কীভাবে এবং কেন আমি আওয়ামী লীগ করি
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
অবস্থাদৃষ্টে আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি যে, আওয়ামী লীগ করেন না এমন এক বিশাল শ্রেণির মানুষ আমায় ভালোবাসেন। তারা অনেকে হয়তো ভাবেন— আমি কেন আওয়ামী লীগ করি, অথবা আমার মতো লোকের আসলে আওয়ামী লীগ করা উচিত নয়। কেউ অবশ্য এ কথাও বলেন যে, আপনার দলকে পছন্দ না করলেও আপনাকে পছন্দ করি। এ শ্রেণির বাইরে কিছু লোক আছেন যারা আমার কোনো কিছুই পছন্দ করেন না।   তারা আমার নামের বিকৃত উচ্চারণ করেন এবং আমার প্রতিটি কর্মের মধ্যে ভণ্ডামি ও ছলচাতুরীর উৎস খুঁজে বেড়ান। তারা প্রবলভাবে আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, যারা জীবনে একবার আওয়ামী লীগ করেছেন তারা কোনো দিন সংশোধন হন না। সুতরাং গোমা রনি একটা মিচকে শয়তান— সে আসলেই একটা আওয়ামী লীগ এবং সময়মতো ছোবল মারার জন্য চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে আছে ম্যানা হয়ে ত্যানা ছিঁড়ার জন্য।

আওয়ামী লীগের মধ্যেও আমাকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দলের সাধারণ উদারপন্থি নেতা-কর্মী, বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, ইসলামপন্থি গ্রুপ এবং সভানেত্রীর কাছের লোকজন আমাকে বেজায় পছন্দ করেন। কিছু লোক আছেন যারা মনে করেন রনি ছেলেটি আসলে ইঁচড়ে পাকা। আঁতেল সাজার চেষ্টা করে কিন্তু আদতে সে আসলে কিছুই জানে না।

নিজের গুরুত্ব বাড়াতে হুটহাট টক-ঝাল মার্কা কথাবার্তা বলে বাজার গরম করে কেবল নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য। তারা আমার লেখালেখি নিয়েও নিদারুণ কটাক্ষ করে বলেন— ‘তেলাপোকাও প্রাণী আর রনিও লেখক’। কিছু বুদ্ধিমান আওয়ামী লীগার আছেন যারা আমার প্রসঙ্গ এলেই কৌশলে এড়িয়ে যান। কারণ তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের সঙ্গে অথবা রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সঙ্গে রনির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তা না হলে দেশের এ বিরূপ পরিস্থিতিতে সে এত নড়াচড়া করছে কীভাবে?

আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনের স্বল্প বুদ্ধি, ভুল করার দারুণ দক্ষতা এবং নানারকম দুর্বলতা ও অক্ষমতার কথা চিন্তা করে প্রায়ই আঁতকে ওঠি। অস্থিরতা, লেগে না থাকার অভ্যাস, লাজুক স্বভাব এবং সবকিছুতে অবহেলা বা গা ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাসের কারণে আমার দুর্বলতা ও অক্ষমতাগুলো প্রায়ই আমার প্রতিপক্ষের জন্য বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আমার চরিত্র অনেকটা চপলা হরিণ শাবকের মতো, যে কিনা তার মায়ের হত্যাকারী বাঘের সামনে অকুতোভয়ে দাঁড়িয়ে যায় এবং শিংবিহীন নরম তুলতুলে মাথা নিয়ে বাঘের হিংস্র মুখে গুঁতো মারার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। আবার একটু পরে নিজের পেটের মধ্যকার গুড়গুড়ানির শব্দ শুনে ভয় পেয়ে ভোঁ-দৌড়ে দিগন্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করে। আমার এ দুর্বলতা সমষ্টি সত্ত্বেও প্রকৃতির অপার কৃপায় আমি জীবনের প্রতিটি বাঁকে চমৎকার সব নেয়ামত যেমন পেয়েছি তেমনি অসংখ্য মানুষের সাহায্য-সহযোগিতাও পেয়েছি অকাতরে। জীবন সম্পর্কে আমার কোনোকালেই হতাশা ছিল না— যেমনটি এখনো নেই এবং অনাগত দিন সম্পর্কে আমি উদ্বিগ্ন নই।

