শোকে গোপাল ভাঁড়ও হাসে না, মন্ত্রী হাসেন
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
শনিবার রাত জেগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বিদেশের মাটিতে মাশরাফি বাহিনীর দীর্ঘ নয় বছর পর ওয়ানডে সিরিজ জয় উপভোগ করে ভোররাতে ঘুমিয়েছিলাম। মনের ভিতর ছিল খুশির বন্যা। দেশের সব মানুষই ক্রিকেট দলের এমন বিজয়ে সুখনিদ্রা নিয়ে বলেছিলেন, রাত জাগা স্বার্থক হয়েছে। টাইগাররা সিরিজ জিতেছে। কিন্তু রবিবার সকাল গড়িয়ে দুপুর না হতেই সড়ক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে দুজন কলেজ ছাত্রছাত্রীর অকাল মৃত্যুর দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই নেমে আসে শোকের ছায়া। ঘাতক বাসচালকদের হাতে লাশের মিছিলে যুক্ত হয়ে যায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজীব এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম।

জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস বেপরোয়া গতিতে আরেকটি বাসকে পাশ কাটিয়ে চলতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়। দুই চালকের পাল্লা দিয়ে রেষারেষিতে নিয়ন্ত্রণহারা জাবালে নূর ফুটপাথের উপরে উঠে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ শিক্ষার্থীদের চাপা দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। দুই ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সঙ্গে করুণ মৃত্যুই ঘটেনি, আরও কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছে যায়।

মিরপুরের কালশীর দিক থেকে শুরু হওয়া উড়ালসেতুটি বিমানবন্দর সড়কে এসে মিশেছে। দিন-রাত স্রোতের মতো গাড়ি চলে এ সড়কে। কখনো-সখনো আনাড়ি চালকরা বেপরোয়া গাড়ি চালায়। সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একদল ছাত্র উড়ালসেতুটির কুর্মিটোলা অংশের ঢালে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। ঘাতক বাসচালক সেই সময় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করে। সহপাঠীদের রক্তাক্ত নিথর দেহ বিক্ষুব্ধ করে তোলে কলেজ ছাত্রদের। ক্ষোভে-দ্রোহে তারা রাস্তায় নেমে আসে। সড়ক অবরোধ করে এবং জাবালে নূরসহ এ ধরনের কিছু বাসে ভাঙচুর চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।

শোকাচ্ছন্ন গভীর বেদনাবোধ গ্রাস করে কোমলমতি কৈশোর উত্তীর্ণ তারুণ্যে পা দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের। সাধারণ মানুষের বুকের ভিতরেও এ নির্মম মৃত্যুর সংবাদ গভীর বেদনার সঙ্গে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বার বার সাধারণ মানুষের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার সংবাদে যখন মানুষের মধ্যে গণঅসন্তোষ দেখা দেয়, শাস্তির দাবি ওঠে, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাওয়া হয়, ঠিক সেই সময় মানুষের তীব্র অগ্নিরোষের মুখে পরিবহন শ্রমিক নেতা ও নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ও পরিবহন মালিকরা ঘাতক বাসচালকদের পক্ষে অবস্থান নেন।

বিকাল গড়াতে না গড়াতেই টেলিভিশনের পর্দায় সেদিন দেখা যায়, নৌ পরিবহন মন্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। সন্তানহারা মায়ের কান্না, পিতার আর্তনাদ তার হৃদয়কে স্পর্শই করতে পারেনি, গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্নের জবাবে উল্টো ভারতের বাস দুর্ঘটনায় ৩০ জন যাত্রীর নিহত হওয়ার সংবাদ শুনিয়ে একরকম বলতে চেয়েছেন, সড়ক হত্যাকাণ্ডে দুই ছাত্রছাত্রীর করুণ মৃত্যু এক স্বাভাবিক ঘটনা। এ দৃশ্য দেখার পর মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়নি, এমন বেদনাবিধুর হত্যাকাণ্ডে পরিবহন শ্রমিক নেতা ও রাজনীতিবিদ মন্ত্রী শাজাহান খানের এমন হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নির্বাক ও স্তম্ভিত করে দেয়।

