বার্লিন ১৯৭৪ > ইন্টারন্যাশনাল চিল্ড্রেন্স ফেস্টিভ্যালে
লুৎফর রহমান রিটন
অ+ অ-প্রিন্ট
বার্লিন তখন পূর্ব জার্মানির রাজধানী। জার্মানি তখন দুই ভাগে বিভক্ত—পূর্ব আর পশ্চিম। পশ্চিম জার্মানি ধনতান্ত্রিক দেশ আর পূর্ব জার্মানি সমাজতান্ত্রিক। ১৯৭৪ সালে সমাজতান্ত্রিক জার্মানির আমন্ত্রণে তৎকালীন জিডিআর-এ (জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক) আমার যাবার সুযোগ হয়েছিলো। আমি তখন খুদে এক বালক। কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার সদস্য। গান গাই ছবি আঁকি আবৃত্তি করি বক্তৃতা করি। কী না করি! আমার তখন ডানা মেলবার দিন। শুয়ো পোকা থেকে তখন আমার ক্রমশঃ প্রজাপতি হয়ে ওঠার দিন। সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলো ছোট্ট একটা পেপার কাটিং।

আরিফ মাহমুদ শৈবাল নামের এক তরুণ বন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো নিউইয়র্কে, এক রাতে, কবি শহীদ কাদরীর বাড়িতে। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী তারিখটি ছিলো ২৪ মে ২০১৬। রাতের সেই আড্ডায় শৈবাল আর ওর বন্ধু মোস্তাফিজকে আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে আবিস্কার করেছিলাম দুজন যথেষ্ট পড়ুয়া এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সত্যিকারের সমঝদার হিশেবে। দেশী-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ বহু বই ওদের পড়া। আমাকে চমকে দিয়ে শৈবাল আমার লেখা একাধিক ছড়া মুখস্ত শুনিয়ে দিয়েছিলো। শহীদ ভাই তখন মিটিমিটি হাসছিলেন। মাত্র কয়েক ঘন্টার আড্ডাতেই ওরা দুজন আমার বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। অতঃপর প্রিয় অনুজের আসনটিও ওরা দখল করে নিয়েছিলো অনায়াস দক্ষতায়।

নিউইয়র্ক থেকে অটোয়া ফিরে আসার কয়েকদিন পর ফেসবুক ইনবক্সে দেখি শৈবাল আমার জন্যে একটা মহার্ঘ্য উপহার পাঠিয়েছিলো সেই রাতেই। উপহারটি পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সচিত্র সংবাদের পেপার কাটিং। ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসের। ১০ জুলাইর সম্ভবত। দৈনিক বাংলার বাণী কিংবা সংবাদে(?) ছাপা হয়েছিলো। ওই পেপারকাটিং-এর দিকে তাকিয়ে ঝটিতি আমি ফিরে গিয়েছিলাম ৪২ বেয়াল্লিশ বছর আগের দিনগুলোয়, যখন আমি ছোট্ট বালক, মুগ্ধ কিশোর।

প্রথমেই চোখ বোলানো যাক সেই সচিত্র সংবাদে। ছয়টি খুদে খুদে প্রোফাইল ফটোগ্রাফের সঙ্গে মুদ্রিত সংবাদে বলা হয়েছে-- 

''আজ শিশু প্রতিনিধিদলের বার্লিন যাত্রা

জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র আয়োজিত আসন্ন আন্তর্জাতিক গ্রীস্মকালীন শিবিরে যোগদানের জন্য বাংলাদেশের ৬জন বিশিষ্ট শিশুপ্রতিনিধি আজ বুধবার বার্লিন যাচ্ছে। ঢাকা সরকারী মহিলা কলেজের অধ্যাপিকা এবং কেন্দ্রীয় খেলাঘরের উপদেষ্টা মিসেস পান্না কায়সার এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব করছেন। বাংলাদেশের ২টি জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন কচি-কাঁচার মেলা এবং খেলাঘর আসরের ৫জন শিশু প্রতিনিধি এই দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এরা হল কচি-কাঁচার মেলার শুক্লা রায়, এ,টি,এম, লুৎফর রহমান লিটন, ইসরাত সিনাহ বোখারী (শাকিলা), খেলাঘর আসরের তাহমীন সুলতানা ও তসলিমা হক।''

