আগুন নিয়ে খেলা রাজনীতির জন্য শুভ নয়
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
জাতির বেদনাবিধুর শোকাবহ আগস্ট এলেই অসংখ্য মানুষের মতো আমার ভিতরও ক্রন্দন করে। কী এক অস্থিরতায় আমাকে ভোগায়। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির মহত্তম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার-পরিজনসহ কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ড কেবল একদল বিপদগামী সামরিক বাহিনীর সদস্যের হত্যাকাণ্ড ছিল না, এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গভীর ষড়যন্ত্র জড়িয়ে ছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন দেশের বাইরে থাকায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন।

বেঁচে গিয়েছিলেন বলেই নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে ’৮১ সালে আওয়ামী লীগ ইডেন কাউন্সিলে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে অন্ধকার, অভিশপ্ত সময়ে গণতন্ত্রের পিদিমের আলো হাতে নেমেছিলেন তার পিতার হাতে স্বাধীন হওয়া রক্তাক্ত এই ভূমিতে। সেই থেকে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হেঁটে একটি গণমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে দ্বিতীয় দফা জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসে। শুধু তাই নয়, সামরিক শাসনের কবল থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন শেখ হাসিনা।

বার বার নানামুখী ঐক্যের রাজনীতির সূচনাও ঘটিয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সামরিক শাসক থেকে গণতন্ত্রের শাসকরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে জাতীয় প্রচার মাধ্যমে নিষিদ্ধ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুহীন এতিম রাষ্ট্রে তার জনকের নামটি পর্যন্ত নিতে কার্পণ্য করেছেন। এমনকি কুখ্যাত ইনডেমনিটির মধ্য দিয়ে মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঘটে যাওয়া ’৭৫-এর কালরাতের হত্যাকাণ্ড যেখানে শিশু থেকে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূরাও রেহায় পায়নি, তার বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার আগে পর্যন্ত কেউ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কথা চিন্তাও করেননি। এই দাবিকে আমলেও নেননি। একজন হৃদয়বান ইতিহাসের মহান নেতার প্রতি সব শাসকের আচরণ নিষ্ঠুরই ছিল, হৃদয়হীনতার নিদর্শনই ছিল না, অকৃতজ্ঞতার আঁকা ক্যানভাসই ছিল না, রাষ্ট্রের জন্মদাতার প্রতি ইতিহাসের বিচারে ছিল এই হত্যাকাণ্ডের বিচার না করার এক অসভ্য, নগ্ন সংস্কৃতি।

২০০০ সালে জাতিসংঘের অবরোধে পতিত পরবর্তীতে ফাঁসিতে জীবন দেওয়া সাদ্দাম হোসেনের ইরাক সফরে গিয়েছিলাম। মূলত মরহুম স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী যিনি মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় ভূমিকাই রাখেননি, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবিত দুই কন্যা এবং তাদের স্বামী-সন্তানকে জীবন ও চাকরির ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন। যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের গণতন্ত্রের মহান নেত্রী শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধীর সঙ্গে। সেখান থেকেই ’৭১-এর অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের দিল্লিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে জাতির জনকের নিথর দেহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে রেখে খুনিদের পাহারায় প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অন্যতম হোতা রাজনীতির ইতিহাসে মীরজাফর খ্যাত খন্দকার মোশতাক অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিই হননি, আওয়ামী লীগের অনেক কাপুরুষ নেতা তার মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর কৃপায় বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক খান পরম আদরে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা, নাতি-নাতনি ও জামাতাকে মেহমান করলেও হত্যাকাণ্ডের খবর শুনতে না শুনতেই চোখ পাল্টে ফেলেছিলেন। একটি জাতির মহান নেতাই না, একটি রাষ্ট্রের জন্মদাতা পিতার বিপদগ্রস্ত কন্যাদের বাসভবনে রাখতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন।

