সিডনিতে জীবনের গল্প-২
কাজী সুলতানা শিমি
অ+ অ-প্রিন্ট
নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে বাসায় ফিরছি। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যাবহার করার এই সুবিধা। একদিকে মন্দ না, গাড়ী ড্রাইভ করতে যে কনশেনট্রেশন দিতে হয় তারচে কল্পনার জগতে একটুখানি বিচরণ, ভালোই তো।  ব্যাপারটা অনেকটা দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া” ধরণের। সেই নিউজিল্যান্ড থেকেই শুধু গাড়ীতে চলাফেরা করে এমন অভ্যাস হয়েছে, গাড়ী না থাকলে বিদেশের জীবন ঘোর অমানিশা মনে হয়। এখন দেখছি আসলে তা নয়। এদেশের পাবলিক সার্ভিস বা ট্রান্সপোর্ট এতোটাই গুছানো যে তেমন কোন অসুবিধাই হয়না। সময়টা একটু বেশী লাগে, এই যা। 

এই যাহ্‌!আজ বোধহয় ভুল করে অন্য রুটের বাসে উঠে পরেছি। মুশকিল হয়ে গেলো দেখছি। প্রথমে বুঝতে পারিনি। কিছুক্ষণ বাইরের দৃশ্য দেখার পর বুঝতে পারলাম, আরে এটা তো প্রতিদিনের দৃশ্য থেকে ভিন্ন। বাসে উঠার সময় কিছুটা অন্যমনস্ক ছিলাম। তার কারন হল, স্টপেজে এসে বাসের অপেক্ষা করছিলাম অন্য দিনের মতো। তেমন কেউ ছিলোনা। কিছু ইয়ং ছেলেমেয়ের দল বাস স্টপেজের বেঞ্চে নিজেদের মধ্যে দুষ্টামি করছিলো। তাদের হাতে, ভ্রুতে রিং পরা ও উল্কি আঁকা আমাদের দেশে বখাটে বলতে যা বুঝায়। আমি তাদের চঞ্চলতা না দেখার ভান করে বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম। দেখছি ওরা যে চিপস চকলেট, ড্রিংস খাচ্ছিলো তার লিটার অর্থাৎ ময়লাগুলো  ফেলছিলো যত্রতত্র। 

আমি তাদের দিকে না তাকিয়ে বা কিছু না বলে লিটার অর্থাৎ তাদের ফেলা আবর্জনাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। আমি এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবর্জনাগুলো দেখছিলাম যেন অতি চমৎকার কিছু দেখছি। আমার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ময়লা দেখার ভঙ্গী দেখে ছেলেমেয়ে গুলো কিছুটা বিব্রত বোধ করা শুরু করলো। এরপর নিজেরাই বলাবলি করা শুরু করলো ময়লা গুলো বিনে ফেলা উচিৎ। ওদের কথোপকথন আমি না শোনার ও না দেখার ভান করে শূন্য দৃষ্টিতে দুর দেখছিলাম। আসলে আড়চোখে দেখছি ওরা ময়লা গুলো তুলছে না কেন! তারপর দেখলাম ছুড়ে ফেলা লিটার সহ স্টপেজের অন্যান্য ময়লা গুলোও ওরা নিজের হাতে কুড়াতে শুরু করলো। আমি নির্বিকার ভঙ্গীতে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলাম যেন ওদের কিছুই দেখছিনা। মনে মনে ভাবলাম এজন্যই তো এসব দেশ এতো পরিষ্কার থাকে। কিছুই বলিনি শুধু তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ময়লা গুলোর দিকে তাকাতেই ওরা বুঝে ফেললো। ইচ্ছে করেই অবশ্য কাউকে কিছু বলিনা। যে বুঝনা সে মুখে বললেও বুঝবেনা। শুধু শুধু কথা বলে এনার্জি খরচ করে কি লাভ। অথচ ওদের বখাটে বলেই ধারণা হয়েছিলো। এমন সময় বাস আসলো আমি নাম্বার না দেখেই ঝট করে উঠে পরলাম। এখন দেখছি এটা আমার গন্তব্যর বাস নয়।

