সিডনিতে জীবনের গল্প
কাজী সুলতানা শিমি
অ+ অ-প্রিন্ট
কাজী সুলতানা শিমি
ঝকঝকে রোদ আজ সিডনিতে। বসে আছি প্যরামাটা বাস-ডিপোতে। বাস আসছে যাচ্ছে। লোকজন উঠানামা করছে। নানা বর্ণের নানা পোশাকে ভিন্নদেশী সব মানুষ। একা থাকলে মাঝে মাঝে জীবনটাকে ফোর-D সিনেমার মতো মনে হয়। যেন চোখের সামনে যা ঘটছে তা এক ছায়াছবি। হঠাৎ করে দৃশ্যপট পাল্টে ও যেতে পারে। দেশের বাইরে আজ ১৫ বছর কিন্তু যা কিছু দেখি কেন জানি এখনো দেশের সব কিছুর সাথে মিলিয়ে দেখার একটা প্রবনতা কাজ করে। এই যে বাস-ডিপোতে  বসে আছি মনে মনে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। 

বি-১ স্টপেজ থেকে গিলফোর্ড বাস ছাড়বে। বাস-ডিপোতে সারি সারি করে নাম্বার দেয়া আছে কোথায় কোন বাস যাবে তার তালিকা ও নাম্বার সহ। তালিকা ও নাম্বার সম্বলিত বাস সময় মতো আসছে আর নির্দিষ্ট গন্তব্যর যাত্রীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কোনটা দোতলা কোনটা একতলা কিন্তু সব কটিই ঝকঝকে তকতকে ও এয়ার কন্ডিশন লাগানো। যাত্রীরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো। যদি বাচ্চাদের প্রাম বা স্ট্রলার থাকে সে ক্ষেত্রে তাকে আগে যেতে দেয়া হচ্ছে। বাসের ড্রাইভার নেমে এসে নিজে ঠেলে সে স্ট্রলার উঠিয়ে নিচ্ছে। আমি বসে বসে দেখছি। ভারি ভালোলাগে এইসব গুছানো কিছু দৃশ্য দেখতে। আমার পাশে অপূর্ব এক সুন্দরী রমণী বসে বসে দুপরের লাঞ্চ করছে হাতের প্ল্যাস্টিকের বক্স থেকে। খাবারের সুস্বাদু গন্ধ আমাকেও কিছুটা ক্ষুধার্থ করে ফেললো। খেতে খেতেই আমাকে জিজ্ঞেস করছে মেরিল্যান্ড যাবার বাস নাম্বার কতো তুমি কি জানো? আমি বললাম জানি। বাস নাম্বার বলে তাকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কি মেরিল্যান্ড থাকো? সে বলল না, মেরিল্যান্ড চুল কাটতে যাচ্ছে এসেছে ক্যাসেলহীল থেকে। আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম এটা কি তোমার পার্মানেন্ট হেয়ার ড্রেসার যে এতদূর থেকে শুধু চুল কাটতে যাচ্ছ? সে বলল, না ফাস্টটাইম যাচ্ছে  তার ফ্রেন্ড বলেছে এই হেয়ার ড্রেসার নাকি ভালো চুল কাটে এবং দাম কম নেয় তাই প্রথম ট্রায়াল দিতে যাচ্ছে। আমি মনে মনে হাসলাম চলনে বলনে যতোই বিদেশী ভেতরে ভেতরে সব এক। সস্তা আর দাম কম শুনে বাস ভাড়া ও সময় নষ্ট করে হলেও ট্রায়াল দিতে যাচ্ছে। 

যাবো গিলফোর্ড। এ রুটের বাস তুলনামূলক কম তাই বসে বসে অনেকক্ষণ নৈমত্তিক দৃশ্য দেখি। এখন যে বাসটি সামনে দাঁড়ানো তাতে লাইনে থাকা যাত্রীরা একে একে উঠছে। বাসে সিগারেট নিয়ে উঠা যাবেনা বলে একজন তার হাতের সিগারেটটি আধা নেভানো অবস্থায় মাটিতে ছুড়ে ফেললো। সাথে সাথে আরেকটি মহিলা যাত্রী সেটি তুলে নিয়ে হাত দিয়ে কচলিয়ে নিভিয়ে তার ব্যাগে রেখে দিলো। দেখে মনে হলো পরে নিজে আবার ধরিয়ে নিবে বাস থেকে নেমে। মহিলার পোশাক পরিচ্ছেদ পরিপাটী দেখতে ও ভদ্র গোছের কিন্তু কেন সিগারেট কুড়িয়ে খাচ্ছে সেটি ঠিক বুঝা গেলনা। বিচিত্র মানুষের আচরণ। 