সেই সময় বড় মনের দুনিয়া কঁপানো কূটনীতিক হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী বেলজিয়াম সীমান্তে তার গাড়ি পাঠিয়ে জার্মানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকন্যাদের নিরাপদে রেখেছিলেন। সেখানেও রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া একদল উগ্র জাসদ কর্মী রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর বাসভবনে হামলাই করেনি, হৃদয়হীন বিক্ষোভও করেছিল। হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জর্দানের আম্মানে অনুষ্ঠিত আইপিও সম্মেলনে সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনি আমাকে নিয়েছিলেন। সেই সুবাধে ইরাক সফরকালে ঐতিহাসিক স্থানগুলো পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছিল। কারবালার প্রধান ফটকে কালো বোরখা পরিহিতা সুন্দরী রমণীদের দেখেছি মাতম করতে করতে ভিতরে প্রবেশ করছেন। সেখানে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হাসান, হোসেনের বিয়োগান্তক হত্যার ঘটনা নিয়ে একজন পুঁথিপাঠ করেন আর সামনে বসা নর-নারী আহাজারি, ক্রন্দন করেন।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড কারবালার চেয়েও নির্মম, নৃশংস ছিল। কিন্তু সেদিনের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ক্ষমতার মঞ্চে আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতক আর কাপুরুষরাই শপথ নেননি, শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেননি; জাতীয় চার নেতা এই অন্যায়ের কাছে নিজেদের সমর্পণ না করায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জীবন দিয়েছেন। গোটা বাংলাদেশ সেদিন শোকে এতটাই স্তব্ধ হয়েছিল, এতটাই স্তম্ভিত হয়েছিল, এতটাই দম বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছিল যে কাঁদতেও পারেনি।

তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও বিভ্রান্তির চোরাবালিতে পতিত হয়ে প্রতিরোধের ডাক দিতে পারেনি। দলের নেতা-কর্মীরা প্রতিরোধের ডাক দিলে যে নেমে আসতেন একথা বলা যায় না। তখনো তাদের হৃদয়ে, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতি উজ্জ্বল। তাদের রক্তে তখনো দ্রোহ। যারা বলেছেন, কেউ প্রতিবাদ করেনি, তারা ভুল বলেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, আওয়ামী লীগের কোনো বড় নেতা ছিলেন না। টাঙ্গাইলের নবনির্বাচিত গভর্নর ছিলেন। একাত্তরের বাঘা সিদ্দিকীর কিংবন্তির খ্যাতি ছিল আকাশে বাতাসে। তার প্রতিরোধ যুদ্ধে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর ব্যানারে অস্ত্র হাতে ১৭ হাজার কর্মী ছুটে গিয়েছিলেন। খেয়ে না খেয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে, এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। শতাধিক তরুণ আত্মাহুতি দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তাদের স্বীকৃতি বা প্রতিদান না-ই দিক, পিতৃহত্যার প্রতিবাদে এই প্রতিবাদ বঙ্গবন্ধু অনুসারীদের গৌরবান্বিত করেছিল। একজন বিশ্বজিৎ নন্দী গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ফাঁসির দণ্ড পেয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে সেনাশাসক এরশাদ তাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। সেই বিশ্বজিৎ নন্দী যার যৌবন ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন একজন নেতা ও তার আদর্শের জন্য। সেই সাহসী তরুণের খোঁজ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেয় কিনা, তাও জানা নেই।

অনেকে প্রচার করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তার জনপ্রিয়তা ছিল তলানিতে। এটা কতটা নির্দয় মিথ্যাচার, ঘাতক ও তার সহযোগীরাই তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। তারা নিহত মুজিবকেও ভয় পেয়েছেন বলে কঠোর প্রহরায় দ্রুত টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে দাফন করেছেন। কতটা তার জনপ্রিয়তাকে ভয় পেয়েছিলেন খুনিরাই বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে বলে গেছেন। জীবিত বঙ্গবন্ধুকে পৃথিবীর কোনো কারাগারে রেখেও যে রুখে দেওয়া যেত না, তিনি যে এই জাতির হ্যামিলনের বংশীবাদক সেটি তারা নিশ্চিত ছিল। তারা আরও নিশ্চিত ছিল তার ডাক, তার কর্মী ও জনগণ উপেক্ষা করতে পারতেন না। এ কারণে তার লাশের জানাজা পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি ঢাকাতে। ইমামের কারণে টুঙ্গিপাড়ায় জানাজা ও ধর্মীয়ভাবে দাফনের অনুমতি দিলেও অস্ত্র উঁচিয়ে রাখা ভয়ার্ত খুনিরা মানুষকে সেখানে অংশ নিতে দেয়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের ফৌজদারি আইনে সাধারণ মানুষ হত্যার বিচারের মতো বিচার হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ায় ষড়যন্ত্রের কালো অধ্যায় উন্মোচিত হয়নি। ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা সেই অন্ধ শক্তিকে ধীরে ধীরে নিয়ে আসছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরাজিত বিশ্ব মোড়ল ও পূর্ব থেকে মধ্যের দেশগুলোও হত্যাকাণ্ডের পর স্বীকৃতি দিয়েছে। অবৈধ খুনি সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেদিন বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সারা দেশের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর যে জেলজুলুম, হুলিয়া, নির্যাতন নেমে এসেছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নিপীড়ন আর কোনো দলের ওপর নেমে আসেনি। এত নির্যাতন আর কোনো রাজনৈতিক দল বহন করেনি।

আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করেন, আমি কেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর প্রতি এক ধরনের দুর্বলতা পোষণ করি? আমি তাদের বলি, দুর্বলতা নয়; তার একাত্তর ও ’৭৫-এর বীরত্বকে আমি কেবল সম্মান করি। সেই গৌরবের কাছে ছোটখাটো ভুলত্রুটি কোথায় হারিয়ে যায়, তা নিজেও বুঝতে পারি না। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ইয়াহিয়া খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে খুঁড়ে রাখা কবরের পাশে যেমন পাকিস্তানের অন্ধ কারা প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন, সে কারণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে ঘটে যাওয়া দৃশ্যের ভিতরের বাইরের অনেক খবর যেমন জানেননি, তেমনি মাঝেমধ্যে মনে হয় ’৭৫ থেকে ৮১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনকালে সারা দেশে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তারুণ্যনির্ভর মেধাবী ও সাহসী সংগঠক ছাত্রলীগকে আদর্শের মহিমায় শক্তিশালী রূপ দিয়েছিল, সেটি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও পুরোটা জানেন না।

’৭৫-এর পর সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক হয়েছিলেন আমার অগ্রজ মতিউর রহমান পীর। পরে দুবার জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রথম কমিটিতে তার সঙ্গে হায়দার চৌধুরী লিটন ও দ্বিতীয় কমিটিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আনোয়ার চৌধুরী আনু সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সেই দুঃসময়ে অনেক ছাত্রলীগ নেতা সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। একজনের নাম নিতে গেলে অনেকের নিতে হয়। তাই সবার নাম নিতে পারছি না বলে নিচ্ছি না। সেই সময় একদিকে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের মার্শাল ল, কঠোর শৃঙ্খল, অন্যদিকে মুজিববিদ্বেষী জাসদ ও উগ্রপন্থি সংগঠনগুলোর সশস্ত্র ত্রাসের ভিতর দিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি ওবায়দুল কাদের ও বাহালুল মজনুন চুন্নুর নেতৃত্বে সারা দেশে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে রূপ নিয়েছিল। খেয়ে না খেয়ে কঠোর পরিশ্রম আর সাংগঠনিক দক্ষতায় তারা সংগঠন করেছিলেন।

ছাত্রজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম বলে ইতিহাসের নির্মাতা, এদেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংগ্রামের পরতে পরতে জড়ানো সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত ছাত্রলীগের প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। একালের ছাত্রলীগ নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। সমালোচনার তীর ছাত্রলীগকে তার অতীত গৌরব থেকে ছিটকে ফেলে বিষের তীরে ক্ষতবিক্ষত করে। এ বিষয়টি আমি পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করি নিবিড়ভাবে। ছাত্রলীগ করলেও আমি আওয়ামী লীগের কর্মী কখনো ছিলাম না। আমি বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধু আমার নেতা। যে জনগণের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সেই মানুষ আমার দল আর একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, উন্নত, আধুনিক বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন। আমার স্বপ্নকে সামনে নিয়ে খোলা হাতে আমি যা লিখতে চাই তা অনায়াসে লিখতেই পারি; এ কথা আমি বলব না। আমি এটিও বলব না, মধ্য রাতের টকশোতে গিয়ে আমার হৃদয় থেকে আসা যে কথাগুলো বলতে চাই; অকপটে সেই সত্য উচ্চারণ করতে পারি না। এ বেদনা আমাকে কুরে কুরে খায়। দহনে দহনে আমার হৃদয় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়। কখনো বিষণ্নতায় ভোগী, কখনো রাজনীতির কুিসত রূপ দেখি।

