সাম্প্রদায়িকতা চাই না
তসলিমা নাসরিন
অ+ অ-প্রিন্ট
ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এবং ঘৃণা কখনও সুপ্ত, কখনও বিকটভাবে প্রকাশিত। আমরা ভুলিনি ১৯৪৬-এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং, নোয়াখালী দাঙ্গা, মালাবার দাঙ্গা, নাগপুর দাঙ্গা, নিলি দাঙ্গা, রাচি দাঙ্গা, ১৯৬৯-এর গুজরাত দাঙ্গা, ১৯৮৪-এর বিভান্দি দাঙ্গা, মীরাট দাঙ্গা, ভাগলপুর দাঙ্গা, নব্বইয়ের দশকে হায়দারাবাদ দাঙ্গা, বোম্বে দাঙ্গা, ২০০২ সালে ফের গুজরাত দাঙ্গা, গত কয়েক বছরে ক্যানিং দাঙ্গা, মুজাফফরনগর দাঙ্গা, কালিয়াচক দাঙ্গা। এইসব দাঙ্গায় হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই মৃত্যু ঘটেছে। হিন্দু আর মুসলমানের শান্তির জন্য, দাঙ্গা এড়াতে, মানুষের মৃত্যু এড়াতে, দেশকে ভাগ করা হলো। যখন রেলগাড়িতে চড়ে এপারের মুসলমান ওপারে যাচ্ছিল আর ওপারের হিন্দু এপারে আসছিল, তখন ১০ লাখ হিন্দু-মুসলমান খুন হয় পরস্পরের হাতে। মাঝে মাঝে মনে হয়, হিন্দু আর মুসলমান বোধহয় কোনও দিনই বন্ধুর মতো বা আত্মীয়ের মতো পাশাপাশি বাস করতে পারবে না।

বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা হয় না ঠিকই, তবে সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের অনাচার নিরবধি চলতেই থাকে, ভয়ে সংখ্যালঘুদের অনেকেই দেশ ছাড়ে অথবা ধর্মান্তরণ করে। মুসলিম মৌলবাদিরা যেমন বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে যা নয় তাই করছে, হিন্দু মৌলবাদিরাও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ভারতবর্ষে। সব দেশেই সংখ্যালঘুরা বিপন্ন বোধ করছে। বাংলাদেশ আর পাকিস্তান থেকে সংখ্যালঘুরা ভারতে পাড়ি দেয়। ভারতের সংখ্যালঘু কিন্তু ভারত ছেড়ে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে বসবাস করতে একেবারেই রাজি নয়। সম্ভবত তারা মনে করে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের চেয়ে কম অসহায় নয়। হিন্দু মুসলমানে দাঙ্গা হাঙ্গামা হিংসে হিংসির মধ্যেও এ ক’দিনে ভারতে কিছু অভিনব ঘটনা ঘটেছে। বিহারের সদর হাসপাতালে রাজেশ কুমার নামের এক ৮ বছর বয়সী থ্যালাসেমিয়ার রোগী ভর্তি হয়েছিল। রাজেশের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। রক্তের দরকার হয়। রাজেশের রক্তের সঙ্গে মেলে এমন রক্ত সহজে মেলে না। হাসপাতালের মেঝে পরিষ্কার করে আনোয়ার হোসেন নামের এক লোক, সে লোক খবর দেন বন্ধু আলম জাওয়াদকে। আলম জাওয়াদ ছুটে এসে নিজের রক্ত দেন রাজেশকে। আলমকে তার রোজা ভাঙতে হয় রক্ত দেওয়ার জন্য। আলমের রক্ত পেয়ে রাজেশ বেঁচে যায়। বিহারেরই দ্বারভাঙ্গায় এরকম আরো একটি ঘটনা ঘটে। খবর যা পেয়েছি, তা হলো—‘রমেশকুমার সিংহের স্ত্রী আরতিদেবী প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে এক নার্সিং হোমে ভর্তি হয়ে নবজাতকের জন্ম দেন। কিন্তু জন্মের পরেই নবজাতকের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাকে নার্সিংহোমের এনআইসিইউ-তে রাখা হয়। চিকিৎসকেরা পরিবারের সদস্যদের জানান, ওই সদ্যোজাতকে বাঁচাতে গেলে ‘ও নেগেটিভ’ গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন। সাধারণ ভাবে ‘নেগেটিভ’ গ্রুপের রক্ত পাওয়া সহজ নয়। পরিবারের চেনাজানা কারও রক্তই আবার ওই গ্রুপের নয়। পরিবারের সদস্যরা তাই গোটা বিষয়টি জানিয়ে ফেসবুক এবং বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আবেদন করেন। বিভিন্ন জায়গায় এসএসবি জওয়ানদেরও বার্তা পাঠানো হয়। গতকাল দ্বারভাঙ্গারই বাসিন্দা মহম্মদ আশফাক ফেসবুকে সেই আর্তিভরা বার্তা দেখেন। আশফাকের রক্তের গ্রুপ ‘ও নেগেটিভ’। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রমেশ সিংহের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পৌঁছে যান নার্সিংহোমে। চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা করেন। কিন্তু রমজানের উপবাস থাকায় তাঁরা রক্ত নিতে পারবেন না বলে জানান। উপবাসের মধ্যে রক্ত দিলে আশফাকই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। নবজাতকের প্রাণ বাঁচাতে উপবাস ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। হাসপাতালেই খাবার খান।

