আমরা কথা বলবো কবে?
তসলিমা নাসরিন
অ+ অ-প্রিন্ট
সাংবাদিক উৎপল দাস ২ মাস ১০ দিন পর অজ্ঞাত স্থান থেকে ফিরে এসেছেন। তাঁকে অপহরণ করেছিল কে বা কারা, আমরা কেউ জানি না। তাঁকে কোথায় রেখেছিল, কেন রেখেছিল, কিছু জানি না। অন্তর্ধানের পর শহরে ফিরে এসে উৎপল দাস প্রায় কিছুই জানাচ্ছেন না। যা বলছেন, তার সবটুকু সত্য বলে আমার মনে হয় না।  তিনি বলছেন যারা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তাঁদের কাউকে তিনি দেখেননি। হয় তাঁর চোখ বাঁধা ছিল, নয় দরজা জানালা বন্ধ এমন একটি ঘরে তাঁকে বসে থাকতে হয়েছিল। কেউ খাবার দিয়ে যেত দরজার নিচ দিয়ে। এভাবে ২ মাস ১০ দিন উৎপলকে তিন বেলা খাবার খাইয়ে পোষার কার কী দরকার ছিল? কত টাকা পাওয়ার জন্য এভাবে মানুষ মানুষকে পোষে? উৎপল কি খুব ধনী লোক? তিনি কি যত টাকা ওরা চেয়েছিল, দিতে পেরেছিলেন? তাঁকে কি নির্যাতন করা হয়েছিল? কারও নাম-ঠিকানা বলছেন না উৎপল দাস। অনুমান করতে অসুবিধে হয় না যে ভয়ে বলছেন না। ভয় তাঁর সারা শরীরে।

ভেবেছিলাম উৎপল দাসকে মেরে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশে কারও গুম হয়ে যাওয়া, কারও আর ঘরে না ফেরা কোনও অবিশ্বাস্য ঘটনা নয়। বাড়ি থেকে কারও বেরোনো মানে এই নয় যে, বাড়িতে সে নিশ্চিতই ফিরবে। যারা অপহরণ করবে, তারা দাবি মিটলেও মেরে ফেলতে পারে, না মিটলেও পারে। তার ওপর দুর্ঘটনা তো আছেই। ফরহাদ মজহারের অপহরণ নাটক হতে পারে, উৎপল দাসের অপহরণ নাটক নয়। এক সময় আমাকে দু’মাস বাংলাদেশে ঘরবন্দি জীবন কাটাতে হয়েছিল। ভারতে কাটাতে হয়েছিল সাড়ে সাত মাস। আমি জানি বন্দিত্ব কী ভয়ঙ্কর। জেলখানার চেয়েও ভয়ঙ্কর। জেলখানায় মৃত্যু চিন্তা গ্রাস করে না। অপহরণে করে, ধর্মীয় হামলায় করে, রাজনৈতিক শত্রুতায় করে। আমি রাজনীতির কোনও দলের সঙ্গে জড়িত না হয়েও নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছি বার বার, সমাজকে ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে মুক্ত করতে চেয়েছি বলে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়েছি বার বার। অন্তরীণ অবস্থায় যেভাবে ছিলাম, সেভাবে চরম শত্রুকেও চাই না থাকুক। উৎপল দাস কেমন ছিলেন অন্তরীণে, সামান্য হলেও অনুমান করতে পারি। ২ মাস ১০ দিনের একটি মুহূর্তও কি তিনি দুশ্চিন্তামুক্ত ছিলেন, মৃত্যুভয় নিশ্চয়ই তাঁকে ছেড়ে দূরে কোথাও যায়নি।

এই একবিংশ শতাব্দীতে, অকল্পনীয় এক বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে আমরা যখন নতুন সৌর জগতের সন্ধান পাচ্ছি, ২২৫ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার টিকিট করে ফেলেছি, এই আমরাই নিজেদের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিংসে দ্বেষ বন্ধ করতে পারছি না, ঘৃণা পারছি না বন্ধ করতে, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ বন্ধ করতে পারছি না। কাউকে নিরাপত্তা দিতে পারছে না সরকার। যারা অপহৃত হয়েছে, তারা ভয় পাচ্ছে। যারা অপহৃত হয়ে ফিরে এসেছে, তারা ভয় পাচ্ছে। যারা অপহৃত হয়নি এখনো, তারাও ভয় পাচ্ছে কোনও সময় তাদেরও ধরে নিয়ে যেতে পারে কেউ।