আমি বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ছিল একটি স্বপ্নের ও একটি আদর্শের হত্যাকাণ্ড। একটি উদার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে হত্যা। জনগণের প্রতি বিশ্বস্ত রাজনীতির এক মহানায়কের হত্যা। তার হত্যাকাণ্ডের পর তার মতো এ বদ্বীপে আর কোনো মহান রাজনীতিবিদের মুখ দুনিয়া দেখেনি। পৌরুষদীপ্ত চেহারায়, ব্যক্তিত্বে, উচ্চতায়, উঁচু তর্জনীতে, কণ্ঠে, সাহসে, লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়, আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক, গণমুখী, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ এ ভূমিতে হাজার বছরে আসবেন কিনা সংশয় রয়েছে। তিনি যে গ্রাম দিয়ে হেঁটে যেতেন সেটি তার হয়ে যেত। তার তর্জনী উঠলেই একটি জাতি জেগে উঠত। বিশ্ব দরবারে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পাইপের এলিন মোরের ধোঁয়া ছেড়ে তিনি যখন পায়ের ওপর পা তুলে বসতেন, সামনে যত শক্তিশালী ধনী রাষ্ট্রের শাসকই বসে থাকুন না কেন, পরিবেশ হয়ে যেত বঙ্গবন্ধুর। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মৃত ও জীবিত সেই সময়ের সাহসী সাংবাদিকরা কড়া সমালোচনায় কলাম লিখে মুজিব ভাই বলে তার বাড়িতে ঢুকে যেতেন। এরা পরবর্তীতে সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে লেখা দূরে থাক, দুই নেত্রীর সমালোচনা করারও সাহস পাননি। জীবিত কেউ কেউ ফরমায়েশি লেখার বাইরে যেতেই পারেন না।

