গরিবের ভাউজ নাকি কাচকি মাছের ভাগা!
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি তাঁর এক বক্তব্যে আফসোস করে বলেছেন, রাজনীতি এখন গরিবের ভাউজ হয়ে গেছে। কথাটি তিনি কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছেন যার মর্মার্থ হলো রাজনীতি এখন অসহায় দরিদ্রজনের সুন্দরী বউয়ের মতো যাকে সবাই ভাবি সম্বোধন করে ঠাট্টা-মশকরা এবং রংতামাশা শুরু করে এবং মনের লুক্কায়িত লালসা ও কামনা চরিতার্থ করার জন্য রাত-বিরাতে সেই গরিবের সুন্দরী বধূর সম্ভ্রমহানির জন্য ইতিউতি করতে থাকে। বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, সবাই এখন এমপি হতে চায়। তিনি নিজের উদাহরণ টেনে বলেন, আমার অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাত-আটবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্যের অভিজ্ঞতা, ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার, সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা অথবা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি পদের অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য দরখাস্ত করি কিংবা হাসপাতালের ডাক্তার অথবা কোর্টের বিচারক হতে চাই তবে কেউ আমাকে নিয়োগ দেবেন না। অথচ কোনো রকম অভিজ্ঞতা ও নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে সবাই এমপি হওয়ার জন্য রাজনীতি শুরু করে দেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাঁর স্বভাবসুলভ রসালো ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাকে হাসিয়েছেন এবং নিজেও হেসেছেন। কিন্তু তাঁর সেই হাসির আড়ালে কতটা কান্না লুক্কায়িত ছিল তা কেবল প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদরাই অনুধাবন করতে পারবেন। আমাদের দেশের অত্যন্ত স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। তাঁর মতো প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও ক্যারিশমাটিক ব্যক্তিত্বের সংসদ সদস্য এ উপমহাদেশের ইতিহাসে খুবই কম আছেন। একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অসাধারণ যোগ্যতা, নিজ নির্বাচনী এলাকায় পাহাড়সম জনপ্রিয়তা এবং সংসদ-সংবিধান ও রাজনীতির বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সুনাম ও সুখ্যাতির কারণে তিনি জীবিত অবস্থায় রীতিমতো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনিও একবার আফসোস করে বলেছিলেন, ‘এমপিগিরি কি কাচকি মাছের ভাগা যে সবাই কিনবার চায়!’

আজ এতদিন পর প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের উল্লিখিত ব্যঙ্গাত্মক বাক্য দুটি মনে পড়ল একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন কা-কারখানার ধরন-ধারণ দেখে। এবারের নির্বাচনে এমপি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রায় ১০ হাজার ব্যক্তি মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। ক্রেতাদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন যাদের দেখলে সিলেটের বিখ্যাত ছক্কা ছয়ফুর শরমে-মরমে মরে যেতেন। যারা মনোনয়নপত্র কিনেছেন তার মধ্যে অনেকে হয়তো এমপি পদটিকে গরিবের সুন্দরী বউ মনে করেছেন এবং পদটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরার পাশাপাশি যদি তা ভোগদখল বা নেহাত রসনাতৃপ্ত ও ইন্দ্রিয়সুখের তরে একটু নির্জনে নিয়ে আদর-সোহাগের সুযোগ মেলে তবে নেহাত মন্দ হয় না। অনেকে আবার এমপিগিরিকে কাচকি মাছের ভাগার চেয়েও নিম্ন স্তরে নিয়ে এসেছেন। তারা হয়তো চলমান সংসদের কিছু সদস্যের বক্তব্য ইউটিউবে দেখার পর নিজেদের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বেশ গর্বের সঙ্গে নিজের প্রার্থিতার যৌক্তিকতা তুলতে গিয়ে বলেছেন, আমার পায়ের বুড়ো আঙ্গুল যে রাজনীতি