মৌচাকে কাক! আমি তো অবাক!
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রথম কাহিনীটি শুনেছিলাম প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার মুখ থেকে। বঙ্গবন্ধুর জননী মানে প্রধানমন্ত্রীর দাদি যেদিন মারা গেলেন সেদিনের একটি ঘটনা শোকসভায় উপস্থিত সবাইকে হতবিহ্বল করে তুলল। খন্দকার মোশতাক আহমদ ঘটনাস্থলে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে প্রচণ্ড শোকে আর্তচিৎকার শুরু করলেন। তার কান্নার স্বর বুক চাপড়িয়ে আহাজারির ঢং এবং বারবার লাশের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে জ্ঞান হারানোর ভণিতা দেখে সবাই নির্বাক, নিস্তব্ধ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সবশেষে লাশ যখন দাফনের জন্য কবরে নামানো হলো তখন খন্দকার মোশতাক শোকে উন্মাদ হয়ে লাশের সঙ্গে জীবন্ত সমাধিস্থ হওয়ার মানসে কবরে নেমে পড়লেন। পরে বঙ্গবন্ধুর হস্তক্ষেপে এবং বিশেষ সান্ত্বনায় খন্দকার মোশতাক সেদিনের অন্তরজলি যাত্রা ক্ষান্ত দিয়ে কবর থেকে ধরাধামে উঠে আসেন। দ্বিতীয় কাহিনী এরশাদ জমানার। তখনকার রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মা মারা যান। রংপুরে মরহুমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে সরকারের মধুমাছিবৃন্দ যে যার মতো শোকের মাতম সৃষ্টি করে আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদের আহাজারি এবং শোকের মাতমের ধরন দেখে উপস্থিত লোকজনের আশঙ্কা হলো— তিনি হয়তো মারাই যাবেন। এ অবস্থায় স্বয়ং এরশাদ সাহেব এগিয়ে এলেন কাজী জাফর আহমেদকে বাঁচানোর জন্য। প্রেসিডেন্ট এরশাদ তার প্রধানমন্ত্রীর মাথায় হাত রেখে বললেন— শান্ত হও জাফর। কারও মা-ই চিরদিন বেঁচে থাকেন না। তোমায় শক্ত হতে হবে— দেশের দুঃখী মানুষের দিকে তাকিয়ে তোমাকে নিজের দুঃখ ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। উপরোক্ত দুটো ঘটনার মতো কৌতূহল উদ্দীপক এবং সাসপেন্সে ভরা বহু কাহিনী আমার জানা আছে। কিন্তু এসব বলে পত্রিকার পাতা না ভরে আজকের শিরোনামের সার্থকতার বিষয়ে দু-চারটি কথা বলি। বর্ণিত কাহিনী দুটোর নায়কদের তাদের সমসাময়িককালে বলা হতো রাজনীতির মধুমাছি মধুপোকা। মৌমাছি এবং মধুপোকার মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মৌমাছিরা তাদের রানীর হুকুমে যার যার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করে। যারা মধু সংগ্রহে নিয়োজিত থাকে তারা মরে গেলেও মধু খায় না। অন্যদিকে কিছু মধুপোকা রয়েছে যারা রানীর অবাধ্য হয়ে সবারই অজান্তে শ্রমিক মৌমাছির আহরণ করা মধু চুরি করে খেয়ে ফেলে। রানীর নিয়োজিত গোয়েন্দারা এসব মধুপোকাকে নিখুঁত ও নির্ভুলভাবে পাকড়াও করে এবং রানীর নির্দেশে মেরে ফেলে।

