বিবর্তনের স্রোতে ভাসমান বাঙ্গাঁলী ও বাঙ্গাঁলিয়ানা
ডা: সুবীর দত্তরায়
অ+ অ-প্রিন্ট
বাঙ্গালি বা বাঙ্গালিয়ানা বলতে  একটা আবছা ভাবমূর্তি মানসপটে উদয় হয়। সেই কৌতুহল আমাদের টেনে নিয়ে  যায় কয়েকটি বৈশিষ্টের  দিকে। তার চেহারা কেমন, তার চলন বলন  কেমন,  তার পোষাক পরিচ্ছদ কেমন, তার খাওয়া  দাওয়া  কেমন এবং সাধারনভাবে তার ভাষায় বা তার সামাজিক  রুপে  সাংস্কৃতিক  ছাপ কেমন তার সন্ধানে মন নিয়োজিত হতে  থাকে। কিন্তু এই  ধরনের  সাধারন চিত্রায়নের অস্পষ্টতা  হচ্ছে এই কারণে যে বাঙ্গাঁলি বলতে  কাকে চিহ্নিত  করা হচ্ছে? যে বাঙলায় কথা বলে সেই বাঙ্গাঁলি, (পশ্চিমবঙ্গ  না  পূর্র্ববঙ্গ বা  বাংলাদেশ কোথায়?) বা সে  প্রবাসী বাঙ্গাঁলী আথবা সে হয়তো অভিবাসী  বাঙ্গাঁলি? কাকে চিহ্নত করা হচ্ছে অনেক ভারতীয় জন্মসূত্রে  বাঙ্গাঁলি হোয়েও সাংস্কৃতিক বিচারে তারা পৃথক ধরনের মানুষ এবং  অনেকে বাংলা ভালভাবে  বলতেই পারে না। সংস্কৃতি বা ভাষা একটা প্রবহমান  ক্রমবির্র্ত্তনশীল  বিষয় যাকে একটা সময়  বা পর্র্বেও গন্ডিতে নির্দিষ্ট না করলে তার চিত্রায়ন অসম্পূর্ন বা সেকেলে  বলে মনে  হতে পারে। বিশেষত মনে রাখা দরকার যে আমরা ক্রমশ: এক গ্লোবালাইজেশনের যুগে ডিজিটালাইজড যুুগে বসবাস করছি, যেখানেই মানুষের জাতি সত্তাও বদলে যাচ্ছে বহুবার বহু  দেশবিদেশে  বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই তার নাগরিকতা  বা প্রাদেশিকতা বা ভাষার প্রাথমিকতা সবই অদল বদল  হয়ে যাচ্ছে  বারে বারে। অনেক নতুন প্রজন্মেও বাঙালি তার বয়স্ক পিতামাতার সময়কার বাঙ্গাঁলি তাকে একইভাবে নাও দেখতে পারে বা এই দুই প্রজন্মের বাঙালির কাছে বাংলা ভাষা বা  বাংলার বাংলা সাংস্কৃতিক  আবেদন অন্য ধরনের প্রাথমিকতা পেতেও পারে। এই সব কারনে আজকের দিনের কোনও লেখকের পক্ষে বাঙ্গাঁলিয়ানাকে বা বাংলা  ভাষা সংস্কৃতিকে চিত্রায়ন করবার সময়  বা মূল্যায়নের সময়  দ্বিধাগ্রস্থবোধ করতেই  হয়। আজকালকার চোখে দেখা বাঙ্গাঁলিরদের বর্র্ণনায়  তবুু কিছু  সারল্যকরনের  চেষ্টা করা যাক।