আমার নিজের বাস এসে গেছে তাই উঠে পড়লাম। অনেক দিন বাসে উঠিনা বলে ওপাল কার্ডের ব্যাবহার ঠিক বুঝতে পারিনা। কার্ডটি রি-লোড করেছি আজ কিন্তু ব্যাল্যান্স শো করছেনা। টেপ ইন টেপ আউট করতে হয় প্রতিবার বাসে উঠার পর ও নামার আগে। আমি একা একটা সিটে বসে পড়লাম। একে একে যারাই বাসে উঠছে প্রত্যেকের কানে দেখছি হেড ফোন লাগানো। এদিকে আবার মোবাইলে টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে মুখে হাসি হাসি ভাব ধরে আছে। প্রথম যখন বিদেশে আসি তখন দেখেছি যাত্রী অথবা বাস ড্রাইভার পরস্পর পরস্পরকে শুভাশিস জানাতো হ্যালো কিংবা গুড মর্নিং বা কিছু একটা বলে। তখন থেকে বলে বলে আমার ও অভ্যাস হয়ে গেছে। আজকাল ইয়ং দের মধ্যে দেখছি সে কার্টেসি তেমন একটা নেই। 

বাস ছাড়ল কয়েক মিনিটের মধ্যেই। অল্প খানিক পথ তাও জানালার পাশে বসতেই ভাল লাগছে। বাইরের দৃশ্য বাস থেকে দেখতেই মনে হয় বেশি সুন্দর। রাস্তার দুপাশটা পরিপাটী করে সাজানো যেন ছবির দৃশ্য। এখানে সব কিছুই খুব গুছানো বিশেষ করে পাবলিক স্পেস গুলো তো আরও বেশি। যে দিকেই চোখ যায় যেন একটা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ। বাসের মধ্যে ক্যামেরা লাগানো আছে বলে সতর্ক করে দেয়া যেন কেউ কোন অযোচিত আচরণ বা পাবলিক স্পেসের ব্যাবহার বিধি লঙ্ঘন না করে। বড় করে বাসের ড্রাইভারের ছবি, নাম ও পরিচয় পত্র টানানো আছে বাসের সামনের অংশে। যে কেউ তার পরিচয় জানাতে পারবে যদি কোন অনিয়ন্ত্রিত ঘটনা ঘটে যায়। বাসের নাম্বার ও কোন কোন রাস্তায় থামবে কয়টা স্টপেজ তারও বিস্তারিত দেয়া আছে যাতে ভুল হলে ও বুঝে নিতে পারে সে কোন রুটে যাচ্ছে। প্রত্যেক সিটের পাশে একটা করে স্টপ বাটন লাগানো। যে স্টপেজে নামতে হবে তার আগে সে বাটনে চাপ দিলেই শব্দ করে বাস স্টপিং লাইট জ্বলে উঠবে। কোন কন্টেকটার বা হেল্পার ছাড়াই বাস ড্রাইভার পরবর্তী স্টপেজে বাস থামিয়ে দেবে। বাস ড্রাইভার একাই সব করছে। ওপাল কার্ড, বাস কার্ড ও ক্যাশ দিয়েও যদি বাসে উঠে কেউ, ড্রাইভার একাই সব সমস্যা সমাধান করে। 

দুপুরের দিকে বাসে তেমন ভিড় হয়না। স্কুল ছুটি বা অফিস ছুটির সময় বেশী ভিড় হয়। আর হলেও বা কি নির্দিস্ট যাত্রীর বেশী বাসে উঠানো নিষেধ। পরের বাসে আসতে হয়। প্যরামাটা বাস-ডিপো থেকে শুধু উডভীল রোড ধরে কয়েকটা স্টপেজ পেরুলেই সাউথ গ্রেনভীল স্কুলের সামনে আমি নামবো। এর মধ্যে দুতিনটা স্টপেজ ছাড়া যাত্রী তেমন উঠেওনি নামেওনি। কাজেই খুব তাড়াতাড়িই গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। আমার নামার পালা, আগেই দেখি কেউ একজন স্টপ বাটন চেপে দিয়েছে তাই আমার আর চাপতে হলনা। গন্তব্যে নেমে পড়লাম। সামনে আলডী” সুপারমার্কেট। তাড়াতাড়ি এসে পড়লাম, হাতে সময় আছে। ভাবলাম টুকিটাকি ঘরোয়া শপিং সেরে নিই। শপিং এর জন্য আলডী”-তে ঢুকে পড়লাম। মাত্র কিছুদিন হলো এটা ওপেন হয়েছে তাই সব কিছু একটু বেশিই ঝকঝকে। অন্যান্য সুপারমার্কেটের তুলনায় আলডী”তে একটু সস্তা হয় সবকিছু। এরা শপিং ব্যাগ দেয়না তাই সে খরচটা বাঁচিয়ে  হয়তো জিনিষপত্রের দাম একটু কম নেয়। শুধু গতানুগতিক ব্র্যান্ড থাকেনা। জিনিষপত্র ভিন্ন কোম্পানির, বিশেষ করে জার্মানির প্রোডাক্ট বেশী থাকে। আমি খুব একটা শপিং করিনা আলডী” থেকে নেয়ায়েত জরূরী না হলে। গ্রোসারি শপিং-এ আমার উলওয়ার্থ-ই বেশী পছন্দ। দোকানে ঢুকার পর এখন দেখছি অনেক কিছুই লাগবে। কি যে করি। পাঁচ মিনিট হাঁটা পথ গ্রোসারি ব্যাগ নিয়ে কিকরে হাঁটবো তাই ভাবছি......                       

 

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:২৯:৫০