বোঝে তার একাংশ না বুঝেও তো অনেকে এমপি হয়েছেন; তাহলে আমার কী দোষ? এমপি পদ-পদবি ও নির্বাচন নিয়ে যে বড় তামাশা হচ্ছে তা কিন্তু হওয়ার কথা ছিল না। কারণ রাজনীতি কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। রাজ্য, রাজা এবং রাজার চিন্তাভাবনা ও নীতি-নৈতিকতার ব্যাকরণের নাম রাজনীতি। বাংলা ব্যাকরণমতে রাজনীতি হলো ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস; যেখানে বলা হয়েছে, রাজার যে নীতি, তাই রাজনীতি। রাজনীতিকে বলা হয় পৃথিবীতে মানবজাতির দ্বিতীয় প্রাচীন পেশা। মানুষের প্রথম পেশা ছিল অসভ্যতামি ও উলঙ্গপনা করে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো এবং বনের ফল-মূল, লতা-পাতা ইত্যাদি খেয়ে জীবন ধারণ করা। প্রাথমিক জীবনে মানুষ পশু শিকার, মাছ শিকার ইত্যাদি করত না। তারা অহরহ পশুদের আক্রমণের শিকার হতো। মানুষ যেদিন পশুর আক্রমণ থেকে বাঁচার কথা চিন্তা করেছিল সেদিন থেকেই রাজনীতির উদ্ভব হয়েছিল। তালা দলবদ্ধ হয়ে থাকা, নেতা নির্বাচন এবং নেতার হুকুমে চলার মাধ্যমে নিজের বন্যজীবনে প্রথম সভ্যতার পরশ বুলিয়েছিল।

আপনি যদি রাজনীতির প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস অধ্যয়ন করেন তবে দেখবেন, অসাধারণ মেধাদীপ্ত ও ব্যতিক্রমী শরীর-স্বাস্থ্যের অধিকারী অভিজাত লোকদের মধ্য থেকেই নেতা নির্বাচিত হতেন। এসব লোক জম্মে র পর থেকেই নেতা হওয়ার অদম্য বাসনা নিয়ে নিজেরা প্রস্তুত হতেন এবং পরিবার-পরিজনও তাদের সেভাবে গড়ে তুলতেন। কোনো ঘোড়াচোর, গরুচোর কিংবা সিঁধেল চোর বিশ্বজয়ী রাজা-বাদশাহ কিংবা সমরজয়ী সেনাপতি হননি। কোনো চরিত্রহীন লম্পট, ব্যক্তিত্বহীন ধামাধরা কিংবা মতলববাজ চাটুকার কোনো নামকরা রাজা-বাদশাহ আমির-ওমরাহ হতে পারেননি। দুনিয়া কাঁপানো সব নায়ক-মহানায়ক কিংবা খলনায়ক রাজা যারা তলোয়ারের ডগায় রাজসিংহাসন ধারণ করতেন তারা সবাই ছিলেন উচ্চ বংশজাত আমির, রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রাজ্ঞ, যুদ্ধ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অতিশয় দক্ষ। চেঙ্গিস খান, হালাকু খান, তৈমুর লং থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সিজার কিংবা মহাবীর হানিবল প্রমুখের শরীরে ছিল রাজরক্ত এবং মন-মানসে ছিল রাজনীতি, সমরবিদ্যা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ শিক্ষা। ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে যখন ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক প্রভুত্ব বিস্তার লাভ করল তখন তারাও প্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্য, গ্রিক সাম্রাজ্য, রোমান সাম্রাজ্য ও মুসলিম সাম্রাজ্যের আদলে রাজনীতির জন্য উচ্চমার্গের শিক্ষা ও বংশমর্যাদাকে প্রাধান্য দিতে আরম্ভ করলেন এবং সেভাবে কয়েক শ বছর অব্যাহত চেষ্টার মাধ্যমে লর্ড, আর্ল প্রভৃতি উপাধির মাধ্যমে রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য উপযুক্ত অভিজাত সম্প্রদায় তৈরি করে ফেললেন। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলের প্রথম দিকে ব্রিটিশরাজ ছাড়াও কয়েকটি বাণিজ্যিক সংগঠন এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন ভূখন্ডে ছোট-বড় অনেক রাজ্য দখল করেছিল। ব্রিটিশ সরকারের নিয়ম মোতাবেক কোম্পানির মালিকরা সরাসরি তাদের অধিকৃত রাজ্যে শাসনকাজ পরিচালনা করতে পারতেন না। তারা ইংল্যান্ডের অভিজাত পরিবার থেকে শিক্ষিত সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তাকে ভাড়া করে এনে নিজেদের অধিকৃত ভূখন্ডের রাজকার্যে নিয়োগ দিতেন। গভর্নর জেনারেল, গভর্নর বা ডেপুটি গভর্নরের মতো রাজনৈতিক পদগুলোয় এমন অভিজ্ঞ রাজপুরুষদের নিয়োগ দিতে হতো যারা ব্রিটেনের রাজদরবার অথবা রাজকীয় সেনাবাহিনীতে সফলভাবে দীর্ঘদিন উঁচু রাজপদে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতেন। শুধু তাই নয়, গভর্নর জেনারেলের পদে নিয়োগদানের আগে সংশ্লি­ষ্ট কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডকে তাদের মনোনীত প্রার্থী সম্পর্কে ব্রিটিশরাজের সরকারি অনুমোদন নিতে হতো।