ক্ষমতার দম্ভ একজন মন্ত্রীকে কতটা উন্নাসিক করে দিলে, কতটা সাত আসমানে উঠিয়ে দিলে এভাবে হাসতে পারেন তা ভাবতেও কষ্ট হয়। জনগণের প্রকৃত বন্ধু একজন রাজনীতিবিদ জনগণ ও মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করে থাকলে এমন দুঃসংবাদে বিমর্ষ, বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে আমরা এবার যেমন দেখিনি, অতীতেও কখনো কোনো দুর্ঘটনার পর চালকের পক্ষ নেওয়া ছাড়া নিহত মানুষের জন্য তাকে বিমর্ষ হতে দেখিনি। একালের মন্ত্রী-নেতারা একদম ভুলে যাচ্ছেন জনগণই সব ক্ষমতার উৎস এবং ক্ষমতা ও কারাগার পাশাপাশি বাস করে।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় যখন নিহত হয়েছিলেন তখন দেশের যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। সেই সড়ক দুর্ঘটনায় দেশের দুজন বরেণ্য সন্তানকে হারানোর বেদনা নিয়ে আমি তার পদত্যাগ চেয়েছিলাম। সৈয়দ আবুল হোসেন নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমের সমালোচনার তীরে পদ্মা সেতু ঘিরেও ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছিল, কানাডার আদালতে যে মামলা হয়েছিল তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তবুও একবার দেশের বাইরে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি এগিয়ে এসে একজন সজ্জন ভদ্রলোক হিসেবে কুশল বিনিময় করেছিলেন এবং তার পদত্যাগ চাওয়ার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। সৈয়দ আবুল হোসেন অনেক দিন ধরে মন্ত্রী নেই। কোনো সংসদ নির্বাচনেই তাকে পরাজয় স্পর্শ করেনি। তবু তিনি সংসদে নেই। মনে মনে এখনো তার কাছে লজ্জিত হই, দুঃখ প্রকাশ করি।

মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদের পর কত দুর্ঘটনায় কত মানুষের প্রাণ গেছে। কত মানুষ কতভাবে নিহত হয়েছেন। কিন্তু আমি আর কারও পদত্যাগ চাইতে যাইনি। অর্থনৈতিক খাতে হরিলুট ঘটে গেছে, তবু আমি কারও পদত্যাগ চাইতে আসিনি। নির্জীবের মতোন আপসের পথেই হেঁটেছি।

একদা পাঠকেরা যে কলমকে ক্ষুরধার বলতেন, সেটার ধারও আমি কমিয়ে দিয়েছি। আমার কণ্ঠ থেকে টকশোতে গেলেও তীর্যক শব্দটি নির্বাসনে পাঠিয়েছি। আমি এখন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে জীবিকানির্বাহের জন্য কাজ করি। আর আপস করে চলি। আপসকামী মানুষেরা কারও পদত্যাগ চাইতে পারে না। আমিও আজ কারও পদত্যাগ চাইতে আসিনি। কিন্তু সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীকে বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলব, আপনার রাজনৈতিক জীবন অনেক দীর্ঘ। পরিবহন শ্রমিকদের উচ্ছৃঙ্খল অমানবিক, দায়িত্বহীন, বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মধ্য দিয়ে সড়ক হত্যার দায় নেবেন না। ছোট্ট এ জীবনে রাজনীতি করতে এসে গণমানুষের সম্মান ও ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়েছেন। সম্মান ও ক্ষমতার উচ্চাসনে বসেছেন। ক্ষমতায় বসতে গিয়ে শপথ গ্রহণ করেছেন। সড়ক হত্যাকারীদের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখুন। গরু-ছাগল চিনলেই লাইসেন্সদানের নীতি থেকে সরে আসুন। আমি আপনার পদত্যাগ চাইছি না। কিন্তু ওদের আসকারা, আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতে বলছি। পরিবহন শ্রমিক নেতা হিসেবে শ্রমজীবী মানুষের জন্য আপনার নিরন্তর ভালোবাসা ও শুভ কামনা চিরকাল থাক। কিন্তু যারা দক্ষ চালক নয়, দায়িত্বশীল নয়, তাদের হাতে গণপরিবহন চালানোর দায়িত্বটি দেবেন না। পরিবহন সেক্টরের চলমান দস্যুপনা, নৈরাজ্য, আইন বিধিবিধান নিয়মনীতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এমনকি যাত্রী হয়রানি থেকে দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে সড়ক হত্যা থেকে শুরু করে হানিফ পরিবহনের মতো বাস থেকে অসুস্থ মেধাবী তরুণ ছাত্রকে চালক হেলপাররা যেভাবে নদীতে ছুড়ে ফেলে হত্যা করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিন। মানুষ হত্যা যেভাবেই হোক তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে খুনিদের সর্বোচ্চ সাজা ভোগ ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা, নিয়মনীতি ফিরিয়ে এনে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখুন।

