সহজ শর্তে নরক লাভের পাঁচালি
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
নরকে আপনার উপস্থিতিকে সবার আগে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারে সেটি সম্পর্কে আপনি চিন্তাভাবনা করলে রীতিমতো অবাক না হয়ে পারবেন না। আপনার একটি মনোবৃত্তি কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি যা কিনা হতে পারে আপনার সহজাত নির্বুদ্ধিতা কিংবা অজ্ঞতা; অথবা নিতান্ত অহংবোধ কিংবা উদাসীনতার কারণেও আপনি এমনটি করতে পারেন। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুরও যে আপনার নরকযাত্রার টিকিটটিকে ৫০% নিশ্চিত করে আপনাকে নরকপুরগামী নরক এক্সপ্রেসের প্রথম শ্রেণির যাত্রীর পর্যায়ে উন্নীত করে তুলতে পারে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলার আগে নরক সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলে নিই।

নরক শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ যদিও ‘হেল’ তথাপি দুনিয়াব্যাপী এটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছে জাহান্নাম হিসেবে। ইহলোক অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় মানুষের মন্দ কর্মের জন্য পরলোকে অর্থাৎ মৃত্যুর পর যে শাস্তির বিধান বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে তা কার্যকরের স্থানের নামই নরক। বিশ্বাসীদের মতে, নরক হলো সেই স্থান যেখানে কিছু পাপীকে শাস্তিদানের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করা হয় পুরস্কার প্রদান করার জন্য। অন্যদিকে বেশির ভাগ পাপীকে অনাদিকাল ধরে অনন্ত শাস্তি ভোগ করে নরকের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে পারলৌকিক জীবন অতিবাহিত করতে হয়। তুলনামূলক ধর্মের বিশেষজ্ঞরা নরককে মোটামুটি দুটি পর্বে বিভক্ত করেছেন। প্রথমটি হলো জীবৎকালের নরকযন্ত্রণা যা মূলত মানুষকে পরলোকে নরকযন্ত্রণার ব্যাপারে সতর্ক করে তাকে পরিশুদ্ধ হওয়ার জন্য প্রকৃতির পক্ষ থেকে একটি সুযোগ বলে বিবেচিত হয়। দ্বিতীয় পর্ব কেবল তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা প্রথম পর্বের নরকযন্ত্রণা থেকে বাঁচার কোনো চেষ্টাই করেন না কিংবা নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা বাদ দিয়ে নরকযন্ত্রণাকে নিয়তি বলে প্রচার করেন এবং বিধাতাকে সবকিছুর জন্য দায়ী করে হররোজ গালাগাল দিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেন।

তুলনামূলক ধর্মের (কমপারেটিভ রিলিজিয়ন) বিশ্লেষকদের উল্লিখিত মতামতের সঙ্গে অবশ্য ধর্মগুরুরা কিঞ্চিৎ মতভেদ করেন। তাদের মতে, নরক বিষয়টিই মূলত পারলৌকিক। অর্থাৎ মৃত্যুর পরই কেবল নরকযন্ত্রণার কথা কল্পনা করা যেতে পারে। কারণ নরকের শাস্তির ভয়াবহতা এবং বীভৎসতা এত বেশি ও ব্যাপক যে দুনিয়ার মানুষের মন-মস্তিষ্ক তা যেমন কল্পনা করতে পারে না তেমন পৃথিবীর আলো-বাতাস, আগুন, শরীর এবং আবহাওয়া নরকযন্ত্রণার জন্য উপযুক্ত নয়। ধর্মগুরুরা পরলোকের নরককে দুটি পর্বে ভাগ করেছেন। একটি হলো অস্থায়ী নরক যেখানে তুলনামূলক কম পাপীদের প্রবেশ করানো হবে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা ভোগের পর তাদের তাদের  শুভকর্মের প্রতিদান স্বরূপ স্বর্গে স্থানান্তর করা হবে। দ্বিতীয় পর্বের নরকের কয়েদিরা হবে ক্ষমার অযোগ্য সব অপরাধের দায়ে দায়ী দাগি আসামি, যারা অনন্তকাল ধরে নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে।