আমাদের ভারতবর্ষে ব্রিটিশরা কমবেশি ২০০ বছর শাসন করে। প্রথম ১০০ বছর অর্থাৎ ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল অবধি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন করত যারা উল্লি­খিত নিয়মে রাজ কর্মচারী ও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী নিয়োগ করত। সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার তাদের সংসদে ১৮৫৮ সালে প্রথমবারের মতো ভারত শাসন আইন পাস করে এবং সেই আইনে ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের হাতে নিয়ে নেয়। তখন থেকে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদগুলোয় সরাসরি ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হতো। পরে শুধু ভারতবর্ষের প্রশাসনে কাজ করার জন্য ব্রিটিশ সরকার আলাদা সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করে, যা সুবিখ্যাত আইসিএস নামে আজও তাবৎ দুনিয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অমর হয়ে আছে। আইসিএস পরীক্ষায় সীমিত আকারে ভারতীয়রা অংশগ্রহণ করতে পারতেন বটে; তবে অন্যান্য যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রধানতম শর্ত ছিল, প্রার্থীকে অবশ্যই অভিজাত বংশজাত হতে হবে।

পৃথিবীর অনাদিকালের প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো রাজনীতি কোনো সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। রাজনীতির জন্য মানুষের প্রথম দরকার পড়বে উদার, উন্নত, খোলামেলা এবং বিশাল একটি মানবহৃদয়। আমি এখানে মানুষের মানবহৃদয় উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, সব মানুষের মানবিক হৃদয় থাকে না। কারও হৃদয় পশুপাখি বা কীটপতঙ্গের মতো হয়। আবার কারও কারও হৃদয় বিশাল হয়। তবে তা অন্যের সম্পদ, অধিকার ও মানসম্মান লুণ্ঠন করে আপন হৃদয়ে ধারণ করার জন্য যাদের কবি-সাহিত্যিকরা রাক্ষুসে হৃদয় বলে আখ্যা দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে সহজাত নেতৃত্বগুণ না থাকলে কেউ রাজনীতিতে এসে টিকতে পারে না। সহজাত নেতৃত্ব কেউ চেষ্টা করে অর্জন করতে পারে না। মানুষ জম্ম গতভাবে নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ঠ হয়। পৃথিবীর আলো-বাতাস, পরিবেশ-প্রতিবেশ, শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক ঐতিহ্য-নেতৃত্বকে বিকশিত করে এবং নেতার ব্যক্তিত্বে সুগন্ধ লাগিয়ে দেয়। প্রকৃ-তির চিয়ায়ত নিয়মে পৃথিবীতে জম্ম গ্রহণ করা মানুষের মধ্যে শতকরা একজন মানুষের মধ্যে সহজাত নেতৃত্বের গুণাবলি থাকে। বাকিরা সবাই নিজের জন্য জম্ম  নেয় নিজের জন্য খায়-দায়, বিশ্রাম করে এবং নেতার কথায় লম্ফঝম্প দিয়ে একসময় মরে যায়।

প্রকৃতির উল্লিখিত হিসাবমতে ১৬ কোটি বাংলাদেশি মানুষের মধ্যে নেতৃত্বের গুণসম্পন্ন মানুষের সংখা মাত্র ১৬ লাখ। নারী-পুরুষ, শিশু-নাবালক, কিশোর-যুবা, প্রৌঢ় কিংবা বুড়োবুড়ি রূপে বিদ্যমান ১৬ লাখ মানুষের মধ্যে যার যার অবস্থান থেকে কেউ হচ্ছেন রাজনীতির মেম্বার, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, এমপি কিংবা মন্ত্রী। কেউ হচ্ছেন কুলির সর্দার, মহল্লার মাস্তান, গুণ্ডারাজ, চোরদের সর্দার, ডাকাতদের সর্দার অথবা মলম পার্টির নেতা। কেউ হচ্ছেন চোরাকারকারি, ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার লুট ইত্যাদির সর্দার। পতিতাপল্লী, নিষিদ্ধমহল, রঙ্গমহল ইয়াবা-মদখোরদের যেমন নেতা আছে তেমনি জুয়ার আসরেরও