সবাই অবাধ বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন চায়
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
অ+ অ-প্রিন্ট
বাংলাদেশ প্রতিদিনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শনি বা রবিবার লেখা তৈরি করি। সোমবার চোখ বুলিয়ে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু এবার শনি-রবি গেছে ভীষণ ব্যস্ততায়। শনিবার প্রেস ক্লাবে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক সংবিধানপ্রণেতা, প্রবীণ নেতা ড. কামাল হোসেনের সংবাদ সম্মেলন ছিল। তার আগে তার অফিসে গিয়েছিলাম। মতিঝিলে দলীয় অফিসেও কাজ ছিল। সংবাদ সম্মেলন শেষে মেয়ে, স্ত্রীকে নিয়ে টাঙ্গাইলের পথ ধরেছিলাম। তাই শনিবার কলম ধরা হয়নি। রবিবার ছিল একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী যাচাই-বাছাই। সেজন্য টাঙ্গাইলে ছিলাম। আটটি আসনে যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছিল সকাল সাড়ে ৯টায়। ১১টার কয়েক মিনিট আগে গিয়েছিলাম রিটার্নিং অফিসারের অফিসে। তখন টাঙ্গাইল-৩, ঘাটাইলের যাচাই-বাছাই চলছিল। লোহার গেট বন্ধ ছিল। বাইরে অপেক্ষা করেছিলাম ১০-১৫ মিনিট। টাঙ্গাইল-৪, কালিহাতীর যাচাই-বাছাইয়ের সময় ২ নম্বরে ছিল আমার মনোনয়নপত্র। আমার টাঙ্গাইল-৪ এবং ৮, দুটি একসঙ্গে সেরে দিতে চাচ্ছিলেন। বলেছিলাম, না। বাকিগুলো শেষ হয়ে যাক। আমি জানতাম ষড়যন্ত্রের কারণে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল হবে। হাজার কোটি টাকা ঋণী, কেউ আবার হাজার হাজার কোটি তাদের এক ফুৎকারে পুনঃ তফসিল হয়ে গেছে। কিন্তু আমারটা হবে না তা আমার জানাই ছিল। তাই বলেছিলাম, সবার শেষে আমারটা ধরা হোক। রিটার্নিং অফিসার তিনবার আমার যাচাই-বাছাই শেষ করে নিতে চেয়েছিলেন। পরে তিনি একেবারে শেষে ধরতে রাজি হন। অন্যান্য জায়গায় যাচাই-বাছাই নিয়ে অনেক অভিযোগ। কিন্তু টাঙ্গাইলে আমার তেমন মনে হয়নি। যাচাই-বাছাইয়ে আমি অনেক সময় ছিলাম। ডিসি, এসপি বা অন্যান্য অফিসারের সঙ্গে আগে কখনো দেখা হয়নি। তাই কারও সঙ্গেই পরিচয় ছিল না। আগে একটা নিয়মের মতো ছিল, ডিসি-এসপিরা প্রথা অনুযায়ী নতুন গেলে পরিচিত হতেন। জানাতেন, আমি প্রথম এসেছি, আপনার সহযোগিতা কামনা করি। এখন সেসব নিয়ম-কানুন অথবা প্রথা বদলে গেছে। কে এলো কে গেল এসবের কোনো কিছু আমরা জানি না। সে যাই হোক, যেহেতু তেমন তয়-তদবির থাকে না, তাই অফিসার কে কখন এলেন গেলেন তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন না থাকলে হয়তো এই ডিসির সঙ্গেও দেখা হতো না। ভদ্রলোক বেশ দক্ষতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই পরিচালনা করেছেন। কর্মচারী-কর্মকর্তারা উপযুক্ত হলে দেশের কল্যাণ হয়, স্বস্তি আসে। ঋণখেলাপি হিসেবে আমার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলো এ নিয়ে তিনবার। প্রথম ২০১৪ সালে সখীপুর-বাসাইল আসনের বিনা ভোটে নির্বাচিত শওকত মোমেন শাজাহানের মৃত্যুর কারণে। আমরা নির্বাচন বয়কট করেছিলাম। কিন্তু কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের জন্ম সখীপুর-বাসাইল উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে, সেহেতু সেখানে আবার উপনির্বাচন হতে গেলে দলীয় চাপে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উপায় ছিল না।  