কি করা এখন তাই ভাবছি। সাথে মোবাইল নেই। এই মোবাইল ফোনটাকে কেন জানি আমি একেবারেই আপন করতে পারিনি। প্রায়ই ফেলে আসি বাসায়। তাতে অবশ্য তেমন একটা অসুবিধাও হয়না। আপন মনে নানা বিষয় চিন্তা করতে পারি। কোন জরুরি ব্যাপার থাকলে তো পরেও বলা যায়। পথে যেতে আসতে যে টুকু সময় তা নিজের করে পাওয়া যায়। যাই হোক আজ সাথে না থাকায় দেখছি একটু ঝামেলাই হয়ে গেলো। বুঝতে পারছিনা কোথায় যাচ্ছি। মোবাইল থাকলে জি পি এস কিংবা গুগল এ দেখে নিতে পারতাম। অগত্যা বাস ড্রাইভারকে বললাম, আমি ভুল করে এই বাসে উঠে পরেছি এই বাস কোথায় যাচ্ছে? সে জানালো বাস অবার্ন যাচ্ছে। আমি প্যারামাটা যাবো, কি করবো এখন’ -ড্রাইভারকে জিগ্যেস করলাম। সে বলল, অবার্ন ট্রেন ষ্টেশন বাসের শেষ স্টপেজ।  ওখানে নেমে ট্রেনে যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারো। আমি ভাবলাম, তাইতো দুই বার বাস বদলানোর চেয়ে একবার ট্রেনে যাওয়াটা তো মন্দ নয়। ট্রেনে প্যারামাটা না গিয়ে গ্রেনভিল কিংবা গিলফোর্ড নেমে গেলেই তো হয়। বাকিটা হাঁটা পথ। দেখা হয়না চক্ষু মেলিয়া’র আশা পূরণ হয়ে যাবে। রথ দেখা কলা বেচা দুটোই। ট্রেনেও চড়া হল আবার নৈসর্গিক দৃশ্যও দেখা গেলো। বাস ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানিয়ে চুপচাপ বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। সময় খুব কম। তাই জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত উপভোগ করা উচিৎ। আমি আর ছুটে চলা প্রকৃতি’-চিন্তা ও বাস্তবতার অপূর্ব উপভোগ। হটাত ড্রাইভারের ডাকে সম্বিৎ ফিরে এলো। বাস অবার্ন ট্রেন ষ্টেশন এসে পরেছে। ড্রাইভারকে বলে রাখায় সেইই আমাকে নামতে বললো। আমি নেমে পড়লাম। 

একই ওপাল কার্ড বাস ও ট্রেন দু’বাহনেই ব্যাবহার করা যায়। কার্ড সুইপ করে ট্রেন স্টেশনে ঢুকে পড়লাম। তেমন ভিড় নেই। দুপাশ থেকেই ট্রেন আসছে যাচ্ছে। পরিচ্ছন্ন ও এয়ার কন্ডিশন লাগানো সব ট্রেনেই। সীট গুলো দুপাশ থেকেই এদিক ওদিক ফেরানো যায়। তাই যেকোনো দিক থেকেই সবাই ট্রেনের সামনের দিকে চলাটা উপভোগ করতে পারে। প্রতিটি বগিতেই ম্যাপের ছবি দেয়া আছে। ম্যাপে ট্রেনের বিভিন্ন লাইন গুলো রঙিন ভাবে চিহ্নিত করা। কোন লাইনে কোন ট্রেন যাবে তা পরিষ্কার ভাবে এঁকে ও লিখে দেয়া আছে। একটু খেয়াল করে তাকালে কারো না বুঝার কথা নয়। তার উপর টিভি পর্দায় স্টেশন গুলোর নাম উঠছে ট্রেন কোথায় কোথায় থামবে। সব কিছুই বেশ গুছানো ও ধারাবাহিক। স্টেশনের ভেতর ট্রেন যেখানে থামবে সেখানে টয়লেট, হাল্কা স্নেক্স ও পানির দোকান ছাড়া তেমন কিছুই নিই। ট্রেনের ভেতর খাওয়া নিষেধ। ট্রেন কর্মচারীর সাহায্য ও নির্দেশনা ছাড়াও মাইকে ক্রমাগত ঘোষণা হচ্ছে কত নাম্বার স্টেশন থেকে কোন ট্রেন কোন দিকে যাবে। ম্যাপ, ট্রেন কর্মচারী, টিভি পর্দা ও ভয়েস এনাউন্সমেন্স সহ সব ধরণের সুবিধা রাখা আছে ট্রেন জার্নি বোঝার জন্য। এসব দেখতে দেখতেই গিলফোর্ড লাইনে যে ট্রেন যাবে সেটা এসে পড়লো। আমি উঠে পড়লাম। এবার আর অন্যমনস্ক ছিলাম না তাই ভুল হলনা। 

ট্রেনের দুলুনিতে বেশীর ভাগ মানুষেরই ঘুম ঘুম অবস্থা। তারপরও কানে হেডফোন হাতের মোবাইলে ফেসবুক। কেউ কেউ মেসেঞ্জারে ব্যস্ত। আমি শুধু দেখছি কে কি করছে। মানুষ বড়ো অদ্ভুত প্রাণী। সবকিছু একসাথে করতে চায়। একসাথে করতে গেলে কিছু কি আর সম্পূর্ণ পাওয়া হয়! কি জানি জীবনটা খুব ছোট বলেই হয়তো সবকিছুতেই এতো তাড়াহুড়া। আমি বাইরের দিকে তাকালাম। একটা অদ্ভুত ভালোলাগা ছুঁয়ে গেলো আমাকে। আমি বসে আছি, চারপাশে সব কিছু ছুটছে………           

 

 

৩০ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:২৬:১২