একটি হৃষ্টপুষ্ট কাউয়ার আত্মকথা
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
একটি হৃষ্টপুষ্ট দেহের মধ্যকার উদাসী মন ও ভগ্ন হৃদয় নিয়ে আজ কাউয়া জাতির আত্মকথা লিখতে বসলাম। সেই অনাদিকাল থেকেই মনুষ্য জাতি কাউয়াদের নানাভাবে অপমান-অপদস্থ করার পরও কোনো দিন আত্মকথা রচনা করার চিন্তা মনের মধ্যে উদয় হয়নি। মানুষ অহরহ আমাদের চোর বলে। বোকা, কুসত ও কর্কশকণ্ঠী বলে গালি দেয়। আমাদের অপয়া এবং খুনি ও ডাকাত পাখি বলে গালাগাল করার পাশাপাশি আমাদের দেখামাত্র অমঙ্গল আশঙ্কায় আঁতকে ওঠে। আমাদের গায়ের রং, মলমূত্র, মাংস, পালক ইত্যাদি সবকিছুতেই বিষ রয়েছে বলে তারা বদনাম রটায়। আমাদের দেখামাত্র তারা লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে এবং হাতের কাছে যা পায় তা ছুড়ে মেরে খিস্তিখেউড়ে মুখ ভেংচিয়ে বলে— এই কাউয়া যা!

মনুষ্য জাতির উল্লিখিত তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও শত মুখের অপপ্রচার সত্ত্বেও মনের ওপর পাষাণ চাপিয়ে রেখেছিলাম। কোনো দিন অভিমান অথবা রাগ করে আমরা মানুষের ক্ষতি করিনি। অথচ ক্ষতি করার বহুশত কায়দা-কানুন আমরা ভালো করেই জানি। আমাদের যারা বোকা বলেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, আমরা কিন্তু তুলনামূলক বিচারে মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। অর্থাৎ আমাদের মাথার ঘিলুর পরিমাণ আনুপাতিকহারে মানুষের চেয়ে অনেক বেশি।

একটি কাউয়ার মাথায় গড়ে ০.২৬ আউন্স ঘিলু বা ব্রেন রয়েছে যা মানবদেহের ওজন আহরিত বিচারে মানব ঘিলুর চেয়ে বেশি। আমাদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি না জেনেই মানুষ হররোজ আমাদের গালি দেয়। তাদের এই দুর্বলতার জন্যই আমরা শুধু কা কা ধ্বনি তুলে নিজেদের বিরক্তি ও প্রতিবাদ প্রকাশ করি। তবুও তাদের আচরণে কোনো দিন মনঃক্ষুণ্ন হইনি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের একজন নামকরা এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ কাউয়া জাতিকে যেভাবে কটাক্ষ করেছেন তাতে আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।

আমার আজকের কাউয়ানামা মূলত সেই রাজনীতিবিদের কথার প্রতিবাদ যিনি তার দলে ঢুকে পড়া সুবিধাবাদী, হারামখোর, মতলববাজ চরিত্রহীনদের স্বরূপ বোঝানোর জন্য কাউয়া শব্দটি ব্যবহার করেছেন। মাননীয় রাজনীতিবিদের সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি কাউয়ারা কোনো দিন আপনার দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী নরাধমদের মতো নয়। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, পৃথিবীতে চল্লিশ প্রজাতির কাউয়া রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকৃতির কাউয়াদের বাস আমেরিকায় যাদের বলা হয় আমেরিকান ক্রো। অন্যদিকে সবচেয়ে ক্ষুদ্রকায় কাউয়ারা থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। বাংলাদেশে সাধারণত দুই জাতের কাউয়া রয়েছে যার একটি হলো দাঁড়কাক এবং অন্যটি পাতিকাক। এবার আপনি আপনার কথিত কাউয়াদের জাতপাত সম্পর্কে একটু খবর নিন। দেখবেন, নরাধমদের কোনো জাতি বা প্রজাতি নেই; নেই কোনো আকার কিংবা আকৃতি। তাদের খাদ্য, পানীয় ও বাসস্থানের কথা শুনলে আপনি ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে পারবেন না।

