গায়েবি মামলার ভবিষ্যৎ কি তবে গায়েব হইবে?
উদিসা ইসলাম
অ+ অ-প্রিন্ট
আশির দশকে বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা ‘মিস্টার ইণ্ডিয়া’৷ জাদুকরি ক্ষমতা নিয়ে সেসময়ের তুলনায় এ সিনেমার সম্পাদনা ছিল আপগ্রেডেড৷ সে তো গেল টেকনিক্যাল আলাপের দিক৷ সিনেমার বিষয়বস্তুও আনকোরা: শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করতে বিশেষ উপায়ে উধাও হয়ে গিয়ে উপযুক্ত সাজার ব্যবস্থা করতেন নায়ক৷ উধাও/গায়েব হয়ে সাজা দিতে পারলেও তাকে যদি কোনোক্রমে দেখে ফেলতো কেউ, গায়েব হওয়ার কৌশলাদি যদি ধরা খেত কোনো কারণে, তাহলে আর তার সেই প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতা থাকতো না, কারণ শত্রুর চেয়ে সে শক্তিতে দুর্বল৷ অর্থাৎ শাস্তি দিতে চাইলে, বদলা নিতে হলে প্রথমত গায়েব হতে হবে৷

শত্রুকে শাস্তির ব্যবস্থা করতে এই গায়েব হওয়া ভালো না খারাপ, সে নিয়ে ভিন্ন পরিসরে আলাপ করা যেতে পারে৷ কিন্তু আলাপ তোলা জরুরি, সেই ঘায়েল করার উদ্দেশ্যেই যখন বাস্তব জীবনে ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু সেই ঘটনাকে ঘটিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে প্রক্রিয়া সেটি চলতে থাকে, সেটি নিয়ে৷ এর নাম গায়েবি মামলা৷

একইসাথে আলাপ তোলা জরুরি, বিএনপির গায়েবি মামলার অভিযোগ যদি সত্য হয়, গণমাধ্যমের কাছে যদি তথ্যপ্রমাণ থাকে, তার পরেও কেন এসব ঘটনা নিয়ে পত্রিকা, অনলাইনের পাতায় তেমন কোনো সাড়া জাগানো অনুসন্ধান নেই৷

গায়েবি মামলা কী এবং কেন

প্রশ্ন হলো, মামলা তো মামলাই, এর আবার গায়েবি রূপ কেমন? মামলা হলো ভিকটিমের অভিযোগ, যেখানে একজন বাদী থাকবেন, যিনি ঘটনার বিবরণী এজাহার আকারে হাজির করবেন, পুলিশ গ্রহণ করবেন এবং তারপর যথাবিহিত নিয়মে সেটি পরিচালিত হবে৷

কিন্তু যে মামলার বিষয়ে অভিযুক্ত নিজে ঘটনার বিষয়ে কোনো আন্দাজ করতে পারে না কিংবা ঘটনা ঘটেনি বা কথিত অপরাধী ঘটনাস্থলে ছিল না, অথচ অভিযুক্ত তালিকায় নাম উঠে যায়, এবং যে মামলায় কখনো কখনো ভিকটিমও থাকে না, তাকে গায়েবি মামলা বলা হয়৷ এ মামলায় আগে অভিযুক্ত নির্ধারণ করা হয়, তারপর তাকে কতদিনের জন্য আটক রাখা জরুরি, তা নির্ধারণ হয় এবং শেষে তার উপযোগী ঘটনা উপস্থাপন করা হয়৷ অনেকটা একবিংশ শতকের শুরুর সেই ক্রসফায়ারের প্রেসবিজ্ঞপ্তির মতোই ছকে বাঁধা৷

হাস্যকর মামলার একাল-সেকাল

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গভবনের কাপ, পিরিচ চুরির মামলা দেন মোশতাকের বিরুদ্ধে৷ ট্রাইব্যুনালের বিচারে তাঁর তিন বছরের জেল ও এক লাখ টাকা জরিমানা হয়৷ অব্যাহতি পান ১৯৭৯ সালে ৷ জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছিল প্লেট চুরির মামলা৷ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে ভ্যানিটি ব্যাগ, স্বর্ণের নেকলেস ছিনতাইয়ের অভিযোগ আনা হয়েছিল মহাজোট সরকারের আমলে৷

কতগুলো উদাহরণ

গতবছর অক্টোবরে হাইকোর্টে ছিল মানুষের ভিড়৷ যদি জিজ্ঞেস করেন, ভাই কী মামলা? উত্তর মিলবে অবধারিতভাবেই, নাশকতা৷ আবার প্রশ্ন করুন ভাই, কবেকার নাশকতা? উত্তরে পাবেন গত মাসের কোনো একসময়৷ কিংবা এইতো, হয়েছে আর কী, ঠিক জানি না৷ নিজের মামলা জানবেন না কেন, জানতে চাইলে উত্তর মিলবে আমি সেসময় এলাকায় ছিলাম না, আর এলাকার লোকজনও এমন কোনো ঘটনার কথা বলতে পারে নাই৷ কিন্তু মামলা হয়েছে৷ আগাম জামিন নিতে এসেছি৷

