কামিনীকাতর যামিনীর ভয়ঙ্কর উপাখ্যান!
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
নারী-পুরুষের অবৈধ প্রণয় এবং নিষিদ্ধ মেলামেশার ভয়ঙ্কর সব উপাখ্যান রাতের বাতাসকে নিয়ত বিষাক্ত করে তুলেছে। বাহারি কুকর্মের পাত্র-পাত্রীরা ইদানীংকালে বাংলাদেশের শহরে-বন্দরে এবং গ্রামগঞ্জে এমন সব অপরাধের জন্ম দিচ্ছে যা গত দুই-চার-দশ বছর আগে কল্পনাও করা যেত না। বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে, জামাই-শাশুড়ি, শ্বশুর-পুত্রবধূ, ছাত্রী-শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকা-ছাত্রের মতো পারস্পরিক মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানজনক সম্পর্কের মাঝে যেসব অশ্লীলতার কথা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে তা বিবেকসম্পন্ন লোকজনকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে।

ঢাকার রেইনট্রি নামক একটি আবাসিক হোটেলকে ঘিরে জমজমাট মাদক ও যৌনতার আসর দেশবাসীকে যতটা না উদগ্রীব এবং উত্কণ্ঠিত করে তুলেছে, তার চেয়েও বেশি আতঙ্কিত করে তুলেছে পিতা-পুত্রের চিরায়ত সম্পর্কের হাল আমলের অশ্লীলতা এবং নোংরা উপাখ্যান জানার পর। অভিযুক্ত পুত্র তার দুই বন্ধুসহ সারা রাত দুই তরুণীকে ধর্ষণ করলেন। ধর্ষণের আগে নিজেরা মাতাল হলেন এবং তরুণীদের মদ্যপানে বেসামাল করলেন। নিজেরা ইয়াবা নামক মরণনেশার বড়ি খেলেন এবং অন্যদেরও খাওয়ালেন। ধর্ষণের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করালেন এবং ফিল্মি কায়দায় অস্ত্র উঁচিয়ে নির্যাতিতদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিলেন। উপর্যুপরি ধর্ষণে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে তরুণীদ্বয় যখন মেঝেতে গড়াগড়ি করে আর্তনাদ করছিলেন তখন ধর্ষকরা উল্লাসের অট্টহাসি দিয়ে বলেছিলেন—চুপ। একদম চুপ। শুধু আজকে নয়— এখন থেকে নিয়মিত আমাদের কথায় এখানে আসতে হবে এবং এমনটি করতে হবে!

উপরোক্ত ঘটনা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর প্রধান ধর্ষকের কথিত বাবা দম্ভোক্তি করে বলেন—জোয়ান পোলা। একটু-আধটু তো করবেই। আমিও তো করি! ধর্ষণের ঘটনায় দেশের আমজনতা যতটা না আতঙ্কিত এবং বেদনাহত হয়েছেন তার চেয়ে বেশি বেদনাহত হয়েছেন ধর্ষকের পিতার মুখ নিঃসৃত আবর্জনা শুনে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এত বড় জঘন্য কর্ম যদি একটু-আধটু হয় তাহলে পুরোটা করলে না জানি কতটা নির্মম ও নৃশংস হতো।

রেইনট্রি হোটেলের ঘটনার আগে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে স্ত্রীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন তার স্বামী। স্বামীর লাশ খাটের তলায় রেখে স্বামী ঘাতিনী স্ত্রী তার পরকীয়ার নাগরের সঙ্গে সেই খাটের ওপরই শুরু করেন ব্যভিচার। পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর নির্বিকার চিত্তে অবলীলায় বলতে থাকেন নিজের কুকর্মের ফিরিস্তির ভয়ঙ্কর সব উপাখ্যান। গত ১৮ মের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আরও একটি পিলে চমকানো খবর প্রকাশিত হয়েছে। জনৈক নারী তার পরকীয়া দেখে ফেলার অপরাধে নিজের ১৩ বছরের কন্যা এবং স্বামীকে নির্মমভাবে মেরে ফেলেছে

সাম্প্রতিককালের সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, কামিনীকাতর নারী-পুরুষের অবৈধ অভিসারের অভিশাপে রাতের আঁধার নিরীহ দেশবাসীর জন্য এক সীমাহীন আতঙ্ক বয়ে নিয়ে আসে। পাপাচারের ধরন ও প্রকৃতির কারণে সাধারণ মানুষের চিরায়ত বিশ্বাস ও ভালোবাসা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। আবার নিজেদের আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের কথাও কাউকে খুলে বলতে পারছে না। স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-পরিজনের সাবলীল সম্পর্কের মধ্যে ঘৃণা, অবিশ্বাস এবং সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছে। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে একে অপরকে এমন সব কথাবার্তা বলছে বা শোনাচ্ছে যা পারস্পরিক সম্পর্কের জন্য আদৌ মঙ্গলজনক নয়।

অবৈধ অর্থ-বিত্ত, বড় বড় পদ-পদবি এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে অশান্ত, উত্তপ্ত এবং বন্ধনহীন করে তুলছে। এগুলোর প্রভাবে নীতি-নৈতিকতা, লজ্জা-শরম, পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বিলীন হতে বসেছে। পাপী মনের অস্থিরতা এবং অবৈধ অর্থের গরমকে সামাল দেওয়ার জন্য মানুষ সব সময় চটুল, হালকা এবং নিষিদ্ধ বিনোদনের রাস্তা খুঁজে বেড়ায়। এ কারণে অনাদিকাল থেকে এই শ্রেণির মানুষ কামাতুর হয়ে যামিনী বিহারে বের হয়ে নিজেদের ভিতরকার পাশবিকতা উদগীরণের জন্য ফন্দি-ফিকির করে আসছে। রাষ্ট্রের সুশাসন, ন্যায়বিচার, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিতা ছাড়া এসব অপকর্ম কোনোকালে বন্ধ হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ হলো—এখানকার পাপাচারের ধরন, প্রকৃতি, মাত্রা ইত্যাদি ইতিহাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিত্যনতুন উপাখ্যান সৃষ্টি করছে। -বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক :  সাবেক সংসদ সদস্য

 

 

২২ মে, ২০১৭ ০৮:৩২:০৪