আজকের শিরোনাম প্রসঙ্গে আলোচনার জন্য এত লম্বা ভূমিকা দিলাম কেবল আমার চরিত্র এবং প্রকৃতির অনুগ্রহ বোঝানোর জন্য। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার সম্পর্ক যেমন প্রকৃতিগতভাবে হয়েছিল তেমনি দলটির আদর্শ এখনো হৃদয়ে ধারণ করে রাখার যে সামর্থ্য আমি পেয়েছি তার পেছনে হয়তো প্রকৃতির কোনো ইঙ্গিত রয়েছে। কারণ সেই স্কুলজীবনে যখন আমি ছাত্রলীগের রাজনীতির প্রতি আদিষ্ট হলাম তখন ছাত্রদলের রমরমা অবস্থা। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্রদের তাদের মতাদর্শে আকৃষ্ট করানোর চেষ্টা করত। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮৩ সাল অবধি বাংলার আনাচে-কানাচে যখন আওয়ামী লীগের জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল ঠিক তখন আমার মতো একজন ভীরু, লাজুক, ঘরকুনো অলস কিশোর কীরূপে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীর খাতায় নাম লেখানোর সাহস নিয়েছিল তা ভাবলে আজও অবাক না হয়ে পারি না।

আমি যখন ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাসে পড়ি তখন সেখানে ছাত্রদলের নীরু-বাবলুর দুর্দান্ত প্রতাপ চলছে। ছাত্ররাজনীতিকে এ দুই ভাই মিলে এমন এক অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত করেছিলেন যাতে গ্রাম থেকে আসা সাহসী যুবকেরা কোনোরকম চিন্তা না করেই হিরো হওয়ার বাসনায় ছাত্রদলের মিছিলে চলে যেত। অন্যদিকে ভীরুরাও সব দল বেঁধে সেই মিছিলে শামিল হতো আশ্রয়লাভ ও নিরাপত্তা পাওয়ার বাসনায়। সে অবস্থায় নিভৃত ছাত্রলীগে অভিযাত্রার মাধ্যমে যে নিভৃত কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলাম তা চলল প্রায় দুই দশক অবধি। ২০০১ সালের পর একজন এমপি প্রার্থী হিসেবে ফরিদপুরের সদরপুরে যে জয়যাত্রা শুরু করেছিলাম তা ফলপ্রসূ হলো ২০০৯ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর।

এ কথা সত্যি, এমপি নির্বাচনের আগে দেশবাসী আমাকে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে চিনতেন না। নিজের লাজুক স্বভাব, নিভৃতচারী ও মরমি চরিত্রের কারণে সারা জীবন শুধু নীরবেই কাজ করেছি এবং এখনো করছি। আমার এ চরিত্রের সঙ্গে রাজনীতির ডামাঢোল, হৈচৈ, নেতা হওয়ার জন্য গুঁতোগুঁতি, পদ-পদবি পাওয়ার জন্য হুড়াহুড়ি একেবারে বেমানান— এবং আমি সেটা করিওনি কোনো দিন। এসব দিক বিবেচনা করলে আমার এমপি মনোনয়ন, নির্বাচিত হওয়া, পরবর্তীতে শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পাঁচটি বছর দায়িত্ব পালন আমার কাছে রীতিমতো বিস্ময়কর বলে মনে হয়। আমার জীবনের অন্যান্য অধ্যায়ের মতো এক্ষেত্রেও প্রকৃতি এক নিদারুণ খেলা খেলেছে। ১০টি বছর ধরে একজন কলাম লেখক অথবা টেলিভিশন, সভা-সমিতি, সেমিনার কিংবা ধর্মীয় মাহফিলের বক্তা হিসেবে আমার দ্বারা যা হচ্ছে তা আমার স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। কেন হচ্ছে কীভাবে হচ্ছে তা যেমন টের পেলাম না তেমনি টের পাইনি কখন যে জেলে গেলাম আর কীভাবেই বের হলাম।

