সাক্ষাৎকার
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ওয়াহিদ অ্যানিমেশনে তুলে ধরবেন ‘একাত্তরকে'
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
ওয়াহিদ ইবনে রেজা
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো তুলে ধরতে পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে যাচ্ছেন ওয়াহিদ ইবনে রেজা৷ চলচ্চিত্রটি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন ডয়চে ভেলের সঙ্গে৷

ডয়চে ভেলে: একাত্তর নিয়ে অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র তৈরির ভাবনা কীভাবে এলো?

ওয়াহিদ ইবনে রেজা: আসলে গল্পটা আমার মাথায় আসে ৫-৬ বছর আগে৷ এতদিন আগে থেকে আমি চরিত্রগুলো নিয়ে ভেবেছি, গল্পটা কেমন হবে সেটা নিয়ে ভেবেছি৷ আমাদের দেশে আপনি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমাগুলো যদি দেখেন, আমরা বৃহৎ পরিসরে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণ করতে পারি না৷ বড় পরিসরে গল্প বলাটা খুব কঠিন এবং ব্যয়বহুলও৷ তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যখন চলচ্চিত্রগুলো হয় ছোট ছোট গল্প নিয়ে হয়৷ তাই আমি চিন্তা করলাম যদি ‘গ্র্যান্ড স্কেলে' গল্প বলতে যাই, তাহলে অ্যানিমেশনটা আমাদের জন্য সোজা হবে, কারণ অ্যানিমেশনে চাইলে আমরা অনেক কিছু করতে পারবো৷ আমরা পুরোনো দিনের রাস্তা দেখাতে পারবো, আমাদের ‘আইকনিক ফিগার' দেখাতে পারবো, যেটা হয়ত লাইভ অ্যাকশনে দেখাতে পারবো না৷ তুলনামূলক ভাবে এতে কষ্ট কম হবে, আর্টিস্টিক হবে এবং নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে বাচ্চারা এ থেকে অনুপ্রাণিত হবে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারবে৷ অ্যানিমেশনের ফলে তাদের মধ্যে এটা দেখার আগ্রহ বেশি হবে৷

চলচ্চিত্রের গল্পটা কোথা থেকে নেয়া হয়েছে?

আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা৷ আমি আব্বুজির কাছে যখন গল্প শুনি, আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে যে কী করে মানুষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে! আমার আব্বা যুদ্ধ করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন৷ উনিসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে চোখ-হাত বেঁধে ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল৷ একজন একজন করে গুলি করে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হচ্ছিল৷ যখন ওনাকে গুলি করতে যাবে, ঠিক সেই সময় তিনি ট্রেন থেকে লাফ দেন এবং প্রাণে বেঁচে যান৷ এটা অসাধারণ একটা গল্প৷

আমি যখন কোনো গল্প নিয়ে চিন্তা করি, তখন সেই গল্পের মধ্যে নিজেকে কল্পনা করি৷ আমি ভাবলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি থাকলে কী করতাম? হয় আমি খুবই ভয় পেয়ে যেতাম অথবা আমি কোনো কিছু না করে বড় বড় কথা বলতাম৷ এই যে দু'টো বিষয় আমার মাথায় আসলো এখান থেকে আমার মাথায় দু'টো চরিত্র আসে৷ একটা চরিত্রের নাম ধ্রুব আর একটা চরিত্রের নাম আক্কু৷

এই দুই চরিত্র বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হবে এবং চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমরাও সেটার সাক্ষী হবো৷ আমরা সরাসরি দেখতে পাবো কিংবদন্তি সেই মানুষগুলোকে৷

এখন আমরা চলচ্চিত্র তৈরির জন্য গবেষণা করছি৷ এই যে টাইমলাইনটা, যে রাস্তাটা ধরে এ দুই চরিত্র হাঁটবে, যে ঘটনাগুলো তারা দেখবে, সব তো দেখানো সম্ভব না৷ আমি চেষ্টা করছি, যেসব ঐতিহাসিক চরিত্র আগের কোনো চলচ্চিত্রে দেখানো হয়নি, তাদের কথা তুলে ধরতে৷

আপনার বাবা নিশ্চয়ই আপনাকে এ কাজে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন?

আমার বাবা বিষয়টা নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন৷ কারণ তাঁর ধারণা আমি এটা ঠিকমত করতে পারবো না৷ আমি তাঁকে বলেছি, ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যটা আমি চলচ্চিত্রে রাখবো৷ ‘নদীতে' ঝাঁপ দেয়ার দৃশ্য রাখবো বলতেই বাবা বললেন, সেটা তো নদী ছিল না৷ আমি বললাম, পুরোপুরি বাস্তব ঘটনা তো তুলে ধরা সম্ভব না৷ আমার কাজ নিয়ে তাঁর উদ্বেগ থাকলেও আমি জানি কাজটা শেষ হলে তিনি ভীষণ খুশি হবেন৷

অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণ তো বেশ ব্যয়বহুল, প্রযোজনার ব্যাপারে কারো সাথে কি কথা হয়েছে?

প্রযোজনা নিয়ে এখনও কারও সাথে তেমনভাবে কথা হয়নি, যেটা আসলে একটু চিন্তার বিষয়৷ আমরা যেটা করছি, টিমটা আমাদের মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে (দলে কে কে আছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত থাকছে অডিওতে)৷ আমি চেষ্টা করছি প্রত্যেকটি ডিপার্টমেন্টের হেড যাতে বাংলাদেশি হয়৷ এখন পর্যন্ত সেভাবেই আমরা এগোচ্ছি৷ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কাস্টিং চূড়ান্ত হয়ে যাবে৷ আমাদের টিমটা এরইমধ্যে কাজ শুরু করেছে৷ আমরা এক মিনিটের একটা টিজার ট্রেইলার তৈরি করছি, এটা আমরা আমাদের কাজের মধ্যে থেকে সময় বের করে বাড়তি কাজ করছি৷ এখন পর্যন্ত সবাই সময় দিচ্ছে নিজের আগ্রহ থেকে৷ কারণ আমার যে লক্ষ্য, সেটাতে তাদের বিশ্বাস আছে৷ ট্রেইলারটা তৈরি হওয়ার পর আমরা কিছু কোম্পানির কাছে এটা জমা দেবো৷ এরই মধ্যে কিছু কোম্পানি আগ্রহও দেখিয়েছে৷

একটা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ আসলে ভীষণ সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল৷ তাই আমরা প্রথমে একটা শর্টফিল্ম বানাবো৷ শর্টফিল্ম করার কারণ কয়েকটা৷ যেটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ সেটা হচ্ছে, দেখা যে আমরা এটা আসলেই নির্মাণ করতে পারবো কিনা৷ কারণ আমরা একটা নির্দিষ্ট স্টাইলে করছি অ্যানিমেশনটা৷ আমরা একটা লেভেল মেনটেইন করতে চাই৷ লজিস্টিক্যালি আমাদের কোথায় ফোকাস করতে হবে সেটাও দেখার বিষয়৷ আমাদের কোথায় খামতি আছে সেগুলো দেখবো৷ আশা করি এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে শর্ট ফিল্মটা তৈরি করে ফেলবো৷ এটা নিয়ে বিভিন্ন ফেস্টিভেল, ফিল্ম মার্কেটে যাবো৷ আমরা খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছি৷-ডয়েচেভেলে

 

 

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৯:৩২:৩৪