জাফর ইকবালদের সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা অব্যাহত থাকুক
যুবায়ের আহমেদ
অ+ অ-প্রিন্ট
ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর তাঁর অগ্রজ হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশ ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া লিখেছেন, ‘‘আমার পরিবার সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধ রাখবে না৷''

ঘটনার পরদিনই নুহাশ হুমায়ূন তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে এই প্রতিক্রিয়াটি দেন৷ তাঁর পুরো বক্তব্যে নেই কোনো আবেগের বাগাড়ম্বর৷ নেই কাউকে আঘাত করার মানসিকতা৷ কিন্তু একইসঙ্গে তা দৃঢ়সংকল্পের প্রতিচ্ছবি৷

তিনি ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, যার বাংলা করলে মানে অনেকটা এমন হয়, ‘‘এটা সবার ক্ষেত্রেই হয়৷ আপনি হয়তো একটা ফোন পেলেন বা কেউ টেক্সট মেসেজ পাঠলো যে, আপনার পরিচিত কেউ ভালো নেই৷ আপনি হাসতাপালে ছুটে যান৷ সাধারণত, হার্টের অসুখ বা ব্রেন স্ট্রোক বা অন্য কিছু৷ কিন্তু আজ ভিন্ন কিছু ঘটেছে৷''

‘‘আমার পরিবারের একজনের ওপর হামলা হয়েছে৷ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, আঘাতের বিষয়টি নিয়ে হলিউড অ্যাকশন মুভির মতো সরাসরি খবর প্রচার করছে৷ আমার নিউজফিড ভেসে যাচ্ছে নানা প্রতিক্রিয়া, ভাবনা ও দোয়ায়৷''

তিনি কোনো অভিযোগ করেননি৷ কিন্তু ফুটিয়ে তুলেছেন হাসপাতালে নেয়ার চিত্র৷ মিডিয়া স্পট থেকে যেমনটি করে তখন প্রচারের প্রতিযোগিতা চালাচ্ছিল, তা অনেকেরই কাছে দৃষ্টিকটু ঠেকেছে৷

ছাত্রদের মধ্যে যারা সঙ্গে ছিলেন, তারা টিভি বা পত্রিকার আলোকচিত্রীদের ক্যামেরা সরিয়ে নেবার অনুরোধ করছিলেন৷ এ রকম ঘটনা প্রথম নয়৷ খবর প্রচারের প্রতিযোগিতায় দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়াটা ঠিক ঘটনা ঘটার মুহূর্তে অনেক সময়ই কঠিন হয়ে পড়ে৷ কিন্তু এ থেকে বেরিয়ে আসাটা জরুরি৷ তবে এ-ও ঠিক গণমাধ্যমের প্রচারণার কারণেই এত দ্রুত খবরটি ছড়িয়েছে৷ কর্তৃপক্ষ তড়িৎ সিদ্ধান্তও নিতে পেরেছেন৷ তাছাড়া গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণেই প্রশাসনও বিষয়টি ভালোভাবে তলিয়ে দেখার একটা চাপ অনুভব করে৷

নুহাশের প্রতিক্রিয়ার দ্বিতীয় অংশটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে অনেকের কাছে৷ তিনি লিখেছেন, ‘‘দেখুন, আমি শুধু চাই আমার চারপাশের মানুষগুলো এই দেশে নিরাপদে থাকুক৷ কিন্তু, বাস্তবতা সে কথা বলছে না৷ আমার জন্য এটা রাজনৈতিক, নৈতিক বা আদর্শিক বিষয় নয়৷ আমার কাছে এটা পারিবারিক বিষয়৷ আর আমি এটা বলতে পারি যে, আমার পরিবার অত্যন্ত শক্ত এবং অবিশ্বাস্য রকমের দৃঢ়৷ এবং সামনে যা-ই আসুক না কেন, যন্ত্রণা বা সংঘাত বা মৃত্যু, আমার পরিবার সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধ রাখবে না৷ লিখে রাখতে পারেন৷'' অত্যন্ত সুদৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন তিনি৷

হামলার ঘটনার পর অধ্যাপক জাফর ইকবাল বা তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হকের প্রতিক্রিয়াও উদাহরণ তৈরি করেছে৷ কতটা মানবিক হলে একজন মানুষ তাঁর ওপর হামলাকারীর খোঁজ খবর নিতে পারেন, ছুরির আঘাতে মাথা থেকে রক্ত পড়ার সময়ও ছাত্রদের শান্ত থাকতে বলতে পারেন, হামলাকারীর খোঁজ-খবর নিতে পারেন, ছাত্রদের অনুরোধ করতে পারেন হামলাকারীকে যেন মারধর না করে৷

জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমিন হকও গণমাধ্যমের সামনে যা বলেছেন, তা প্রশংসনীয়৷ তিনি বলেছেন, ‘‘জাফর ইকবাল ক্যাম্পাসে ফিরে যাবেন৷ তাঁর পাঁচটা কোর্স আছে৷'' একটি দম্পতি পেশাগত দায়িত্বে কতটা নিবেদিত এমন সময়েও এ কথা বলতে পারে!

ঘটনার জন্য তিনি কাউকে দোষারোপ করতেও রাজি নন ইয়াসমিন হক৷ বারবারই বলছিলেন, পুলিশ সবসময়ই পাহারা দিয়েছে৷ বরং জাফর ইকবালই মাঝে মাঝে বিরক্ত হতেন, এতটা নিরাপত্তা কেন দেয়া হচ্ছে৷ তাঁর কণ্ঠে উদ্বেগ ছিল না, ছিল না অনুযোগ বা অভিযোগের সুর৷ বরং পুরো পরিবারটিরই বিপর্যয়ের সময়ও শান্ত থেকে লড়ে যাবার মানসিকতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে, যা সত্যিই অনুসরণীয়৷

যুবায়ের আহমেদ, ডয়চে ভেলে

০৬ মার্চ, ২০১৮ ২৩:৩৪:২০