যাক যে কথা বলছিলাম, বঙ্গবন্ধু তার মৃত্যুর আগে যতগুলো বক্তৃতা করেছেন, দলের উন্মাসিক নেতা-কর্মীদের প্রতি আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধির পথ নিতে বলেছেন। ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনকে নিবিড়ভাবে দেখলে তাদের এ প্রশংসা দিতেই হয়, সংগঠনের কর্মীদের নিয়ম-শৃঙ্খলায় রাখতে তারা আন্তরিকতার অভাব দেখাচ্ছেন না। যেখানেই ছাত্রলীগ সন্ত্রাসে, চাঁদাবজিতে, ধর্ষণের মতো ঘটনায় সংগঠনকে কলঙ্কিত করছে সেখানেই তারা বহিষ্কারের দণ্ডাদেশ দিচ্ছেন। গোটা সমাজ এবং রাজনীতি যেখানে মূল্যবোধহীন অবক্ষয়ের পথে, যেখানে গোটা ছাত্ররাজনীতি ঐতিহ্যের সংস্কৃতি থেকে পথহারা, যেখানে ২৬ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচন নেই, সেখানে সুস্থ শিক্ষাঙ্গননির্ভর মেধাবী ছাত্রদের অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব আশা করি কীভাবে? ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ছাড়া আওয়ামী লীগের কেউ নিয়মিত লিখেন না। ইতিহাসের নির্মোহ সত্য নদীর স্রোতের মতো খলবল করে উঠে আসে তাদের হাতে। এক সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের লিখতেন। মন্ত্রিত্ব আর দল চালাতে গিয়ে দিবা-রাত্রি পরিশ্রম তার লেখার শক্তি কেড়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার— ‘ওরা টোকাই কেন?’ সেই কবে আমাদের মুগ্ধ করেছিল। সংবাদ মাধ্যমে কালেভদ্রে লিখলেও নিয়মিত লেখার সময় নেই তার। ইদানীং বাহালুল মজনুন চুন্নু মাঝেমধ্যে লিখছেন। তোফায়েল আহমেদ এক আলোচনা সভায় ষাটের দশকের ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, বকেয়া অফিস ভাড়ার টাকার জন্য তার অগ্রজ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে বাড়িওয়ালা আটকেছিলেন। ষাটের ছাত্রলীগের অসাধারণ সংগঠক ও নিউক্লিয়াস সদস্য আবদুর রাজ্জাক ক্ষমা চেয়ে, মিনতি করে সময় নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে। তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে রাজ্জাক গেলেন বেগম মুজিবের কাছে। বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধু জেলে থাকলে সংসারই সামলাতেন না, কর্মীদেরও দেখভাল করতেন। তিনি আবদুর রাজ্জাকের হাতে টাকা দিলেন। সেই টাকা বকেয়া অফিস ভাড়া পরিশোধ করে বাকিটা সংগঠনের পেছনে খরচ হলো। ষাটের ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করার সুযোগ যার হয়নি, সেটি তার দুর্ভাগ্য। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের জন্য অবারিত ছিল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসেননি এমন কর্মী পাওয়া যাবে না। গণমুখী চরিত্রের আওয়ামী লীগের নেতাদের সংস্কৃতিই ছিল কর্মী ও মানুষ তাদের বাড়ি গেলে ডাল-ভাত যাই থাক তা-ই খেয়ে আসবে। সেই সংস্কৃতি পাল্টে গেছে এখন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে একদিকে মুজিব উৎখাতের নামে জাসদ ও গণবাহিনীর ত্রাসের রাজত্ব, গুপ্তহত্যা, অন্যদিকে সর্বহারাদের শ্রেণিশত্রু খতমের নামে আগুন, থানা লুট, জনপ্রতিনিধি হত্যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সরকার ও জনগণকে অস্থির করে তুলেছিল। চীনা ভাসানীপন্থি মেননদের সঙ্গে মস্কোপন্থি মতিয়া চৌধুরীরাও পাল্লা দিয়ে মুজিববিদ্বেষী বক্তৃৃতা কম করেননি। গণকণ্ঠ আর হককথা, গুয়েবলসীয় প্রচারণাকে হার মানিয়েছিল। আওয়ামী লীগেরও একদল নেতা-কর্মীর আচরণ ছিল সহ্যসীমার বাইরে। রক্ষীবাহিনীর আচরণ ছিল আতঙ্কগ্রস্ত। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র তো ছিলই। সেই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এখনো আছে। বিরোধী দলের রাজনীতি দমন করতে গিয়ে তাদেরও সেই পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই বলছেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে পরিস্থিতি সুখকর নয়। শেখ হাসিনা অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মতো দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে ছুটছেন। কিন্তু দুর্নীতি, টাকা পাচার, ব্যাংক লুট, শেয়ার কেলেঙ্কারি থামানো যায়নি। ধর্ষণের মহোৎসব চলছে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মধ্যদিয়ে সরকার ও বিচার বিভাগ মুখোমুখি প্রায়। এবার প্রথম আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে উচ্চ আদালতের সম্পর্কের সুর কেটে যেতে দেখা যাচ্ছে। সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব অনেক হয়ে গেছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হলেও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলে বসেছেন, যতবার বাতিল হবে ততবার তারা পাস করবেন। তিনি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নন। বাজেটের সমালোচনার ক্ষত এখনো শুকায়নি, সেখানে এ ধরনের বক্তব্য একজন সিনিয়র মন্ত্রীর উন্মাসিক আচরণ ছাড়া কিছু নয়। শাসক দলসহ রাজনৈতিক শক্তিকে উপলব্ধি করতে হবে আগুন নিয়ে খেলার আলামত দেশ ও রাজনীতির জন্য কখনো শুভ হয়নি। যারা উল্লসিত পাকিস্তানে উচ্চ আদালতে নওয়াজ শরিফ বরখাস্ত হয়েছেন, এখানে ঈদের পর বিএনপি রিট মামলা দায়ের করলে একটা কিছু ঘটে যাবে, বর্তমান সংসদ বা আগামী নির্বাচন ঘিরে সেটি অস্থিরতাই বাড়াবে না, অভিশাপও বয়ে আনতে পারে। দৃষ্টি এখন সবাই সুপ্রিম কোর্টের দিকেই রাখছেন। মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল উচ্চ আদালতকে বিতর্কিত করা যাবে না। একদলীয় শাসনব্যবস্থা, সামরিক শাসন এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সুশীলের শাসন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রই জনগণের আশা ও আকাঙ্ক্ষার পথ। সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সেই দুয়ার খুলতে সব রাজনৈতিক দলকেই একটি সমঝোতায় আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দলের দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতাদের নিয়ে দলের উন্মাসিকদের দমন করে আওয়ামী লীগের ঐক্য, সংহতি প্রতিষ্ঠার পথ বের করতে হবে। ঘনীভূত হওয়ার আগেই সংকট মোকাবিলা করার পথ খুঁজে নিতে হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

সূত্র : বিডি প্রতিদিন

 

 

 

 

 

 

০৯ আগস্ট, ২০১৭ ১১:১০:১৩