আমি আপনার পদত্যাগ চাইতে আসিনি। কিন্তু করজোড়ে মিনতি করছি, পরিবহন শ্রমিকদের জীবনভর আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। দেশের মন্ত্রী হয়ে মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে বেপরোয়া গাড়ি চালকদের স্বার্থকেই ঊর্ধ্বে রেখেছেন। এটা কতক্ষণ রাখবেন তা আপনার বিবেকের কাছে ছেড়ে দিলাম। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালক থাকতে পারে না। কিন্তু গাড়িচালকদের কারণে যখন সড়কে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের জীবন নিবে যায়, রাজীব-মিমের পিস্ট নিথর দেহের পোস্টমোর্টেম হয়, তাদের সহপাঠীরা দ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠে, মাথায় আসমান ভেঙে পড়ায় মা-বাবারা কান্নায় ভেঙে পড়ে, চলে শোকের মাতম, তখন আপনি হাসবেন না। বিবেকতাড়িত হন। মানুষের বুকের ভাষা শোনতে চেষ্টা করুন।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রখ্যাত রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় যুক্ত ছিলেন গোপাল ভাঁড়। রাজা তাকে তার সভাসদদের মধ্যকার পঞ্চরত্নের একজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেই আমলে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাসাদের সামনে নির্মিত তার একটি প্রতিকৃতি ভাস্কর্য এখনো সেখানে অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। পরবর্তীতে কৃষ্ণনগর পৌরসভার সীমানায় ঘূর্ণিতে গোপাল ভাঁড়ের নতুন মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। প্রায় ২০০ বছরের অধিককাল ধরে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মানুষের কাছে গোপাল ভাঁড় চরিত্রখানি লোক হাসানোর প্রতীক হিসেবে রূপকথায় সমহিমায় টিকে আছে। একালেও গোপাল ভাঁড় সমাজে প্রচলিত এক অনন্য অসাধারণ ভাঁড়ের প্রতীক। তাকে নিয়ে টিভি চ্যানেল সিরিয়াল বানায়, অ্যানিমেশন কার্টুন নির্মিত করে। গোপাল ভাঁড়ের অস্তিত্ব নিয়ে ইতিহাসবিদ, গবেষক ও ভাষাবিদদের বিতর্কের বিষয় হয়ে থাকলেও গোপাল ভাঁড়ের গল্পগুলো মানুষের রসবোধকে উসকে দেয়।

