ধর্মগ্রন্থগুলো ধর্মের বই, বিজ্ঞানের বই নয়
তসলিমা নাসরিন
অ+ অ-প্রিন্ট
সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি বিজ্ঞানীরা কিছু একটা আবিষ্কার করলেই ধার্মিকদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়, তাঁরা বেশ জোর গলায় বলেন, এটি তাদের ধর্মগ্রন্থে ছিল। কম্পিউটার এসেছে জগতে, ধর্মীয় সংগঠন বলে বসলো, ধর্মগ্রন্থের অমুক স্থানে স্পষ্টই লেখা আছে কম্পিউটারের কথা। মোবাইল এলো, একই ঘটনা। তারও আগে, বিদ্যুৎ এলো, ধর্মগ্রন্থে আল্লাহ বলা হয়েছে বিদ্যুতের কথা। নতুন কোনও নক্ষত্র বা গ্রহ আবিষ্কার হলো, এও নাকি ধর্মগ্রন্থে ছিল। বাইবেলে সব প্রশ্নের উত্তর আছে, এরকম দাবি করার লোক কম নেই। হিন্দুরাও বলে সবই বেদে আছে।

কিছুদিন আগে ১০৫তম জাতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের উদ্বোধন করে ভারতের বিজ্ঞান-প্রযুক্তিমন্ত্রী হর্ষবর্ধন দাবি করলেন, ‘আইনস্টাইনের চেয়ে বেদ এগিয়ে। স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, আইনস্টাইনের বিখ্যাত ‘‘e=mc2’ সূত্রটির চেয়েও উন্নততর তত্ত্ব থাকতে পারে বেদে।’

তাঁর ওই মন্তব্যের জন্য মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন সাংবাদিকরা, কবে কোথায় এমন কথা বলেছিলেন হকিং? যদি বলে থাকেন, তার বৈজ্ঞানিক কোনও ভিত্তি আছে কি? মন্ত্রী উত্তর এড়িয়ে বলেছেন, ‘আপনারাই খুঁজে দেখুন। না পেলে দিল্লিতে আমার কাছে আসবেন।’

বেদের ধারণাগুলির বিজ্ঞানের পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত নয় বলেই সেগুলিকে ভুল মনে করা ঠিক নয় বলে মনে করেন ভারতের অনেক বেদ বিশেষজ্ঞ। এর আগে ২০১৫ সালের বিজ্ঞান কংগ্রেসে বলা হয়েছিল, এখনকার বিমান আবিষ্কার হওয়ার বহু আগে বৈদিক শাস্ত্রেই আধুনিক বিমান বা পুষ্পক রথ-এর কথা বলা হয়েছিল।

বিজ্ঞানী না হলেই, ভারতের অনেক শিক্ষিত লোকেরা বলেন, ‘শূন্য’ বা ‘জিরো’ না জন্মালে অঙ্কশাস্ত্রের জন্মই হতো না। সেই শূন্যের জন্মধাত্রী ছিল আমাদের ভারত ভূখণ্ডই। আর অঙ্কের অস্তিত্ব না থাকলে বিজ্ঞানই ভূমিষ্ঠ হতো না!’ কিন্তু তাই বলে আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানের যা যা আবিষ্কার হয়েছে, তার সব কিছুরই ‘বীজ’ ছিল প্রাচীন ভারতে বা প্রাচীন ভারত অনেক এগিয়ে ছিল আধুনিক বিজ্ঞানের চেয়ে— এমন দাবি শুনলে রীতিমতো আশঙ্কা হয়। দাবি যারা করেন, তাঁদের শিক্ষিত ভাবাটা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্টিফেন হকিং বেদ সম্পর্কে এমন কোনও কথা বলেছেন কিনা জানার জন্য স্টিফেন হকিং ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ম্যাল্কম পেরি জানিয়ে দিয়েছেন স্টিফেন হকিং বেদ নিয়ে এমন মন্তব্য কখনও কোনওদিনই করেননি। পেরি ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাহলে কী দাঁড়ালো? বিজ্ঞানমন্ত্রী সঠিক তথ্য না জেনে মন্তব্য করেছেন। এ কথা এখন সকলে জানে যে ফেসবুকে স্টিফেন হকিং নামে নকল একটি একাউন্ট খুলে ভারতের বেদ-বিশ্বাসী ‘হরি সায়েন্টিস্ট’ স্টিফেন হকিং এর নাম দিয়ে বেদের প্রশংসা করে মনগড়া কথা বলেছেন। হরির মনগড়া কথাকেই বিজ্ঞানমন্ত্রী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর মন্তব্য বলে ধরে নিয়েছেন। বিজ্ঞানমন্ত্রী বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন বেদ-এ। তাই এত সহজে ফেসবুকের একটি কোটেশন তাঁকে উত্তেজিত করতে পেরেছে। বিজ্ঞানে বিশ্বাস করলে হয়তো সংশয় প্রকাশ করতেন, গবেষণা করতেন, সত্যিই স্টিফেন হকিং বেদ নিয়ে এমন কথা বলেছেন কিনা।

