আমার গেলাস সদাই থাক অর্ধেক পূর্ণ
আলী যাকের
অ+ অ-প্রিন্ট
এই পরিণত বয়সে এসে আমার এই পরম আশাবাদী মনটাকে আর বদলাতে চাই না। থাকুক না সে যেমন আছে? জীবনের সেই কোন বিহানবেলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার জীবনে রোদ, বৃষ্টি এবং দাবদাহের প্রচণ্ডতা অথবা কালো মেঘের ভয়াবহ কটাক্ষ আমাকে জীবনবিমুখ করতে পারেনি। বড় সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছিলাম বোধ হয়, যে কারণে আমার জীবনের কোনো সমস্যাই আমি মাটিচাপা দিয়ে রাখতে পারিনি; বরং অতি স্বচ্ছন্দে মুখোমুখি হয়েছি তার। জীবন কখনো আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। সব সমস্যার একটা না একটা সমাধান খুঁজে পেয়েছি। এভাবেই জীবন কেটেছে যুগের পর যুগ। এভাবেই চালিয়ে যেতে চাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

আমাদের সমাজে সাম্প্রতিককালে চিন্তাশীল একটি জনগোষ্ঠী অনেক লেখাপড়া করে, অনেক চিন্তাভাবনা করে যেকোনো সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে। আমি এ পর্যন্ত দেখিনি যে তারা কখনো কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পেরেছে। বাল্যকালে বাবার কাছে শুনেছি যে একজন ইংরেজ সাহেবকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘এই পরিস্থিতিতে আমি কী করব?’ তার উত্তরে তিনি ভেবেচিন্তে বলবেন, ‘আমি যদি তুমি হতাম এবং সমস্যাটা যদি ঠিক একই রকম হতো, একচুলও এদিক-ওদিক না হয়ে, তাহলে আমি হয়তো তুমি যা ভাবার চেষ্টা করছ সেই সম্পর্কে আরো একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, ভেবেচিন্তে অতঃপর একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতাম। ’ এমনই জটিল ছিল তাঁদের সহজীকরণ প্রক্রিয়া। কোনো একটা জটিল বিষয় নিয়ে যদি একাধিক পণ্ডিত ব্যক্তি একসঙ্গে বসে সেই জটিলতার সমাধানে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে সাধারণত এই রকম দাঁড়ায়, যেমন লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘একটি সম্মেলনের সংজ্ঞা হচ্ছে কতিপয় বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং সবজান্তা মানুষের দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে তর্কবিতর্কে প্রবৃত্ত হওয়া। এর ফলে তাঁরা এককভাবে সমস্যাটির সমাধানের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না বটে, তবে যৌথভাবে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে সমস্যাটির আসলেই কোনো সমাধান নেই। ’

হবুচন্দ্র রাজার পায়ে ধুলা লাগে, তাই তাঁর মন্ত্রী গোবুচন্দ্রকে তিনি কড়া ধমক দিয়ে বললেন—এ সমস্যার একটি সমাধান করা দরকার। এর পরে রবীন্দ্রনাথের বর্ণনায় আছে—শুনিয়া গোবু ভাবিয়া হল খুন/দারুণ ত্রাসে ঘর্ম বহে গাত্রে/পণ্ডিতের হইল মুখ চুন/পাত্রদের নিদ্রা নাহি রাত্রে/রান্নাঘরে নাহিকো চড়ে হাঁড়ি/কান্নাকাটি পড়িল বাড়ি-মধ্যে/অশ্রুজলে ভাসায়ে পাকা দাড়ি/কহিলা গোবু হবুর পাদপদ্মে—/‘যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে/পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!’

আমরা সাধারণ মানুষরা বড় বড় তত্ত্বকথা শুনে অভ্যস্ত। শুরুতে ভাবতাম যে এর মধ্যে অন্তর্নিহিত কোনো উপদেশ কিংবা পরামর্শ নিশ্চয়ই আছে, যার দ্বারা সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এখন যেন মনে হয় যে যেকোনো বিষয়ে অভিমত কিংবা বচনকে যদি একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে শক্ত করা হয় অথবা যদি মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলা যেতে পারে যে এই সমস্যার সমাধান এভাবেও সম্ভব, ওভাবেও সম্ভব; কিন্তু তৃতীয় কিছু চিন্তা করতে হবে, তাহলে বোধ হয় পণ্ডিতরা পালে হাওয়া পান। সাধারণ মানুষ মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ভাবে, ‘বাহ, বেশ জবরদস্ত কথা বলেছে তো!’ সমস্যাটি কিন্তু যেমন গ্যাঁট হয়ে বসেছিল, তেমনি বসে থাকে। বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। কিছু সমস্যা নিজ থেকেই সমাধান হয়ে যায়, অন্যদিকে কিছু সমস্যা কিছুদিন বাদে আর সমস্যা থাকে না। বিশেষজ্ঞরা এতে বড় স্বস্তি পান। সাধারণ মানুষ তাঁদের কথা ভুলে গিয়ে নিজ নিজ জীবনধারণের চিন্তায় মগ্ন হয়।

সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে যে সমস্যার আয়তন ও সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত আরো বেশি জটিল ও অবোধগম্য হওয়ায় গণমাধ্যম এ নিয়ে বেশ খেলাধুলা করে। তারা একবার এই কথা বলে, আরেকবার সেই কথা। এসব সমস্যা, যেমন সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে পুলিশের স্বেচ্ছাচারিতা, রাজনীতির কূটকচাল, এমনকি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক—সব বিষয়েই আজকাল গণমাধ্যম আমাদের অহরহ তাদের মন্তব্যে ভারাক্রান্ত করছে। যদি কোনো ব্যক্তি এ নিয়ে উদ্ভট একটি মন্তব্য করে, আমি জিজ্ঞেস করে দেখেছি, তাদের জবাব সাধারণত হয় ‘ওই যে অমুক টিভিতে দেখলাম কিংবা তমুক পত্রিকায় পড়লাম?’ কেবল পড়া এবং দেখাটাই কি যথেষ্ট? এ কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘আমরা তবে আর কী করব? আমরা হতদরিদ্র জনগণ, লোকে যা বলে তা-ই শুনি। ’ আজকাল তো এমন হয়েছে যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রায় সবারই একটি নিজস্ব মত আছে। অবশ্য এই মতটি কান-কথার ওপর নির্ভরশীল। কানের কথায় অতি পুরনো একটি কৌতুক মনে পড়ে গেল। এক লোককে বলা হলো, চিলে তার কান নিয়ে গেছে। সে নিজের কানে হাত দিয়ে পরীক্ষা না করেই চিলের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন দান করে ফেলল। এই যে নিজের কানটি আছে কি না তা না দেখা বা নিজের জ্ঞানের পরিমিতির মধ্যে যে বোধগম্যতা আছে, তা দিয়ে কোনো বিষয় বোঝার চেষ্টা না করে কেবল চিলের পেছনে পেছনে দৌড়ানো—এতে আমরা দিন দিন বড়ই কাহিল হয়ে পড়ছি।