নরক সম্পর্কে উল্লিখিত সাদামাটা আলোচনার পর আমরা শিরোনাম প্রসঙ্গে চলে যাব। আপনার যে বদ আমলটি আপনাকে প্রতিনিয়ত নরকের পথে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাবে তা হলো, নরকে না যাওয়ার ব্যাপারে আপনার সন্দেহাতীত আত্মবিশ্বাস। সাধারণত যারা কখনই মৃত্যুর কথা চিন্তা করে না কিংবা মৃত্যুভয়ে ভীত নয় তারাই নরক সম্পর্কে বেখবর হয়ে পড়ে। নাস্তিক হওয়ার কারণে যেমন আপনি মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে উদাসীন হতে পারেন তেমন আস্তিক হওয়ার পরও আপনার আচরণ নাস্তিকের মতো হয়ে যেতে পারে। পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস মদ-মত্ত ক্ষমতা, সুস্বাস্থ্য এবং বাধাহীন অনৈতিক জীবনযাপনের অবারিত সুযোগ মানুষকে সাধারণত মৃত্যুর কথা ভুলিয়ে দেয়। এ ছাড়া মানুষের অতিরিক্ত ধর্ম-কর্ম, দান-খয়রাত, অন্যান্য শুভকর্ম এবং স্বর্গপ্রাপ্তির আত্মবিশ্বাস তাকে নরকের যাত্রী বানিয়ে ফেলতে পারে। এ ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

ধরুন আপনি পুণ্যলাভের জন্য মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ইত্যাদি উপাসনালয় নির্মাণ করলেন। সাধ্যমতো দরিদ্র আত্মীয়স্বজন ও অভাবী মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করলেন এবং আপন ধর্মমতে ইবাদত-বন্দেগি করলেন। ভালো মানুষ হিসেবে চারদিকে আপনার ধন্য ধন্য রব পড়ে গেল। আপনি স্বর্গলাভের ব্যাপারে অতিরিক্ত আশাবাদী হতে গিয়ে একবারও মনে করতে চাইলেন না যে, আপনার উপার্জিত অর্থের বিরাট অংশই হারাম। অথবা আপনার সব শুভকর্ম কেবল লোক দেখানো এবং মহলবিশেষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। আপনি ভালো কাজ করেন এই আশায় যে, লোকজন আপনাকে ভালো বলুক এবং পৃথিবীতে আপনার কর্ম অমর হয়ে যাক। অতিমানবতার জন্য আপনার অন্তর যদি না কাঁদে এবং কোনো শুভকর্মের পেছনে যদি কেবল বিধাতাকে খুশি করার প্রবণতা না থাকে তবে আপনার দাতব্যকর্ম আপনার চরিত্রে এমন একটি তকমা লাগিয়ে দেবে যাকে ইসলামের পরিভাষায় বলা হয় রিয়া এবং ইসলাম ধর্মমতে রিয়াকারীরা স্বর্গ বা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না।

রিয়া হলো মানব মনমানসিকতা এবং চরিত্রের একটি জটিল ও দুর্বোধ্য অধ্যায়। মানুষ যখন এই অধ্যায়ে প্রবেশ করে তখন সে নিজেকে নিজে চিনতে পারে না। তার চালচলন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ ইত্যাদিতে প্রচণ্ড অসংলগ্নতা দেখা দেয়। সে ক্ষণে হাসে আবার ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে ওঠে। কখনো অপব্যয়ে মেতে ওঠে আবার কখনো প্রচণ্ড কৃপণতা আরম্ভ করে। কোনো কর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা রিয়াকারীর পক্ষে সম্ভব হয় না। আজ যাকে সে আদর-যত্ন করল, কাল হয়তো তাকেই অযত্ন ও অবহেলা শুরু করবে। অন্যদিকে, আজ যাকে ঘৃণা করছে কাল হয়তো তাকেই আবার কোলে তুলে নাচানাচি শুরু করবে। রিয়াকারীরা সাধারণত দাম্ভিক ও কথায় কথায় তর্ক সৃষ্টিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে। অন্যকে ছোট করা, মানুষের মনে আঘাত দেওয়া এবং নিজেকে খুব বড় নতুবা হীনমন্য মনে করার মাধ্যমে রিয়াকারীরা ধীরে ধীরে নরকের পথে এগোতে থাকে অতীব দক্ষতার সঙ্গে। ভালোমানুষীর আড়ালে ইপ্সিত মন্দ ইচ্ছা বা মন্দ আকাঙ্ক্ষা যেমন আপনাকে নরকের পথে নিয়ে যেতে পারে তেমন ভালোমানুষীর আড়ালে মন্দ কর্ম আপনার নরক গমনকে বেশ সহজসাধ্য করে তুলতে পারে। একজন মন্দ মানুষ দ্বারা জনগণ যত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতির শিকার হয় ভালো বেশধারী মন্দ লোকদের দ্বারা। যাদের লোকজন সাধারণত মুনাফিক, বকধার্মিক, ভণ্ড ইত্যাদি নামে অভিহিত করে। আমাদের দেশের আঞ্চলিক ভাষায় এসব মানুষকে অনেকে মিচকে শয়তান, চোট্টা, ম্যানা শয়তান ইত্যাদি বলে ধিক্কার জানাতে থাকে। ভালো মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মন্দ মানুষেরা তাদের অপকর্ম দ্বারা সাধারণত মানুষ ও বিধাতা উভয়ের হক নষ্ট করে নিজেদের নরক গমনের পথ মসৃণ করে তোলে।