আমাদের দল বেশ ছোট। কিন্তু আমরা চেষ্টা করি দলীয় কর্মীদের মতামতকে যথাযথ মূল্য দেওয়ার। দলীয় কর্মীদের ইচ্ছার মূল্য দিতে গিয়ে আমরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সরকারি উদ্যোগে পুনঃ তফসিল করা ব্যাংক ঋণকে অস্বীকার করে ঋণখেলাপি দেখানো হয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে ঢাকা-টাঙ্গাইল, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহে প্রায় ৪৭টি সেতু ধ্বংস করেছিলাম। স্বাধীনতার পরপর সেই সেতু মেরামতের জন্য আমরা যখন ঝাঁপিয়ে পড়ি তখন দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধে হানাদারদের চলাচল বন্ধ করতে সেতু ধ্বংস করা যত কঠিন তার চেয়ে অনেক কঠিন স্বাধীন দেশে ধ্বংস রাস্তাঘাট মেরামত করা। মুক্তিযুদ্ধ অনেকেই করেছেন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অহংকার করেন। মুক্তিযুদ্ধ করে যে বিরাট কিছু করেছি আজ পর্যন্ত এক দিনের জন্যও তা বুঝতে পারিনি। মাঝে হয়তো কিছু সময় গৌরবের নির্মল বাতাস আশপাশ দিয়ে বয়ে গেছে। কিন্তু তা বড় ক্ষণস্থায়ী। ১৬ ডিসেম্বর যখন হানাদার সেনাপতি টাইগার নিয়াজির গুহায় গিয়েছিলাম তখন জীবনের পরোয়া করিনি। বরং ভারতীয় সেনাপতি মেজর জেনারেল নাগরা, ব্রি. সানসিং, ব্রি. ক্লের আমাকে নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন, তারা ভারতীয় নিয়মিত বাহিনী। তাদের জেনেভা কনভেনশনের রক্ষাকবচ আছে। আমি একেবারে মাটি থেকে উঠে আসা মুক্তিযোদ্ধা, কাদেরিয়া বাহিনী। আমার রক্ষাকবচ কোথায়। ভারতীয় সেনাপতিরা উদ্বিগ্ন। কিন্তু আমি এক মুহূর্তের জন্য হইনি। নিয়াজির সঙ্গে যখন দেখা হয় ঘৃণায় তার সঙ্গে হাত মেলাতে পারিনি, মিলাইওনি। নারী ইজ্জত হরণকারী, নরঘাতকের সঙ্গে হাত মেলাতে বিবেক সায় দেয়নি। যুদ্ধের সময় একমাত্র আমাকে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে যারা এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, তাদের সঙ্গে হাত মেলানোর দীনতা আমার কখনো ছিল না।

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা দখলের তেমন পরিকল্পনা ছিল না। ভারতীয় বাহিনীর ধারণা ছিল ঢাকা বিজয় খুবই কঠিন হবে। তাই ঢাকাকে চারদিক থেকে চেপে ধরার পরিকল্পনা ছিল। সেজন্য আগরতলা থেকে শক্তিশালী ভারী সৈন্য দলের ঢাকায় আসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসা বাহিনীর দায়িত্ব ছিল। পশ্চিমে নবীনগর, উত্তরে টঙ্গীর রাস্তায় জাঁকিয়ে বসে থাকা। আমার কাছে পরিকল্পনাটি পছন্দের ছিল না। তাই ঢাকা দখলই যদি আমাদের দায়িত্বে না থাকে তাহলে আর দক্ষিণে যাওয়া কেন। মুক্ত টাঙ্গাইলকে সুরক্ষিত করে অবস্থান করাই ভালো। ১৩ ডিসেম্বর গভীর রাতে সিদ্ধান্ত হয় পশ্চিমে নবীনগর পর্যন্তই আমাদের দায়িত্ব। আরও এগিয়ে গেলে অথবা ঢাকা দখল নিলে কোনো আপত্তি নেই। আল্লাহ মেহেরবান, শত ষড়যন্ত্রের পরও সবার আগে একমাত্র বাঙালি হানাদারের গুহায় গিয়ে বাঘকে শৃগালের মতো টেনে বের করেছিলাম। ওইসব বাঘের চলাফেরা বন্ধ করতে আমরা যে রাস্তাঘাট-পুল ভেঙেছিলাম তা দ্রুত সেরে ফেলতে