জান্নাতের পাসপোর্ট
তসলিমা নাসরিন
অ+ অ-প্রিন্ট
বাংলাদেশে জঙ্গি দল আখেরাত আর জান্নাতের পাসপোর্ট বানিয়েছে। পাসপোর্ট দুটোর রঙ সবুজ। জান্নাতের পাসপোর্টের ওপরে এক বৃত্ত, বৃত্তের ভেতরে সোনালি অক্ষরে লেখা... ‘এই বিশ্ব সৃষ্টি জগতের একমাত্র মালিক আল্লাহ। ’ নিচের দিকে সাদা কালিতে ইংরেজিতে লেখা ‘পাসপোর্ট অফ হেভেন, উইথ ভিসা। ’

কিছু কিছু লোক নিজেদের আল্লাহতায়ালার চেয়েও বড় এবং বিচক্ষণ, সর্বশক্তিমান এবং মহান বলে মনে করে। নিজেদের তারা শেষ বিচারক বলে মনে করতেও এতটুকু দ্বিধা করে না। সবচেয়ে ভয়ংকর শেরেক কিন্তু তারাই করছে যারা জান্নাতের পাসপোর্ট বানাচ্ছে। মানুষ কতটুকু পাপ বা পুণ্য করেছে দুনিয়ায়, তা হিসাব করে আখেরাতের ময়দানে মানুষের বিচার করবেন আল্লাহতায়ালা। তিনিই পাপীদের ঠেলে দেবেন দোজখে, আর পুণ্য যারা করেছে, তাদের পাঠাবেন বেহেস্তে বা জান্নাতে। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু লোক ভেবে নিয়েছে মানুষের বিচার করার মালিক তারা। তারাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে পাপী আর কে পুণ্যবান। পাপীদের নৃশংসভাবে খুন করতে তারা দ্বিধা করছে না। আর পুণ্যবানদের দিব্যি দিয়ে দিচ্ছে জান্নাতের পাসপোর্ট। পাপী তারা তাদেরই বলছে, যারা প্রশ্ন করে। পুণ্যবান তাদের চোখে তারা, যারা প্রশ্ন করে না, যারা বিশ্বাস করে, এবং জেহাদে নামে।

যদি আখেরাতের ময়দানে কোনও পাসপোর্ট দেওয়ার বন্দোবস্ত থেকে থাকে, তবে তা দেবেন আল্লাহতায়ালা, অন্য কেউ নয়। এই দুনিয়ায় যারা জান্নাতের পাসপোর্ট দিচ্ছে, তাদের আমরা চিনি। তারা মানুষের মগজধোলাই করতে ব্যস্ত। ধর্মের নামে এক গাদা হিংসে আর ঘৃণা ঢুকিয়ে দেয় মগজে। ওই হিংসে আর ঘৃণাই চিন্তাশক্তি নষ্ট করে, সুস্থ ভাবনা দূরে সরায়। মগজধোলাই হওয়া মানুষকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করানো সম্ভব, অন্যকে হত্যা থেকে শুরু করে নিজেকে হত্যা অবধি। পেটে আত্মহত্যার বোমা বেঁধে বলে দেওয়া হয় নিজেকে হত্যা করে হলেও যদি ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা করা যায়, তবে নিশ্চিতই জান্নাত। রাজিব হায়দার থেকে শুরু করে অভিজিৎ, অনন্ত, ওয়াশিকুর, সামাদ, দীপন, জুলহাসকে যারা মেরেছে, তারা শর্টকাটে জান্নাতে যাওয়ার জন্য মেরেছে। যারা হলি আর্টিজান ক্যাফেয় মানুষকে গলা কেটে কেটে নৃশংসভাবে মেরেছে, তারাও শর্টকাটে জান্নাতে যাওয়ার জন্য মেরেছে। তারা বিশ্বাস করেছে বিধর্মীদের এবং অবিশ্বাসীদের খুন করলেই বেহেস্ত নিশ্চিত।

