শেরেবাংলার বাঁশ ও নৌকার মাঝি বদল
নঈম নিজাম
অ+ অ-প্রিন্ট
অনেক দিন আগে শোনা একটা মিথ মনে পড়ছে। কলকাতায় অবস্থানকালে শেরেবাংলার কাছে এক লোক টাকা ধার চাইতে এলেন। শেরেবাংলা লোকটাকে বসিয়ে রেখে গেলেন ভিতর বাড়িতে। ফিরলেন নগদ অর্থ হাতে। প্রথম লোকটাকে দেন ধার চাওয়া ২০ টাকা। সঙ্গে যোগ করলেন আরও পাঁচ টাকা। চাওয়ার চেয়ে বেশি পেয়ে লোকটি বিস্ময় নিয়ে বলল, আমি তো ২০ টাকা চেয়েছিলাম। আপনি দিলেন ২৫ টাকা। মহাশয় বুঝতে পারছি না কিছু। জবাবে শেরেবাংলা বললেন, বাছা ২০ টাকা তুমি চেয়েছ দিলাম। সঙ্গে আরও পাঁচ টাকা দিলাম আগে থেকে একটা বাঁশ কিনে রাখতে। কারণ আজ আমি তোমার উপকার করলাম। জানি এর বিনিময়ে তুমি আমাকে কী দেবে? তাই তোমার কাজটি ভবিষ্যতে ভালোভাবে করতে, বাঁশ কেনার টাকা আগাম দিয়ে রাখলাম। আশা করি আমার জন্য ভবিষ্যতে কষ্ট করে তোমার আর বাঁশ কিনতে পয়সা লাগবে না। কথাটি মিথ হলেও এখনকার অনেক বাস্তবতার সঙ্গে বড় বেশি মিল খুঁজে পাই। জগতে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কারও একবার উপকার করলেন, দুবার করলেন, তিনবারের সময় না পারলে আপনার জন্য বাঁশ অপেক্ষা করছে। যেন আপনার সারা জীবনের দায়িত্ব তার জন্য করে যাওয়া। এর বাইরে গেলেই খবর আছে। দেখিয়ে দেবে আপনাকে। জগৎ বড়ই জটিল। ছোটখাটো হীনমন্যতাই সর্বনাশ ডেকে আনছে আমাদের। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই জীবনে অনেক কিছু দেখলাম। বেলা বয়ে যাচ্ছে। এই বয়সে মানুষের জন্য অনেক করার চেষ্টাও করেছি। বড় জটিল আমাদের সমাজ, চারপাশ। মানবিক মূল্যবোধগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। ব্যবধান বাড়ছে মানুষে মানুষে। নৈতিক অবক্ষয় তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। একজন মা সন্তানকে হত্যা করছে। আবার সন্তান হত্যা করছে বাবা-মাকে। পারিবারিক, সামাজিক বন্ধনের জায়গাগুলো আলগা হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হায়েনা লোভী চোখের আনাগোনা শেষ করে দিচ্ছে সবকিছু। আমার স্ত্রী মাঝে মাঝে বলেন, তুমি মানুষ চেন না। আমারও আজকাল তাই মনে হয়। জগতে মানুষ চেনার চেয়ে কষ্টকর আর কিছু নেই। মানুষ যদি মানুষ থাকত তাহলে এত কথা আর বলতে হতো না। জগৎ সংসারে এত সমস্যা তৈরি হতো না। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেছেন, ‘শুধু পরিবেশ দূষণ নয়, এর চেয়ে আরও বড় দূষণ রয়েছে মানুষের মনে ও চিন্তায়। এই দূষণ দূর করতে হবে।’ জানি না এই দূষণ দূর হবে কিনা। সমাজ ও রাজনীতি যে দিকে যাচ্ছে শেষ কোথায় জানি না।

কমিটমেন্টের জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিরোধ আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে হিংসা, বিদ্বেষ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখানে দুটি চিন্তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রগতিশীলতার কথা বলে বিভক্তির রেখা নিজেরাই টানছি আমরা। ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে স্বার্থপরতার বিভেদ গ্রাস করছে সব কিছুতে। কিছু মানুষের, অতি উৎসাহ ক্ষতি করছে সমাজকে। জগতে আজব কিসিমের হতাশ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যারা ভালো কিছু খুঁজে পায় না কোনো কিছুতেই। সব কিছুই খারাপ তাদের চোখে। স্বার্থের সামান্য দ্বন্দ্বে জগৎ সংসারে ঝামেলা তৈরিই কারও কারও কাজ। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা কোথায় যাচ্ছি? কেন যাচ্ছি? একবারও কেউ ভাবছি না কী রেখে যাচ্ছি আগামীর জন্য? জগৎ সংসার কি শুধুই প্রতিহিংসার? বিভাজন শুধু বিএনপি আওয়ামী লীগে নয়। সব পেশা, চিন্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। বড় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ হিংসা বিদ্বেষও এখন ভয়াবহ। আমাদের এই সমাজ এমন ছিল না। একজনের বিপদে পুরো গ্রাম, পাড়া-পড়শি ছুটে আসতেন। এখানে ধর্ম-বর্ণ, রাজনীতি থাকত না। কেউ বুঝতে চান না, আজকের রাজা কাল ফকিরে পরিণত হন। কবি নজরুল বলেছেন, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়।’ আসলেও তাই। ছোটবেলায় দেখেছি, আমাদের কাছারি ঘরের সামনে ফুল বাগান ছিল। আমি নিজেও এই বাগান পরিচর্যা করতাম। আমার একটা প্রিয় ফুল ছিল গন্ধরাজ। সাদা ফুটফুটে গন্ধরাজে চারপাশ মৌ মৌ করত। এখন সেই কাছারিও নেই, গন্ধরাজও নেই। গ্রামেগঞ্জে এখন প্রিন্সেস লাকিখানের গান হয় না। যাত্রা, জারি, ভাণ্ডারি, পালাগান কোনোটাই নেই। বিদ্যুতের আলোর ঝলকানিতে হারিয়ে গেছে আমার সব ঐতিহ্য অন্ধকারে। এখন মানুষ মোবাইল ফোনে সারা দুনিয়ার খোঁজ রাখে। ডিস টিভিতে বিদেশি অনুষ্ঠান দেখে। কিন্তু নিজের ঘরের খবর রাখে না। সন্তানের ভালোমন্দ দেখে না। হৃদয় দিয়ে অনুভব করে না অতীতকে। সেই হারিয়ে যাওয়া বৈশাখ, বর্ষাকে। অথচ বৈশাখের ঝিরি ঝিরি বাতাস দেখে সামাজিক গণমাধ্যমে কত কী লেখেন। কিন্তু বিজ্ঞানের আলো আঁধারিতে সব অতীত হয়ে গেছে স্বপ্নের মতো। কেউ বোঝে না, ঝিরি ঝিরি বাতাস ঠিক আছে। কিন্তু ঝামেলা বৈশাখী ঝড় উঠলে। টিনের চালা উড়ে যেতে পারে মুহূর্তে। তাই বৃষ্টি দেখে রোমান্টিজম জাগলে চলবে না। ঝড়ের কথা মনে রাখতে হবে।

পত্রিকায় দেখছি, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আসনে নৌকার মাঝি বদলের দাবি উঠছে। এই দাবি অন্য কারও নয়, দলের মাঠের নেতা-কর্মীদের। কেন এই দাবি? প্রশ্ন করলাম আওয়ামী লীগের একজন নেতাকে। জবাব এলো, এত বড় দলের নৌকার দাবিদার তো অনেক থাকবেই। এটা কোনো সমস্যা না। সমস্যা অন্যখানে। সেই দিন গুলশানে বন্ধুদের এক আড্ডায় গেলাম। সরকারি দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও ছিলেন। এর মাঝে একজন একটি ব্যাখ্যা দিলেন আগামী ভোট নিয়ে। সরকারি দলের নেতারা আজকাল যুক্তি শুনতে নারাজ। তারা মনে করে অপকর্ম যত খুশি করবে। কিন্তু শেখ হাসিনার দায়িত্ব তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসা। অনেক এমপিকে প্রশ্ন করলেও তারা বলেন, আগামী ভোটে আসলে সমস্যা আছে। তবে আপা আছেন। চিন্তা নেই। তিনি সব সামলে নেবেন। এটা কোনো কথা হলো না। অপকর্ম করবেন আপনারা, আর দায়িত্ব আপনার নেত্রী কেন নেবেন? এ কথা বাস্তব, শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে দলে ও দেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তার একক জনপ্রিয় অবস্থান, রাজনৈতিক কূটকৌশল আওয়ামী লীগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। দেশকে নিয়ে গেছে নতুন উচ্চতায়। তিনি ৩০০ আসনে ভোট করলে অথবা রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি চালু থাকলে সমস্যা ছিল না। সমস্যা পাঁচটির বেশি আসনে তিনি ভোট করতে পারবেন না। বাকি আসনে দলের লোকজনকেই দাঁড়াতে হবে। আর সমস্যা এখানেই। দলের নেতারা যার যা খুশি করছেন। কোথায়ও সমন্বয় নেই। নেতায় নেতায়, কর্মী কর্মীতে বিরোধ। চাওয়া পাওয়ার হিসাব নিকাশ। পরিবারতন্ত্র আর আত্মীয়করণ। ১৬০টির বেশি আসনে এমপিদের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জোট মহাজোটের গ্যাঁড়াকলে আছে আরও ২৫টির বেশি আসন। সেদিন ঢাকার একটি এলাকার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বললেন, এমপি সাহেব বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা দেন না। মামলা দেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। এই পর্যন্ত ২৭০০ মামলা হয়েছে দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে খুনের মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলার আসামি কোনো কর্মী কি কাজ করবেন আগামী নির্বাচনে এই এমপি মনোনয়ন পেলে? ঠিক পাশের আরেকটি