চাকরির টোপ দিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নামানো হচ্ছে দেহ ব্যবসায়!
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট


“বাড়ির পিছনের আখের ক্ষেতে লুকিয়ে দেখেছিলাম সেনারা বাবাকে গুলি করে মারছে। পালিয়ে আসার সময় রাস্তায় জঙ্গলের মধ্যে একবার মগ গুন্ডারা মাকে টানাটানি করেছিল। কিন্তু দেশ ছেড়ে শরণার্থী শিবিরে এসে এখন তো শরীরটা বাঁচাতে পারব কি না তা নিয়ে খুব ভয়ে আছি।” কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে কাঁপা কাঁপা গলায় শোনালেন বছর সতেরোর কিশোরী আয়শা। অপহরণের ভয়ে রাতে কালো পলিথিনের ছোট্ট ঘরে মেয়েকে কোমরের সঙ্গে দঁড়ি দিয়ে বেঁধে ঘুমাচ্ছেন মা জরিতুনেচ্ছা বেওয়া। তিনটে প্লাস্টিকের কুঁড়েঘরের পর থাকেন যুবতী হামিদা। দুই শিশুর মা। স্বামী মোকচ্ছেদ সেনাদের সঙ্গে লড়তে গিয়ে বেপাত্তা। আপাতত পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে। কিন্তু এখানে এসে প্রতিদিনই নতুন উৎপাতের সম্মুখীন হচ্ছেন হামিদা। সবাই হামিদাকে কক্সবাজারে নিয়ে গিয়ে চাকরি দিতে চাইছেন।

হামিদা বললেন, “হঠাৎ আমার প্রতি এখানকার এক শ্রেণির দালালের এত কেন দয়া তা জানি। দেখুন পাশের বস্তির অনেক মেয়ে-বউরা না খেতে পেয়ে সাহায্য চাইছে। কেউ এক টাকা দিতে আসছে না। অথচ আমায় চাকরি, টাকা সবই দিতে আসছে। পরিবর্তে কক্সবাজারে যেতে হবে।” শিবিরের বাইরে কুতুপালং এলাকা ছেড়ে রোহিঙ্গাদের যাওয়া নিষেধ। কিন্তু নিজের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে দালালরা কক্সবাজার নিয়ে যাবে বলেও হামিদার মতো কিশোরী ও তরুণীদের টার্গেট করছে।

মেয়েদের মোটা টাকার চাকরির টোপ যে মাঝে মধ্যেই আসছে সে অভিজ্ঞতার অভিযোগ করলেন বালুখালি শরণার্থী শিবিরের জুবের বিবি। তিন সন্তান ও স্বামী হারা জুবের আপাতত দুই মেয়েকে নিয়ে এখন নয়া আতঙ্কে রয়েছেন। বুঝতে পারছেন না শিবিরে ঘুরে বেড়ানো দালালদের হাত থেকে তাদের কীভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন। এদিকে মনোরমার ক্ষোভ, “সবার নজর আমার শরীরে, লোকগুলোর নজর খারাপ। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দু’একজন আবার বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছে। আমি জানি, বিয়ে করে নিয়ে গিয়ে ঢাকায় বিক্রি করে দেবে।” জুবের ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা পুলিশের কাছে অভিযোগ করলেন, “বাংলাদেশি লোকেরা সাহায্য দেওয়ার নামে এসে মেয়েদের চাকরিতে নিয়ে যেতে চাইছে। আশেপাশের কয়েকটা মেয়ে কক্সবাজারে চাকরি করতে গিয়েছে মাস খানেক আগে। কিন্তু এখনও ফেরেনি।” দেশ ছেড়ে মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে একটি সংগঠিত প্রতারণা চক্র যে রোহিঙ্গা কিশোরী ও যুবতীদের ফাঁসাতে অতিমাত্রায় সক্রিয় সে অভিযোগ প্রকাশ্যেই মেনে নিলেন শিবিরের ভারপ্রাপ্ত পঞ্চায়েত সদস্য আব্দুল মোনায়েম। কক্সবাজার প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরি এলাকার একশ্রেণির দালাল ও চক্রের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত লাগোয়া সাগর বিলাস ও আলকক্স নামের দুই রিসর্টে থাকলে রোহিঙ্গা ‘তাজা পাখি’ কম দামে মিলবে বলে ঘর নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ঘর ভাড়া ও ‘পাখি’র খরচ মিলিয়ে মাত্র ২৫ হাজার বাংলাদেশি টাকা পড়বে। কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশকর্তারা স্বীকার করলেন, “সস্তায় রোহিঙ্গা কিশোরী ও যুবতীদের হোটেল এনে দিচ্ছে দালাল চক্র। গত একমাসে শতাধিক রোহিঙ্গাকে বিভিন্ন হোটেল ও রিসর্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত হয়ে এদের আবার ক্যাম্পে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।” সমুদ্র সৈকতের টানে এন্ডারসন রোডের আহসান বোডিং, সাতকানিয়া বোডিং, সংলগ্ন রাজমনি হোটেলে গত কয়েকদিনে অভিযানে দফায় দফায় অভিযানে দেহব্যবসার দায়ে গ্রেফতার হয়েছে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা তরুণী। যাদের অধিকাংশেরই বয়স ১১ থেকে ১৭ বছর।















 


০৮ নভেম্বর, ২০১৭ ২১:০০:২৩