আপনি যদি আপনার দলের কথিত কাউয়াদের ব্যাপারে খোঁজ নেন তবে দেখবেন যে, তারা সর্বদা অন্যের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান যেমন ছিনিয়ে নেয় তেমনি পরস্ত্রী, পরধন টানতে টানতে আপনার প্রিয় দেশমাতৃকার স্বাধীনতাকে হুমকির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসে। তারা অন্যকে অভুক্ত রেখে নিজেদের উদরপূর্তি করতে অভ্যস্ত। নিরীহ মানুষকে অত্যাচার এবং ক্ষমতাবানদের পদলেহন তাদের বৈশিষ্ট্য। তারা চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই, নেশা, জেনা, ব্যভিচার, ঘুষ-দুর্নীতি, রাহাজানি ইত্যাদি অপকর্মকে একসঙ্গে ককটেল বানিয়ে নিয়মিত পান করার কারণে দুনিয়ার কোনো নীতিকথা, শাসন, শাস্তি এবং নিয়ন্ত্রণ তাদের স্পর্শ করতে পারে না। তাদের স্পর্ধা ভূলোক-দ্যুলোক ছাড়িয়ে সপ্ত আসমান ভেদ করতে চালাচ্ছে। তারা কাউকে ভয় পায় না, কারও কোনো পরোয়া করে না। তাদের পরিবার নেই, নেই কোনো সমাজ বা ধর্মকর্ম। আপন লোভ ও পিপাসার কাছে তারা সবকিছু জলাঞ্জলি দেয় প্রচণ্ড দাম্ভিকতা ও নিষ্ঠুরতার সঙ্গে।

ভুয়া কাউয়াদের বাদ দিয়ে এবার আসল কাউয়া কাহিনী শুনুন। আমরা সব সময় দলবদ্ধ হয়ে চলি। আমাদের দলে কমপক্ষে ১০টি কাউয়া থাকে। কোনো কোনো এলাকাভেদে আমাদের কাউয়া দল বা কাউয়া লীগের সদস্যসংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। আমরা সব সময় দলের নীতি-আদর্শ, নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলি। আমরা কোনোকালে নেতার বিরুদ্ধাচরণ করি না, অবাধ্য হই না এবং বেইমানি করি না। চোগলখোরি, মোনাফেকি, দলীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া আমাদের সংবিধানে নেই। গত ১/১১-এর সময় আপনাদের দলের লোকজন আপনাদের নেত্রীকে জেলে ঢোকানোর জন্য এবং তাকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কারের জন্য যে বেইমানি, চক্রান্ত এবং মোনাফেকি করেছেন তা কাউয়ারা স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। আপনারা তাদের দলে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে কত্ত বড় ভুল করেছেন তা হাড়ে হাড়ে যখন টের পাবেন, তখন হয়তো করার কিছুই থাকবে না।

আমাদের কাউয়া লীগের বা দলের কোনো সদস্য সামান্য শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করলে আমরা জরুরি ভিত্তিতে আদালত বসাই। দলের মুরব্বিরা একটি কাউন্সিল অব জাজ মনোনীত করে দেন। তারপর দীর্ঘ শুনানি, সওয়াল-জওয়াবের মাধ্যমে জুরি বোর্ড সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আসামিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ  গ্রহণে কোনো ত্রুটি রাখা হয় না। বিষয়টি বেশি জটিল এবং জরুরি হলে সাধারণ কাউয়াদের মধ্য থেকে জুরি ও এমিকাস কিউরি মনোনীত করা হয়। চূড়ান্ত বিচারে আসামি যদি দোষী সাব্যস্ত হয় তবে জল্লাদদের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। প্রকৃতির অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে এরূপ সুন্দর ব্যবস্থা নেই। আমাদের দলের জল্লাদ কাউয়াদের কিলিং বার্ডরূপে প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা আখ্যা দিয়ে থাকেন এবং আমাদের বিচারব্যবস্থা, শাসনপ্রণালি, শৃঙ্খলাবোধ ইত্যাদিকে ন্যায়ের মানদণ্ড হিসেবে গবেষকরা মানব জাতির জন্য অনুকরণীয় করার সুপারিশ করেন।

