ম্যাডাম, দেশ বিক্রি কেমন করে হয়?
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
ভারতের কংগ্রেস জোটের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ঢাকা সফর করেন তখন দুই দেশের প্রত্যাশার শীর্ষে ছিল তিস্তা চুক্তি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাদ সেধেছিলেন। মনমোহনের ঢাকা সফর সঙ্গী হননি। দিল্লির মনমোহন সরকার ও কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উষ্ণ সম্পর্ক থাকলেও মমতার কারণেই সেবার তিস্তা চুক্তি হয়নি।   সম্প্রতি চীন থেকে সাবমেরিন কেনার পরই দিল্লির তত্পরতা, শেখ হাসিনার ভারত সফরকে দুই দেশের গণমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল আলোচনা ও জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি হতাশার চাদরে ঢেকে দিলেও এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর ঘিরে আশার আলো ছয় বছর পর আবার জ্বলে উঠেছিল। ভারতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির আমন্ত্রণে মমতা দিল্লি এসেছিলেন। কংগ্রেস জোটকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দিল্লির ক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদি বিজেপিকে নিয়ে ফিরলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেই উষ্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন।   সেই ধারাবাহিকতায় হাসিনা-মোদির পারস্পরিক সমঝোতা দফায় দফায় দেখাসাক্ষাৎ, কথাবার্তা, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধিই করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের দিল্লি সফরেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমানবন্দর থেকে তার বাসভবন হায়দরাবাদ হাউস হয়ে প্রণব মুখার্জির রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত দুই দেশের শীর্ষ নেতার পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতার দৃশ্যপটই আসেনি, সুমহান মুক্তিযুদ্ধে রচিত ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নিবিড়তাই ফুটে ওঠেনি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির কণ্ঠে সম্মান ও আন্তরিকতা উচ্চারিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার তিনটিসহ ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেছেন। বাংলাদেশের প্রবল প্রত্যাশাই ছিল না, দিল্লি সরকারেরও আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল না এই সফরে তিস্তা চুক্তি সম্পাদন নিয়ে। কিন্তু মমতাহীন মমতা ‘তিস্তায় পানি নেই’ এমন মন্তব্য করে চুক্তিতে আপত্তি দিয়ে অন্য পাঁচটি নদীর পানি বণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দান ঢাকা ও দিল্লি সরকারকে চুক্তি করতে দেননি। বাংলাদেশের জনগণের তৃষ্ণা নিবারণ দূরে থাক গভীর আবেগের বিপরীতে, আমাদের ন্যায্য পাওনাকে আবারও অস্বীকার করে রীতিমতো প্রহসন করেছেন। ভারতের গণমাধ্যম বলেছে, মমতা দিল্লি সরকারের সঙ্গে দর কষাকষি ও টানাপড়েন বাড়িয়েছেন। কিন্তু ভারতের গভীর বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধা বাংলাদেশের জনগণের ন্যায্য তিস্তা চুক্তির দাবিকে দিল্লি সরকার বারবার করতে চেয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, তিস্তার চুক্তিতে সম্মতি না দিয়ে মমতার বিকল্প প্রস্তাব কার্যত কূটকৌশলের আশ্রয় ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফরের আগে হৃদয় নিঃসৃত বন্ধুত্বের দুয়ার খুলে ভারতের গণমাধ্যমের এক নিবন্ধে লিখেছিলেন— ‘বন্ধুত্ব এক বহতার নদীর নাম’। সেখানে মমতা দীর্ঘ ছয় বছর পরে ফের তিস্তা চুক্তি আটকে দিয়ে সুমহান মুক্তিযুদ্ধে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ-ভারতের জনগণের আবেগ-অনুভূতির সম্পর্কে ছন্দপতন ঘটালেন। যদিও শনিবার দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জোর দিয়েই বলেছেন, তার এবং শেখ হাসিনার সরকারই দ্রুত তিস্তার পানি ভাগাভাগি সমাধান করতে পারবেন। গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে আরও বলেছেন, তিস্তা শুধু ভারত আর বাংলাদেশের জন্যই নয়, দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নরেন্দ্র মোদির পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের ব্যাপারে ভারতের সহযোগিতা পাব। ’