বাঙালি রসিক ও লৌকিক সংস্কৃতিতে গোপাল ভাঁড় চরিত্রখানি অমলিন। সেই গোপাল ভাঁড়ও জানতেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে কখন হাসাতে হয়। রম্য চরিত্র হলেও তিনি এতটাই বুদ্ধিদীপ্ত ছিলেন যে, তাকে বীরবল ও মোল্লা নাসির উদ্দিনের সমতুল্য করেছে ইতিহাস। মৃত বাড়িতে হাসাহাসি কেউ যেমন করেন না, তেমনি গোপাল ভাঁড়কে সব পরিবেশে তুলে আনা হয় না। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে মানুষ হাসে ঘটনার পরম্পরায় মানুষ কাঁদে। লাশের সামনে, নির্মম হত্যাকাণ্ডে নিহতের সংবাদে মানুষ শোক-কাতর হয়। নির্বাক হয়। অস্রুসজল হয়। এটাই মানুষের মানবিক চরিত্র।

কিন্তু রাজীব-মিমের এমন হৃদয়বিদারক সড়ক হত্যাকাণ্ডের পর আপনার হাসি ও বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশই করেননি, ক্ষমাও চেয়েছেন, মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে লজ্জিত হয়েছেন। এটা সঠিক সিদ্ধান্ত বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজ তাদের প্রতিবাদী অবস্থান থেকে যখন ক্ষমা চাইতে বলেছে, আপনি তখন ক্ষমা চেয়েছেন। এতে আত্মশুদ্ধির মহত্ত আছে। লজ্জার কিছু নেই। একই সঙ্গে নিজেকে জিজ্ঞেস করে জানুন, কখন হাসতে হয়, কখন কাঁদতে হয়, কখন বিষাদগ্রস্ত হতে হয়। এ সড়ক দুর্ঘটনার পর ১৩ বছরের মুন্না যাত্রী নিয়ে বাস চালাচ্ছে এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আপনি যদিও প্রথমে বলেছিলেন, ক্ষমা চাওয়ার কথা নয়, তবু দুঃখ প্রকাশ করছেন। কিন্তু দেশের মন্ত্রী হিসেবে এমন বক্তব্য ও হাসির পর ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে নিজের ভুল শোধরানোর এবং সতর্ক হওয়ার মহত্ত রয়েছে।

র‌্যাব সড়ক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী জাবালে নূর পরিবহনের চালক মাসুম বিল্লাহ, সোহাগ, জুবায়ের এবং তাদের দুই সহযোগী এনায়েত ও রিপনকে গ্রেফতার করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। মানুষ এখন এই অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি দেখতে চায়। চায় নিরাপদ সড়কের দাবিটির সমাধান।

আমরা জানি, একেকটি ইস্যু আসে একেকটি ইস্যু যায়। একেকটি ঘটনা আসে ঝড় তুলে আরেক ঘটনায় তা তামাদি হয়ে যায়। ছাত্রছাত্রী হত্যার প্রতিবাদে নগরীতে সব কলেজের ছাত্ররা মঙ্গলবার রাজপথ উত্তাল করেছে। তাদের ভাঙচুর, আগুন সমর্থনযোগ্য নয়, তবে মানুষের নিরাপদ জীবন ও সড়ক হত্যার প্রতিবাদ জনসমর্থন-সহানুভূতি পেয়েছে তাই বলে এটা লাগাতার চলতে পারে না। তাদেরও প্রতিবাদ আন্দোলন কর্মসূচি যেন হঠকারী পথ না নেয়। মানুষকে যেন দুর্ভোগে না ফেলে। জনসমর্থন যেন না হারায়। জনসমর্থন রাখতে হলে জনদুর্ভোগ অব্যাহত সৃষ্টি করা যাবে না। ভাঙচুর, আগুন চালানো যাবে না। জনসমর্থন ধরে রাখা কর্মসূচিতেই সড়ক হত্যার সমাধানে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা পদক্ষেপ দ্রুত নিতে বাধ্য করতে হবে।