প্রথম নিবেদন হচ্ছে আমরা বাঙ্গালিরা খুববেশীদিনের চিহ্নিত মানুষ নই।  সুনীতি চট্টোপধ্যায়ের   মতে দশম শতাব্দীতে যে Spech  Community তৈরী হয় সেই সময় থেকেই বাংলা ভাষাভাষী  গোষ্ঠীর রুপরেখা টানা যায়। সাধারন বিবরনে ১৩শ থেকে ১৮শ শতাব্দীতে ‘অন্ধকার যুুগ’ বলা হয়। সেই সময়  মুসলিম রাজত্বকাল। তবে অন্ধকার কথাটি পূর্ণ সত্য ব্যক্ত করেনা। কিছু উপজাতিয় সংস্কৃতি বৌদ্ধ বা আগেশার নামপন্থী সংস্কৃতি, স্থানীয় উপভাষা, মগধি, সংস্কৃত, পালি ইত্যাদি ভাষার ভেতর দিয়ে একটা অন্তঃসলিলা মিশ্রন চলছিল, যাকে আত্বীকরন (ধপঁষঃধৎফরড়হ) বলে। এই মিশ্র সংস্কৃতির পর্বেই চৈতন্যদেবের এবং কবি জয়দেবের আবির্ভাব হয়, সৃষ্টি হয় বাংলার কৃষধামালি, মুরশিদি গানে, খাটুগানে ও পরে দেখতে পাই আলাওল কবিকো মনে রাখা দরকার, মুসলিম রাজত্বকালেই (১৭১৭-১৭২৭) এর মধ্যে রাজধানি স্থানন্তরিত হয় ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে এবং পরের আমলে বঙ্গঁসংস্কৃতির পাঠস্থান হয় কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক। সিরাজুদ্দোলার পরাজয়ের পর শুরু হয় ইংরেজের অনুপ্রবেশ এবং বাংলার নবজাগরন বা রেনেসাঁ। এই রেনেসাঁর কালে তিনটি সংস্থার ভুমিকা স্মরন করা দরকার। ১৮০০ সালে শ্রীরামপুরে প্রিন্টিং প্রেস প্রতিষ্ঠা, ফোর্ট উইলিয়াম প্রতিষ্ঠা ও প্রেসিডেন্সি কলেজ প্রতিষ্ঠা। এই ইতিহাস স্মরনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাঙ্গঁলি স¤্রদায়কে কবে কোথায় ও কারা সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছিল, সে বিষয়ে একটা ধারনা থাকা দরকার।

পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গেঁর নানা মানুষ জনের সমবেত প্রচেষ্টাতেই এই বিস্ময়কর বাঙালি ও বঙ্গঁসংস্কৃতির উদ্ভব হয় মাত্র ছয় সাতশো বছরের মধ্যেই। এই পর্য্যায়ের পর গ্রাম্য সালালের ঘরে দুলাল জাতিও ভাষা থেকে এবং সংস্কৃত ধৈর্য্য শুদ্ধ বাংলা থেকে আমরা কথ্য বাংলা ভাষা সাহিত্যের দরবারে, পৌঁছে যাই মাত্র দেড়শ বছরের মধ্যেই। স্মরন করুন বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম চন্দ্র, শরৎ চন্দ্র ও অবশ্যই নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবীন্দ্রনাথ থেকে তাঁর গীতাঞ্জলি পর্ব থেকে শেষের কবিতার ভাষা সৃষ্টিকে। এবং কল্লোল কাথি কলম, সবুজ পত্র ইত্যাদিও মাধ্যমে আধুনিক বাঙালি ও বাংলা ভাষার পরিবর্তনকে চিনতে পারা সহজবোধ্য হয়ে আসে। আমরা যেন উপরোক্ত মানুষ গুলোর যাদুর কাঠির স্পর্শে একশো বছরের মধ্যেই প্রায় দুশো বছরের যাত্রা পেরিয়ে গিয়েছিলাম। আজ বাংলা ভাষা যে পৃথিবীর চতুর্থ (বা অনেকের মতে পঞ্চম) বৃহত্তম ভাষা ও তথ্য ও শব্দ সম্ভাওে পূর্ণ এই ভাষাটির গৌরবে উভয় বাংলার মানুষজনেরই যৌথ উত্তরাধিকার।

পশ্চিম বঙ্গেঁ বাংলা ভাষা ২০টি ভারতীয় ভাষার মধ্যে একটি ভাষা হোল বাংলা দেশে এটি জাতীয় ভাষা। এককালে আরাকানের নবাবের প্রশয়েই বাংলা ভাষা গোপনে সযত্নে লালিত হয়ে জাতীয় ভাষা রুপে পরে ফিরে আসে। বাংলাদেশ বাংলাভাষার পূর্নঅভ্যুস্থানের জন্য বিশেষ দাবী রাখতেই পারে।

