ভিসিকে তার সন্তানের পিতা দাবি করে ঝিলিকের আর্তনাদ
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
অ+ অ-প্রিন্ট
গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) ভিসির বিরুদ্ধে চাকরির প্রলোভনে এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ উঠেছে। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন আফরিদা খাতুন ঝিলিক (১৯) নামে ওই নারী কর্মচারী। এমএলএসএস হিসেবে মাস্টার রোলে নিয়োগপ্রাপ্ত ঝিলিক গত রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভিসির অফিস কক্ষের সামনে তার দুগ্ধ পোষ্য শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে চিৎকার ও আর্তনাদ করে এ অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি ভিসিকে নিজের সন্তানের বাবা দাবি করেন। এদিকে গত ২২ এপ্রিল প্রাপ্ত ২১ মিনিটের একটি ভিডিও ক্লিপ ও গতকাল সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঝিলিক তার এক বছর বয়সী কন্যাসন্তানের পিতৃত্বের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। এ সময় তিনি ভিসিকে তার সন্তানের পিতা দাবি করে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এ সন্তান ওনার, এ সন্তানের সঙ্গে ওনার চেহারার অনেক মিল আছে।’

এ সময় ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দীন তার ভাড়াটিয়া লোকজন দিয়ে ঝিলিককে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে দীর্ঘ সময় আটকে রাখেন এবং বিভিন্ন প্রকার হুমকি দেন। এরপর ভিসির নারী কেলেঙ্কারির বিষয়টি টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়।

অন্যদিকে ভিসির কুকীর্তি ধামাচাপা দিতে একটি প্রভাবশালী মহল ওঠে পড়ে লেগেছে বলে জানা গেছে। কয়েকজন ‘কথিত’ সাংবাদিককে হাত করে গণমাধ্যমকে ম্যানেজ করার চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। মুখ না খুলতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে ভুক্তভোগী ঝিলিককে।

আফরিদা খাতুন ঝিলিকের ধারণকৃত ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন চাকরি দেয়ার কথা বলে তাকে বিভিন্ন সময় যৌন নির্যাতন করতে বাধ্য করেন। এ ছাড়া সম্পত্তি লিখে দেয়ার আশ্বাস ও ভালোবাসার ছলনায় প্রলুব্ধ করে দিনের পর দিন তার বাংলোয় রেখে তাকে ঝিলিকের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

এ বিষয়ে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে ঝিলিক বলতে থাকেন, ‘আজ আমি সবকিছু ফাঁস করে দেব’। খুলে দেব মানুষ নামের নরপশুর মুখোশ।’ এ ছাড়া ভিসিকে তার সন্তানের পিতা দাবি করে তার কাছে আরো অনেক ভিডিও ক্লিপ আছে বলে দাবি করেন ঝিলিক। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সহায়তা চান তিনি।

সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের ভূতপুর্ব জেলা প্রশাসক (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালক হিসেবে কর্মরত) মো. খলিলুর রহমান ২০১৬ সালে শেখ রাসেল দুস্থ পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, টুঙ্গিপাড়ায় অনাথ হিসেবে আশ্রিত ঝিলিককে পিতৃস্নেহে নিজের মেয়ে পরিচয় দিয়ে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি তার মেয়ে অনাথ ঝিলিককে বশেমুরবিপ্রবির ভিসির কাছে চাকরির ব্যাপারে অনুরোধ করেন। ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দীন তাকে নিজ বাংলোতে আশ্রয় দিয়ে মাস্টার রোলে চাকরি দেন। এরপর বিভিন্ন প্রলোভনে তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন ভিসি। এর এক পর্যায় ঝিলিক গর্ভবতী হয়ে পড়লে সন্তান নষ্ট করার জন্য ভিসি তাকে চাপ দেন। ঝিলিক তা করতে অস্বীকার করলে তাকে চোর অপবাদ দিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বাংলো থেকে বের করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ঝিলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত সোনাকুড় গ্রামে বাসা ভাড়া নিলে ভিসি তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ঝিলিককে মারপিট করায় এবং তাকে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলে। পরবর্তীতে একটি সমঝোতার মাধ্যমে ঝিলিককে প্রতি মাসে ৮ হাজার টাকা দেয়ার অঙ্গীকার করেন ভিসি। প্রতিমাসে ঝিলিকের ব্যবহƒত গ্রামীণ ফোন নম্বরে বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওই টাকা পাঠিয়ে দেয়া হতো। সর্বশেষ গত ২৪ মার্চ বিকাশের মাধ্যমে ঝিলিককে ৮ হাজার টাকা পাঠানো হয়। ভিসির আস্থাভাজন ও প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করতেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির নারী কেলেঙ্কারীর বিষয়টি নতুন কিছু নয়। গত বছর ৫ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘ভিসির বাসভবনে বিউটি পার্লার’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সময় সংবাদটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্প্রতি বিভিন্ন অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী অফিস সহকারীর সঙ্গে ভিসির অনৈতিক সম্পর্কের খবর প্রকাশ হয়। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন নারী শিক্ষকের সঙ্গেও ভিসির অনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জনশ্রুতি রয়েছে।

এ বিষয়ে ভিসি মুঠোফোনে বলেন, ‘আল-আমিন সিকদার (কুটু) নামে এক ব্যক্তি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির আবেদন করেছেন। কিন্তু তার চাকরি না হওয়ায় তিনি ঝিলিককে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করাচ্ছেন, আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য।’

২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০৯:৫০:২১