ভালো কাজে পুলিশ, মন্দ কাজে পুলিশ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
বাংলাদেশে এখন চলছে পুলিশ সপ্তাহ৷ প্রথম দিনেই পুলিশের ১৮২ জন সদস্যকে সাহসিকতার জন্য দেয়া হয়েছে পুলিশ পদক৷ আবার একই সময়ে কয়েকটি নেতিবাচক ঘটনায় সমালোচিতও হচ্ছে পুলিশ৷ অথচ পুলিশের সাহস আর সেবার দিকটিই দেখতে চান নগারিকরা৷

পুলিশ সপ্তাহ শুরু হয়েছে ৮ জানুয়ারি৷ শেষ হবে ১৫ জানুয়ারি৷ রাজারবাগ পুলিশ লাইনস-এর পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী৷ সেই অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা বিভিন্ন সাহসী ও সেবামূলক কাজের জন্য ১৮২ জন পুলিশ সদস্যকে নিজ হাতে পদক তুলে দেন৷ এরমধ্যে সর্বোচ্চ পদক হলো বাংলাদেশ পুলিশ পদক(বিপিএম)৷ আর সেই পদক পেয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সোয়াট টিমের তরুণ কনেষ্টবল সৌরিদ হোসেন৷ তিনি হুইল চেয়ারে বসে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই পদক নেন৷ সৌরিদ হোসেন ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘গত বছরের ১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে জঙ্গি বিরোধী অভিযানে আমি অংশ নিই৷ আত্মঘাতী জঙ্গিরা আমার সামেনেই গ্রেনেড বিফোরণ ঘটালে আমার বাঁ পায়ের হাড় ভেঙ্গে যায়, বাঁ হাতের একটি আঙুল উড়ে যায়, মুখের চোয়াল এবং কয়েকটি দাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়৷ চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসার পর এখন ঢাকার পুলিশ হাসপাতালে আমার চিকিৎসা চলছে৷ চিকিৎসকরা বলেছেন আমি পুরোপুরি সুস্থ হবো, তবে সময় লাগবে৷''

সৌরিদ বলেন, ‘‘আমার শারীরিক কষ্ট আছে৷ আবার গৌরবও হয়৷ কারণ, আমি দেশের জন্য, দেশের  মানুষের জন্য কাজ করেছি৷ পদক নেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমার চিকিৎসার সব দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়েছে৷''

আরেক প্রশ্নের জবাবে পুরষ্কৃত এই পুলিশকর্মী বলেন, ‘‘জীবনবাজি রেখে ভয়-ভীতির উর্ধে উঠেই পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে৷ ভয় পেয়ে কী হবে, যা হবার তা তো হবেই৷''

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সহকারি পুলিশ কমিশনার অহিদুজ্জামান নুরও এবার বাংলাদেশ পুলিশ পদক পেয়েছেন৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমি জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ব্যক্তিগত অবদানের জন্য এই সর্বোচ্চ পুলিশ পদক পেয়েছি৷ ঠিক কী কাজটি করেছি তা টেকনিক্যাল কারণে বলা যাবে না৷ তবে এটুকু বলা যায় যে, আমি জঙ্গিবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ করি৷ এই সময়ের উল্লেখযোগ্য যে জঙ্গিবিরোধী অপারেশন হয়েছে, তার মধ্যে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সিলেটের আতিয়া মহল, চাপাইনবাগঞ্জ, সর্বশেষ ঢাকার পান্থপথের অলিও হোটেল জঙ্গিবিরোধী অভিযানের সাফল্যে আমার ব্যক্তিগত অংশগ্রণ এবং অবদান আছে৷''

তিনি আরেক প্রশ্নে জবাবে বলেন, ‘‘বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা এখন জঙ্গিবাদ৷ এটা পুরোপুরি নির্মূলে আমি কাজ করতে চাই৷''

এই ১৮২ জনের বাইরেও বাংলাদেশে আরো অনেক পুলিশ সদস্য আছেন, যাঁদের সেবা এবং পেশাগত দক্ষতা প্রশংসনীয়৷ কিন্তু পুলিশ সপ্তাহ চলাকালেই ডিএমপি' অতিরিক্ত কমিশনার ডিআইজি মিজানুর রহমানের ঘটনা দেশের মানুষকে বিস্মিত করেছে৷ তিনি এক নারীকে দ্বিতীয় বিয়ের পর উল্টো তা অস্বীকার করে প্রতারণার মামলা দিয়ে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন৷ ওই নারীর অপরাধ, তিনি বিয়ের ঘটনা ডিআইজি'র কথামতো গোপন রাখেননি৷ সংবাদ মাধ্যমে এ খবর আসার পর তাকে অবশ্য প্রত্যাহার করা হয়েছে৷ তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে৷

মঙ্গলবার খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় একটি পুলিশ ফাঁড়ির ১২ কনস্টেবল ও এক এএসআইকে প্রত্যাহার করা হয়েছে৷ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছেন৷ আর এর প্রতিবাদ করায় তারা ওই ছাত্রী ভাইকে মারধর করেছেন৷

একই দিনে ঝিনাইদহের মহেশপুর থানার একজন এসআইসহ চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয় ৬৫ পিস ( সাড়ে ছয় কেজি) সোনার বার ডাকাতির অপরাধে৷ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে তারা মহেশপুরের সুন্দরপুর নামক স্থানে সোনারতরী পরিবহন নামে একটি বাসে অভিযানের নামে ওই সোনার বার ডাকাতি করে৷

২০১৬ সালে প্রায় ১৩ হাজার ৬শ' পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপরাধ ও অপকর্মের অভিযোগ আনা হয়৷ চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ১শ' জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে৷ এসব অভিযোগের বেশিরভাগই কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে৷ পুলিশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসূত্র, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগই বেশি৷

পুলিশ সদর দপ্তরের সিকিউরিটি সেলের তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে পুলিশের বিরুদ্ধে ৭২১টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে৷ এই মামলাগুলোতে ৭৯৮ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ এদের মধ্যে শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই পুলিশের বিরুদ্ধে মোট ১২৮টি মামলা দায়ের হয়৷

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘পুলিশ সপ্তাহে মূলত পুলিশের সারা বছরের কাজের হিসাব এবং পরবর্তী বছরের কাজের নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়৷ আগের বছরে কাজে কোনো ভুল বা সীমাবদ্ধতা থাকলে তা কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নির্ধারণ করা হয়৷ আর দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিরও পরামর্শ নেয়া হয়৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘যাঁরা সাহসিকতার জন্য পদক পান, তাঁরা যেমন উৎসাহিত হন, কাজের স্বীকৃতি পান, তেমনি অন্য পুলিশ সদস্যরাও উদ্বুদ্ধ হন৷ আর পুলিশে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়েন, তা সত্য৷ কিন্তু এর দায় দায়িত্ব তাদের নিজেদের৷ পুলিশ বাহিনী তাদের দায়-দায়িত্ব নেয় না, নেবেও না৷'' -ডয়েচেভেলে

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ১০:০৪:৪২