আওয়ামী লীগের রাজনীতির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আমার অভিষেক হয়েছিল ঠিক যেন যুবরাজের মতো। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর সব শীর্ষ নেতৃবৃন্দই আমার ব্যাপারে জানতে কৌতূহল ছিলেন। তারা আমাকে ভালোবাসতেন এবং সাধ্যমতো স্নেহ করতেন। আমার স্পষ্টভাষিতা এবং যে কোনো সমস্যার গভীরে ঢুকে চটজলদি সমাধান বের করে আনার প্রকৃতি প্রদত্ত ক্ষমতা দেখে নেতৃবৃন্দ চমকিত হতেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতেন। ফলে আওয়ামী লীগ নামক দলটির নীতি-আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করতে শিখি। দলকে সফলতার দিকে টেনে আনার জন্য কতিপয় শীর্ষ নেতৃত্বের অপরিসীম ত্যাগতিতিক্ষা আমাকে রীতিমতো মুগ্ধ করে তোলে। ঠিক তেমনি কতিপয় নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডের কারণে অতীতে দলের কত্তবড় বিপর্যয় হয়েছিল সেসব কাহিনীর নেপথ্য ঘটনা শোনার পর নিজের অজান্তে কিছু কর্মের প্রতি প্রবল ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ওসব কর্ম করা আধুনিক যুগের কুশীলবদের বিরুদ্ধে আমার মুখ ফসকে মাঝেমধ্যে কিছু অপ্রিয় এবং আপাতদৃষ্টিতে বিব্রতকর কথা বের হয়ে দেশময় হৈচৈ ফেলে দিত। আমি শত চেষ্টা করেও কেন যে তখন নিজের মুখে তালা লাগাতে পারিনি কিংবা লিখতে গিয়ে কৌশলী হতে পারিনি তা আজও ভেবে পাই না।

একটি অনাহুত দুর্ঘটনার কারণে নাটকীয়ভাবে আমাকে জেলে যেতে হয়েছিল। এটাকেও আমি প্রকৃতির লীলাখেলা বলব। কারণ যে ঘটনা যে বা যার সঙ্গে ঘটেছিল তাতে আমার জেলে যাওয়ার কথা ছিল না। বিগত দিনগুলোতে সরকারের বাঘা বাঘা সব মন্ত্রী এবং প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমার বিরোধ হতো কিন্তু ওসব নিয়ে ঘরে-বাইরে আমাকে কোনো দিন বিপদ-বিপত্তি পোহানো তো দূরের কথা এতটুকু বিব্রতও হতে হয়নি। এ প্রসঙ্গে আমার শুভার্থীদের সঙ্গে কথা হলে আমি বিষয়টি হালকা করার জন্য বলি— সারাজীবন ছক্কা মেরেছি কেবল শেষেরটা ক্যাচ হয়ে গেছে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর আমার মনমানসিকতার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কেন আমি প্রথামতো জেল থেকে বের হয়ে সভানেত্রীর কাছে গেলাম না, নির্বাচনী এলাকায় বড় বড় তোরণ করে বিশাল সংবর্ধনা গ্রহণ করলাম না, কেন সংসদ বর্জন করলাম এবং শেষ অবধি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলীয় মনোনয়ন কিনলাম না তা আজও আমার মাথায় ঢুকছে না। সবচেয়ে আশ্চর্যকর বিষয় হলো— এসব বিষয় নিয়ে আমার কোনো আফসোস যেমন নেই তেমনি কোনো রাগ-ক্ষোভ-অভিমানও নেই। সম্ভবত আমার জীবনে প্রকৃতির অফুরান নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের কারণে আমার অন্তরাত্মা একথা ভেবে স্থির থাকে যে, যা হয়েছে তা অবশ্যই মঙ্গলের জন্যই হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারবিরোধী বড় বড় দলগুলো থেকে যেমন আমার কাছে তাদের দলে যোগদানের প্রস্তাব আসে তেমনি ছোট ছোট দলগুলো রীতিমতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমাকে তাদের দলে ভেড়ানোর জন্য। আমি তাদের সবার কাছে যে নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রাখি সেই কথামালা নিয়েই আজকের শিরোনাম বিষয়ে বিস্তারিত লেখার চেষ্টা করব।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একান্তই ভালো লাগার। দলীয় পদ-পদবির লোভ, নিজেকে লাইমলাইটে আনা কিংবা দল ক্ষমতায় গেলে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে এমন চিন্তা করে যেমন রাজনীতি শুরু করিনি তেমনি এ ধরনের চিন্তা মাথায় কোনো দিন আসেনি। দলকে নিয়ে আমার বিশ্বাস ও ভালোবাসার যে গভীরতা ছিল তা সফলতার মুখ দেখেছে প্রকৃতির দয়ায়। আমার চেয়েও বহু ত্যাগী, বহু যোগ্যতর এবং বিখ্যাত সব নেতা বহু যুগ চেষ্টা করেও এমপি হওয়া তো দূরের কথা, দলীয় মনোনয়ন পর্যন্ত পাননি। সেখানে আমি যে বয়সে এমপি হয়েছি তার জন্য সারাটি জীবন দল ও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতা না দেখালে আল্লাহ বেজার হবেন। কারণ তিনি কোনো অকৃতজ্ঞ বান্দাকে একদম পছন্দ করেন না।