এবারে বিশেষ সবুজ সজল পরিবেশে লালিত বাঙ্গালি বা বাংলাভাষি এই পরিচয়ের মধ্যেও কত জটিলতা লুকিয়ে আছে সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যাক। যে ভাষাগত সরলীকরনে আমরা বহুকাল অভ্যস্থ ছিলাম সেটা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গঁ ভাষা এবং পূর্ববঙ্গীয় বাঙ্গাঁল ভাষা। কিন্তু এই দুই অঞ্চলের ভাষাতেও কোনও নির্দিষ্ট মানদন্ড বা (standard)  আছে কি? যেমন আগে বলা হতো অক্সফোর্ডের কথ্য ভাষাটাই ইংরেজী ভাষার সর্ব স্বীকৃত standard রুপ। রাজধানী কলকাতা ভিত্তিক বাংলাভাষা কিন্ত standard বাংলাভাষা নয় এবং কথায় দেখিনে ভাষার (দক্ষিন বাংলার কথ্য ভাষা) মিশেল থাকা ও সর্বগ্রহ্য নয়। মেদিনীপুর ও উড়িষ্যার সীমান্ত অঞ্চলে যে কথ্যভাষা গুলো আছে বা পুর্নিয়ায়, মেথিনী ভাষার যে মিশ্র কথ্যভাষা প্রচলিত আছে সেগুলির অনেকাংশই Dialect (আঞ্চলিক উপভাষা) বলে অভিহিত হবে। Dialect এর উদাহরন আরও বাড়ানো যায়। কিছু লোক বলেন কেষ্ঠনগরী কথ্য ভাষাই নাকি standard বাংলা ভাষা। এই প্রসঙ্গেঁর আলোচনা পূর্ববাংলার (বাংলাদেশের) বহু স্থানীয় কথ্য ভাষার সম্বন্ধেও প্রবেস। যেমন ঢাকা ময়মনসিংহ, সিলেট বা বরিশালের কথ্যভাষা স্থানীয় কথা সাহিত্যে standard বাঙ্গাঁলি ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়নি। পশ্চিম বঙ্গেঁও দেশভাগ উদ্বাস্ত অনুপ্রবেশ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের লোকজনের ক্রমাগত আসা যাওয়ার ফলে বাঙ্গাঁল ভাষাও আজকাল তেমন অপরিচিত নয়। বরং পশ্চিমবঙ্গেঁর সাহিত্য পত্রিকাগুলিতে, নাটকে, ফিল্মগুলিতে (বাঙ্গাঁল ভাষা) এখন নিত্য ব্যাবহৃত কৌতুকপ্রদ এবং উপভোগ্য হয়ে উঠেছে যদিও বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলাভাষায় লেখা পত্রপত্রিকা বা সাহিত্য নাটকে যে ভাষা চালু রয়েছে সেটা পশ্চিম বঙ্গেঁ প্রচলিত ভাষার সঙ্গেঁ সহজভাবে তুলনী। 

এই সমতার প্রবাহ আরও বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা এবং দৈনন্দিন কথা ভাষায় কিছু শব্দ ব্যবহৃত যেগুলি আরবী, এবং উর্দ্দু ঐতিহ্যজাত। যেমন আদাব, পানি, গোসল, নিকা, দাওয়াত, নাস্তা, আম্মা, আব্বু, খালা, ইনসাআল্লাহ ইত্যাদি শব্দের ব্যাবহার। এমনকি বহুনন্দিত সুফিয়াকামালের একটি ছড়াতেও দেখা যায় এই শব্দের বিন্যাস।

