ভোটযুদ্ধ নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্যের নির্মোহ পোস্টমর্টেম
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক বিশেষ বর্ধিত সভাটি রাজনৈতিক কারণে যেমন অর্থবহ, তেমনি সেখানে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া এক ঘণ্টা ২৬ মিনিটের দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছয় হাজারের বেশি তৃণমূল নেতাকে এ বৈঠকে ডাকা হয়েছিল। ডাকা হয়েছিল দলীয় সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলের নেতা-কর্মীদের জন্য শেখ হাসিনার নির্দেশনামা জাতীয় রাজনীতিতেও ইঙ্গিতবহ। তার বক্তব্যের ভাষাগত গাঁথুনি, শব্দচয়ন ও সরাসরি নির্দেশনামা নেতা-কর্মীদের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদকেই বড় করে তোলেনি, আগামী জাতীয় নির্বাচন যে সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে সেটিরও সরাসরি ইঙ্গিত রয়েছে। গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য এটা নিশ্চিত আনন্দের সংবাদ যে, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে না। যদিও সেই সময় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের হটকারী সিদ্ধান্তে নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের নামে সহিংস কর্মসূচি আওয়ামী লীগ জোটকে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার পথে ওয়াক ওভার দিয়েছিল। সময়ের বিচারে এমন নির্বাচন ও সংসদ যেমন মানুষের কাছে প্রত্যাশার ছিল না, তেমনি বিএনপির সিদ্ধান্ত হটকারী ও আত্মঘাতী বলেই বিবেচিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে উৎসবমুখর পরিবেশে সারা দেশের নেতা-কর্মীরা ছুটে এসেছিলেন। আওয়ামী লীগের আন্দোলন-সংগ্রামের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্মৃতিবিজড়িত দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নতুন ভবনটিও সেদিন উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের ৬৯ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলীয় প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ৩৭ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও তিনবার সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসেই নয়, উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো দলের এত দীর্ঘ সময় নেতৃত্বে থেকে সাফল্যের গৌরব অর্জনের এমন নজির আর কোনো রাজনীতিবিদের নেই।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান। ভারত-পাকিস্তানের বিভক্তি ও স্বাধীনতা লাভ। দুই বছরের মাথায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি ও টাঙ্গাইলের শাসছুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নামের রাজনৈতিক দলটির জন্ম হয়েছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান দলটির প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এদিকে কারামুক্তির পর দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামছুল হকের বিষাদগ্রস্ত জীবনের ট্র্যাজিক পরিসমাপ্তি ঘটলে, অসাধারণ সংগঠক শেখ মুজিবুর রহমান দলটির সাধারণ সম্পাদক হন। এমনকি মন্ত্রিত্বের মোহ ত্যাগ করে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নেন।

১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে দলের সভাপতি মওলানা ভাসানী ন্যাপ গঠন করে সমাজতন্ত্রের পথে বেরিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জেল-জুলুম-নির্যাতন সয়ে স্বাধিকার-স্বাধীনতার পথে ভঙ্গুর আওয়ামী লীগকে তার ইমেজের ওপর ভর করে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করেন। সারা দেশ ঘুরে সংগঠনকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সত্তরের জাতীয় নির্বাচনে তার প্রতি ব্যালট বিপ্লব ঘটে যায়। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পথ ধরে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল। আর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্থান ও চূড়ান্ত বিকাশ দুই পর্বে সংঘটিত হয়। জন্মকাল থেকে স্বাধীনতা উত্তরকাল পর্যন্ত তৃণমূল বিস্তৃত দলটি জনপ্রিয় হয় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে। বঙ্গবন্ধু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগ ও সেনাবাহিনীর বিপথগামী একটি খুনি চক্রের হাতে পরিবার-পরিজনসহ নিহত হলে আওয়ামী লীগ নামের দলটির ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন নেমে আসে। একদিকে সেনা শাসকদের দমন-পীড়ন। অন্যদিকে উগ্রপন্থি অতিবিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তির প্রতিহিংসামূলক অপপ্রচার ষড়যন্ত্রের ভিতর দিয়ে দলের আদর্শিক নেতা-কর্মীরা সংগঠিত হলেও নেতৃত্বের কোন্দল দলকে ভাঙনের তীরে নিয়ে যায়। এমনি পরিস্থিতিতে ৮১ সালের ইডেন কাউন্সিলে দিল্লি নির্বাসিত মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সভাপতি নির্বাচিত হন। সেই বছর ১৭ মে দেশে ফিরে আসার পর চরম প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখে দলের নেতৃত্ব নিয়ে তাকে ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ উত্তাল সময় পাড়ি দিতে হয়। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে নৌকার নবীন মাঝি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে ফের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৃণমূল বিস্তৃত জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করে তিন দফায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