২০১৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর জুড়ে আলোচনায় ছিল এইসব মামলা৷ যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের অধিকাংশই বিএনপি জামায়াতের রাজনীতির সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন৷ বিএনপির দাবি অনুযায়ী, ১৯টি জেলা ও মহানগরে ৫৮টি গায়েবি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৪০ জন নেতা-কর্মীকে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন নেতা-কর্মীকে৷ বিএনপির অভিযোগ, নির্বাচনের সময় তাদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই এসব গায়েবি মামলার আশ্রয় নিয়েছে সরকার৷

বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, ডেমরা থানাতেই সেপ্টেম্বরে দায়ের হওয়া ৪টি মামলার এজাহার ঘেঁটে দেখা যায় দিন-তারিখ ও স্থান ভেদে ঘটনার বিবরণ প্রায় একইরকম৷ এর একটা ব্যাখ্যাও বিবিসিকে দিয়েছেন ডেমরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান৷ তিনি বলছেন, অপরাধীরা যদি একইরকমভাবে অপরাধ ঘটায় তাহলে মামলার এজাহারেও তো ঘটনার বিবরণ একইরকম থাকবে৷ ঘটনা ঘটার সত্যতাও তো পাওয়া যাচ্ছে না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘ঘটনাস্থলের মানুষজন আপনাকে কে কী বললো, সেটা আমাদের দেখার বিষয় না৷''

যদিও প্রশাসন অস্বীকার করছে পুরো বিষয়টিকে৷ প্রশাসন একমত হবে এরকম একটি বিষয়ে সেটি ভাবাটাও খুব বেশি ইতিবাচক হওয়া ছাড়া কিছু নয়৷গায়েবি মামলাবলে কোনো কিছু নেই বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, গায়েবি মামলা বলতে কিছু নেই৷ সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে৷

তবে যে আইনি লড়াইও হলো

এই গায়েবি মামলা আছে কি নেই সেই তর্কের মধ্যেই এইসব মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইও হয়েছে৷ গায়েবি মামলা নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়৷ রিট আবেদনে বলা হয়, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তিন হাজার ৭৩৬টি মামলা দায়ের করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী৷ এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে তিন লাখ ১৩ হাজার ১৩০ জনকে৷ আর অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে কয়েক হাজার৷ এ ধরনের মামলা সঠিক হয়েছে কিনা তা তদন্ত করতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করার নির্দেশনা চাওয়া হয় রিটে৷ কিন্তু এর সমাধান মেলে না যখন কিনা বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী একটি অন্তর্বর্তী আদেশ জারির পাশাপাশি রুল জারি করলেও কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন৷

তাহলে কেন এই মামলা?

গতবছর সেপ্টেম্বর থেকে পত্রিকার খবর, বিরোধী দল বিএনপির নেতা-কর্মীদের নতুন করে যে ধরপাকড় চলছে, তার অধিকাংশই হচ্ছে গায়েবি অভিযোগ বা মামলার ভিত্তিতে৷ গায়েবি মামলা বলার কারণ মামলায় বর্ণিত অপরাধ আদতেই ঘটেছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না৷ এসব মামলায় আসামিদের মধ্যে আছেন এমন ব্যক্তি, যারা নিজেরাও ঘটনা বিষয়ে অবহিত নন৷

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এধরনের মামলা করার রেওয়াজ থাকলেও এত ব্যাপক পরিসরে এর আগে করা হয়নি৷ নির্বাচনের মাঠে বিএনপি সংগঠকদের নামতে না দেয়ার কৌশল হিসেবে এই মামলা বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও তারা এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি, তথ্যও হাজির করতে পারেনি৷

শেষ কোথায়?

প্রশ্ন হলো, যদি মামলাটি হয় কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে তাহলে এখন এই মামলাগুলোর কী হবে? সম্প্রতি কোনো ধরনের ভুয়া মামলা দায়ের হয়েছে কিনা এবং ওইসব মামলায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে আসামি করা হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে৷ ওই নির্দেশের আলোকে ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে যাচাই-বাছাই৷ যাচাই বাছাই শেষে মামলাগুলো সঠিক মনে না হলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে এবং মামলার ইতি ঘটবে৷ কিন্তু তৃণমূলের বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা মনে করেন, তদন্ত না করে, আসামি না ধরে এই মামলাগুলো ঝুলিয়ে রাখা হবে যে-কোনো সময় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য৷

শেষ করি, শুরুর কথা দিয়েই৷ এতসব তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে গণমাধ্যম কেন সেই অর্থে সরব নয়৷ তথ্য সঠিক হলেও ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বাইরে তা প্রকাশের জন্য ‘যদি' হেনস্তার শিকার হতে হয় সেই শঙ্কার জায়গা থেকে অনেকেই আর এসব নিয়ে কথা বলতে চান না৷ শুধু ভিন্নমত প্রকাশের জন্য ৫৭ ধারার খড়গের নীচে পড়ার আশঙ্কা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চায় গণমাধ্যম৷

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে আরও শক্তিশালীভাবে মুখ বন্ধ করা গেছে৷ তাই বলে বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা নেই তা বলতে পারবেন না, প্রমাণ করা দূরে থাক৷ সবাই অনেক কিছু বলছে, অনেক কিছু লিখছে, অনেক কিছু চিন্তা করছে৷ কিন্তু অনেকে যে অনেক কিছু বলছে না, সেটি বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে৷ -ডয়েচেভেলে

উদিসা ইসলাম, সাংবাদিক

 

০২ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:৪১:০১