আপনি জেনে অবাক হবেন, কাউয়াদের মধ্যে পারিবারিক সম্প্রীতি, ছোটদের স্নেহ ও মুরব্বিদের সম্মান করার অসাধারণ রীতিনীতি রয়েছে। আমাদের সমাজে স্বামী-স্ত্রীর প্রেম, তাদের কুটুস ফুটুস সম্পর্ক, খুনসুটি ইত্যাদির মোহময় মাধুর্য লাইলি-মজনুর প্রেমকে ছাড়িয়ে যায়। কাউয়া দম্পতি সব সময় একই সঙ্গে থাকে। কাউয়ানির যখন ডিম পাড়ার সময় হয় তখন পরিবারের সবাই মিলে দম্পতির জন্য নতুন বাসা বেঁধে দেয়। সেখানে স্বামী-স্ত্রী মিলে দিবারাত্র খোশগল্প, আহার-নিদ্রা, গান-বাজনা এবং সুখ সঙ্গমে সময় কাটায়। পরিবারের অন্য সদস্যরা মিলে সংশ্লিষ্ট দম্পতির আহারের ব্যবস্থা করে। দম্পতিটির যদি ছেলেমেয়ে থাকে তবে তারা সার্বক্ষণিকভাবে পিতা-মাতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে। আমাদের সমাজে আমরা সর্বদা মুরব্বিদের সম্মান করি এবং দলনেতার হুকুমকে শিরোধার্য মান্য করি। কাউয়ারা কোনো দিন নিজেদের মধ্যে মারামারি করে না। পেঁচা, শকুন, বাদুড় প্রভৃতি পাখির সঙ্গে আমরা এলাকার দখল নিয়ে মাঝেমধ্যে যুদ্ধ করি। আমরা কোনো পেঁচা বিশেষ করে হুতুম পেঁচাকে দুই চক্ষে দেখতে পারি না। আমরা সর্বভুক প্রাণী তবে মরে গেলেও নিজেদের মাংস খাই না। আমরা কোনো জীবিত প্রাণীকে সাধারণত শিকার করি না এবং কোনো  প্রাণীর রক্ত খাই না। আমাদের দলের কেউ মারা গেলে আমরা মৃত কাউয়ার দাফন-কাফনের আগে বেশ আয়োজন করে মাতম শুরু করি। মৃত কাউয়ার পরিবারকে সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাদ্য পরিবেশন করি। আমরা বেশ গুরুগম্ভীর পরিবেশে এবং সম্মানজনকভাবে মৃতের সৎকার সম্পন্ন করি।

প্রকৃতির কাউয়া বাদ দিয়ে এবার নরাধম কাউয়ার জাত নিয়ে কিছু বলি। এরা যে পাত্রে খায় সেই পাত্র ছিদ্র করে এবং খুব বেশি খানাপিনা হলে মনের আনন্দে খাদ্যের পাত্রে পেশাব করে। তারা সাধুবেশে প্রণতি দিতে দিতে কপালে কালো দাগ বানিয়ে ফেলে এবং নিজেদের ফেরেশতা সাজানোর জন্য যথারীতি কলাকৌশল প্রয়োগ করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। তারপর অত্যন্ত পাকা হাতে নানারকম অপকর্ম করে বেড়ায়। তারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে এবং অবৈধ অর্থের পাহাড়ের ওপর বসে ভুক্তভোগী লোকদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার এবং নির্যাতনের বিষাক্ত চাবুক মারতে থাকে। তারা প্রকৃত সাধু সজ্জন, সৎ ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে অহরহ ঠাট্টা-মশকরা করে এবং নানাভাবে ভালো মানুষের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে বসবাসের অনুপযোগী ও দুর্বিষহ বানিয়ে ফেলে।

আপনি যাদের কাউয়া বলে গালি দেন তাদের কোনো দল নেই, নেই কোনো লীগ বা ফেডারেশন। তাদের কোনো বুলি যেমন নেই তেমন তাদের কোনো রংও নেই। তারা চোরও নয়, আবার ডাকাতও নয়। চোর-ডাকাত-গুন্ডা-বদমাশ-নাফরমান-বেইমান-মোনাফেক ইত্যাদি শব্দ একত্র করলে যে বীভৎস ককটেল বা দুর্গন্ধময় জগাখিচুড়ি তৈরি হবে তার সঙ্গে হয়তো রাজনীতির কাউয়াদের তুলনা করা যেতে পারে। কারণ রাজনীতি হলো মানুষের রাজকীয় আচরণের সর্বোচ্চ ধাপ। দেশের আপামর জনসাধারণের বিশ্বাস, ভালোবাসা, সমর্থন এবং দোয়াকে আমানত বানিয়ে রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন। দেশবাসী তাদের প্রিয়জনের ইজ্জত-আব্রু, নিজেদের ধন-সম্পদ-প্রাণ ও মাতৃভূমির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রাজনীতিবিদের কাছে সমর্পণ করে। জনগণ নিজেদের টাকায় গুলি ও বন্দুক কিনে রাষ্ট্রের হাতে দিয়ে দেয় প্রয়োজনে তা তাদের বুকের ওপর চালানোর জন্য। কাজেই মানুষ রাষ্ট্রকে যতটা বিশ্বাস করে অতটা বিশ্বাস পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এমনকি দেবতাদেরও করে না।