ফোনে আশফাক বলেন, ‘রোজা অন্য সময়ে ফের রাখা যেতে পারে। আসলে আল্লাই আমাকে দিয়ে এই কাজ করিয়ে নিয়েছেন।’ পরিবারের সদস্যরাও আশফাকের উদারতায় কৃতজ্ঞ। তাঁদের কথায়, ‘ধর্মের নামে ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করেন যাঁরা, তাঁরা আশফাকের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন!’

এই দুটো ঘটনাই আমাকে মুগ্ধ করেছে। হিন্দুর জন্য মুসলমান যুবকেরা নিজের রোজা ভাঙতে এতটুকু দ্বিধা করেননি। মানবতার ধর্মের চেয়ে বড় কোনও ধর্ম নেই কোথাও। আলম জাওয়াদ আর মহম্মদ আশফাক নিজেরা ধার্মিক হয়েও অন্য ধর্মের লোকদের ঘৃণা তো করেনইনি, বরং তাদের দুঃসময়ে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। ধর্মের সবচেয়ে বড় দিক মানবতা। মানবতা উধাও হয়ে গেলে ধর্মে যা থাকে, তা হলো নরক থেকে বাঁচতে বা স্বর্গের পথে যেতে প্রভুর স্তুতি গাওয়া।

ধর্ম থেকে মানবতা উধাও হতে আমরা অনেক দেখেছি। কিন্তু ঘৃণা হিংসে অবিশ্বাস নিয়ে জীবনভর পাশাপাশি বাস করা যায় না। শিক্ষিত সচেতন সংস্কৃতিমান মানুষ কখনও একই জনগোষ্ঠীকে ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন হওয়ার কারণে বিভক্ত হতে দিতে চাইবে না। দুই সম্প্রদায়ে মানবতার চর্চা না হলে দুই সম্প্রদায়ই ধ্বংস হবে একে অপরের অস্ত্রে।