সন্দেহ নেই মুদ্রণ প্রমাদের শিকার কিংবা প্রুফ রিডারের মাতুব্বরীর শিকার হয়ে আমার রিটন নামটা লিটন হয়ে গেছে। কৈশোর পেরুনোর আগেই আমি আমার নাম থেকে ''এটিএম''কে খারিজ করে দিয়েছিলাম। একজন মানুষ কেনো কয়েকজন মানুষের নাম দখল করবে! আমার বাবা মা আমার নাম রেখেছিলেন আবু তাহের মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ওরফে রিটন। আমি প্রথম তিনজনকে বাদ দিয়েও লুৎফর রহমান এবং রিটনকে অর্থাৎ দুজনকে বহন করছি, একটি নামে। পরবর্তী জীবনে অবশ্য প্রমাণ পেয়েছি হাতেনাতে যে এটিএম সঙ্গে রেখেও বিখ্যাত হওয়া যায়। উদাহরণ--এটিএম শামসুজ্জামান। আমার প্রিয় অভিনয় শিল্পী।

যাক, বিষয়ে ফিরে আসি। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরপর, ১৯৭৩ সালে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের নেতৃত্বে খেলাঘর এবং কচি-কাঁচার মেলার দুটি শিশুপ্রতিনিধিদল সোভিয়েট ইউনিয়নের আর্তেক ও জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত দুটি গ্রীস্মকালীন শিশু উৎসবে যোগ দিয়েছিলো।

১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানীর বার্লিনে আমরা গিয়েছিলাম দ্বিতীয় দল হিশেবে। মোট একুশটি দেশ থেকে আমন্ত্রিত শিশু প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সেই চিলড্রেন্স ফ্যাস্টিভ্যালে এসেছিলো। তিন সপ্তাহের সেই ক্যাম্পে যোগ দিয়ে যে অভিজ্ঞতা আমি সঞ্চয় করেছিলাম তা ছিলো আমার সারা জীবনের অমূল্য সম্পদ। ওই ক্যাম্প থেকেই প্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক একটি পৃথিবীর স্বপ্ন রোপিত হয়েছিলো আমার শিশুমনোজগতে।

বার্লিনে যাওয়া সেই প্রতিনিধিদলে একমাত্র তসলিমা হক ছিলো আমার সমবয়েসী। বাকি সবাই ছিলো বয়েসে আমার সিনিয়র। আমিই ছিলাম দলের মধ্যে একমাত্র ছেলে, আর বাদবাকি সবাই মেয়ে। রীতিমতো 'হংসমধ্যে বক যথা' অবস্থা যাকে বলে।

ছবির প্রথম মেয়েটা তাহমীন সুলতানা ওরফে স্বাতী। রাজনীতিবিদ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ছোট বোন। স্বাতী আপা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচয় কালে বলতেন--'আই এম তাহমীন সুলতানা। কেইম ফ্রম খেলাঘর।' প্রথমেই বাংলাদেশের নাম বলতেন না। পরে বলতেন প্রথমে খেলাঘর পরে বাংলাদেশ। এই স্বাতী আপা ছিলেন খুবই নরম স্বভাবের। খুব সামান্যতেই চোখের জলে ভাসতেন। ক্যাম্পে রাতে আমাদের নিজেদের কক্ষে ফিরে এসে কিংবা দিনে বাইরে বেড়ানোর সময় জার্মানীর সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘড়ির টাইম মিলিয়ে বলতেন--আল্লা জানো বাংলাদেশে এখন সকাল এগারোটা বাজে। আর এইটুকু বলার পরেই কেঁদে ফেলতেন। তাঁর চোখ টলোমল করতো অশ্রুতে। আমি খুব মজা পেতাম ব্যাপারটায়। আহারে কী নরম স্বভাবের মেয়েরে বাবা!

ছবির দ্বিতীয় মেয়েটা ইসরাত নিগাহ্‌ বোখারী ওরফে শাকিলা।(পত্রিকাটি ওর নামও ভুল করেছে।) এই শাকিলা হচ্ছে আমার স্ত্রী শার্লির বড় বোন। ছেলেবেলায় শাকিলা এবং শার্লি এই দুই বোনের সঙ্গেই আমার ছিলো গভীর সখ্য। কচি-কাঁচার মেলায় আমরা একসঙ্গে ছবি আঁকতাম গান গাইতাম।

শাকিলার পরেই দলের সবেধন নীলমনি (পুরুষসদস্য!) বালকটি রিটন। পত্রিকায় মুদ্রিত এই ছবিটা তোলা হয়েছিলো হাটখোলার অভিসার সিনেমা হলের উল্টোদিকের 'বীথি ফটোগ্রাফার্স' থেকে।

ছবির শেষের জনের আগের জন তসলিমা হক। সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের ভ্রাতৃজ। ওর ডাক নাম মিতা। মিতা এখন খুবই বিখ্যাত। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হককে কে না চেনে!