নেতা থাকে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রছাত্রীদের যেমন নেতা থাকে; তেমনি শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার প্রভৃতি পেশাজীবীর নেতানেত্রীর পাশাপাশি খেলার মাঠ, হাট-বাজার, বিপণিবিতান ও উপাসনালয়েরও নেতা থাকে। নেতৃত্বের সহজাত গুণাবলি থাকলে নেতা হওয়া যায় বটে কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষা-দীক্ষা, গুণাবলি, উন্নত চরিত্র, সৎ মনমানসিকতা ইত্যাদি না থাকলে মানুষের নেতৃত্বগুণ কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। বরং উল্টো তার নিজের জন্য এবং তার অধীন লোকজনের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে। চোরের নেতা ধর্মালয়ে ঢুঁ-মারে, বাটপারদের নেতা রাজনীতির জন্য লাফ মারে, ডাকাতদের নেতা ব্যবসায়ী সংগঠনের দিকে নজর দেয় এবং লুটেরাদের নেতা ব্যাংক মালিক হওয়ার জন্য দৌড়াদৌড়ি করে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়। আগেকার জমানায় নেতারা নিজেদের অধিক্ষেত্র অতিক্রম করতেন না। ফলে পতিতালয়গুলোর সাহিত্য-সংস্কৃতি, সুর-তাল-লয়-ছন্দ সৃষ্টি হতো। ডাকাতদের মধ্য থেকে রবিনহুড পয়দা হতো এবং যুদ্ধের ময়দানেও মানবতার জয়গান বেজে উঠত। রাজদরবারে ন্যায়বিচার, ধর্মাচার, নীতিনিষ্ঠ এবং সভ্যতা-ভব্যতার ঐতিহাসিক দলিল রচিত হতো। রাজ অনুগ্রহে আইন-ই-আকবরী, ফতোয়া-ই-আলমগীরী, হিদায়া, শাহনামা এবং ইবনে ইসাহাকের সিরাতে রসুল বা ইবনে কাসিরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া রচিত হতো।

আমাদের এ উপমহাদেশে সুলতানি আমলে কিংবা মোগল আমলে যারা রাজনীতি করতেন তারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত আলো ছড়াতে থাকবে। এমনকি প্রাচীন ভারতের বৈদিক যুগে কিংবা তারও আগে মহাভারতের যুগে রাজনীতি যেমন ছিল তার কাহিনী শুনে আমরা আজও পুলকিত হই। ব্রিটিশ ভারতে যেসব দেশীয় লোকজন রাজনীতি এবং সমাজসেবা করতেন তার যে নমুনা এখনো সমাজ-সংসারে বিদ্যমান সেরূপ একটি সামান্য উদাহরণ স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে একটিও নেই। আমাদের রামসাগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, রাজেন্দ্র কলেজ, বি এল করেজ, বি এম কলেজ, রাজশাহী কলেজ নামের শত শত ঐতিহ্যবাহী শত বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রিটিশ ভারতের দেশীয় রাজনীতির ফসল। তখনকার রাজনীতি কেমন মানের ছিল তা আমরা প-িত জওহরলাল নেহরু, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, শরৎ বসু,  চিত্তরঞ্জন দাস, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মোহাম্মদ আলী, স্যার সৈয়দ আহমদ, নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখের জীবনালেখ্য পাঠ করলেই বুঝতে পারব। পাকিস্তান জমানা থেকেই রাজনীতির মান নামতে আরম্ভ করে। রাজনীতির ময়দানে অন্য শ্রেণি-পেশার নেতারা ঢোকার চেষ্টা করেন এবং খানিকটা সফল হয়ে যান। পাকিস্তান রাজনীতির প্রথম পতন আরম্ভ হয় রাজনীতিতে সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের অনুপ্রবেশের কারণে। যার অব্যবহিত প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে সামরিক শাসন এবং সেই শাসনের হাত ধরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় বিভক্তি হয় এবং আমরা একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করি। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির পতনও শুরু হয়েছিল আমলাতন্ত্রের হাত ধরে। আমাদের সংবিধানের বিতর্কিত কিছু অনুচ্ছেদ ৫৪ ধারার মতো আইন, চতুর্থ, পঞ্চম, সপ্তম সংশোধনী ইত্যাদির মাধ্যমে সংবিধানের যে বারোটা বাজানো হয়েছে, তা মূলত পাকিস্তানফেরত সামরিক-বেসামরিক আমলাদের বুদ্ধি-পরামর্শ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিতেই হয়েছে। আমাদের দেশে দুটি সামরিক শাসনামলে আমলাতন্ত্র এতটাই ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে যার কারণে রাজনীতি, এমপিগিরি, মন্ত্রীগিরি, আমলা-কামলা, বুদ্ধিজীবী এবং ধনিক শ্রেণির কাছে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও হাসি-তামাশার বিষয়ে পরিণত হয়। একজন ক্যাপ্টেন বা মেজর পদমর্যাদার লোক যখন গ্রামের কোনো স্কুলশিক্ষক অথবা থানার মুন্সেফ কোর্টের উকিলকে এমপি বানিয়ে দিত তখন পরিস্থিতি কেমন হতো তার লিখিত ও প্রামাণ্য দলিল এ দেশে রয়েছে। এরশাদ জমানায় জনৈক এমপি সংসদে দাঁড়িয়ে নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধির আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, আমাদের মেজর পদের সমান মর্যাদা দেওয়া হোক। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা চালু হওয়ার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং ২০১৪ সালের পর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এখন অনেকে থানার ওসির মতো ক্ষমতা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতো ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু সংসদে দাঁড়িয়ে দাবিনামা পেশ করতে পারেন না। ১/১১-এর সময় সামরিক-বেসামরিক আমলারা ছোট-বড় সব রাজনীতিবিদকে যে নির্যাতন করেছেন, সেই অপমান মনে রাখার মতো বুদ্ধিমত্তা, ধীশক্তি ও ব্যক্তিত্ব বতর্মান জমানার কতজন রাজনীতিবিদের মধ্যে রয়েছে; তা আমার জানা নেই।

আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, উপসচিব ও যুগ্মসচিব পদমর্যাদার সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের বেশির ভাগ সদস্য এমপিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মজা পান। কিন্তু তারা যখন সচিব পদমর্যাদায় পৌঁছেন তখন তাদের মধ্যে এমপি হওয়ার খায়েশ দেখা দেয়। তাদের মধ্যে যারা উচ্চাভিলাষী তারা অতিরিক্ত সচিব হওয়ার পর থেকেই রাজনীতির কেন্দ্রগুলোয় ধরনা দিতে থাকেন। ঠিক একইভাবে অন্যান্য শ্রেণি-পেশার লোক যখন সফলতার মধ্যম স্তরে থাকেন, তখন তারাও এমপিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এক ধরনের তৃ-প্তি লাভের চেষ্টা করেন। কিন্তু যেই না তারা স্ব স্ব পেশার শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছেন অমনি তাদের গরিবের ভাউজের প্রতি লালসা জম্মম নেয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ের অরাজনৈতিক টানাপড়েন এবং রাজনীতিতে অযোগ্য লোকদের আধিক্য ও নির্বোধ লোকজন কর্তৃক কৌশলগত স্থানগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় পুরো অঙ্গনটিতে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে, এমপি পদটি একশ্রেণির লোকজনের কাছে কাচকি মাছের ভাগার মতো সস্তা হয়ে পড়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কাল্যে যদি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো লোক নেতৃত্বে থাকতেন, তবে সব মনোনয়নপ্রত্যাশীকে তিন ঘণ্টার একটি লিখিত পরীক্ষায় বসিয়ে সংসদ, সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব ও সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে রচনা করে উত্তর লিখতে বলতেন। আর তখন যদি বিচারপতি মোর্শেদ, কায়ানি ও ইব্রাহিমের মতো বিচারক এবং আবুল হাসনাত ওরফে ইসমাইল মিয়া অথবা এ আর খন্দকারের মতো পুলিশপ্রধান এবং জেনারেল শিশুর মতো সেনা কর্মকর্তা থাকতেন, তবে সেই পরীক্ষায় ফেল মারা সবাইকে লাল দালানে ঢুকিয়ে গরিবের ভাউজের দিকে নজর দেওয়ার ফল কাচকি মাছের ভর্তায় বেশি করে লবণ ও মরিচ মিশিয়ে মুখ ও অন্যান্য ছিদ্রপথে প্রবেশ করিয়ে এমপি হওয়ার বাসনা মিটিয়ে দিতেন। লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০৯:২৬:১৮