শুধু মুসলমানের মানবতাই নয়, হিন্দুর মানবতাও দেখছি ভারতবর্ষে। যশপাল সাক্সেনা যা করেছেন, তারও কোনও তুলনা হয় না। খবরে পেলাম—‘গত ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম দিল্লির রঘুবরনগরে নিজের বাড়ির কাছেই গলা কেটে খুন করা হয় তাঁর বছর তেইশের ছেলে অঙ্কিতকে। অঙ্কিত ফটোগ্রাফার ছিল, প্রেম করতো এক মুসলিম মেয়ের সঙ্গে। দুজনের এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি মুসলিম প্রেমিকার আত্মীয়রা। এ নিয়েই দুপক্ষে ঝগড়া চলাকালীন অঙ্কিতের গলায় ছুরি চালিয়ে দেয় মেয়েটির বাবা। এই খুনের সঙ্গে ধর্মকে জড়িয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টাও কম হয়নি। রুখে দাঁড়িয়েছিলেন যশপাল। ক্ষোভ জানিয়ে বলেছিলেন, তাঁর ছেলের খুনের ঘটনায় যেন সাম্প্রদায়িক রং না লাগানো হয়। এবার নিজে সম্প্রীতির বার্তা দিতে চান ছেলের নামে তৈরি ট্রাস্ট থেকে। যশপালের কথায়, ‘আমার ছেলেকে খুনে যারা দোষী, তাদের ধর্মের জন্য ওই ধর্মের অন্যদের কেন দায়ী করা হবে? আমি ও আমার স্ত্রী দু’জনেই অসুস্থ। আমাদের দু’জনকে তো রোজ সঙ্গ দেন, খাবার খাওয়ান আশপাশের বহু মুসলিম পড়শি। আমাদের পাশের বাড়ির ইজহার আলম এবং ওঁর ছেলে আজহারই আমাদের ইফতার পার্টির প্রস্তাবটা দেন। ওঁরা তো আমাদের পরিবারেই অংশ।’

ছেলে নেই। তবে তাঁর স্মৃতি যেন থাকে। তাঁর নাম যেন ছড়িয়ে যায় সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে। এই আশায় ৩ জুন ইফতার পার্টির আয়োজন করছেন দিল্লিতে নিহত অঙ্কিত সাক্সেনার বাবা যশপাল। মঙ্গলবার তিনি ফোনে বলেন, ‘অঙ্কিতের নামে ট্রাস্ট তৈরি করছি আমরা। এই অনুষ্ঠানেই সেটির পথচলা শুরু হবে।’

পুত্রহারা যশপাল মনে করিয়ে দেন, বন্ধু অঙ্কিতের শেষকৃত্যে যাবতীয় আচার পালন করেছিলেন আজহারই। আর এই বাস্তবকেই ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। যশপাল বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের ছেলের নাম সবার মনে থাকুক। সেটা কোনও ভাল কাজের মধ্যে দিয়েই সম্ভব। আর এজন্য তো আমাদের শক্ত হতেই হবে। প্রথমে ভেবেছিলাম ছোট আয়োজন হবে। কিন্তু এত ভাল সাড়া পাচ্ছি যে ঠিক করেছি, এলাকার কোনও পার্কেই ইফতার পার্টি হবে।’

যশপাল সাক্সেনা, মহম্মদ আশফাক, আলম জাওয়াদের মতো লোক আছে বলেই মনে হয় হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠা সম্ভব।বাংলাদেশেও হিন্দুদের ইসকন বা বৌদ্ধদের মন্দির রোজার সময় গরিব মুসলমানদের ইফতার খাওয়ায়। মুসলমানরা কি মসজিদ থেকে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের ধর্মীয় পরবে উৎসবে দান খয়রাত করেন? যদি দু’পক্ষ থেকেই মানবিকতার চর্চা হয়, তাহলে দু’পক্ষের ধর্মই মানবিক ধর্ম হিসেবে পরিচিত হবে। এটিই তো সভ্য হওয়ার লক্ষণ। ধর্মের কারণে যুদ্ধ বিগ্রহ অত্যাচার নির্যাতন হানাহানি কাটাকাটির ইতিহাস আমরা বইয়ে পড়েছি। হানাহানির ইতিহাসকে সম্প্রীতির ইতিহাসে পরিণত করতে শুভবুদ্ধির মানুষই পারেন। একে অপরের সাহায্যে আমরা পাশে দাঁড়াবো, রমজানের পবিত্র মাসে এ-ই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক। লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

৩১ মে, ২০১৮ ১২:৫২:৩৭