলেন। এবং সত্যি বলতে কি, আপন দুলাভাইয়ের চাইতেও অধিক প্রিয় ছিলেন তিনি আমাদের কাছে। তিনি আমাদের ভাইবোনদের দল বেঁধে সিনেমা দেখাতেও নিয়ে যেতেন।

নাদের ভাই যখন আমাদের টিনশেডের বাড়িতে লজিং ছিলেন, পড়াশুনার পাশাপাশি চাকরি খুঁজছেন, তখন, আমার বাবা তাঁকে চমৎকার একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলেন। কাজটা ছিলো পার্ট টাইম। তাঁর হাতের লেখা ছিলো মুক্তোর মতো ঝকঝকে এবং আর্টিস্টিক। আমার বড় মামা ছিলেন ঢাকা বোর্ড অফিসের(টেক্সট বুক বোর্ড) কন্ট্রোলার। সুন্দর হস্তাক্ষরের কারণে বড় মামাকে ধরে আমার বাবা তাঁকে জুটিয়ে দিলেন সার্টিফিকেট লেখার কাজ। তখন মুদ্রিত ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের নাম ইত্যাদি সুন্দর হস্তাক্ষরে উৎকীর্ণ হতো। এবং নাদের ভাইয়ের চমৎকার ইংরেজি হাতের লেখার গুণে আমার বাবা তাঁকে পাসপোর্ট লেখার কাজও জুটিয়ে দিয়েছিলেন। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নান্দনিক হস্তাক্ষরে তিনি ওইসব লিখে দিতেন। বিনিময়ে মোটামুটি ধরণের একটা সম্মানি তিনি পেতেন।

দিন যায়। মাস যায় বছর যায়।

নাদের ভাই গ্রামে থাকেন নিজের সংসার নিয়ে। মাঝে মধ্যে বেড়াতে আসেন আমাদের বাসায়, কখনো স্ত্রীকে নিয়ে, কখনো একা।

মাঝে কী যে হয় তাঁর! নানান কথা উড়ে আসে আমাদের বাড়িতে। আমরা জানতে পারি অতি সজ্জন ভদ্র ও বিনয়ী মানুষটা পালটে যাচ্ছেন দিনকে দিন। একদিন শুনলাম তিনি পলাতক জীবন যাপন করেন। তাঁর আব্বা এসে দুঃখ করে আমার বাবাকে জানিয়ে যান বদলে যাওয়া পুত্রের অবিশ্বাস্য কাহিনি। আমাদের দুলাভাই ডাকাত দলে নাম লিখিয়েছেন! হ্যাঁ, একটা সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য হিশেবে তাঁর নাম গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিলো!

মাঝে মাঝে দুলাভাই আসেন আমাদের বাড়িতে। অল্প কিছুদিন থাকেন। তারপর আবার চলে যান। যখন বুঝতে পারেন আমরা জেনে গেছি তাঁর গোপন কীর্তিকলাপ তখন আসা কমিয়ে দেন। কিন্তু আসেন প্রায়ই। কেনো আসেন? শুধুই কি পলাতক জীবনের নিরাপদ আশ্রয়ের অভিলাশে? না মনে হয়। মনের টানও ছিলো খানিকটা। তিনি আমাদের পরিবারের একজন নিয়মিত সদস্যই তো ছিলেন! আমার বড় ভাইকে তিনি একটু বেশিই পছন্দ করতেন। তারপর আমি ছিলাম তাঁর দ্বিতীয় পছন্দের। আমাকে খুবই ভালোবাসতেন।

এরমধ্যে একটা কাণ্ড ঘটলো। আমাদের একজন প্রাইভেট টিউটর আমাদের একটি বোনকে উদ্দেশ্য করে রাফ খাতায় 'কিছুমিছু' লিখেছিলো! সেই লেখাটা অভিভাবক মহলে ব্যাপক নিন্দা ও ধিক্কার কুড়ালো। লোকটা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো।লোকটাকে শাস্তি দিতে তৎপরতা শুরু হলো। লোকটা টের পেয়ে লজ্জিত হয়ে বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিলো। লোকটাকে চরম শিক্ষা দিতে বদ্ধ পরিকর আমার বাবার উস্কানিতে বড় ভাই দায়িত্ব নিতে বাধ্য হলেন। আমার বাবা মা বরাবরই দুর্বলের ওপর ক্ষমতা দেখাতে পছন্দ করতেন।প্রাইভেট টিউটর লোকটা অতিশয় দুর্বল ধরণের মানুষ। সব বিবেচনায়। সুতরাং শিক্ষা তো তাঁকে পেতেই হবে। ভরসার দূত হয়ে এই সময়ে আবির্ভূত হলেন সজ্জন দুলাভাই ওরফে ডাকাত দুলাভাই।