একুশের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ছাড়াও ২৪ বার তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান সুসময়ে আসার আগে দীর্ঘ দুঃসময়ের রজনী তাকে পোহাতে হয়। কঠিন ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে জীবন ক্ষয়ে ক্ষয়ে তাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হয়। এই ৩৭ বছরের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের সংগ্রামে সফলই হননি, ভোটযুদ্ধেই জেতেননি, দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কেই নিয়ে যাননি, শত অর্জনের মধ্যে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কার্যালয়টিকেও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আধুনিক রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে নির্মিত করেছেন। সেই কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান গণভবনে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপভোগ করেছেন। দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর রাতে সংসদে দলটির ইতিহাস ও বিভিন্ন সময়ে এ পর্যন্ত যারা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করে অনেকের মাঝে প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ আবেগঘন বক্তব্য রাখেন।

বর্ধিত সভায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলতে গিয়ে, ‘টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে জয়লাভের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে, মানুষের হৃদয় জয় করে, দলকে বিজয়ী করার আহ্বানই জানাননি, পরিষ্কার বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন হবে চ্যালেঞ্জিং।’ তার মানে পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচন যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে সেই ইঙ্গিতই শেখ হাসিনা দিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে বলেছেন, ‘নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি করে কেউ জিততে পারবে না। আওয়ামী লীগ এ বদনাম নেবে না।’ অর্থাৎ আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী আত্মঅহমিকায়, আত্মতৃপ্তিতে ভুগছিলেন ক্ষমতার জোরে ক্ষমতায় ফিরে আসবেন, নেত্রীর বক্তব্য তাদের হুঁশ ফিরিয়ে আনার জন্য সতর্ক বার্তা।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা যে উন্নয়ন করেছি, মানুষ নৌকায় ভোট দেবে না, এটা হতে পারে না। যদি ভোট না দেয় সে জন্য আপনারাই দায়ী থাকবেন। কারণ আপনারা সঠিকভাবে মানুষের কাছে যেতে পারেননি, তাদের কাছে সরকারের উন্নয়নের কথা বলতে পারেননি, তাদের বোঝাতে পারেননি।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমরা যে কাজ করেছি তা অন্য দল করেনি, তাহলে তারা কেন ভোট পাবে?’ তিনি বলেন, ‘সামনের নির্বাচন এ কথাটা সব সময় মনে রাখতে হবে। নির্বাচন মানেই এটা চ্যালেঞ্জিং হবে। এ নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্যাগের মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে, যেন এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে।’ দলের অভ্যন্তরে বিভেদ পরিহারের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যাকে আমরা নৌকা মার্কা দেব, যাকে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী করব তার পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে।’ তিনি জোট-মহাজোট প্রসঙ্গে বলেন, ‘জোট করেছি, মহাজোট করেছি। দলের স্বার্থে এটা করতে হয়েছে। আগামীতেও আমরা এটা করব। আমরা বন্ধু হারাব না। সবাইকে নিয়েই থাকতে চাই।’

অর্থাৎ সারা দেশে নেতা-কর্মীদের অভ্যন্তরীণ দলাদলি, বিভেদের চিত্র যে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার চোখের সামনে রয়েছে সেটি মাঠ নেতাদের জানিয়ে দিতে তিনি ভোলেননি। এমনকি তার রাজনৈতিক বিজয় অর্জনের পথের সাথী জোট-মহাজোটের প্রার্থীদের জন্য যে আসন ভাগাভাগির ছাড় দেবেন এবং আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দলের বৃহত্তর স্বার্থে সেটি মেনে নিতে হবে, সেই তাগিদ তিনি সরাসরি দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিগত ১০ বছরের টানা ক্ষমতার মেয়াদকালে মাঠপর্যায়ের অনেকেই স্বঘোষিত প্রার্থী হিসেবে নিজেদের নামে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন।

এক সময় রাজনীতিতে একেকটি নির্বাচনী এলাকায় যিনি মনোনয়ন পেতেন, তার সঙ্গে বড়জোর এক-দুজন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। সেই সময়গুলোতে কর্মীবান্ধব সংগঠক জনপ্রতিনিধি হওয়া নেতার সংখ্যা ছিল কম। আর মাঠপর্যায়ে সেই নেতাদের প্রতি অনুগত কর্মীর সংখ্যা ছিল বেশি। ক্ষমতার মোহ বা ক্ষমতার ছায়ায় কারও কারও হাতে টাকা-পয়সা আসায় এলাকায় সংগঠনে প্রভাব থাকুক না থাকুক, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা থাক বা না থাক, নিজেরা নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে ওই এলাকার শক্তিশালী প্রার্থী বা এমপিদের বিরুদ্ধে রীতিমতো বিষোদগারে নেমেছেন, কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন। পরিস্থিতি এমন যেন কর্মী নয়, সবাই নেতা। এ ধরনের পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে জীবিতকালে অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একবার বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘এমপি কি কেচকি মাছের ভাগা? যে সবাই এমপি হতে চায়!’ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এদের নিয়েও পরিষ্কার ধারণা রাখেন বলেই বর্ধিত সভায় বলেছেন, ‘কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত প্রার্থী হয়ে বিএনপির সন্ত্রাস, লুটপাট, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করাসহ তাদের অপকর্মের কথা বলে না। তাদের বক্তব্য আওয়ামী লীগ এমপির বিরুদ্ধে, সংগঠনের বিরুদ্ধে। তাদের সাবধান করে দিয়ে বলেন, সরকারের উন্নয়নের কথা না বলে কার কী দোষ আছে সেগুলো জনগণের কাছে গিয়ে যারা বলবেন, তারা দলের মনোনয়ন পাবেন না।