ভারত বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে আমাদের রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য ও বাগ্যুদ্ধ চলছে। নানামুখী বিতর্কের ঝড় উঠেছে। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন, আমাদের প্রত্যাশা ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার রূপরেখায় এমনকি কিছু থাকবে না যেটা বাংলাদেশের জন্য বিব্রতকর হয়। তিনি বলেন, একটা বিষয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারতের সঙ্গে এখন অনেক কিছুই আদান-প্রদান হচ্ছে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভারতে যাচ্ছেন, আবার ভারতের সেনাবাহিনীও বাংলাদেশে আসছেন। অনেক সময় দুই দেশের মধ্যে যৌথ মহড়াও হচ্ছে। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদের ব্যাপারে দুই দেশের তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু এমন কিছু প্রতিরক্ষা সমঝোতা চুক্তি আশা করি না যাতে অন্য একটি তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন ঘটার শঙ্কা থাকে। এটা কারও জন্যই কাম্য হবে না। তিনি তিস্তা চুক্তির ন্যায্যতা ফিরিয়ে দেওয়ার কথাই বলেননি, ৫৪টি অভিন্ন নদীর ব্যাপারেও অতিসত্বর চিন্তাভাবনার তাগিদ দিয়েছেন।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তিস্তা নিয়ে যে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন তাতে ভবিষ্যতে এ নিয়ে চুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। গণমাধ্যমে তার যে বক্তব্য এসেছে তা হতাশাজনক। তবে এটাই শেষ কথা নয়। ভারত বাংলাদেশকে এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। ভবিষ্যতে ভালো কিছু হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে সামরিক সমঝোতা যেগুলো হয়েছে এগুলো একটি রূপরেখা। সেখানে আপত্তিকর, উদ্বেগ প্রকাশ করা বা বিব্রতকর এখন পর্যন্ত কিছু দেখছি না। তবে ভারতের সঙ্গে আমাদের সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন যৌথ মহড়াও হচ্ছে। এর মধ্যে ছয় ধাপের সামরিক যৌথ মহড়া হয়েছে। এগুলো মনে হয় সামরিক সমঝোতায় রয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। এতদিন ধরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক যে কার্যক্রম হয়ে আসছে সেটারই একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর দুটি বক্তব্যই প্রায় অভিন্ন। দুজনই সফর ও চুক্তিকে ইতিবাচকভাবেই দেখেছেন। নেতিবাচক কোনো কিছু দেখেননি।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর ও দুই শীর্ষ নেতার চুক্তির কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আগামী আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য হলো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে দিতে হবে। বেগম খালেদা জিয়া আরও বলেছেন, পাঁচ বছর কাগজ-কলমে দেশটা ভারতের কাছে বিক্রি করে আওয়ামী লীগ বিদায় নেবে। ’ রবিবার রাতে গুলশান কার্যালয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দ দেখা করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির মতো জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন এ ধরনের কথা বলেন তখন আমাদের মানসিক ও রাজনৈতিক দৈন্যই দৃশ্যমান হয়। দেশের রাজনীতিতে বিএনপির জন্ম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার-পরিজনসহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, সামরিক ক্যু ও পাল্টা ক্যু, সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা আরোহণের মধ্য দিয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও আওয়ামী লীগের শক্তির বিপরীতে কার্যকর কোনো বিরোধী দল দাঁড়াতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে খুনি চক্রের প্রহরায় বিশ্বাসঘাতক মোশতাক সরকার উত্খাত, খালেদ মোশাররফ বীরউত্তমের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মুখে কর্নেল তাহেরের গণবাহিনী ও সৈনিক সংস্থার কাঁধে ভর করে সেনাশাসক জিয়া ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ বিরোধী চীনাপন্থি অতি বাম, স্বাধীনতাবিরোধী দক্ষিণপন্থি মুসলিম লীগ, কিছু মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কিছু মানুষকে টেনে এনে বিএনপি নামে দলটি করেছিলেন। মূলত বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ বিরোধী প্লাটফর্ম হিসেবে রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান নিলেও সেনাশাসক এরশাদের আগমনের মধ্য দিয়ে দলটি ভঙ্গুর হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার হত্যা ও ব্যর্থ সাত্তার সরকারকে হটিয়ে সেনাশাসক এরশাদের ক্ষমতা আরোহণে ভাঙনকবলিত বিএনপির হাল ধরেছিলেন স্বামীর উত্তরাধিকারত্ব নিয়ে খালেদা জিয়া। সেনাশাসক এরশাদ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় বাসস্থানসহ সুযোগ-সুবিধা লাভ করলেও গণতন্ত্রের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ছাত্রদলের শক্তির ওপর ভর করে সমর্থকদের দেওয়া আপসহীন নেত্রীর তকমা নিয়ে রাজনীতিতে উঠে এসেছিলেন। তা-ই নয়। গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে ব্যালট বিপ্লবে দু-দুবার ও সাংবিধানিকভাবে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে ভারতের কাছে দেশ বিক্রির অভিযোগ আনেন তখন প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়— ভারতবিরোধী রাজনীতির জিগির এদেশে অতি বামদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিএনপি সবচেয়ে বেশি করেছে। এতে এক সময়ে রাজনৈতিকভাবে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে লাভবান হলেও আজকের বিশ্ব রাজনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতায় এ ধরনের বক্তব্য কতটা বিএনপির জন্য লাভজনক। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, ম্যাডাম আপনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু দেশ কেমন করে কাগজে-কলমে বিক্রি করা যায় সেটি ব্যাখ্যা করে বলবেন কি। সুমহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ রক্ত দিয়েছে। আড়াই লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে। গোটা বাংলাদেশ শ্মশান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি জাতির জীবনে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের চেয়ে বড় গৌরব আর কিছু নেই। রাজনৈতিক কারণে দেশ বিক্রির এমন অভিযোগ রাজনৈতিক দারিদ্র্যের বহিঃপ্রকাশই নয়, রাজনৈতিক পরাজয়ের গ্লানির আর্তনাদই নয়, লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীন জাতির আত্ম অহঙ্কারের জায়গা থেকে অবমাননাকর।