দুলাভাই এক দুপুরে বড় ভাই আর আমাকে নিয়ে প্রাইভেট টিউটরের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রি বিল্ডিং-এর উদ্দেশে রওনা হলেন। লোকটা সেখানেই চাকরি করে। দুলাভাইয়ের সঙ্গে একটা রিভলবার ছিলো। রেজিস্ট্রি বিল্ডিং-এর সামনে এসে আমি নেমে গেলাম রিকশা থেকে। আমি যাবো না ওপর তলায়। লঘু অপরাধে রিভলবার দেখিয়ে ভয় দেখানোর এই অপকীর্তিতে শামিল হতে মন সায় দিচ্ছিলো না। আমাকে নিচ তলায় রেখে ওরা দু'জন ওপর তলায় গিয়ে খুব ঠাণ্ডা মাথায় কার্য সমাধা করে ফিরে এলেন।

বিষয়টা ধামাচাপা পড়লো চিরতরে।

দু'দিন পর এক দুপুরে আমি একা একাই রেজিস্ট্রি বিল্ডিং-এ গিয়ে লোকটার সঙ্গে দেখা করলাম। খুবই ভালোবাসতেন তিনি আমাকে। টেবিলের সামনে আমাকে দেখেই কেমন অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন ভদ্রলোক। আমি তাঁকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করলাম। বললাম, সেদিন আপনার প্রতি সুবিচার করা হয়নি। আমি খুবই দুঃখিত স্যার। আমিও এসেছিলাম ওঁদের সঙ্গে। কিন্তু আপনার মুখোমুখি হইনি।

তিনি বললেন, দ্যাখ এতোকিছুর দরকার ছিলো না। মুখে বললেই হতো। আমারে পিস্তলও দেখাইছে!

আমি আবারো সরি বললাম। তাঁর চোখে কৃতজ্ঞার অশ্রু চিকচিক করছে দেখলাম। পরিস্থিতি হালকা করার জন্যে বললাম, স্যার চা খাওয়ান।

--তুই চা খাবি? আমার কাছ থেকে চা খাবি তুই? বলতে বলতে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন বিধ্বস্ত ভেঙে পড়া মানুষটা। ক্যান্টিনে গিয়ে চা আর সিঙ্গারা খেতে খেতে কতো যে গল্প করলাম আমরা! আমি একেকটা কথা বলি আর তিনি হাসিতে লটকে থাকেন। আমার সঙ্গে কথা বলে অপমানিত মানুষটা অনেক স্বাভাবিক হয়ে এলেন।

এরপরেও আরো কয়েকবার গেছি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।

লোকটা খুব দ্রুত বুড়ো হয়ে যাচ্ছিলেন! দারিদ্র্য তাঁকে বৃদ্ধে রূপান্তরিত করছিলো।

দিন যায়।

কিছুদিন পর আবারও এলেন আমাদের দুলাভাই। সেই ডাকাত দুলাভাই। পকেটে যার রিভলবার থাকে। আগেই বলেছি দুলাভাই আমাকে খুবই পছন্দ করতেন। আমার সঙ্গে অনেক গল্প হতো তাঁর। একদিন আমি আর তিনি কথা বলছি। আশপাশে আর কেউ নেই। হঠাৎ প্রশ্ন করলাম তাঁকে,

--আচ্ছা দুলাভাই, এই যে আপনি রাতে গ্রামে ডাকাতি করতে মানুষের বাড়িতে দলবলসহ হানা দেন, ভয় করে না আপনার?

তিনি বললেন, আরে নাহ্‌ কিসের ভয়? হাতে অস্ত্র থাকে না! অস্ত্রের শক্তি অনেক।

আমি বললাম, বাড়ির পুরুষ সদস্যরা আপনাদের ওপর পালটা হামলা করে না?

