সংলাপে কি লাভ!
আব্দুল হালিম মিয়া
অ+ অ-প্রিন্ট
বিএনপি খুব খুশী। সিইসির সাথে সংলাপের পর দলটি বলেছে তারা কিছুটা আশাবাদী। ভেতরের কোন কারন আছে কিনা জানি না, তবে ইনকিলাবের নিউজ পড়ে একটু বিশ্লেষন করা যেতে পারে বিএনপি একটু খানি হলেও কেন আশাবাদি:

১) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ভালো ভালো কাজ করেছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

২) সিইসি বলেন, আমি বিএনপির শাসন আমলেও চাকরি করেছি। বিএনপির এই সংলাপের দিকে জাতি তাকিয়ে আছে। দলটি অনেক বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। তাদের দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা ক্ষমতায় থাকার সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা গঠন ও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা চালু করে। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করে বিএনপি।

৩) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের খুব বেশি কিছু করার নেই। তারপরও এই সংলাপের পর বিএনপি কিছুটা আশাবাদী তো বটেই।

৪) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, সংলাপে আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনও তাদের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে। তবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন ও সহায়ক সরকারের যে দাবির কথা তাদের বলেছি সেই ব্যাপারে কমিশন তাদের ক্ষমতার মধ্য থেকে কিছু করার চেষ্টা করবে বলে আমাদের জানিয়েছেন।

এবার আসুন দেখি সেখানে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে কি প্রস্তাব দিয়েছে। ইনকিলাবেরে রিপোর্ট মতে বিএনপির প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে-

"সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচনের সাতদিন আগে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, ইভিএম পদ্ধতি না রাখা, আরপিও সংস্কার, সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনার পরিবেশ তৈরি করতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ২০০৮ সালের আগে সীমানা নির্ধারণ আইন কার্যকর করা। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার প্রসঙ্গটি নিয়েও কথা বলে বিএনপি। তবে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেয়নি দলটি।"

কিছুদিন আগে জাতীয় পার্টি সংলাপ করেছে, অন্যান্য দলও সংলাপ করবে। সরকারি দল আওয়ামী লীগও করবে।

এইসব রাজনৈতিক দল সিইসির সাথে যে সংলাপ করছে, সেখানে এমনভাবে প্রস্তাব ও আলোচনা করছে যাতে তাদের নিজেদের দলের সুবিধা হয় ও তারা ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন। ভাল কথা। সমস্যা হলো একটা দলও, আমি আবারও বলছি একটা দলও এমন কোন প্রস্তাব দিতে পারছে না যাতে জনগন ক্ষমতায় ফিরে আসে, যাতে গনতন্ত্র, আইনের শাসন ক্ষমতায় ফিরে আসে। এমনকি ছোট ছোট দল যারা বড় দলগুলোর টুপলা টেনে ক্ষমতার লেজুর হন, তারাও এমন কোন কথা বলছেন না যাতে জনগন ক্ষমতায় ফিরে আসে। যাতে সংসদে সত্যিকারভাবে জনগনের মতামতের প্রতিফলন ঘটে। যাতে জাতীয় সংসদ সত্যিকারভাবে জাতীয় হয়ে উঠে, জনগনের প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে উঠে।

 

শুধু দু একটা উদাহরন দিই। কেউ কি বলেছে বা বলবে,

১) নির্বাচনে কেউ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বেধে দেয়া নিয়মের বাইরে একটি টাকাও খরচ করতে পারবে না। বৈধ বা অবৈধভাবে, চুরি করে, গোপনে বা অন্যের মাধ্যমে যদি কোনরকম টাকা খরচ করার প্রমান পাওয়া যায় তাহলে তাৎক্ষণিক রাস্তায় আদালত বসিয়ে শাস্তি স্বরুপ জেল জরিমানা ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষনা করা হবে।

২) নির্বাচনে যে টাকা খরচ করা হবে তার অবশ্যই বৈধ উৎস থাকতে হবে। আয়কর পরিশোধের ডকুমেন্ট চাহিবা মাত্র কমিশনের ভ্রাম্যমান আদালতকে বা টিমকে দেখাতে হবে। না পারলে তাদের বিরুদ্ধেও উপরোল্লিখিত ব্যবস্হা নেয়া হবে।

৩) কোন রাজনৈতিক দল যখন দলীয় নমিনেশন দেন তাদেরকে কঠোরভাবে মনিটর করা হবে। কাউকে বা কোন দলীয় প্রার্থীকে টাকা বা ঘুষের বিনিময়ে প্রার্থী করা যাবে না। খাতির, তদবীর, পরিচিতি, গাড়ী, বাড়ী, শান শওকত, বিদেশী উপঢৌকন বা কোন কিছুর বিনিময়ে মনোনয়ন বাণিজ্য করা যাবে না। যদি করা হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রমান সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্হা নেয়া হবে।

৪) কোন রাজনৈতিক দল তার প্রার্থীর সম্পত্তি ও আয় ব্যায়ের হিসাব নিখুঁতভাবে দাখিল করা ছাড়া নমিনেশনের ধারে কাছেও আসতে পারবে না।

৫) সরকারী কর্মচারীরা অবসরের তিন বছর আগে রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

ইত্যাদি বিষয়ে একটা দলও কি প্রশ্ন করেছেন, প্রস্তাব দিয়েছেন?

সকল রাজনৈতিক দলই ভুয়া কথা বলে যে তারা সৎ ও জনদরদী প্রার্থী চান। অথচ আমরা জানি কিভাবে জনগনের নামে, জনগনের কথা বলে, জনগনের দোহাই দিয়ে জনগনকে বোকা বানিয়ে নানা কায়দা কৌশল করে কখনো ভোটের আগেই, কখনো সাজানো ভোটের দিন, কখনো ভোট নামক রাষ্ট্রীয় মেকানিজম করে মুলত একটা লুটেরা ও শোষক শ্রেনীকে জাতীয় সংসদে নিয়ে আসে, যারা কোনভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের প্রতিনিধিত্ব করেন না। ফলে তাদের কাছে, তাদের একশ্রেনীর চামচাদের কাছে বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগন পাঁচ বছরের জন্য কয়েদ হয়ে যান, জুলুম নিপীড়ন নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত হন।

ফলে সিইসি যে সংলাপ করছেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্হায় এনে, তাদের ডেকে এনে একটা সুস্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যে চেষ্টা করছেন তার পাশাপাশি সিইসির উচিত তাদের একটা টিম উল্টা রাজনৈতিক দলের মহাপরাক্রমশালী সকল একনায়ক সভাপতি/চেয়ারম্যানদের বাড়ীতে যেয়ে একান্তে বৈঠক করে প্রকৃত জনগনকে ক্ষমতায়নের ব্যবস্হা করা।

তা যদি না পারেন, নির্বাচনের নামে দেশে পাঁচ বছর পর পর যাই হোক, সেটাকে যেন জনগনের নামে নামায়িত না করা হয়। রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়া আর জনগনের ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্যে আকাশ আর পাতালের মতো পার্থক্য দিনের আলোর মতোই দৃশ্যমান।

 

 

১৫ই অক্টোবর, ২০১৭

টরন্টো।

১৬ অক্টোবর, ২০১৭ ২২:৩৩:৫০