আমার দলত্যাগের প্রস্তাবের বিপক্ষে আমি পাল্টা প্রশ্ন করি— কেন আমি আওয়ামী লীগ ছেড়ে অন্য দলে যাব। আমার দল বা দলীয় প্রধান বা কোনো দলীয় নেতা তো কোনো দিন আমার বিরুদ্ধে একটি বিরূপ মন্তব্য করেননি। বরং আমি আমার ব্যতিক্রমী মনমানসিকতা এবং প্রথাবিরুদ্ধ আচরণ দ্বারা বহুবার দলকে নানাভাবে বিব্রত করেছি। কিছু কিছু সমালোচনার কারণে পত্রিকায় হেডলাইন হয়েছে। বিরোধী দল সরকারকে খোটা দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে এবং জনগণের কাছে কিছুটা হলেও দলকে জবাবদিহি করতে হয়েছে। তারপরও দল তার গণতান্ত্রিক সত্তা বজায় রেখে আমাকে কোনো শাস্তি দেয়নি কিংবা আমাকে বিব্রত হতে হয় এমন কোনো বক্তৃতা-বিবৃতি দেয়নি। শাসক দলে থেকে আপন দলের সমালোচনা করার রেওয়াজ কেবল আওয়ামী লীগেরই রয়েছে। অন্য কোনো দলের নেতা-কর্মীরা নিজ দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা তো দূরের কথা, যারাই সামান্য একটু চোখ বাঁকা করে তাকান তবে তাদের ঠ্যাং, জামা-কাপড় ইত্যাদি যে আস্ত থাকে না তার ভূরি ভূরি নজির এদেশে রয়েছে।