সবশেষে টিপ পরা মেয়েটি শুক্লা রায়। কুমিল্লার বিখ্যাত শিক্ষক পরিবারের মেয়ে। শুক্লাদি তখন ক্লাশ নাইন বা টেন-এ পড়েন। খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারতেন। তাঁর বড় বোন অধ্যাপিকা স্বপ্না রায়ের কাছে শুনেছিলাম, পেশায় শিক্ষক শুক্লাদি এখন ইরানে থাকেন বরের সঙ্গে। শুক্লাদির সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই সেই ১৯৭৪-এর পর থেকেই।

ছবিতে আমার পরের জন আমাদের দলনেতা অধ্যাপিকা পান্না কায়সার। একাত্তরের শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী। অভিনেত্রী শমি কায়সারের মা। আমরা তাঁকে ভাবী সম্বোধন করতাম। পান্না ভাবী দেখতে তখন একেবারে পরীর মতো ছিলেন। অনেক ভালোবাসা আর আদর পেয়েছি আমি পান্না ভাবীর কাছে। মনে পড়ে, ঢাকা থেকে জার্মান এয়ারলাইন্স ইন্টারফ্লুগ-এ জীবনের প্রথম দীর্ঘ বিমানযাত্রায় খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম আমি। আমার পাশের আসনে থাকা এক বয়স্ক যাত্রী একটু পর পর বমি করছিলেন। সেইটা দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে তা সংক্রমিত হয়েছিলো আমার মধ্যেও। কিছুই খেতে পারছিলাম না। এক পর্যায়ে ক্লান্ত অবষণ্ণ ক্ষুধার্ত আমি নেতিয়ে পড়েছিলাম। বার্লিন এয়ারপোর্টে গভীর রাতে আমাদের রিসিভ করতে উপস্থিত ছিলেন জার্মানিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত। সম্ভবত তাঁর নাম ছিলো মিস্টার খুরশিদ। এয়ারপোর্ট থেকে একটা মাইক্রোবাসে করে আমরা রওনা হয়েছিলাম ক্যাম্প অভিমুখে। মাইক্রোবাসে আমার পাশের আসনেই ছিলেন পান্না কায়সার। খুবই ঘুম পাচ্ছিলো আমার। আমার বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে এক পর্যায়ে আমাকে তিনি কাছে টেনে নিয়ে তাঁর কোলের ওপর শুইয়ে দিয়েছিলেন। আমি রাজি হচ্ছিলাম না। লজ্জায় তাঁর কোল থেকে মাথা সরিয়ে নিতে চাইলে তিনি খুব আদর করে আমাকে বলেছিলেন, এখন তোমার মা সঙ্গে থাকলে কী করতেন তিনি? তুমি কি তখন তাঁর কোল থেকে মাথাটা সরিয়ে নিতে? বোকা ছেলে আমি তো তোমার মায়ের মতোই।

এরপর আর কথা বাড়াতে হয়নি। নিশ্চিন্তে আমি ঘুমিয়ে পরেছিলাম পান্না ভাবীর কোলে। এবং পরবর্তী জীবনে এই পান্না ভাবীকে আমি সব সময় মায়ের আসনেই দেখে এসেছি। (অনেকদিন দেখা হয় না ভাবীর সঙ্গে। এরপর ঢাকা গেলে ভাবীকে না দেখে ফিরবো না।)