টুইটারে বা ফেসবুকে কোনটি নকল একাউন্ট কোনটি সত্যিকারের তা বোঝা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। সেদিন এক ভদ্রলোক আমাকে বলছিলেন, ‘আপনার তো অনেক একাউন্ট, সব একাউন্টের পোস্টগুলো পড়ি।’ আমি বলেছি ‘আমার অনেক একাউন্ট নেই, আমার একটাই একাউন্ট, বাকিগুলো ফেক। অন্য লোকেরা তৈরি করেছে। আমি চিনি না ওদের।’

বিজ্ঞানমন্ত্রী না হয় ভুল করেছেন। কিন্তু অনেক শিক্ষিত হিন্দুকে দেখেছি যারা বেদের কথাগুলোকে ধ্রুব সত্য বলে মানেন। অনেকে বিশ্বাস করেন, বেদেই বলা হয়েছে আধুনিক টেস্ট টিউব পদ্ধতিতে শিশু-জন্মের কথা। বেদেই বলা আছে জেনেটিক ক্লোনিং এর কথা, বলা আছে প্লাস্টিক সার্জারির কথা। কর্ণের জন্ম যখন জরায়ুর বাইরে, তখন নিশ্চয়ই কর্ন ছিল টেস্ট টিউব বেবি, গণেশের ঘাড়ের ওপর যে হাতির মাথা বসানো হয়েছে, প্লাস্টিক সার্জারি ছাড়া তা তো সম্ভব হয়নি। ধর্মের রূপকথাগুলোকে বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করার চল বেশ জোরেশোরেই শুরু হয়েছে আজকাল।

হাজার হাজার বছরের পুরোনা ধর্মগ্রন্থগুলোর বিভিন্ন শ্লোকের মধ্যে আধুনিক বিজ্ঞান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা বিজ্ঞান সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান আছে, এমন মানুষের এখন দিন রাতের কাজ। বিজ্ঞান যদি ধর্মকে অস্বীকার করে, তবে ধর্মের বেঁচে থাকার আর কোনও রাস্তা আছে বলে অনেকে মনে করে না। ধর্ম তো এতকাল বিজ্ঞানের সমর্থন ছাড়াই বেঁচে ছিল। হঠাৎ এই ভয় কেন?

আমরা বিজ্ঞান জানার জন্য বিজ্ঞানের বই পড়ি। কিছু লোক বিজ্ঞান সম্পর্কে অতি অল্প জ্ঞান নিয়ে ধর্মগ্রন্থ পড়ে নানা শ্লোককে নানা কায়দায় ব্যাখ্যা করে দুনিয়াকে দেখাতে চায় বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে  ওই শ্লোকের আড়ালে। এতে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ দেওয়া গেল, আবার ঈশ্বর যে বিজ্ঞানীদের চেয়ে বড় বিজ্ঞানী তাও প্রমাণ করা গেল। বিজ্ঞানীরা কোনও কিছু আবিষ্কার করার পর কেন ধর্মগ্রন্থে সেই আবিষ্কারের কথা খোঁজা শুরু হয়? কেন আগে থেকে কেউ শ্লোক খুঁজে বলে রাখেন না যে ঈশ্বর এইসব জিনিস আবিষ্কারের কথা বলে রেখেছেন?