বর্ধিত সভার বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু যেভাবে সুফি সাধকের হৃদয় নিয়ে দলের উন্নাসিক দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের সুপথে ফিরে আসার আকুতি জানাতেন, বক্তৃতায় বার বার, ভোগ নয় ত্যাগের মহিমায় মানুষের কল্যাণে মানুষের জন্য রাজনীতি করার অনুরোধ জানাতেন, তেমনি তার কন্যা শেখ হাসিনাও জানিয়েছেন। সারা দেশে দলের যেসব এমপি অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে দলকে বিতর্কিত করছেন, দলের আদর্শবান, নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীদের সরিয়ে ক্ষমতার মধু আহরণে ছুটে আসা সুবিধাবাদী বসন্তের কোকিল, যাদের হাইব্রিড বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং নাশকতার মামলার আসামি বিএনপি-জামায়াতের অনেক কর্মীকে দলে টেনে নিজেদের আধিপত্যের পাল্লা ভারী করেছেন, সেই খবরও যে বঙ্গবন্ধুকন্যা রাখেন তার বক্তব্যে সেই আভাসও পাওয়া গেছে। তাদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘দেশের জনগণ খুবই হিসাবি। কেউ দুর্নীতি করলে তারা তা ভুলে যায় না। মানুষের চোখ খুলে গেছে। সময় খুব বেশি নেই। কাজ করতে গিয়ে টাকা দেবে আর ভোট চাইতে গেলে বলবে, টাকা দিয়ে কাজ নিছি, ভোট দেব কেন?’ তিনি বলেন, ‘তিন কারণে দলে অনুপ্রবেশকারীরা আসে। আমরা ক্ষমতায় থাকার কারণে বিভিন্ন দল থেকে আমাদের দলে ছুটে আসছে। আর গ্রুপ করার জন্য যাকে পাচ্ছেন তাকে নিয়ে নিজের শক্তি দেখাতে চান? এরা আসে মধু খেতে। এরা থাকতে বা কাজ করতে আসে না। যারা আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে সন্ত্রাস করে মামলার আসামি হয়েছে, সেই মামলা থেকে বাঁচতে আসছে। আরেকটি অংশ আসছে ক্ষমতার কাছ থেকে পয়সা কামাতে।’

শেখ হাসিনা বলেন, আমি সারা দেশে সার্ভে করে বের করেছি, যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি, তাদের মধ্যে কারা আমার দলে। সেই তালিকা আমার কাছে রয়েছে। কাজেই বলব, কেউ যদি তাদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, এখনই বিদায় করুন। দলের লোকই আপন হয়। বাইরের লোক আপন হয়ে গেছে এটা মনে করার কোনো সুযোগ নেই।

অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বর্ধিত সভায় দেওয়া শেখ হাসিনার বক্তব্যের নির্মোহ পোস্টমর্টেম করলে যে চিত্র ওঠে আসে তা হচ্ছে, নিম্নরূপ।

এক. আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে চ্যালেঞ্জিং। অর্থাৎ সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এরমধ্যে বিএনপিরও যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই সেই আভাস পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও কয়েকদিন আগে বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অনেক দলই অংশ নেবে। অর্থাৎ ছোট ছোট দলও ভোটযুদ্ধে শরিক হবে। এতে মানুষের প্রত্যাশার ভোটযুদ্ধের আভাসই পাওয়া যাচ্ছে।

দুই. দলের অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবে না। যারা বিভেদ সৃষ্টি করেন, অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেন, ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করেন না এবং মানুষের মধ্যে এলাকায় জনপ্রিয় নন, তারা মনোনয়ন পাবেন না। দলের মনোনয়ন তারাই পাবেন যারা তৃণমূলে ও মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন দফায় দফায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দিয়ে যে জরিপ করেছেন তার আলোকে যেমন বক্তব্য রেখেছেন তেমনি মনোনয়নও দেবেন জনপ্রিয়দের। এর আগেও বলাবলি হচ্ছে আগামী নির্বাচনে প্রায় শখানেক বর্তমান এমপি মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন।

