রাখাইনে ব্যাপক ধর্ষণে দায়ী সেনাবাহিনী: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
 

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক ধর্ষণের ঘটনায় সেনাবাহিনীকেই দায়ী করেছে । বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) সংস্থাটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত তিনমাস ধরে ওই অঞ্চলে জাতিগত নিধনের উদ্দেশে অভিযানের নামে নারী এবং কিশোরীদের ধর্ষণ, সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে মিয়ানমার সেনারা। খবর রয়টার্স।

এ সপ্তাহের শুরুতে রাখাইনে সেনাবাহিনীর ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিষয়ে নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটির এক রিপোর্টে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন যুদ্ধ-সংঘাতে যৌন সহিংসতা বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত প্রমিলা প্যাটেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সেনাদের নির্দেশে, পরিকল্পনায় এবং তাদের সক্রিয় অবস্থানেই সেখানে যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী সোমবার একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে রাখাইনে সব ধরনের হত্যা, ধর্ষণ এবং নিপীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেনাবাহিনী।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৫২ জন নারী এবং কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এদের মধ্যে ২৯ জনই জানিয়েছেন, সেনারা তাদের ধর্ষণ করেছে। এদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাইকে গণধর্ষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জরুরি নারী অধিকার গবেষক এবং সংস্থাটি থেকে প্রকাশিত রিপোর্ট প্রস্তুতকারী স্কি হোয়েলার বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বার্মিজ সেনাদের জাতিগত নিধনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং বিধ্বংসী বৈশিষ্ট্র ছিল ধর্ষণ।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বার্মিজ সেনাদের বর্বর আচরণের কারণে অগণিত নারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

মিয়ানমারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ধর্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দেশটির সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযানের ঘোষণা দিয়ে আগে থেকেই রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো অবরুদ্ধ করে রাখে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পরে প্রবেশের চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ওইদিনের পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নিপীড়ন, ধর্ষণসহ নানা অমানবিক নির্যাতন। সেনা অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন। জাতিগত নিধনের পাশাপাশি জ্বালিয়ে দেয়া হয় রোহিঙ্গাদের প্রতিটা গ্রাম। সেইসাথে সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শরণার্থী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এ অঞ্চলে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র হিসাবে, সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অধিকাংশ শক্তিশালী রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংগঠনের চাপে পড়লেও মিয়ানমান এ হত্যাযজ্ঞ থেকে নিজেকে নিবৃত করেনি। আন্তর্জাতিক মহল বারবার দেশটির স্টেট কাউন্সিলর সু চিকে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর জাতিগত নিধন বন্ধ করার আহবান করলে তিনি তাকে গুরুত্ব দেননি। এমন কি কোন মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে এই অঞ্চলে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার।

এ ছাড়াও সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী এখনো প্রতি সপ্তাহে দেশটি থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে।

গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের ঘটনায় পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এভাবে কয়েক দশক ধরে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এখন পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা শরণার্থী সংকট হচ্ছে রোহিঙ্গারা। সংস্থাটি মিয়ানমার সেনা বাহিনীর এই নির্মমতাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘জাতিগত নিধন’ বলে উল্লেখ করেছে।

এদিকে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান, জর্ডানের রানী রানিয়া আল আব্দুল্লাহ, মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি, জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতাবিষয়ক বিশেষ দূত প্রমীলা প্যাটেন ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন।

 

 

১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ১০:১৭:১৬