মানুষের সর্বোচ্চ বিশ্বাস, পবিত্র আস্থা ও ভাবনাহীন নির্ভরতার সঙ্গে যারা বেইমানি করতে পারে সেসব নরাধমকে আপনি শকুন ডাকুন অথবা হায়েনা বা কুকুর বলে গালি দেন, কিন্তু দোহাই কাউয়া বলবেন না। কারণ কাউয়ারা বড়ই নিরীহ ও ভদ্রশ্রেণির পাখি। তাদের গায়ের রং কালো বটে কিন্তু মনটা অতীব পবিত্র। এজন্যই আমরা মানুষের হাতে সাবান দেখলে রেগেমেগে অস্থির হয়ে পড়ি এবং সুযোগ পেলেই সাবানটি ছিনিয়ে নিয়ে হয় দূরে কোথাও ফেলে দিই নতুবা খেয়ে ফেলি। কারণ মানব জাতি যখন কুিসত একটি মন নিয়ে অহরহ ঘুরে বেড়াতে থাকে এবং তা পরিষ্কারের চেষ্টা না করে কেবল বাহ্যিক ময়লা দূর করার জন্য শরীরে সাবান ঘষার কসরত করে তখন কাউয়া জাতির মেজাজ নিরানব্বই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে গরম হয়ে পড়ে। মানুষের এ ধরনের ভণ্ডামি দেখে আমাদের গা জ্বালা করতে থাকে। ফলে আমরা সুযোগ পেলেই ছো মেরে মানুষের সাবান ছিনিয়ে নিয়ে যাই। যাওয়ার সময় কা কা ধ্বনিতে গালাগাল দিয়ে বলতে থাকি, ওরে ব্যাটা কুলাঙ্গার! আগে মনের ময়লা পরিষ্কার কর!

পৃথিবীর সব ধর্মমত ও বিশ্বাসে কাউয়া জাতির উল্লেখ রয়েছে। ইসলামে বলা হয়েছে, ‘আমরাই প্রথম মানুষ জাতিকে শিখিয়েছি কীভাবে মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়া যায়। ’ হিন্দুধর্মে আমাদের সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে। যেমন ‘আমরা অনেক গায়েবি খবর রাখি। আমরা গৃহস্থদের ঘরে মেহমান আগমনের খবর পৌঁছে দিই এবং অনেক ক্ষেত্রে লোকজনকে নানা বিপদ-আপদের কথা আগাম জানিয়ে দিই। ’ হিন্দুরা আমাদের দেবতা শনির বাহন বলে বিশেষ যত্নআত্তি করে এবং অলৌকিক পাখি হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দেয়। ইউরোপীয় কবি-সাহিত্যিকরা অবশ্য কাউয়াদের ব্যাপারে সর্বদা নেতিবাচক ও ভীতিকর প্রচারণা চালিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে।

আমরা মানুষের মুখ দেখে চিনতে পারি এবং তাদের ভালো-মন্দ ব্যবহার মনে রাখি। কাজেই মানুষের ব্যবহার অনুযায়ী আমরা তাদের বন্ধু বানাই অথবা শত্রুতা পোষণ করি। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষের অনেক জুলুম ও অত্যাচার রুখে দিই। আপনারা নিশ্চয়ই ২০০৬-২০০৮ সালে টানা দুই বছর ধরে জাপানের কাউয়া জাতির বিদ্রোহের কথা শুনে থাকবেন। ওই সময়ে আমরা জাপানের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছিলাম। আমাদের কারণে দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো হুটহাট বন্ধ হয়ে যেত। জাপানের সুবু ইলেকট্রিক কোম্পানি আমাদের একটি অভয়ারণ্য ধ্বংস করে সেখানে একটি বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা নির্মাণ করে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ফোরাম ‘কাউয়া কা কার’ অর্থাৎ পলিটব্যুরোর বৈঠক বসে। দীর্ঘ আলোচনার পর পলিটব্যুরোর সভাপতি ও কা কা সান ওরফে কাউয়া কা কা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করেন।

নেতার নির্দেশ পাওয়ামাত্র কাউয়াবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য সুবু পাওয়ার কোম্পানির সঞ্চালন লাইনের ওপর হামলা চালায়। তারা দুই বছরে মোট চৌদ্দ শ ফাইবার অপটিক কেটে পুরো দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ্যবস্থা দুই শবার বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তারা কয়েক হাজার কৃত্রিম পাখিঘর যা জাপানসহ সারা দুনিয়ায় ‘লাভ নেস্ট’ রূপে পরিচিতি পায় তা নির্মাণ করে দেয়। ফলে আমাদের ক্রোধ প্রশমিত হয়ে যায়। আমরা আমাদের শান্তি ও ভালোবাসার আবাসন পাওয়ার পর মানুষের বিরুদ্ধে চলমান দুর্বার আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিই। কাজেই এমন একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যখন মনুষ্য জাতির কলঙ্ক বলে পরিচিতি পাওয়া কুলাঙ্গারদের কাউয়া বলে গালি দেওয়া হয় তখন প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি কাকদের পক্ষ থেকে আত্মকথা লিখা ছাড়া আর কোনো শান্তিপূর্ণ বিকল্প থাকে না।  লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও কলামিস্ট।

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:০০:৩৭