কুড়ি-পঁচিশটা দেশ থেকে ছেলেমেয়েরা এসেছিলো বার্লিনের সেই ইন্টারন্যাশনাল চিল্ডেন্স ফেস্টিভ্যালে। বার্লিনে আমরা কুড়িদিন ছিলাম। এক বিকেলে একটা স্টেডিয়ামে আমাদের পারফরম্যান্স ছিলো। বিশাল স্টেডিয়ামভর্তি অগুন্তি মানুষের উপস্থিতিতে আমার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা একটা ছড়াগান গেয়েছিলো—রেল গাড়ি ঝিকঝিক/ঝিকঝিক ঝিকঝিক/চলছে তো চলছে চলছে/হুঁইশেল বাজিয়ে যাত্রীকে ডাকছে/ঘুম থেকে উঠতে সে বলছে/....। খুব ভালো হুঁইশেল দিতে পারতাম আমি। রেলের হুঁইশেল। গানটির মাঝখানে কোরাস কণ্ঠের ঝিকঝিক ঝিকিঝিকের সময় ওভারল্যাপিং করে বারকয় আমি সেই হুঁইশেলটা দিতাম প্রাণপণে। তাতে এই গানের বিটের সঙ্গে ট্রেনের একটা আবহ তৈরি হতো। আমাদের এই গানটা বার্লিন ক্যাম্পে খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা আমাদের দেখলেই ‘ঝিক্‌ঝিক্‌ ঝিক্‌ঝিক্‌’ বলে উল্লাস প্রকাশ করতো। গানটির সুর আর রিদম সম্ভবত মুগ্ধ করেছিলো ওদের। স্টেডিয়ামেও আমাদের সঙ্গে ‘ঝিক্‌ঝিক্‌ ঝিক্‌ঝিক্‌’ করছিলো ছেলেমেয়েরা। আমার হুঁইশেলটাও বিপুল করতালি কুড়িয়েছিলো সেদিন। এই গানটা আমরা ঢাকাতেই শিখে নিয়েছিলাম খেলাঘরের বন্ধুদের কাছ থেকে। গানটি লিখেছিলেন ছড়াকার আখতার হুসেন। আর সুর করেছিলেন সেলিম রেজা।

আমাদের গাওয়া আরেকটি গান বার্লিন ক্যাম্পে খুব পরিচিতি পেয়েছিলো। সুখেন্দু চক্রবর্তী স্যার চলে যাবার পর কচি-কাঁচার মেলায় আমাদের গানের নতুন টিচার হয়ে এসেছিলেন মোশাদ আলী নামের একজন পল্লীগীতির শিল্পী। তাঁর কাছে শিখেছিলাম একটা গান--''এই দুনিয়ায় অত্যাচারী থাকে কি করিয়া/এক জোটে শোষণের পথে দাঁড়াইলে রুখিয়া/হেইয়ারে হেইয়া.../অই পশুদের এবার মোরা দিবরে উড়াইয়া সকলে মিলিয়া একজোট হইয়া/হো...দেখো অই পশুরা পালায় কেমন একতার ভয় পাইয়া...।'' গানটা পরবর্তীতে তারেক মাসুদের 'মুক্তির গান' চলচ্চিত্রে দেখেছি। শরণার্থী ক্যাম্পে ক্যাম্পে ট্রাকে করে ঘুরে বেড়ানো শিল্পীরা বিপুল ভট্টাচার্যের সঙ্গে এই গানটাও গাইতেন। 

বার্লিন ক্যাম্পে এক বিকেলে এই গানটা গাইবার পর থেকে ছেলেমেয়েরা আমাদের দেখলেই ঝিকঝিক ঝিকিঝিকের পাশাপাশি 'হেইয়ারে হেইয়া' বলেও স্বাগত জানাতো। খেলাঘরের মেয়েরা অর্থাৎ স্বাতী আপা এবং মিতা আমাদের কাছ থেকে গানটা শিখে নিয়েছিলো।

বার্লিনের অনুষ্ঠানমালায় একটা দিন ছিলো একেবারেই অন্যরকম। আগে থেকেই ঘোষণা দেয়া সেই দিনটা ছিলো সবক’টা দেশের ছেলেমেয়েদের জাতীয় পোশাক পরার দিন। পান্না ভাবীসহ দলের মেয়েরা সবাই পরেছিলো সুন্দর সুন্দর শাড়ি। কী যে সুন্দর লাগছিলো মেয়েগুলোকে! ফিরোজা রঙের ঝলমলে একটা শাড়ি পরেছিলেন পান্না কায়সার। এমনিতেই অসম্ভব রূপসী ছিলেন তিনি। ফিরোজা রঙের শাড়িতে তাঁকে পরির মতো লাগছিলো। সবক’টা দেশের ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রবল ঈর্ষা জাগিয়ে সেদিন বিকেলের সেই অনুষ্ঠানে মিডিয়ার দৃষ্টি কেড়েছিলো আমাদের মেয়েরা। সেদিন, সব ক্যামেরাম্যান মানে ফটোসাংবাদিকরা ঝাঁক বেঁধে বিভিন্ন য়্যাঙ্গেলে অবিরাম শাটার টিপে যাচ্ছিলেন বাংলাদেশের শাড়িপরা মেয়েদের দিকে তাক করে।