রাজনীতির মধুমাছি বা মধুপোকারা সহজে ধরা পড়ে না। আবার ধরা পড়লেও তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ইতিহাস খুবই নগণ্য। ফলে রাজনীতির মৌচাকের মধুভাণ্ডারে মৌচোরের সংখ্যা যেমন গাণিতিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি দিনকে দিন চোরদের চেহারা, চরিত্র, প্রকৃতি ও আদল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। পূর্বে রাজনীতির মৌচাকের মধু চুরির কর্মে নিয়োজিত থাকত রাজনীতির মাঠের নিবেদিতপ্রাণ অথচ ধান্ধাবাজ, ত্যাগী অথচ অসৎ, মেধাবী অথচ চরিত্রহীন প্রকৃতির মুধপোকা। কালের বিবর্তনে মধুপোকাদের স্থান দখল করতে থাকে ধূর্ত শৃগালেরা। এসব নিয়ে বহু কবি বহু কবিতা রচনা করেছেন। কী করে রাতের আঁধারে মৌচাকে হানা দিয়ে মধু খেতে গিয়ে চালাক চতুর শেয়ালরা মৌমাছির কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে তা কবির ভাষায় এবং শিল্পীর তুলিতে অনবদ্য আকার ধারণ করে আমাদের শিশুতোষ বিদ্যা ও বুদ্ধিতে এমন এক বোধ সৃষ্টি করত যাতে কেউ অনাগত দিনে শিয়ালের মতো চুরি করে মধু খাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হতো না। এসব কারণে বহুদিন রাজনীতির মৌচাকে শিয়ালের আক্রমণ বন্ধ ছিল।

কালের বিবর্তনে রাজনীতির মধুভাণ্ডার এখন কাক, ফার্মের মুরগি প্রভৃতি কুিসত এবং দুর্বল পাখিদের মালিকানায় চলে গেছে। আমি বেশ অবাক হয়ে ভাবী— বোকা কাক এবং নিতান্ত দুর্বল ফার্মের মুরগি কী করে পরিশ্রমী এবং অমিত বিক্রম রাজনীতির মৌমাছিদের নিয়ন্ত্রণ করে বা ভয় দেখিয়ে অথবা তাদের চোখে ধুলো দিয়ে মধুভাণ্ডারের দখল নিয়ে নিল। আগের জমানার মুধপোকা কিংবা ধূর্ত শিয়াল বহু কষ্ট করে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মধু চুরির চেষ্টা চালাত। আর ইদানীংকালের কাকেরা নিজেদের নির্বুদ্ধিতা এবং কুিসত কর্মের দাপটে রাজনীতির মৌমাছিদের রানী মোমাছির মতো নিয়ন্ত্রণ করছে। কাকদের হুকুমে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে। মৌচাক বানায়। মধু সঞ্চয় করে এবং নতুন মৌমাছি পয়দা করে। অন্যদিকে, কাকেরা মধু খায়, মধু বিতরণ করে এবং তাদের হুকুম অমান্য করলে মৌমাছিদের শাস্তি দেয়। মৌলোভী কাকদের দাপটে এখন বাতাস উল্টোদিকে প্রবাহিত হয়, নদীর স্রোত থেমে যায় এবং প্রকৃতিতে ঋতু বিভ্রাট শুরু হয়। কবিরা কবিতা লিখতে ভুলে যায়— গায়কেরা নৃত্য করে এবং নৃত্য পটীয়সীরা বেদবাক্য পড়ায়। কাকদের কা কা রবের তাণ্ডবে ময়না-টিয়া, দোয়েল, শ্যামা প্রভৃতি গানের পাখি কলকাকলি ভুলে গিয়েছে। কাকেরা ময়লা আবর্জনা বাদ দিয়ে দিবানিশি মধু ভক্ষণ করায় সমাজ সংস্কার ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কাকদের সাবেক খাদ্য ভক্ষণের জন্য শকুন আমদানি জরুরি হয়ে পড়েছে। ভারসাম্যহীন এই পরিস্থিতিতে একদল জ্যোতিষী বহু পিলে নস্যি নাকে মেখে অবশেষে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন— ভবিষ্যতে যদি শকুনেরা মধু খেতে চায় তবে কাউয়াদের কী হবে!’ বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

 

২৪ আগস্ট, ২০১৭ ০৫:৫৫:৫৮