-“শান্তি সাম্য সেবা মৈত্রী ঘটিয়েছে প্রসারিত হাত-

কওমী হেলাল আজ দীনি বুম হুরিয়াত”।

তাছাড়া ‘র’ এবং ‘ড়’ শব্দের বিষম ব্যাবহার এবং কিছু ক্রিয়াপদ যেমন ‘দিবে’, ‘নিবে’ ইত্যাদির ব্যাবহার পাঠকের চোখে বাধার সৃষ্টি করে। আরও বিস্ময়কর মনে হয় বাংলাদেশে নামকররে ব্যাপারে। কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক- ফারদানা শান্তা বহুল চৌধুরী লিবু, এলিনা মিতা, এনামুল করিম নির্ঝর, সাদাত হোসেন মিন্টু, সহিফুল আলি টুকু ইত্যাদি। এই শব্দ ব্যাবহারের মধ্যে যেন একটা আরবী বা ‘মুসলমানী’ স্বাতন্ত্র রক্ষার চেষ্টা চোখে পড়ে। যেন বলার চেষ্টা হচ্ছে- আমরা প্রথমে ইসলামপন্থী পরে বাঙ্গাঁলী। আর পশ্চিম বঙ্গের ভাষাতে ঘোষিত হচ্ছে- ‘আমরা প্রথমে ভারতীয় পরে বাঙ্গাঁলী। যদিও সে বাঙ্গাঁলী খৃষ্টান, হিন্দু মুসলমান, বৌদ্ধ ইত্যাদি যে কোনও ধর্মাবলম্বী হতে পারে বা ভারতের ভিন প্রাদেশিক মানুষ হোতে পারে। জানিনা বাংলাদেশের এই স্বাতন্ত্র রক্ষার দায় বা ‘চধহ ওংষধসর’ আবেদনের ছত্রছায়া থেকে কোনও দিন সম্পূর্ণভাবে বেরোতে পারবে কিনা বা সেটা সকলের কাম্যও কিনা। এই প্রশ্ন এ জন্যে মনে এল যে বাংলাদেশের সৃষ্টিই হোল ভাষা আন্দোলনের জন্য এক রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। এবং সেখানে বাংলা ভাষাই অবশেষে একমাত্র জাতীয় ভাষা। ইসলামিক রাষ্ট্রের পরিচয় থেকে বাংলাদেশে সেকুলার ডেমোক্রেটিক রাষ্ট্রের (ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ) দিকে রাজনীতির আবহাওয়া পরিবর্ত্তিত হচ্ছে এবং দুই বাংলার ভেতর ভাষাগত এবং সংস্কৃতিগত আদানপ্রদান বেড়েই চলছে। দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সঙ্গীতই বাংলা ভাষায় এবং রবীন্দ্রনাথ রচিত। নজরুল উভয় দেশেই পূজিত। তবে এই প্রসঙ্গেঁ শেষে একটা অনুমান লেখকের মনে থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রচলিত চট্রগ্রামের কথ্য ভাষা বোধহয় কখনই এপার বাংলায় বেধগম্য হবে না। আর একটা  বিষয় সম্বন্ধে উভয় বাংলাতেই সচেতনাতা দরকার। সেটা হচ্ছে চলতি কথ্যভাষায় বা লিখিত ভাষায় হিন্দি শব্দ, আরবী শব্দ, বিশেষ করে ইংরেজী শব্দের ব্যাবহার ক্রমশ: বেড়ে যাচ্ছে। পড়বার সময় দৃষ্টি তেমন ধাক্কা খায় না কারণ বহু ইরেজী, হিন্দি, আরবী শব্দ আমরা দৈনন্দিন জীবনে প্রতিনিয়ত ব্যাবহার করে থাকি কিন্তু মনে থাকেনা যে পুরনো বাংলাভাষা আজ ক্রমশ: এক মিশ্রিত ভাষায় পরিণত হচ্ছে।

সিমান্ত অঞ্চলে যেমন পূর্ণিয়া মিথিলা ইত্যাদির কথ্য ভাষায় কাছাকাছি অঞ্চলের বেশঅন্যর টান থাকে।

তবে উভয় বাংলায় লিখিত ভাষায় সংস্কৃত ঘেঁষা শুদ্ধ বাংলার চেয়ে সহজ কথ্য বাংলাভাষার প্রচলন ক্রমেই বাড়ছে। 

সাধারণ বাঙ্গাঁলিদের শারীরিক গঠনে তেমন কোনও বৈশিষ্ট আছে বরে মনে হয় না। বংশগতভাবে (Geneticaly)  নানা জাতের কোষ বাহিত পরম্পরায় এই দুই দেশেই সর্বপ্রকারের চেহারা দেখতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন- “ শক্ হুন দল পঠান মোগল এক দেহে হোল লীন।