পৃথিবীর কোনও দেশে, এমনকি মুসলিম দেশেও, আমি শুনিনি, জান্নাতের পাসপোর্ট বানিয়েছে কেউ। বাংলাদেশই এই অভিনব কাজে প্রথম। নারায়ণগঞ্জ থেকে জেএমবির কিছু জঙ্গি ধরা পড়েছে সেদিন, ওদের হাতেই পাওয়া গেছে আখেরাতের আর জান্নাতের পাসপোর্ট। জঙ্গি জিহাদিরা নিশ্চিত তারা জান্নাতবাসী হবে। এই জঙ্গিরা ধর্মের উদারতাকে, মানবিকতাকে, সহমর্মিতাকে, সহনশীলতাকে হঠিয়ে দিয়েছে, ধর্মের ভেতর নিয়ে আসতে চাইছে অনুদারতা, অসহিষ্ণুতা, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতা আর বর্বরতা। জঙ্গি সংখ্যা প্রচুর না হলেও জঙ্গিদের প্রকাশ্যে এবং গোপনে সমর্থন করার লোক দেশে প্রচুর। ভয়টা এ কারণেই। নিজের দেশের হিন্দু-বৌদ্ধদের ওপর হামলা হওয়ার পর, খুব বেশি মানুষকে দেখি না পথে নেমে প্রতিবাদ করতে। তার চেয়ে অন্য দেশের মুসলমানের ওপর আমেরিকা বা ইসরায়েল আক্রমণ করলে মানুষ প্রতিবাদে মুখর হয়। সুন্নি-মুসলমান যখন শিয়া বা আহমদিয়া-মুসলমানকে হত্যা করে; আইসিস, আল-কায়েদা, বোকো হারাম, লস্কর এ তৈয়বা, জইশা মুহাম্মদ, হরকাতুল মুজাহেদিন দলের মুসলমানেরা যখন নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করে, তখন বাংলাদেশের খুব কম মুসলমানকেই দেখি প্রতিবাদ করতে। তাহলে কি গোপনে গোপনে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী মুসলমানদের পক্ষ নেয় অনেকে? আমার ভয় হয়। মগজধোলাই শুধু জঙ্গিরাই করে না। মগজধোলাই সরকারও করে, কিছু পত্র-পত্রিকা করে, কিছু রেডিও টেলিভিশন করে। অসুস্থ পরিবেশ প্রতিবেশ করে।

যুবসমাজের একাংশ নষ্ট হচ্ছে মাদক সেবনে, আর শর্টকাটে জান্নাতে যাওয়ার লোভে। যুবসমাজই দেশের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ যদি পচে যেতে থাকে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ যাবে পচে। আমাদের দায়িত্ব দেশকে পচনের হাত থেকে বাঁচানো। মানুষকে ঘৃণা আর হিংসে থেকে মুক্ত করা। মানুষকে মানবিক করা। মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করা। বিজ্ঞানমনস্কদের অত সহজে কেউ ধর্মের নামে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করতে পারে না। মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করার কোনও উদ্যোগ কি সরকার নিয়েছে, যেমন নিয়েছে মানুষকে ধার্মিক করার?

মানুষ ধার্মিক হওয়ায় ক্ষতি নেই। কিন্তু এমন ধার্মিক হওয়ায় অবশ্যই ক্ষতি, যে ধার্মিক জান্নাতের পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার জন্য মানুষের অনিষ্ট করে, যে ধার্মিক সর্বশক্তিমান আল্লাহকে বিশ্বাস করার বদলে বিশ্বাস করে জঙ্গিনেতাদের ।

ধর্ম অনেক রকমভাবে পালন করা যায়। জঙ্গিরা ধর্ম পালন করে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সন্ত্রাসীরা ধর্ম পালন করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। দরিদ্রকে সাহায্য করেও, আর্তের সেবা করেও, মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেও ধর্ম পালন করা যায়। এই মানবিক ধর্ম চর্চারই প্রয়োজন এখন। নিজের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করে আরবীয় সংস্কৃতিকে ভালোবাসছে বাংলাদেশের মানুষ। আরবীয় পোশাক আশাক পরার ধুম লেগেছে। মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই... যে যতই চেঁচাক, বাংলাদেশের মুসলমানকে সৌদি আরবের মুসলমানেরা মিশকিন বলে, ভাই বলে না। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সৌহার্দের চেয়ে শত্রুতা বেশি।

মানবিক ধর্ম চর্চা ছাড়া আর উপায় নেই। বিভেদ আর বিচ্ছেদের, ঘৃণা আর হিংসের রাজনীতি পৃথিবীকে ধ্বংস ছাড়া আর কিছু করবে না।-বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

 

 

 

 

 

 

১৫ জুন, ২০১৭ ১০:০৮:৩১