তিন. রাজনৈতিক মিত্র শক্তি ১৪-দলীয় জোট ও এরশাদের জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত শাসনামল থেকে যেভাবে পথ চলছে আগামী নির্বাচনেও যে সে ধারা অব্যাহত রাখবে শেখ হাসিনা তার নেতা-কর্মীদের এটি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন। রাজনীতি ও ক্ষমতার স্বার্থে নির্বাচনে জোট-মহাজোটকে যে অনেক আসন ছেড়ে দেওয়া হবে এবং দলীয় স্বার্থে ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে নেতা-কর্মীদের সেটি মেনে নিতে হবে, সেটি বুঝিয়ে দিয়েছেন।

চার. সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিসহ বিভিন্ন মহলে যত সন্দেহ সংশয়, অভিযোগ থাক না কেন শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে এটাই জানিয়েছেন, নির্বাচন হবে অবাধ-গ্রহণযোগ্য। জনরায়ের প্রতিফলন ঘটতে দেওয়া হবে। ভোট চুরির দায় তার দল নেবে না। তাই তিনি বলেছেন, দলকে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে মানুষের হৃদয় জয় করেই আবার গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় আসতে হবে।

পাঁচ. আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে, সে ৭৫ উত্তর সময়কালই হোক আর বিএনপি-জামায়াত জামানায়ই হোক— নেতা-কর্মীদের হামলা, জেল মামলাসহ অবর্ণনীয় দমনপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। সেই সময়ও দলের নেতা-কর্মীদের লাশ দাফন ও চিকিৎসার দায় শেখ হাসিনাকেই টানতে হয়েছে। শেখ হাসিনা সর্বশেষ ওয়ান-ইলেভেনের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে নিজ ক্যারিশমায় দলকে টানা দুই টার্ম ক্ষমতায় এনেছেন। নেতা-কর্মীরা মন্ত্রী-এমপি, ক্ষমতার অংশীদার হয়েছেন। নেতা-কর্মীরা সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যে সুসময় অতিক্রম করে লাভবান হয়েছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনা দেশকে মধ্যম আয়ের দেশেই নিয়ে যাননি, অবকাঠামোর উন্নয়নে বিশেষ করে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প নিজ টাকায় করছেন। সাবমেরিনই কেনা হয়নি মহাকাশে স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করেছেন। সমুদ্র বিজয় থেকে সীমান্ত সীমানা বা ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছেন। বিশাল বাজেট বিশাল উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ দেশজুড়ে তবু যদি জনগণ ভোট না দেয় সেজন্য তিনি তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। বলেছেন, ভোট না দিলে দায় তাদের নিতে হবে। মাঠপর্যায়ে যে একদল নেতা-কর্মী দুর্নীতি, অনিয়ম-উন্নাসিক দাম্ভিক আচরণে দলকে বির্তকিত করছেন এবং সরকারের উন্নয়ন জনগণের সামনে নিয়ে হৃদয় জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, সেটি বলতেও ভুলেননি। দিয়েছেন হুঁশিয়ারি।

কথায় আছে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটে বা রাজপথে নামলে ফলাফল ঘরে ওঠে। সর্বশেষ খুলনার মেয়র নির্বাচনে নিজভাই মনোনয়ন না পেলেও শেখ হেলাল এমপি দলকে ঐক্যবদ্ধ করে তালুকদার খালেকের বিজয় ঘরে তুলেছেন। নারায়ণগঞ্জেও শেখ হাসিনার নির্দেশে দলের প্রার্থী আইভির বিজয়ে ভূমিকা রাখেন শামীম ওসমান এমপি। কুমিল্লায় ভোটে হারলেও দলীয় ঐক্য ভোটের ব্যবধান নতুন প্রার্থীকে নিয়ে কমিয়ে ছিল। মাঠ নেতা-কর্মীদের সামনে এখন শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের হৃদয় জয় করে দলকে ক্ষমতা এনে ঋণশোধের অগ্নিপরীক্ষা।

যাক, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আগামী জাতীয় নির্বাচনের যে দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে সেখানে সব দলের অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণরায় প্রতিফলিত হলে, একটি প্রাণবন্ত কার্যকর সংসদ আমরা ফিরে পাব। যেখানে জাতীয় ইস্যুতে তুমুল বিতর্ক হবে। শক্তিশালী সরকারকে শক্তিশালী বিরোধী দল জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে গিয়ে সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত করবে। মানুষ জনসমর্থিত প্রার্থী যেমন ভোটে দেখতে চায়, তেমনি নিজের ভোট যাকে খুশি তাকে দিতে চায়। চায় গণরায়ের মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর সংসদ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আমরা সেই স্বপ্ন দেখতেই পারি।  লেখক :  নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

২৭ জুন, ২০১৮ ১০:০৯:৫৬