--আরে ধুর! কী যে বলিস! পুরুষরা বুদ্ধিমান। আমাদের উপস্থিতি টের পেলে তারপর হাতে অস্ত্র দেখলে পুরুষগুলো একদম চুপ মেরে যায়। আমরা প্রথমেই বলি--একদম চুপ। আওয়াজ করলেই গুলি। পুরুষগুলো কথা শোনে। একদম চুপ করে থাকে। পুরুষদের আমরা ভয় করিনা একটুও। আমাদের যতো ভয় --ওই মহিলাদের।

--কেনো? মহিলাদের ভয় কেনো?

--আরে ওই ফালতু মহিলাগুলার মাথায় নাই ঘিলু। হঠাৎ ঘরে ডাকাত দেখলেই চিৎকার শুরু করে। অস্ত্র তাক করে চুপ করতে বললেও চিল্লানি থামে না! কী বিপদ বল্‌তো! ঘিলুহীন অই বেক্কল মহিলাদের কারণে কতো যে বিপদে পড়তে হয়েছে! কয়েকবার তো ধরাই পড়ে যাচ্ছিলাম গ্রামবাসীর হাতে!

০০০

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়।

এক বিকেলে বকশী বাজার এলাকায় হঠাৎ দুলাভাইকে আবিস্কার করলাম টাইট একটা হাফ হাতা শার্ট পরা অবস্থায়, রিকশা চালকের আসনে! আমাকে দেখে লাজুক হেসে রিকশা সাইড করলেন। তারপর সিটে বসেই হাসিমুখে চিরাচরিত নিচুস্বরে কুশল বিনিময় করলেন। আমি যে তাঁকে রিকশাচালকের বেশে আবিস্কার করে বিস্ময়ের অকূল সমুদ্রে হাবুডুব খাচ্ছি সেটা বুঝতে পেরে দুলাভাই বললেন,

--ওঠ। রিকশায় ওঠ। কোথায় যাবি তোকে নামিয়ে দিয়ে আসি। ওয়ারি ছাড়া যেখানে বলবি নিয়ে যাবো।

--ওয়ারি ছাড়া কেনো?

--নারে ওয়ারি যাওয়া যাবে না। আমি কোনো প্যাসেঞ্জার নিয়ে ওয়ারি যাই না। যাবোও না কোনোদিন। আর শোন বাসায় কাউরে কইস না আমার সঙ্গে তোর দেখা হইসিলো! আর শোন আমাকে এই বেশে দেখে কষ্ট পাইস না। জীবনে বাঁচতে হলে মানুষকে কতো কী যে করতে হয়! কিছুতেই আমি রাজি হলাম না তাঁর রিকশায় চড়তে।

অনেকক্ষণ কথা বলার পর এক পর্যায়ে আমরা বিদায় নিলাম পরস্পরের কাছ থেকে। দুলাভাই একজন দক্ষ রিকশাচালকের মতো প্যাডেল মেরে রওনা হন আজিমপুরের দিকে। ক্রমশঃ অপসৃয়মান তাঁর রিকশার দিকে আমি অপলক তাকিয়ে থাকি দীর্ঘক্ষণ।

দুলাভাইকে আমার বাস্তবে দেখা কোনো স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হয় না। কোনো গড়পরতা মানুষ বলেও মনে হয় না তাঁকে। বরং তাঁকে জীবনঘনিষ্ঠ কোনো উপন্যাসের চরিত্র বলে মনে হয়। যে চরিত্রটি বহুমাত্রিকতার এক অনন্য উদাহরণ। যে চরিত্রটি জীবনকে উল্টেপাল্টে দেখতে চায়। জীবনটা তাঁর হীরকখণ্ড! আলোয় অন্ধকারে যে জীবনের হীরকখণ্ডটি দ্যুতি ছড়ায় নানান রঙের। এবং শেষমেশ এই চরিত্রটি আমাকে বাধ্য করে বিশ্বাস করতে যে--এই পৃথিবীর সবচে রহস্যময় প্রাণিটির নাম হচ্ছে মানুষ! সূত্র: ফেসবুক স্ট্যাটাস

 

 

২৫ মে, ২০১৮ ০১:২৪:৫০