সরকারকেও উপলব্ধি করা উচিত এটাই দেশের তারুণ্যের ক্ষোভ ও দ্রোহের বহিঃপ্রকাশ। গণঅসন্তোষ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে তারুণ্য দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠেছিল। দমননীতি সাময়িকভাবে পরিস্থিতিকে সামাল দিলেও স্থায়ী সমাধান দেয় না। এতে যে কোনো সময় যে কোনো পথে আন্দোলন দানা বাঁধতে পারে। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও দেশকে এখন নির্বাচনের পথেই অগ্রসর হতে হবে। আগামী দিনের জন্য কোনো ইস্যুকেই জিইয়ে রাখা সঠিক হবে না। প্রতিটি সমস্যার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে যেতে হবে। সোমবার বিমানবন্দর দিনভর অবরোধ করে গোটা নগরীকেই যানজটের কবলে ফেলে ছাত্রছাত্রীরা অচল করে দিয়েছে। নিহত দুই শিক্ষার্থীর সহপাঠীদের সঙ্গে নগরীর অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীরাও সংহতি প্রকাশ করে রাস্তায় নেমেছে। নয় দফা দাবি তারা দিয়েছে। তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দ্রোহ ছিল, প্রতিবাদ ছিল, হঠকারিতা ছিল না। তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক আন্দোলনে নজির স্থাপনের জন্য অভিনন্দন জানাতে হয়। এর আগে ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও শান্তিপূর্ণ তীব্র আন্দোলন নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাতৃহৃদয় নিয়ে সমাধান দিয়েছিলেন। তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করে চলে গিয়েছিল। রাজীব ও মিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কলেজ ছাত্রছাত্রীরা যে নয় দফা দাবি দিয়েছে সেটি বিবেচনায় নিয়ে সরকার আলোচনার মাধ্যমে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানের পথে হাঁটতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক বিবেচনায় সুখকর নয়। পরিবহন খাতের নৈরাজ্য যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করানো, ইচ্ছামতো ভাড়া নেওয়া, যাত্রী হয়রানি, যেনতেন উপায়ে লাইসেন্স বের করা, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সমাধানে যেতে হবে। নতুন ইস্যু এলে চলমান ঘটনা ভুলে যাওয়া বা তামাদি করা সঠিক নয়। মানুষের মনে পরিবহন খাত নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিনে পুঞ্জীভূত। এটা এখন বিস্ফোরিত হয়েছে। এর সমাধান দরকার। বেপরোয়া চালক এবং পরিবহন মালিকদের সৃষ্ট নৈরাজ্য পরিস্থিতির বিরুদ্ধে আমজনতার ভিতরেও তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। সেই অসন্তোষ স্থায়ী সমাধানের পথে দূর করা সম্ভব। সরকারকে সেই পথে নিতে হবে।

উচ্চ আদালত সড়ক দুর্ঘটনা ঘিরে যে রায় নির্দেশনা দিয়েছে সেটি সময়ের বিচারে উপযুক্ত এবং অভিনন্দনযোগ্য। যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছে সে আর সন্তান ফিরে পাবে না। যে পিতা তার বুকের ধন কন্যাকে হারিয়েছে, সেও একজন বাসচালক। মেয়ে নিহত হওয়ার জায়গায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া স্কুলে যাওয়া-আসার ছাতাখানি নিয়ে সোমবার বুকভরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম বিলাপ করে বলছিলেন, ‘সেই কত বছর ধরে বাস চালিয়ে আসছি। আমার গাড়িতে অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি, আমি তো কাউকে মারিনি, তাহলে আমার কপালে এমন ঘটনা ঘটল কেন? যে বাস আমার মেয়েকে কেড়ে নিয়েছে সেই বাস আমি আর চালাব না। আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাই।’ জাহাঙ্গীর আলমের এ কান্না দেশের লাখো সন্তানের মা-বাবারই কান্না। সব মানুষের আকুতি একটাই নিরাপদ সড়ক চাই। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। সড়ক-মহাসড়কে নৃশংস হত্যাকাণ্ড যেমন দেখতে চাই না, তেমনি কোনো মন্ত্রী বা রাজনীতিবিদের মুখে নির্দয় হাসি আর অপরাধীকে রক্ষার বক্তব্যও শোনতে চাই না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

 

 

০১ আগস্ট, ২০১৮ ০৯:২০:২৯