বাংলাদেশের মেয়েদের না হয় জাতীয় পোশাক শাড়ি। কিন্তু ছেলেদের? আমি কি লুঙ্গিটুঙ্গি পরে নেমে পড়বো মাঠে? না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি হাজির হলাম সেখানে, শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিবকোট পরে। মুহূর্তেই বেঁধে গেলো হুলুস্থুল কাণ্ড! ফটোসাংবাদিকরা এবার একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমার ওপর। অবিরাম শাটার টিপছেন তাঁরা। ফ্লাশগানের আলোয় ভেসে যাচ্ছি আমি! শেষ বিকেলের যাই যাই রোদের আলো-আঁধারীর অপরূপ বিভায় সে এক স্বর্ণালি সময়ের বর্ণালি মুহূর্ত! বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের নেতারা ছুটে এসে আমার সঙ্গে হ্যাণ্ডশেক করতে করতে মহাবিস্ময়ে উচ্চারণ করলেন—শ্যাক্‌ মুজিবুর রক্‌মান, ব্যাঙ্গালাডেস...! 

ফটোসাংবাদিকরাও আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন—হ্যাল্লো শ্যাক্‌ মুজিবুর রক্‌মান!

আমার খুশি দেখে কে! খুশিতে প্রায় লাফাচ্ছি আমি। সদ্যস্বাধীন একটি দেশের মহান স্থপতিকে,আমাদের বঙ্গবন্ধুকে, আমাদের শেখ মুজিবুর রহমানকে পৃথিবীর সবাই চেনে! তাঁর নাম, তাঁর ফটোগ্রাফ এমনকি তাঁর পোশাকটি পর্যন্ত পরিচিত বিশ্ববাসীর কাছে! ওরকম শাদা পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে হাফ স্লিভ কালো কোট পৃথিবীতে একজন নেতাই পরেন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর পোশাকটাই ট্রেডমার্ক পৃথিবীর মানুষের কাছে। আর তাই তো বঙ্গবন্ধুর পোশাকে আমাকে দেখেই চারপাশের লোকজন উল্লাসে ফেটে পড়েছে—হ্যাল্লো শ্যাক্‌ মুজিবুর রক্‌মান! 

সেদিন রাতে বার্লিনের টিভি নিউজে আমাদের দেখিয়েছিলো। টিভি পর্দায় নিজের রঙিন ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আমার সেই প্রথম। এর আগে কালার টিভি দেখিনি আমি।

পরদিন বার্লিনের বেশ কয়েকটা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিবকোট পরিহিত খুদে এক বঙ্গবন্ধুর ছবি! ছবির ক্যাপশনে এমনটাই বলা হয়েছিলো। আমাদের ইন্টারপ্রেটার জার্মান তরুণী ডাচ ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকার ক্যাপশন অনুবাদ করে শুনিয়েছিলো আমাকে।

আজ তেতাল্লিশ বছর পর আমার স্মৃতির য়্যালবামের সবচে বর্ণাঢ্য পাতাটির দিকে চোখ রাখতে গিয়ে কেবলই মনে হচ্ছে জাতীয় পোশাক পরার সেই বিশেষ দিনটিতে, বার্লিনে, শাদা পাজামা-পাঞ্জাবির সঙ্গে মুজিবকোট পরে, কাকতালীয় ভাবে, অজান্তেই আমাদের জাতীয় পোশাকহীনতার বিষয়টিকে আড়াল করতে সক্ষম হয়েছিলো স্বপ্ন দেখা মুগ্ধ এক কিশোর। (স্বাধীনতার পঁয়ল্লিশ বছর পরেও আমাদের কোনো ‘জাতীয় পোশাক’ নেই!)

লেখার সঙ্গে জুড়ে দেয়া দ্বিতীয় ছবিতে বার্লিনের ক্যাম্পে বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের ভাব বিনিময়। এই ছবিতে বালক লুৎফর রহমান রিটনকে কি চেনা যায়? সবার ডানে শক্লা রায়।

অটোয়া ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সূত্র: লেখকের ফেসবুক থেকে

 

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:১৭:৪৯