তার সাথে যোগ করা যায়- আর্য অনার্য্য আদিবাসী মঙ্গোঁলিয়ান, নিগ্রোয়েডধাচের মানুষ যারা, সব অঞ্চলেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদা কালেঅ বাদামী কোনও রংয়ের মানুষরই অভাব নেই। অর্থাৎ বাঙ্গঁলিরা এমন এক মিশ্রিত জাতি যার কোনও .............. শারীরিক বাচাঁ নেই, যেমন আছে চীনে জাপানী নেপালিদের।

ক্রমশ: উভয় বাংলাদেশীয়দের মধ্যে সাজপোশাকের মধ্যেও তেমন পার্থক্য নেই। বাড়ীতে বা পড়ায় ধুতি, লুঙ্গি ফতুয়া পাঞ্জাবী কুর্ত্তা পাজামা এবং মহিলাদের মধ্যে শাড়ি সালোয়ার কামিজ এর চল প্রায় একই প্রকারের। শুধু স্কুল কলেজ বা ইউনিভার্সিটি ও কাজের জায়গার সার্ট প্যান্ট। জিন্স অতবা মহিলাদের লম্বা কুর্ত্তা ফ্রক জাতীয় ডেস ইত্যাদি প্রায় রোজকার পরিধানে পরিনত গোয়েছে। পশ্চিম বঙ্গেঁ বিশেষ বিশেষ সামাজিক আনুষ্ঠানিক কাজকর্মের সময় গিলেকরা পাঞ্জাবী, কোঁচকানো ধূতির প্রচলন এখনও আছে , যদিও প্রবাসী বাঙ্গাঁলি বা অভিবাসী বাঙ্গাঁলিরা সেই ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানেও কোনও পোষাকি গতানুগতিকতা ব্যাবহার করেন না অধিকাংশ সময়ে। দুই বাংলাদেশেই শিরস্ত্রান ও কাঁধের উপর চাদরের ব্যাবহার প্রায় উঠেই গেছে। নামাজের সময় মাথায় সাদা ছোট টুপির ব্যাবহার বোরখা হিজাবের ব্যাবহার এখনও আছে যেমন আছে পৈতে সিদুঁর নোয়াবালার ব্যাবহার।

একটা বৈচিত্র আজকাল প্রবাসী বা অভিবাসী বাঙ্গালিদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে যে সব রকম উৎসবেই এমন কি কিছু কিছু ধার্মিক অনুষ্ঠানগুলোলোতেও যেমন দূর্গা পূজো স্বরস্বতী পূজো দীপাবলি, হোলি, ঈদ ইত্যাদিতেও সব ধর্মের বা জাতের লোক একসাথে যোগ দিচ্ছে। একবার কাডাতে বেড়াতে গিয়ে একটা মজাদার স্লোগান পড়লাম“ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার।” অথর্ধাৎ যে কোনও উৎসবে নববর্ষ বা পচিঁশে বৈশাখ বা সঙ্গীত, কলা, নাটক, যাত্রা ললিত কলা ইত্যাদি নানা সার্বজনিক অনুষ্ঠানে একসাঙ্গেঁ সব ধর্মের সর্বশ্যেণীর বাঙ্গাঁলিদের যোগদান এখন বহুল প্রচলিত ঘটনা। তবে এখানে একটা বিশেষ মন্তব্য রাখা দরকার নূতন প্রজন্মের মানুষ ...ল সম্বন্ধে। বিশেষ করে প্রবাসী বাঙ্গালি ও অভিবাসী বাঙ্গলি ছেলেমেয়েরা যারা গান নাটক আবৃত্তি ইত্যাদি বাচ্কি অনুষ্ঠানে যোগদানও করে তারা অনেকেই বাংলা জানে না অর্থাত্ পড়তে জানে না।

তারা অনেক সময় পাঠংশ (Script)  বা গানের কথা ইরেজি বা হিন্দি ভাষাতে লিখে নেয় ও মুখস্ত করে নেয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আগে ভাগে। বাড়ীতে অনেক প্রবাসী বা অভিবাসীদের ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্ত্তা বলেন ইরেজিতে বা হিন্দিতে।