গিয়ে সেই বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিলাম। যুদ্ধ করা যত কঠিন, জীবন দেওয়ার চাইতে দেশ গড়া খুব একটা কম কঠিন নয়। এর মধ্যে আবার কাদেরিয়া বাহিনীর হাত থেকে অস্ত্র আনতে ’৭২-এর ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সড়কপথে টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে ছোট-বড় ২৭টি সেতু ভাঙা ছিল। অস্ত্র নিয়ে ফেরার চার-পাঁচ দিন পর বঙ্গবন্ধু আমায় বললেন, ‘কী হবে কাদের! রাস্তাটা তাড়াতাড়ি ঠিক করে ফেলতে না পারলে ময়মনসিংহ-জামালপুর-নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জের মানুষ না খেয়ে মরবে।’ এখনকার মতো তখন যেখানে সেখানে রাস্তা ছিল না। যুদ্ধের উন্মাদনা নিয়ে বলেছিলাম, যেভাবে ভাঙা হয়েছে সেভাবেই আবার নির্মাণ করে ফেলা হবে। শুরুও করেছিলাম। তখন রাস্তা নির্মাণে রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে ছিল না, ছিল সিঅ্যান্ডবি। তারা রড দেয়, সিমেন্ট দেয় কাজ হয়। মুক্তিযুদ্ধে যারা ট্রেনিং নিয়েছে যারা সরকারি কর্মকর্তা ছিল কমবেশি সবাই ভাতা বা বেতন পেয়েছে। কাদেরিয়া বাহিনীর যোদ্ধারা মাসে ১০ টাকাও পায়নি। যেভাবেই হোক স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তার কাজ চলছিল, সেতু হচ্ছিল তাতে তিন-চার মাস চলে গিয়েছিল। যাদের নেতৃত্বে কাজকর্ম হচ্ছিল নির্মাণ হচ্ছিল তারা একদিন বলল, সিঅ্যান্ডবি মাল মেটারিয়াল দিতে পারছে না। মিস্ত্রি, লেবার না হয় আমরা দিলাম। কিন্তু রড-সিমেন্ট-পাথর পাব কোথায়? গেলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম তখনকার পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রধান আতোয়ার রহমানকে। আতোয়ার রহমান বঙ্গবন্ধুকে বললেন, সরকারি জিনিস হিসাবপত্র ছাড়া স্টোর থেকে বের করা যায় না। কী করতে হবে? অন্তত একটা লাইসেন্সের দরকার। সেই লাইসেন্সের ওপর কাজের হিসাব-কিতাব করা যেতে পারে। সোনার বাংলা প্রকৌশলিক সংস্থা (প্রা.) লিমিটেডের অর্ধেক নাম জাতির পিতার, অর্ধেক আমাদের। সোনার বাংলা বঙ্গবন্ধুর, প্রকৌশলিক সংস্থা আমাদের। জয়েন স্টকে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনে রিকুমেন্ডেশন লাগে। যেটা করেছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর কোথাও এমন বিরল ঘটনা ঘটেনি। ’৭২ থেকে ’৭৫ বঙ্গবন্ধুর জীবিতকালে আমরা আড়াই-তিন কোটি টাকার কাজ করেছি। তাতে প্রায় ৩৫-৪০ লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কে আমাদের ৯০ লাখ টাকা সমাপ্ত কাজের বিল ছিল যা ’৭৫-এর আগস্টের ১৫-২০ তারিখে চেক নেওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ জাতির পিতার নির্মম হত্যার কারণে তৈরি চেক আমরা নিতে পারিনি। সে সময় আমাদের উত্তরা ব্যাংকে লেনদেন ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ প্রতিরোধে ১৬ বছর নির্বাসনে কাটিয়ে দেশে ফিরে সোনার বাংলাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা হলে আমাদের ব্যাংকের আদান-প্রদান শুরু হয় অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে। জামালপুরের মোস্তফা আমিনুর রশিদ ছিলেন তখন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০ লাখ দিয়ে শুরু হয়ে ৪ কোটি ৫০ লাখে শেষ হয়। ব্যাংক আমাদের ৪ কোটি ৫০ লাখও দেয়নি। ৪ কোটি ৫০ লাখের মধ্যে শুধু ২ কোটি ৯৪ লাখ নগদ টাকা দিয়েছিল। যেটাকে আসল মূলধন ধরা চলে। ’৯৪ থেকে ওয়ান ইলেভেনের অবৈধ সরকার আসা পর্যন্ত সোনার বাংলার হিসাব কোনো দিনও অনিয়মিত হয়নি। আর এই সময়ে আমরা ব্যাংককে সুদ ও অন্যান্য চার্জ দিয়েছি ১,৪৬,১০,৯৯৮+৩৯,৫৭,৬৬৬+৫৬,৫০,০০০ =২,৪২,১৮,৬৬৪ টাকা। ওয়ান ইলেভেনের কারণে ঋণটি অনিয়মিত হয়। সেজন্য ব্লকড করতে বলেছিলাম। ব্যাংক তাও শোনেনি। জানি না, পাকিস্তানের সময় পাকিস্তানের কাছে যেমন শত্র“ ছিলাম, রক্ত দিয়ে শ্রম-ঘাম দিয়ে যে বাংলাদেশ বানিয়েছিলাম সেই বাংলাদেশেও কেন যেন শত্র“ হলাম। এবার নির্বাচনের আগে বার বার ব্যাংককে জিজ্ঞাসা করেছি, কত টাকা হলে আমরা ঋণখেলাপির অপবাদ থেকে মুক্ত হতে পারি। তারা সব সময় বাঙালকে হাই কোর্ট দেখিয়েছে। মজার ব্যাপার, হাই কোর্টও ঋণটিকে নিয়মিত করতে নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশের পরও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সোনার বাংলা এরই মধ্যে তাদের চাহিদামতো অনেক টাকা শোধ করেছে। আরও বললে আরও পরিশোধ করা হতো। কারণ ব্যাংকের পাওনা আমরা সব সময় পরিশোধ করতে চাই। কিন্তু নির্বাচনে যাতে না দাঁড়াতে পারি তার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্যাংক এসব করেছে।

অবিশ্বাসে দেশ ছেয়ে আছে, কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। আগে সরকারি কর্মচারীদের সততার প্রতীক, বিবেকের মানদ  মনে করা হতো। এখন তারা শুকনো পাতার মতো। মৃদুমন্দ বাতাসেও এদিক-সেদিক ওড়াউড়ি করে। তাই কারও প্রতি কারও আস্থা-বিশ্বাস নেই। সেজন্য প্রায় সব দল বিকল্প প্রার্থী হিসেবে অনেককে মনোনয়ন দিয়েছিল। টাঙ্গাইল-৮ ও ৪-এ আমার সঙ্গে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বিকল্প প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কালিহাতীতে আজাদ সিদ্দিকী ও লিয়াকত আলী, সখীপুরে আমার প্রাণের ধন ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া বড় মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক। হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক ও কুঁড়ি সিদ্দিকীর মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কুঁড়ি সিদ্দিকীকে ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে। মজার ব্যাপার, ১০-১২ বছর বয়স থেকে আমার পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্ক। ’৭০-এর নির্বাচনের পরপরই কয়েকজন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে সখীপুর পাইলট স্কুল মাঠে এক বিশাল জনসভায় গিয়েছিলাম। তারপর মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের পর সখীপুর আমার হƒদয়জুড়ে বিরাজ করে। আসলে আমি নিজেও বুঝতে পারিনি, আমার হƒদয়ের ধন ছেলে মেয়ে তার মধ্যে কুঁড়ি। আর যেখানেই যাই আমার বুকে-মুখে দেহমনে সখীপুর থাকে। সেই সখীপুর-বাসাইলের সংসদ সদস্য প্রার্থী হবে আমার ছেলে মেয়েÑ কখনো কল্পনাও করিনি। সরকার এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে মতবিরোধে