ধর্মান্ধ মুসলমানরা সম্ভবত মানুষ চাঁদে যাবে এই ধরনের কোনও আয়াত না পেয়ে মানুষ চাঁদেই যায়নি, এমন কথা বলতে শুরু করেছে। ওদিকে আবার কিছু হিন্দু মহাভারতে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন তা ‘বিগ ব্যাং’ ছাড়া অন্য কিছু নয় তা বলছেন। অভিজিৎ রায়ের ‘সবই ব্যাদে আছে’ প্রবন্ধ পড়ে জানতে পারলাম, মৃণাল দাসগুপ্ত ভারতের জাতীয় বিজ্ঞান আকাদেমির বিখ্যাত বিজ্ঞানী। উনি দাবি করেন, আজ আধুনিক বিজ্ঞান যে সমস্ত নতুন তত্ত্ব ও তথ্য প্রতিদিনই আবিষ্কার করছে, তার সবকিছুই নাকি প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা বের করে গেছেন, ‘বেদ’-এ নাকি সে সমস্ত আবিষ্কার ‘খুবই পরিষ্কারভাবে’ লিপিবদ্ধ আছে। মৃণাল দাসগুপ্তের ভাষায়, রবার্ট ওপেনহেইমারের মতো বিজ্ঞানীও নাকি ‘গীতা’র বিশ্বরূপ দর্শনে এতই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন যে, ল্যাবরেটরিতে আণবিক শক্তির তেজ দেখে ‘গীতা’ থেকে আবৃত্তি করেছিলেন— দিবি সূর্য্যসহস্রস্য ভবেদ যুগপদুত্থিতা। যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ ভাসন্তস মহাত্মনঃ//

কেউ কেউ তো বলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ছিল ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’। উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহূত প্যাট্রিয়ট মিসাইল নাকি হিন্দু পুরাণের ‘বরুণ বাণ’ আর ‘অগ্নিবাণ’!

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানের ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বকে কোরআনের আয়াতের সঙ্গে মেশাতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন—‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্বের সাম্প্রতিক ভাষ্যটি বর্তমানে মহাবিশ্বের উৎপত্তির সর্বোত্কৃষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করছে। কিন্তু আগামীকাল যদি এর চাইতেও কোনো ভালো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে কী হবে? তাহলে কি নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ধর্মগ্রন্থের আয়াত বদলে ফেলা হবে?’

পোপও ১৯৫১ সালে বিগ ব্যাং এর সঙ্গে বাইবেলের সৃষ্টি তত্ত্বের মিল খুঁজে পেয়েছেন বলে প্রচার করছিলেন তখন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ হেনরি লেমিত্রি আপত্তি করেছিলেন। ফ্রাঙ্ক টিপলার ওদিকে পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও খ্রিস্টধর্মকে ‘বিজ্ঞান’সম্মত বানানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। বিজ্ঞানীরাও অদ্ভুত কিছু কারণে পথভ্রষ্ট হন এবং ধর্মান্ধর মতো আচরণ করেন। এতে নিশ্চয়ই তাঁদের কিছু উদ্দেশ্য সাধন হয়।

মুসলিমদের অনেকে বলেছেন, কোরআনের কিছু আয়াত বিবর্তন তত্ত্বের ‘সরাসরি’ প্রমাণ। ‘সৃষ্টি’ বোঝাতে ‘খালাকা’ শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে, যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ‘ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া’— সুতরাং, তাঁরা বলছেন, এটাই বিজ্ঞানের ‘বিবর্তন’।

একদিক দিয়ে ভালো যে, বিজ্ঞানকে আগে যেমন ধর্মবাদীরা অস্বীকার করতো, এখন তা করে না। এখন ঠিকই বোঝে যে বিজ্ঞান সত্য, বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে গেলে লাভের চেয়ে বরং ক্ষতি। নতুন ছেলেমেয়েরা ভালো চাকরি বাকরি পাওয়ার আশায় ইস্কুল কলেজে বিজ্ঞান পড়ছে। ধর্ম যদি বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলে, তারা ধর্মের ব্যাপারে সন্দিহান হতে পারে, সে কারণেই ধর্মবাদীরা ধর্মের মধ্যে বিজ্ঞান পেতে চাইছে। তাই বিজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ না করে বরং সমর্থন জোগানোর জন্য, প্রাচীন সব ধর্মগ্রন্থ থেকে সব আয়াত বা শ্লোক হাজির করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানকে সমর্থন করেই ধর্মকে টিকে থাকতে হবে। তারপরও বলছি, সবচেয়ে বড় ধর্ম ধর্মগ্রন্থের ধর্ম নয়, সবচেয়ে বড় ধর্ম মানবতার ধর্ম। সেটি যার অন্তরে আছে, সে-ই সত্যিকারের ধার্মিক। সেই সত্যিকার ধার্মিক আয়াত বা শ্লোকের মিথ্যে ব্যাখ্যা দিয়ে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে না। লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

২৩ মার্চ, ২০১৮ ২৩:৩৯:৩৫