খবর বেরিয়েছে, উৎপলের জন্য তার বাবার মোবাইল ফোনে মুক্তিপণ চাওয়ার একটি ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু যারা এই ফোন করেছিল, তারা কেউ যোগাযোগ করেনি। আবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে একটি হাসপাতালে উৎপল আছে জানিয়ে তার চিকিৎসার জন্য টাকাও চাওয়া হয়েছিল একবার। কিন্তু ওই হাসপাতালে পরে উৎপলকে পাওয়া যায়নি। শুনেছি, উৎপল নিখোঁজ হওয়ার কিছু দিন পর একইভাবে উধাও হয়ে যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মুবাশ্বার হাসান সিজার। ৭ই নভেম্বর থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তাঁর। অন্তর্ধান হওয়ার পর যাঁরা ফিরে আসেন, তাঁদের কেউই কোথায় ছিলেন ঠিক কেমন ছিলেন, কাউকে বলেন না। কারা অপহরণ করেছিল, তাও বলেন না। না বলার কারণ তো একটিই, মুখ খুললে মেরে ফেলা হবে— এই হুমকি। পুলিশ কী করে অপরাধীদের সন্ধান পাবে, যদি ভুক্তভোগীরা মুখ না খোলে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা কেন মুখ খুলবে, যদি নিশ্চিতই না হতে পারে এ ব্যাপারে যে, মুখ খুললে কোনও বিপদ হবে না।

উৎপল কিন্তু অপহরণকারীদের হাত থেকে বাঁচেননি। যারা তাঁকে ২ মাসের বেশি সময় আটকে রাখতে পারে, কিন্তু ধরা পড়ে না, তারা ছোটখাটো কোনও গোষ্ঠী নয়। উৎপল তাদের সম্পর্কে পুলিশকে বা মিডিয়াকে সামান্য জানালেই খুন হয়ে যাবেন। এখনও জিম্মি তিনি, প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে। যতদিন বাঁচেন, ততদিন এভাবেই, মুখে কুলুপ এঁটে বাঁচতে হবে।

বলছিলাম নিরাপত্তা ব্যাপারটা সম্ভবত এখন নিতান্তই বিলাসিতা। যে কেউ আমাদের যে কাউকেই যখন খুশি যা খুশি করতে পারে। ধর্ষণ করতে পারে, খুন করতে পারে, অপহরণ করতে পারে। আমাদের সরকার আছে আমাদের দেখভাল করার জন্য, আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সরকার ব্যর্থ নিরাপত্তা দিতে। নারীর তো নিরাপত্তা নেই-ই। নারী আদৌ কোনও নিরাপত্তা অদূর ভবিষ্যতে পাবে বলেও মনে হয় না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নেই। আমিও ছিলাম বাংলাদেশের একজন সংখ্যালঘু। আমার ভিন্ন-মতের কারণেই ছিলাম সংখ্যালঘু। আমারও নিরাপত্তা ছিল না বাংলাদেশে। আমাকে নিরাপত্তা দিতে সরকার চায়নি। তাই দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। আমাদের সরকার নির্লজ্জ, অন্য কোনও সভ্য সরকার হলে লজ্জা পেত। সরকারের কাজ দেশেই নাগরিকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, গুন্ডা-বদমাশদের কাজ দেশ থেকে নাগরিকদের বের করে দেওয়া। সরকার যখন গুন্ডা হয়ে ওঠে, তখন আমরা বোবা হয়ে বসে থাকি। আমি না হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে বোবা বানানোর বিরুদ্ধে লড়ছি। কিন্তু সকলেই তা পারে না।  উৎপল দাস বোবা হয়ে আছেন। ভয়ে বিবর্ণ হয়ে আছেন। এরকম কত মানুষ আচমকা চুপ হয়ে যাচ্ছে। ভায়োলেন্সের ভয়ে জাতিটাই ধীরে ধীরে বোবা হয়ে যাচ্ছে। আমরা কবে কথা বলবো?  লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৯:৫৯:৩১