একটু লক্ষ করলেই পাঠক বুঝতে পারবেন, আমাদের এই যে যেকোনো বিষয়ে ত্বরিত অভিমত সৃষ্টি করা এবং তা নিয়ে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কথাবার্তা অবলীলায় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে বলে যাওয়া—এতে  সমূহ বিপদের আশঙ্কা থেকেই যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৫ বছর হলো। আমরা সবাই বলে বেড়াই যে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে হবে। আমরা যদি এতে সত্যিকার অর্থেই বিশ্বাস করে থাকি, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটিও আমাদের জানা দরকার। জানা দরকার কী কারণে আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, যুদ্ধের সময় কারা আমাদের বন্ধু ছিল, যুদ্ধের পরেই বা কারা আমাদের দিকে সব ব্যাপারে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই মৌল বিষয়গুলো যদি আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি, তাহলে একটি ইতিবাচক স্থান থেকে সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় যেকোনো বিষয়ে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারি।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। এর আগে যে তিনজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন আই কে গুজরাল। আই কে গুজরালের বাংলাদেশ সফরের পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেছে। আমার মনে হয়েছে যে ১৯৭৪-এ মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রথম একটি সত্যিকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান সব সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে। আমরা যদি কেউ আশা করে থাকি যে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একটি সফরেই অথবা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের মাধ্যমে আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারব, তাহলে সেটা নিতান্তই বালখিল্যের চিন্তা হবে। যে সমস্যাগুলো আমাদের এই দুই দেশের মধ্যে ৪২ বছর ধরে, অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিরাজ করছে এবং যে সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা কোনো সরকারই করেনি, বিশেষ করে তারা, যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে যারা হাতে মারণাস্ত্র নিয়ে মার্শাল লর মাধ্যমে আমাদের দেশে ক্ষমতায় এসেছে, সেসব সমস্যার সমাধান একটি বা দুটি সফরেই হয়ে যাবে ভাবলে আমরা মূর্খের রাজ্যে বাস করছি। গত ৪২ বছরে সমস্যা লাঘবের চেষ্টা না করে সমস্যাকে আমরা আরো জটিল করে তোলার চেষ্টায় ব্যাপৃত ছিলাম। কথায় আছে—বাঘের ঘা হলে সে সেই ঘাটিকে সারতে দেয় না। চুলকে চুলকে জীবিত রাখে এবং জিবে চেটে পরম আনন্দ লাভ করে। আমাদের সরকারগুলোও এই বাঘের ঘায়ের নীতি অনুসরণ করেছিল। আমরা চেষ্টা করছি, ভারতের মধ্যে একটি কৃত্রিম শত্রু সৃষ্টি করে তার সঙ্গে ছায়াযুদ্ধ করতে এবং সে সম্পর্কে অপার মিথ্যা কথা আমাদের দেশের মানুষকে বুঝিয়েছি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য। আমরা যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন লক্ষ করেছি যে পাকিস্তানি সরকার এই একই নীতি অনুসরণ করত। কেউ যদি চিৎকার করে কেঁদে উঠত এই বলে যে ‘আমি খেতে পাচ্ছি না, আমায় খাবার দাও’, তাহলে পাকিস্তানি সরকার বলত, ‘ভারতীয় আগ্রাসনের জন্য পাকিস্তানের নিরাপত্তা হুমকির মুখে’ (!) নিজস্ব সমস্যাগুলো সমাধান করতে অক্ষম এই ক্ষমতালোভীরা সব বিষয়ে অন্যকে দোষারোপ করতে বড় সিদ্ধহস্ত হয়। আমরা লক্ষ করেছি যে ভারতের যেকোনো সরকারপ্রধান যখন এখানে আসেন তখন আমাদের মধ্যে যেসব রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দল সর্বদাই ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করে, তারাও একেবারে গদগদ হয়ে হামলে পড়ে তাঁদের সান্নিধ্য পেতে। কিন্তু সেসব সরকারপ্রধান চলে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তারা আবার আড়মোড়া ভেঙে তাদের ভারতবিরোধী চরিত্রের বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করে। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের কণিকার একটি পদ্যের উল্লেখ করছি, ‘যথাসাধ্য-ভাল বলে, ওগো আরো-ভাল/কোন্্ স্বর্গপুরী তুমি করে থাকো আলো?/আরো-ভাল কেঁদে কহে, আমি থাকি হায়/অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়। ’ এবারের ভারত-বাংলাদেশ সংলাপে অনেক বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার কথা ছিল। সব কটিতে হয়নি। এবং এই না হওয়ার পেছনে ভারতের অপারগতাই ছিল প্রধান কারণ। যত দূর জানি, অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং অন্যগুলো অচিরেই হবে বলে আশা করা যায়। কেননা এগুলো সম্পর্কে দ্বিপক্ষীয় একটি বোঝাপড়া আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের আগেই হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের জাঁতাকলে থেকে আমাদের মানসিকতা এমন হয়ে গেছে যে আমরা ধরেই নিই, যেকোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে দেশের নির্বাহী প্রধানের সম্মতিই যথেষ্ট। এর কারণ এই যে এখনো আমরা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হইনি। ভারত একটি বিশাল দেশ এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর যথেষ্ট ক্ষমতা। কিন্তু যেকোনো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো মুখ্যমন্ত্রী যদি গররাজি থাকেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রীরও কোনো বিষয়ে সম্মত হওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। কিন্তু অচিরেই সব সমস্যার সমাধান হবে যদি দুই দেশের মধ্যে হৃদ্যতা থাকে, থাকে উষ্ণতা এবং সহমর্মিতা।

সব শেষে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে চাই, ‘তপন-উদয়ে হবে মহিমার ক্ষয়/তবু প্রভাতের চাঁদ শান্তমুখে কয়/অপেক্ষা করিয়া আছি অস্তসিন্ধুতীরে/প্রণাম করিয়া যাব উদিত রবিরে। ’

অতএব, আমি অর্ধপ্রাপ্তিকে পূর্ণপ্রাপ্তি বলেই ধরে নিতে চাই। আশা করি, আশাহত হব না। -কালের কন্ঠ

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

 

২২ এপ্রিল, ২০১৭ ১১:৪১:০৩