একটি স্বাধীন জাতির রাজনৈতিক নেতৃত্বের কণ্ঠে সরকারের সমালোচনা মানানসই হলেও দেশ বিক্রির অভিযোগ বেমানানই নয়, সবার জন্য গ্লানি ও লজ্জার। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মসজিদে উলু ধ্বনি হবে, এমন সাম্প্রদায়িক মন্তব্য বিএনপির রাজনীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে কালের যাত্রাপথে। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর ফেনী পর্যন্ত ভারতের হয়ে যাবে এমন মন্তব্য অসারেই পরিণত হয়নি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচ্চতাকে খাটো করেছে। ভারত আমাদের ভুটান বানাতে চায়, বেগম খালেদা জিয়ার অতীতের এমন মন্তব্য আরেকটি দেশের প্রতি তাচ্ছিল্যের প্রকাশই ঘটায়নি, কূটনৈতিক শিষ্টাচারকেও লঙ্ঘিত করেছে।

আওয়ামী লীগ নামের দলটি বিশ্বাস করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি সেনাশাসক জিয়াউর রহমান পরোক্ষাভাবে জড়িত। বিশ্ব নেতৃত্বও পিতা-মাতাসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্যের ঘাতকের হাতে প্রাণ হারানোর কারণে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার প্রতি সহানুভূতিশীল। মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা রক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে স্বজন হারানোর ক্রন্দন নিয়ে স্রোতের উজানে সাঁতার কেটে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। ২৪ বারের বেশি তাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। মৃত্যু ভয়কে জয় করে তিনি প্রমাণ করেছেন তার সাহস ও প্রজ্ঞা দিয়ে তিনিই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একমাত্র বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্ব। আওয়ামী লীগের বাঘা বাঘা নেতা, সমমনাদের বিরোধিতাকে মোকাবিলা করে তাদের বিড়াল বানিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনিই সিংহকন্যা। তাই তার সংগ্রামের ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ ভারত নেতা নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্ববরণ্যে নেতারা।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গণতন্ত্রের আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বসেছেন। নিশ্চিত বিজয়ের মুখে ’৯১ সালের নির্বাচনে নাটকীয় পরাজয় মেনে নিয়ে শেখ হাসিনা সংসদ নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বসে দেশকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন। সেখানে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে শাহ এমএস কিবরিয়াসহ আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের একে একে হত্যা করে প্রকাশ্য সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে পৃথিবী থেকে উড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টার দায় সেদিনের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে অস্বীকার করবেন? সেই একুশের গ্রেনেড হামলাই কি এদেশের রাজনীতিতে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে এ শিক্ষাই দেননি যে, তার জন্য বিরোধী দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ। সেদিনই কি দেশের রাজনীতিতে বিশ্বাসের চিহ্ন মুছে যায়নি। আগামী পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছেন বলে যে বক্তব্য বেগম খালেদা জিয়া দিয়েছেন তাতে জানতে ইচ্ছা করে দেশের জনগণ ক্ষমতায় বসায় নাকি ভারত বসায়। জনগণের বদলে ভারত যদি কাউকে ক্ষমতায় বসায় তাহলে প্রশ্ন ওঠে আসে— ’৯১ ও ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে কি জনগণের বদলে ভারত ক্ষমতায় বসিয়েছিল। যদি বসিয়ে থাকে তাহলে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র উলফাদের আশ্রয় আপনার শাসনামলে কারা দিয়েছিল। কারা ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান এনেছিল। কারা একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ঘটিয়েছিল। যেখানে জিয়া নিহত হওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া ও তার সন্তানেরা রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশানের বাসভবন পেয়েছিলেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ট্রাস্ট করে জাদুঘরে দেওয়ার পর মুজিবকন্যা শেখ রেহানার নামে দেওয়া ধানমন্ডির সাধারণ বাড়িটি কারা কেড়ে নিয়ে থানা বানিয়েছিল।