এলাকার একজন এমপি শুধু বিয়ে করেন। এ পর্যন্ত কতটি বিয়ে করেছেন তিনি নিজেও জানেন কিনা সন্দেহ। বিয়েপাগল এই এমপিও দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেন। কারণ তিনি গত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ করেননি। লালমনিরহাটের এক এমপি শুধুই হয়রানি করেন দলের কর্মী ও সাংবাদিকদের। এভাবেই চলছে। সবকিছু সবাই জানেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো কিছু কেউ গায়ে মাখেন না। কারণ সবাই মনে করছেন, ২০১৪ সালের মতো গায়েবি একটা কিছু হবে।

আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতাকে প্রশ্ন করলাম, দলের অভ্যন্তরীণ সব চিত্র কি শীর্ষমহল জানেন? এই নেতা বললেন, না জানার কিছুই নেই। সবাই সব জানেন। নেত্রীও জানেন। এই নেতা আরও বলেন, নেত্রী অবশ্যই বিতর্কিতদের রাখবেন না। কারণ সবার আমলনামা তার কাছে রয়েছে। তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনেও ৫৬টি আসনে মনোনয়ন পরিবর্তন করেছিলেন। মন্ত্রিসভার পুরনো সদস্যরাও বাদ পড়েছিলেন। এবার গণপরিবর্তন আসবে মনোনয়নে। দলকে রক্ষা করতেই শেখ হাসিনা এই কাজ করবেন। এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ ক্ষমতাবান নেতা হচ্ছেন শেখ হাসিনা। তার চোখের আড়ালে কোনো কিছু যাওয়ার সুযোগ নেই। কোন নেতা কী করছেন তিনি সব জানেন। সব বোঝেন। তিনি সময়মতো সবকিছু করেন। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে অবশ্যই তার পরিকল্পনা আছে। তবে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিতর্কিত, এলাকার অজনপ্রিয়, মানুষের অর্থ মেরে দেওয়া মানুষগুলো মনোনয়ন পাবেন না। দুর্বল নৌকার মাঝি বদল হবে সব এলাকাতেই। তিনি পরিবর্তন আনবেন। ২০১৪ সালে ৫৬ আসনে পরিবর্তন করলে এবার অবশ্যই ১৫৬ আসনে পরিবর্তন আনতে হবে। জোট মহাজোটের দুর্বল প্রার্থীদেরও এবার রাখা যাবে না। বিতর্কিতদের মাঠে দেখলে মানুষের ভিতরে অসন্তোষ, ক্ষোভ তৈরি হবে। আওয়ামী লীগের কর্মীরা হতাশ হবে। আর সব হতাশার ফলাফল কখনো ভালো হয় না। আপাতত খোলা চোখে হতাশা চোখে পড়ছে না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর রেশ পড়ে। বিশেষ করে ভোটের সময় দলীয় কর্মীরা প্রার্থীর বিপক্ষে গেলেই বিপদ। অতীতের দৃষ্টান্তগুলো এ ব্যাপারে ভালো কিছু নয়। হতাশা, বঞ্চনা সর্বনাশ বয়ে আনে। একজন এমপির কী দরকার নিজের নির্বাচনী এলাকায় পুত্র, কন্যা, স্ত্রীকে দলের দায়িত্বে আনার? অথবা স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর? অথবা ব্যবসা দেওয়ার। এখন তাই হচ্ছে। পরিবারতন্ত্র, দলীয় কর্মীদের বঞ্চনা, নির্বাচনী এলাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যই সর্বনাশ আনছে এমপিদের। প্রার্থী বদল না করলে এই সর্বনাশা চিত্রটি পাওয়া যাবে আগামী নির্বাচনে। প্রার্থী খারাপ হলে কর্মীরা বসে থাকবে ঘরে। তখন স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীরা এর সুবিধা নেবে। প্রশাসন স্রোতের দিকেই গা ভাসাবে। ইতিহাস তাই বলে। সবারই মনে রাখা দরকার, আজ আপনার, কাল কর্মীদের। উইনস্টন চার্চিলের মতে, জনগণের শোধ নেওয়ার ও হিসাব-নিকাশের সময় একবারই। ভোটের সময় তারা সেই সুযোগটুকু নিয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও পাঁচ বছরের সব হিসাবের জবাব একবারই দেয়। সেই জবাব অনেক সময় বড় নিষ্ঠুর হয়। নিজ দলের কর্মীরাই দলের প্রার্থীর সর্বনাশ করে, সারা বছরের সব বঞ্চনা, হতাশা ও কষ্টের জবাব দিয়ে। এখন সেই জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মীরা। সময়মতো তাদের না নামাতে পারলে আগামী হয়ে উঠবে অনেক বেশি কঠিন। সেই কাঠিন্যকে ভেদ করে উঠে দাঁড়ানো হবে মুশকিল। লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

০৮ এপ্রিল, ২০১৮ ০৩:০০:২৯