আপন মানুষের সমালোচনা কিংবা প্রিয়জনকে শাসন করার জন্য ভালোবাসার কতটা উঁচু স্তরে আরোহণ করতে হয় তা কেবল তারাই বলতে পারবেন যারা এতদসংক্রান্ত ব্যাকরণ সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন। আরবিতে ভালোবাসার আদি ও প্রাকৃত শব্দের নাম ওয়ালা। বলা হয় ওয়ালা শব্দ থেকেই আল্লাহ শব্দটি এসেছে। ওয়ালা বা ভালোবাসার মোট ১০টি স্তর রয়েছে। মানুষ যখন নবম স্তরে পৌঁছে তখন সে দিওয়ানা বা মাজনুন হয়ে যায়। দশম স্তরে পৌঁছার পর সে ফানাফিল্লাহ হয়ে পড়ে। এভাবে অষ্টম স্তরে পৌঁছানো মানুষের মধ্যে কেবল তার প্রিয়জন ছাড়া অন্য কারও জন্য কোনো অনুভূতি থাকে না। প্রিয়জনকে শাসন করা বা সমালোচনা করার ক্ষমতাটি মানুষ পায় ভালোবাসার চতুর্থ স্তরে পৌঁছার পর। কাজেই বেশির ভাগ মানুষের মনমানসিকতা যদি প্রথম স্তরে থাকে এবং তাকে যদি চতুর্থ স্তরের পথ্য দেওয়া হয় তাহলে যে বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয় তা আমার আগে জানা থাকলে আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীই আমাকে নিয়ে কষ্ট পেতেন না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দল পরিবর্তন কোনো ভালো ফলাফল সৃষ্টি করতে পারেনি। তাছাড়া নিজ দল, নিজ গৃহ বা আপন দেশ ত্যাগ করে পরবাসী হওয়া মানব চরিত্রের একটি দুর্বলতম দিক। বরং সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে একটি স্থানে টিকে থাকার মধ্যেই রয়েছে বীরত্ব। অন্যদিকে বিরুদ্ধবাদীদের ওপর বহু বছর পরে হলেও নিজস্ব মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারার মধ্যে এক ধরনের সফলতা এবং মর্যাদা রয়েছে। আমি যে কথাগুলো বিগত দিন থেকে আজ অবধি বলে এসেছি তা অত্যন্ত দুর্বল এবং অকার্যকর প্রমাণিত হবে যদি আমি দল ত্যাগ করি। অথচ আমি যদি আমার মতাদর্শ আওয়ামী লীগের মতো বিশাল একটি দলের বিপুল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ঠিকমতো প্রচার-প্রসার ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তবে যে উন্নত গণতন্ত্র, নৈতিক মানসম্পন্ন শাসন ব্যবস্থা এবং নিষ্ঠাবান কর্মীসমৃদ্ধ রাজনৈতিক দলের স্বপ্ন দেখছি তা সহজেই বাস্তবায়িত হবে।

আমি আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকতে চাই দলটির মৌলিকত্ব বা হোমো জিনিয়াসনেসের জন্য। এ দলে বহিরাগত নেই। ছদ্মবেশী, ভিন্নমতের সুবিধাবাদী এবং সুযোগসন্ধানীরা এ দলে এসে টিকতে পারেন না। একজন কর্মী ছাত্রলীগ করতে করতে আওয়ামী লীগ হয়ে যায়। অথবা পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদি, নানা-নানীর আওয়ামী লীগের রাজনীতি সম্পৃত্তার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে সারা বাংলাদেশের নেতা-কর্মীরা এক ধরনের আত্মীয়তা ও মায়ার বন্ধনে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ থাকেন। আপন পরিবারের নিকটজন, পিতা-পুত্র, মাতা-কন্যা, ভাই-বোন প্রমুখের সঙ্গে মাঝেমধ্যে প্রবল দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয় বটে কিন্তু রক্তের টানে তারা স্বভাবে অনায়াসে মিলেমিশে পুনরায় পথ চলতে পারেন তেমনি কখনো সম্ভব হয় না পরিবার-বহির্ভূত শত্রুতার ক্ষেত্রে। কাজেই আওয়ামী পরিবারেও স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে— রয়েছে একজনকে পেছনে ফেলে অন্যজনের এগিয়ে যাওয়ার উদগ্র বাসনা।   কিন্তু এতকিছুর পরও যখন জয় বাংলা বা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান ওঠে তখন আওয়ামী লীগের কর্মীদের শরীরে যে রক্তের নাচন শুরু হয় তাতে  বেশির ভাগ বিরোধ কর্পূরের মতো বাতাসে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে যায়। -বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।

 

 

 

 

০৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ২৩:০৬:৩০