রাজনীতিতে উত্থান-পতন থাকেই। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশল নির্ধারণের পথে। ’৭৫-এর রক্তাক্ত পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ২১ বছর দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে, নির্যাতন সয়েছে। হঠকারী উগ্র পথ কখনো নেয়নি। রাজনৈতিক দল হিসেবে রাজনৈতিকভাবে প্রতিটি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ’৭৮, ’৮১ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ’৭৯ এবং ’৮৬ সংসদ নির্বাচন বর্জন করেনি। সেনাশাসকদের অধীনে পরাজয় জেনে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন পরিস্থিতি শেখ হাসিনা তার প্রজ্ঞা দিয়ে, ধৈর্য ও সাহস দিয়ে জয় করেছেন।

বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলতে পারবেন— বিএনপির সিদ্ধান্ত কোথা থেকে আসে। লন্ডন না মালয়েশিয়া থেকে, দলের নেতাকর্মীরাও জানেন না। ২০০৮ সালের নির্বাচন যেখানে বিএনপি বর্জন করেনি সেখানে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ব্যাপক জনসমর্থনের মুখে খালেদা জিয়া কেন বর্জন করলেন, কার ইশারায়। পরবর্তীতে দলের কোন ফোরামে আলোচনা করে অনির্দিষ্টকালের হরতাল অবরোধ আগুন সন্ত্রাসের হঠকারী কর্মসূচি দিয়ে সারা দেশের নেতা-কর্মীদের শত শত মামলার ফাঁদে ফেললেন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলতে পারবেন, দলের এত এত যোগ্য মেধাবী প্রজ্ঞাবান ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব থাকার পরও তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত হচ্ছে। শেখ হাসিনা যেখানে ফজরের নামাজ পড়ে রাজনীতির দাবার চাল দেন খালেদা জিয়া সেখানে এশার পরে রাত গভীরে গুলশান কার্যালয়ে কেন আসেন। এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়া কর্মী বিচ্ছিন্ন, বিএনপি দল গোছাতে পারেনি, এখন পর্যন্ত বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি, এখন পর্যন্ত বিএনপি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় কিন্তু ভারতবিরোধী জিকির কেন বন্ধ করছে না? কারা প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠক বাতিল করিয়েছিলেন।

বিজেপির প্রবীণ নেতা সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী এল কে আদভানি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেছেন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে। অথচ ভারত প্রশ্নে বিএনপি নেত্রীর বক্তব্য, ’৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধী বিচার প্রশ্নে ভূমিকা, জামায়াত প্রশ্নে মিত্রতা, বিএনপি-জামায়াত শাসনামল থেকে নানান কর্মকাণ্ড বিএনপিকে ’৭১-এর পরাজিত পাকিস্তানঘেঁষা করে রেখেছে।