পরিশেষে প্রবাসী বাঙ্গাঁলি ও অভিবাসী বাঙ্গালিদের কয়েকটি সমস্যা সম্বন্ধে বলা দরকার। প্রথমত: বিরাট সংখ্যার বাঙ্গলি পুরুষ ও মহিলারা আজকাল অন্য দেশের অন্য জাতির বা অন্য ভাষার অন্য ধর্মের পুরুষ মহিলাদের সঙ্গেঁ বিবাহিত হচ্ছেন। এই ধরনের মিশ্র বিবাহের ফলে তাঁদের স্বল্পকালের আহরিত এই পারম্পরিক ও সামাজিক যোগাযোগে বাংলা ভাষার ব্যাবহার কমে আসএছ। ইংরেজি ও হিন্দির ব্যাবহার বাড়ছে। এদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছিন্নতার (Divorce)  সংখ্যাও বেশ বাড়ছে। সন্তানদের প্রতি পালন করা ও তাদের দৈনন্দিন অভ্যাস রচনায়, খাওয়া দাওয়ার প্রকরণে ও সামাজিক আদান প্রদানের ষ্টাইল ও ট্র্যাডিশনগুলো বদলে যাচ্ছে।

স্কুলে কলেজের পাঠ্যক্রমে পিতামাতার অংশগ্রহণ আজকাল ক্ষীয়মান। অনেক সময় শিক্ষক শিক্ষিকাদের অনুমোদিতও নয়। ব্যাক্তি স্বাধীনতার অবাধ বিস্তারে সরকারি সহায়তাও সহজলভ্য। ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশায় এবং যৌন সংযোগের সুযোগসুবিধা উপলব্ধ হওয়ার ফলেও ঘরে বাইরে নান সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

যৌথ পরিবার প্রথা ক্রমশ: অবলুব্দ হতে চলেছে। শ্রদ্ধা প্রদার্পণ বা ভালবাসা প্রদর্শেণের কায়দাও বদলে যাচ্ছে।

স্ত্রী শিক্ষার প্রচলনে এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর যৌথভাবে কর্মোদ্যমে যোগদানের ফলে আর্থিক স্বাচ্ছল্য হয়তো বাড়ছে কিন্তু পরিবারের লোকজনের মধ্যে বা বাঙ্গাঁলি / স্বজাতিয় প্রতিবেশীদের সঙ্গেঁ  (অনেক সময় স্বল্প পরিচিত) সাক্ষাত আলাপচারিতা তেমন হচ্ছে না। শহুরে জীবনে এটা যে শুধু বাঙ্গালি পরিবারগুলিতেই ঘটছে এমন নয়। তবে যৌথ পরিবার ভেঙ্গেঁ যাচ্ছে, নিকট আত্মীয়তার বন্ধনগুলি ছিন্ন হোয়ে আসছে এবং বয়স্ক মানুষজন ক্রমশ: একাকীত্বে ভুগছেন। এই বিবর্ত্তনটি নিয়ে বাঙ্গাঁলিদের হতাশ্বাস ফেলতে দেখি প্রাসই। বিশেষত: প্রবাসী ও অভিবাসী বাঙ্গালি পরিবারগুলিতে এই অশুভ ছায়া যে বিস্তার লাভ করছে এটা সহজেই লক্ষনীয়। এই কারনেও প্রবাসী ও অভিবাসী বাঙ্গালি জীবন ক্রমশ:ই বিদেশীদের মত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।

একদিকে যেমন অনেক বাঙ্গালিই সংরক্ষণশীলতা বা অর্থহীন আচার বিচার বোধের গ-ী থেকে বেরিয়ে আসছেন। পাঁজি পুরোহিত, মৌলভি হাকিম পরিচালিত জীবন থেকে এখন অনেকেই মুক্ত হোয়ে আসছেন কিন্তু ভোগবাদি বাঙ্গালি, প্রতিযোগিতায় দৌড়তে থাকা বাঙ্গালি তার সহজ মানবিকতাবোধ বা মমত্ববোধগুলি যেন না হারিয়ে ফেলে। সেটার দিকে লক্ষ রাখতে হবে।