শওকত মোমেন শাজাহান সখীপুর-বাসাইলের সংসদ সদস্য হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে। আমার ছেলে কিংবা মেয়ে সখীপুর-বাসাইল থেকে ভোটে দাঁড়াবে তা এক বছর আগেও ভাবিনি। কিন্তু শত্র“ যখন আক্রমণ করে তখন শত্র“কে কাবু করার জন্য শক্তিশালী অস্ত্র প্রয়োগ করতে হয়। একেবারে রাস্তাঘাটের সাধারণ মানুষের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমি আমার মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকীকে প্রার্থী করেছি। এই তো মাসখানেক আগে কোথায় যেন বসেছিলাম। কয়েকজন বয়সী মানুষ আলতোভাবে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলছিলেন, ‘বঙ্গবীর সিদ্দিকী সাহেব, আপনার নির্বাচনে যদি কোনো অসুবিধা হয় ব্যারিস্টার মাকে দাঁড় করিয়ে দিন। দেখবেন, আপনার চাইতে বেশি ভোট পাবে।’ কথাটা আমার কেমন যেন নাড়া দিয়েছিল। কিন্তু একজন নয়, দুজন নয়, গত কয়েক মাস অনেকের কাছে একই কথা শুনেছি। তাই শেষ পর্যন্ত কুঁড়ি সিদ্দিকীকে প্রার্থী করা। যাচাই-বাছাইয়ের পর কালিহাতী-ঘাটাইল-সাগরদিঘী-বড় চওনা-কচুয়া হয়ে সখীপুরের দীপ-কুঁড়ি-কুশি কুটিরে গিয়েছিলাম। তার আগে আমার বহুদিনের কর্মী শওকত মোমেন শাজাহানের মাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আমার স্ত্রীর ইচ্ছা ছিল শওকত মোমেন শাজাহানের মার সঙ্গে দেখা করবে। এখন আর স্ত্রীর কোনো কথা ফেলে রাখি না। সখীপুরের বাড়ির আঙিনা পুরোপুরি ভরে গিয়েছিল। কুঁড়ির মা তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘মেয়ে হিসেবে কুঁড়ি ভোটে দাঁড়ায়নি, ভোটে কাদের সিদ্দিকী দাঁড়িয়েছেন। কুঁড়ি তার প্রতিচ্ছবি। দেহ কুঁড়ির, আত্মা বা প্রাণ কাদের সিদ্দিকীর।’ আমি অভিভূত হয়েছি, আমার স্ত্রীর অমন সাবলীল বক্তব্যে। মনে হয় কুঁড়ি জীবনে এই প্রথম অসংখ্য মানুষের সামনে দুকথা বলেছে। মিনিটের বেশি হবে না। তার কথার সারমর্ম, ‘আমি ভোটে দাঁড়াতে চাইনি। নানা ষড়যন্ত্রে আমার বাবাকে দাঁড়াতে দেয়নি। তাই তাকে সাহায্য করতে তার হয়ে আমি দাঁড়িয়েছি। আপনারা আমার বাবার কথা মনে করে আমাকে সাহায্য করবেন।’ সখীপুরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা আমাকে অভিভূত করেছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন বাসাইলের অসংখ্য মানুষ, ভোটার কুঁড়িকে আশীর্বাদ ও দোয়া করেছে। কাল থেকে আমিও ভাবছি, সখীপুর-বাসাইলের মা-বোনেরা সারা জীবন ভোট দিয়েছে। কিন্তু মেয়ে হিসেবে কোনো মেয়েকে ভোট দিতে পারেনি। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি এবার হয়তো মেয়ে ভোটাররা একজন মেয়েকে ভোট দিতে পারবে। ছেলে ভোটাররা তাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক কাদের সিদ্দিকীর মেয়েকে কাদের সিদ্দিকী মনে করে ভোট দেবে। সত্যিই আল্লাহর লীলা বোঝা দায়। শওকত মোমেন শাজাহানের ছেলে এমপি হয়েছিল, এবার কি আমার মেয়ে হবে? আমার ছেলে উপযুক্ত চমৎকার দেহগড়নের অধিকারী। হঠাৎই সে কেন এমন অসুস্থ হয়ে পড়বে- এসবই কি আল্লাহর লীলা!  লেখক : রাজনীতিক

- বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

০৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১০:২৮:৪৯