নরক লাভের উল্লিখিত উপায়সমূহ ছাড়াও কিছু প্রকাশ্য কর্ম দ্বারা মানুষ নিজেদের নরকের মেহমান বানিয়ে ফেলে। মিথ্যাচার, অবিচার, অনাচার, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, হত্যা, গুম ইত্যাদি প্রকাশ্য অপরাধ যেমন নরকের পথ প্রশস্ত করে তেমন জিনা, ব্যভিচার, বলাৎকার, অশ্লীলতা ও কুৎসা রটনার দায়ে অভিযুক্ত মানুষ তাদের বদ কর্মসমূহ দ্বারা নিজেদের হাতে-পায়ে নরকের বেড়ি পরিয়ে ফেলে। আমানতের খিয়ানত, বিশ্বাসভঙ্গ, সমাজে অনাসৃষ্টি, অনৈক্য সৃষ্টি এবং অবাধ্য ও উগ্র আচরণ নরকের মেহমানদের অন্যতম অলঙ্কার ও সাজসজ্জা বলে স্বীকৃত। সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে নিজেদের বক্তব্যকে আকর্ষণীয় বানিয়ে যেসব বক্তা লোকজনকে বিভ্রান্ত করে তাদের নরক লাভের সম্ভাবনা সম্ভবত ৫০%-এর চেয়েও কিছুটা বেশি হতে পারে।

অকৃতজ্ঞতা এবং কথায় কথায় অভিশাপ দেওয়ার প্রবণতা আপনাকে নিশ্চিতভাবে নরকের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। অকারণে সন্দেহ পোষণ, সম্মানিত লোককে অসম্মান করা এবং মন্দ কথা প্রচার করা নরকবাসীদের অন্যতম প্রবণতা। কথায় কথায় বাগড়ম্বর করা, সত্য ঘটনা লুকিয়ে রাখা এবং সবকিছু এড়িয়ে চলার প্রবণতার কারণে মানুষের নরকমুখী হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। সমাজ-সংসার, রাষ্ট্র, ময়-মুরব্বি, পিতা-মাতা, নেতা এবং শিক্ষকের অবাধ্যতা নরকী জনগণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গরিব মানুষের বড়লোকী ভাব, ধনীদের কৃপণতা ও দুর্বলদের রাগচণ্ডাল স্বভাব নরকপ্রাপ্তির সম্ভাবনা বৃৃদ্ধি করে। জ্ঞানচর্চা না করা, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যার্জন না করা, মূর্খ হওয়ার প্রতিযোগিতা করা এবং না জেনে কথা বলার অভ্যাস নরক লাভের শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম।

আলোচনার এই পর্যায়ে আপনি নরকযাত্রীদের একটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে নিতে পারেন। কেউ যদি আপনাকে সত্য লোকদের মধ্য থেকে নরকের মেহমানদের খুঁজে বের করতে অনুরোধ করে সে ক্ষেত্রে আপনি খোঁজ করুন সেসব লোক যারা শত বিত্ত-বৈভব, ক্ষমতা ও ভোগবিলাসের মধ্যে থেকেও সারাক্ষণ বিষণ্নতার মধ্যে নিমজ্জিত থাকে। যাদের মনের মধ্যে অকারণে ভয়, সন্দেহ এবং অবিশ্বাস প্রতিনিয়ত নানারকম অস্থিরতা ও অনাসৃষ্টির জন্ম দেয় আপনি তাদের চিহ্নিত করুন। লোকজন যাদের কথায় বিশ্বাস করে না এবং কর্মে আস্থা রাখে না তারা অবশ্যই ভালো মানুষ নয়। নরকের যাত্রীদের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা হররোজ প্রকৃতি দ্বারা নানাভাবে অপদস্থ ও অপমানিত হতে থাকে। ধরুন আপনারা কিছু লোক একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ লক্ষ্য করলেন যে একজন কেতাদুরস্ত লোককে দেখে রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলো অকারণে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। অথবা একটি লোক বার বার নিজের অজান্তে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে পা ডুবিয়ে দেয় অথবা পা পিছলে বার বার ময়লার মধ্যে পড়ে যায়। রাস্তা দিয়ে চলতে ফিরতে যেসব অযাচিত অপমান, দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনার শিকার হয় তাদের প্রকৃতি যে ভালোবাসে না সে ব্যাপারে আপনি অন্তত ৫০% নিশ্চিত হতে পারেন। লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

 

 

 

 

 

 

০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০৬:৫১:৫৪