একটা স্বীকৃত সত্য (নানা সমীক্ষার ফলশ্রুতি) যে আজ দেশে বিদেশে বাঙ্গালির ক্রম বর্দ্ধমান উন্নতি লক্ষ করা যাচ্ছে। নানা ক্ষেত্রে বিশেষত: সায়েন্স, টেকনলজি, সাহিত্য সঙ্গীত নাটক, ললিতকলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে। নানা দেশে পত্র পত্রিকায় টেলিভিশনে বাঙ্গালির উপস্থিতি এখন আর তত বিস্ময়কর মনে হয় না। আবার বিদেশে কিছু এশিয় ছাত্র ছাত্রীদের সঙ্গেঁ বাঙ্গালি ছাত্রছাত্রীদের থেকে এগিয়ে রয়েছে। এটা উভয় বাংলার বাঙ্গালিদের একটা গৌরবের ব্যাপার। কিন্তু বাঙ্গালিরা তার বিশ্ব বিখ্যাত রন্ধন কৌশল ভুলে যাবে, বিশ্ব নাগরিকতার আকর্ষনে এটা যেন একেবারেই মানা যায় না। ঠিক তেমনি বাঙ্গালি বিশেষ করে প্রবাসী ও অভিবাসী বাঙ্গালিগন গাইবে না(অনেক সময় সমবেত কণ্ঠে), এমন অশুভ চিন্তাকে মনে ঠাঁই দিতে চাই না।

প্রবাসী বাঙ্গালিদের সম্বন্ধে কিছু কটুকথা প্রচলিত আছে। বাঙ্গালিরা নাকি ‘......’ অর্থাৎ গোষ্ঠিবদ্ধভাবে থাকতে ভাবে থাকতে চায় এবং অন্য ভাষাভাষিদের উদ্দেশ্য করে নিজেদের মধ্যে বাংলায় কথাবার্ত্তা বলে। জীবনের বেশী অংশ প্রবাসী বাঙ্গালি হিসেবে কাটাবার পর এবং বিদেশের বেশীরভাগ অঞ্চলে বহু সময় ক্ষেপনের পর একথা নির্দ্ধিধায় বলতে পারি ঐ দুই দুর্বলতা অন্য সমস্ত দেশী বিদেশী ভাষিদের মধ্যেও একই পরিমানে বর্তমান বা বিদ্যমান। তবে এ কথা ঠিক যে অনেক অবাঙ্গালিরা উভয় বাংলার শহুরে অঞ্চলে কিছুকাল বসবাস করার পর যত সহজে স্থানীয় বাংলাভাষায় কথাবার্ত্তা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যান, বাঙ্গালিরা তেমন সহজে স্থানীয় অন্য ভাষা শিখে উঠতে পারে না। বহু প্রবাসী বাঙ্গালিরা দীর্ঘকাল প্রবাসে বসবাসের পরেও ঠিকমত হিন্দি বা ইরেজি বলতে পারে না। কিন্তু আতিথেয়তার ব্যাপারে বাঙ্গালিরা “বসুধৈব কুটুম্বসম” এই মন্ত্রে দীক্ষিত।

স্বাভাবিক বন্ধুত্ববোধ বা মানবিকতা বোধ এখনও দুই বাংলাতেই দৃশ্যমান এবং প্রবাসে বা বিদেশে অভিবাসী বাঙ্গালিরা এখনও অন্য ভাষাভাষিদের তুলনায় প্রর্থিত প্রতিবেশী বা বন্ধু হিসেবেগন্য হচ্ছেন।

তবে বিশ্বায়নের ¯্রােতে; বিশ্বনাগরিকতার প্রভাবে ও প্রসারে যে আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্সিত তৈরী হচ্ছে তাতে নূতন প্রজন্মের বাঙ্গালিদের মধ্যে বাঙ্গালিয়ানার মুখ্য উপাদানগুলি সর্বাংশে টিঁকে থাকবে সে কথা হলপ্ করে বলা যাচ্ছে না।

তবে এটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় যে যতদিন বাঙ্গালিরা ঘরে বাংলায় কথা বলবে, বাঙ্গাঁলি খানা রাধবে, সমবেতভাবে বাংলা গান গাইবে এবং বারোমাসে তের পার্বনে সবাইকে নিয়ে উৎসব সৃষ্টি করতে থাকবে ততদিন নূতন প্রজন্মের বাঙ্গলিদেরও নানা উৎসব বাসরে আলাদা করে চেনা যাবে।।

 

৩০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:৫৮:৩৭