পাকিস্তান আমলে পশ্চিমা ২২ পরিবারের বাইরে এদেশের এক পরিবার অর্থাৎ ২৩ পরিবারের সন্তান সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান সরকারি রোষানলে থাকলেও দলের স্থায়ী কমিটিতে তার ঠাঁই হয়নি। তিনিও ভাইস চেয়ারম্যান, তার একজন স্টাফও ভাইস চেয়ারম্যান। আবদুল্লাহ আল নোমান যাকে দলে এনেছিলেন তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেও নোমান এখনো ভাইস চেয়ারম্যান। প্রবীণ রাজনীতিবিদ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন অপমানের যন্ত্রণা বুকে নিয়ে রাজনীতি থেকেই সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। দলের এত বড় কমিটি কোনো বৈঠক হয় না। কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচি নেই।

তেল গ্যাস জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। বিএনপি মানুষের পাশে দাঁড়ায় না। হাওরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের ঘরে ঘরে কান্না। খালেদা জিয়া কেন সেখানে যান না। দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারত্ব বহন করে চায়— সরকার ও বিরোধী দল হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তি। দেশের মানুষ চায়, দেশে শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল। যেমনটি ’৯১ ও ’৯৬ সালে ছিল। শক্তিশালী সরকারের সঙ্গে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে সরকার হয় জবাবদিহিমূলক, গণতন্ত্র হয় শক্তিশালী, মানুষের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ বাড়ে।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বিএনপির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত দেশকে, দেশের শাসন ব্যবস্থাকে ভারসাম্যহীন করে রেখেছে। সরকার ও বিরোধী দল শক্তিশালী থাকলে গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি শক্তিশালী জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলে। শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকলে গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি যে সাহস পায় খালেদা জিয়া বিরোধী দলে থাকলে সেটি কেন পায় না এবং সংসদের বাইরে কেন!! এ প্রশ্ন করতেই হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির জনকের ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে, একদলীয় বাকশাল গঠন নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকেই যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, তিনিই যে জাতির জনক এটি মীমাংসিত সত্য।

দেশের মানুষ, দুনিয়া ও ইতিহাস স্বীকার করলেও বিএনপি তা স্বীকারে কার্পণ্যতা, কাদের কথায় খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার শোকাবহ রজনীতে কেক কেটে জন্মদিন পালন করেছেন সেটি বড় প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে অন্যদিকে দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্য ছেড়ে খালেদা জিয়ার উচিত আত্মসমালোচনা ও আত্মবিশ্লেষণ করে আগামী দিনের রাজনীতির রূপরেখা প্রণয়ন। শক্তি থাকলে গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন, সামর্থ্য না থাকলে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ। সেই নির্বাচন সামনে রেখে এখনই খালেদা জিয়ার জনসভা, জনসংযোগের সফরসূচি প্রণয়ন। ভারতবিরোধী দায়িত্বহীন বক্তব্যের বদলে উপলব্ধি করা সুমহান মুক্তিযুদ্ধে ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, ট্রেনিং দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, যুদ্ধে তারা রক্ত দিয়েছে। রক্তে লেখা বন্ধুত্বে সমস্যার সমাধান আলাপ-আলোচনা ও দেনদরবারে হবে। বৈরিতায় নয়।

ভারতের সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছে তা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় জণগনের সামনে খোলাসা করবেন এবং সেটা করা উচিত। এ চুক্তিতে আমাদের লাভের পাল্লা কতদূর সেটি জনগণকে জানাতে হবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে মানুষের প্রত্যাশা চুক্তি ও স্মারক এবং সরকারের বক্তব্য বিশ্লেষণ করার পরে বক্তব্যদান। এমনকি আমাদের তিস্তার ন্যায্য পাওনার ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে অভিন্ন কণ্ঠে কথা বলা।   এটি একটি জাতীয় স্বার্থ। ভারত সরকারের মমতাকে বোঝাতে হবে— শেখ হাসিনার সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদী, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি উড়িয়ে দিতে জনগণকে নিয়েই সংগ্রাম করছেন। বন্ধুত্ব ও প্রেম একতরফা হয় না। বন্ধু, বিশ্বাস ও আস্থার পথে চলার জন্য যে চুক্তি তৈরি হয়ে আছে বছরের পর বছর সেটি ঝুলে থাকতে পারে না। তিস্তার ন্যায্য পাওনা আমাদের দিতেই হবে।   তিস্তা চুক্তি দ্রুত করতেই হবে।  -বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক।

 

 

 

 

 

১২ এপ্রিল, ২০১৭ ০৮:৫৬:৫০