নিজের চোখের পানি ভালোবাসি কিনা আজও জানি না
সামিয়া রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
কিছু দিন আগে এক কোচিং সেন্টারে এক ভদ্রমহিলা আরেক ভদ্রমহিলাকে বলছিলেন, ভারত ও ইন্ডিয়া পাশাপাশি দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ভারত দেশটা ভালো, কিন্তু ইন্ডিয়া দেশটা খারাপ। ভারতে মুসলমানদের নামাজ পড়তে দেওয়া হয়,     কিন্তু ইন্ডিয়াতে দেওয়া হয় না। আরেকজন মহিলা মন দিয়ে তার কথা শুনছিলেন, বিশ্বাস করছিলেন, মহিলার জ্ঞানের মুগ্ধতায় চমত্কৃত হচ্ছিলেন। মজার ব্যাপারটি হচ্ছে, মহিলাটি অশিক্ষিত নন এবং তিনি নিজেও একজন শিক্ষকের সন্তান। সত্যিকারের এই গল্পটি কিন্তু বাংলাদেশের গল্প। শুনেছিলাম দুর্ধর্ষ সাহসী এক মানুষের কাছ থেকে। এক গেরিলা যোদ্ধার কাছ থেকে। কর্নেল তৌফিকুর রহমান (অব.)। তিনি হতাশ হয়ে বলছিলেন, এদের বোঝাবে কে? কেমন করে শিক্ষা, জ্ঞানের এত অধঃপতন হলো! কখন হলো! দুঃখ করে বলছিলেন, স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর মুক্তিযুদ্ধটা হয়ে গেছে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের যুদ্ধ। সেদিন ২৬ মার্চ এক বেসরকারি টেলিভিশনে এমন একজনকে নিয়ে আসা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা নামে, যিনি মুক্তিযোদ্ধা নাম দিলেও, বীরপ্রতীক উপাধি পেলেও মুক্তিযোদ্ধা নন। তিনিই আজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বয়ান করেন! আর আমরা— মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম, অর্ধসত্য ইতিহাস জানা জাতি, তাই শুনি আর গণমাধ্যমের ক্ষমতার জোরে অথবা জ্ঞানের অজ্ঞতায় সে বয়ান জানাই জাতিকে। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাখো হাজার সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় বা আমাদের সাধারণ প্রচারমাধ্যমে তো দূরের কথা, আমাদের ইতিহাসেও স্থান পান না। অবশ্য দুর্দান্ত সাহসী গেরিলা রাইসুল ইসলাম আসাদ, এ টি এম মুনিরউদ্দীনের নাম যখন মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই, সেখানে সাধারণেরা স্থান পাবে না এ তো খুবই স্বাভাবিক। একটা গল্প বলি। আমার ছোটবেলার গল্প। আমার বাবা কাজী মাহমুদুর রহমানের লেখা একটি নাটক ‘বধ্যভূমিতে শেষ দৃশ্য’-এর শুটিং হচ্ছিল। প্রযোজনায় ছিলেন সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন। আমি খুব ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। ছিলামও খুব ছোট। কিন্তু স্মৃতিতে জ্বলজ্বলে হয়ে আছে একটি ঘটনার কারণে। যুদ্ধের মাঝে রাইসুল ইসলাম আসাদ বাড়িতে লুকিয়ে এসেছিলেন তার মা-বোনকে দেখতে। দেখতে পান সবাই মরে পড়ে আছে। আমার মনে আছে ঘরে ঢুকে রাইসুল ইসলাম আসাদ যখন দেখলেন আমরা বেঁচে নেই তখন তিনি পাগলের মতো কাঁদতে লাগলেন। শুটিং শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কেউ তার কান্না থামাতে পারেনি। প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা ধরে মানুষটি শুধু কেঁদেই গিয়েছিলেন। কাঁদছিলেন, শুধুই কাঁদছিলেন। এই ছিল আমাদের যোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাদের কাছে এতটাই আবেগ আর ভালোবাসার। মুক্তিযুদ্ধ যেমন একদিনে হয়নি, পেছনে আছে দীর্ঘ ইতিহাস, তেমনি জঙ্গিবাদ এই সমাজে, রাষ্ট্রে, গোটা বিশ্বে একদিনে জেঁকে বসেনি। ধাপে ধাপে তারা অগ্রসর হয়েছে। ’৭১-এ পরাজিত হয়ে আবারও ফিরে এসেছে ছদ্মনামে, ছদ্মপরিচয়ে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। রাজনীতি বোঝার আগেই এই দুর্ধর্ষ সাহসী মানুষেরা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পৃথিবীকে চেনার আগেই তারা নিষ্ঠুরতা দেখেছিলেন। শুধু ভালোবাসার প্রবল টানে জীবন বাজি রেখে ঘর ছেড়ে বের হয়ে এসেছিলেন। তাদের লড়াই ছিল ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার লড়াই। লড়াই ছিল দেশের অস্তিত্বের লড়াই। আর আজ পৃথিবীকে চেনার আগে, ভালোবাসার আগেই কিছু তরুণ জড়িয়ে পড়ছে সন্ত্রাসে, জঙ্গিবাদে, জড়িয়ে পড়ছে নিষ্ঠুরতায়। পৃথিবীতে টেনে আনছে নির্মমতা। ঘর, দেশ, পুরো বিশ্বই তাদের কাছে তুচ্ছ। অতি তুচ্ছ মানব জাতি! ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে বাস করত ছোট্ট একটি পরিবার। কৃষক পরিবার। স্বামী, স্ত্রী আর ছোট একটি ছেলে। সহায়-সম্ব্বল কিছুই ছিল না তাদের। হাতেগোনা ৪-৫টি মুরগি ছিল তাদের সম্পদ। তারা তাদের এক কক্ষের কুঁড়েঘরটি ছেড়ে দিতে দ্বিধা করেনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। দ্বিধা করেনি তাদের সাকল্যে সম্পদ মুরগি কেটে অভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষুধার জোগান দিতে। কৃষকের ইচ্ছা ছিল যুদ্ধে যাওয়ার। কিন্তু কোলের সন্তানের চিন্তায় সরাসরি অস্ত্র ধরা সম্ভব হয়নি, হয়তোবা সাহসও হয়নি। কিন্তু অস্ত্র হাতে যুদ্ধে না গেলেও সত্যের পক্ষে ছিলেন, যোদ্ধাদের পক্ষে ছিলেন। আড়ালে থেকে সাহস, আশ্রয় জুগিয়ে গেছেন যোদ্ধাদের। এই তো ছিল বাংলাদেশ। এই তো ছিল মুক্তিযুদ্ধ। চিত্র কেন বদলে গেল! চিত্র কি বদলেছে আদৌ? না আমরা সমাজের শতকরা পাঁচ ভাগের পরিবর্তনের আশঙ্কায় ভীত। কিন্তু মাত্র এই পাঁচ ভাগের ধ্বংসের রূপ কি আমরা ’৭১-এ দেখিনি! গেরিলা যোদ্ধা এ টি এম মুনিরউদ্দীন বলছিলেন, ঘরের শত্রু বিভীষণ হলে আপনি ঘর রক্ষা করবেন কীভাবে! ’৭০-এর নির্বাচনে যখন বঙ্গবন্ধু জয়লাভ করেছিলেন, কিন্তু সে সময়ও তো পঁচিশ-ত্রিশ ভাগ মানুষ তাকে ভোট দেয়নি। এই পঁচিশ-ত্রিশ ভাগ আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। ছদ্মনামে, ছদ্মপরিচয়ে। কিন্তু সাত নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামানের কন্যা লুবনা মরিয়মের মত ভিন্ন। তার মতে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই সন্ত্রাসবাদের কোনো মিল নেই। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর উত্পত্তি। বহিঃশক্তির ভূমিকা এখানে মুখ্য। কিন্তু গেরিলা যোদ্ধা কর্নেল (অব.) তৌফিক রুদ্ধকণ্ঠে বলেন তার জীবনের গল্প। মুক্তিযোদ্ধাদের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনটি মেডেল দেওয়া হয় তাকে। ওয়ার মেডেল, ভিক্টোরি মেডেল, কনস্টিটিউশন মেডেল। লাঠি ঠেকিয়ে তার গায়ে পরিধান করা মেডেলটি পরিহাস করে তার নিজের ফোর্সের জেনারেল তাকে বলেছিলেন, এগুলো কেন তোমরা লাগাও? এই দুর্দান্ত সাহসী যোদ্ধাও একসময় কুণ্ঠিত হয়ে লজ্জা পেতেন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে। লুবনা মরিয়মের যুক্তি, বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকা না থাকা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক বিভাজন, সমাজতন্ত্রের ডিসকোর্সকে বাতিল করে ধর্মের ডিসকোর্সে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেখানেই, যেখানে দেশ, মানুষ, সমাজ, পরিবারে ভালোবাসার বন্ধন থাকে, আত্মার বন্ধন থাকে, বৈশ্বিক রাজনীতির ওয়াহাবিজম বলি আর উন্মত্ততা বলি তা প্রবেশ করবে কীভাবে? সবই কি এককাতারে পোস্ট আইডলজিক্যাল যুগের নাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? যদি আমাদের দুর্বলতা থেকে না থাকে? ইঞ্জেক্ট করার জন্য শিরা তো লাগবে! কর্নেল তৌফিক একটি গল্প বলছিলেন। লে. কর্নেল হায়দারের গল্প। এই বীরউত্তমকে ভারতীয় দালাল বলে অভিযুক্ত করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থানে লে. কর্নেল হায়দার ও খালেদ মোশাররফকে মেরে ফেলা হয়। স্বাধীনতার পরে সম্ভবত জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কর্নেল তৌফিক একটি জি থ্রি রাইফেল পাকিস্তান আর্মির এক পাঠান সৈন্যের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলেন। ওটা তার হাতে ছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তার হাতে রাইফেলটি দেখে ভারতীয় কর্নেল তাকে প্রশ্ন করেন এবং রাইফেলটি ভারতীয় আর্মির কাছে ফেরত দিতে বলেন। ক্লাস টেনের ছাত্র ছিলেন তখন কর্নেল তৌফিক। তিনি লে. কর্নেল হায়দারের শরণাপন্ন হন। সে সময় তিনি মেজর হায়দার হয়েছিলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তৌফিক তুমি যুদ্ধ করে রাইফেল পেয়েছ। তুমি সেই রাইফেল সারেন্ডার করবে বাঙালি আর্মির কাছে। তুমি দেবে না। ভারতীয় কর্নেল জোর করতে থাকলে তিনি আবার লে. কর্নেল হায়দারের শরণাপন্ন হন। কর্নেল হায়দার বলে ওঠেন, তোমাকে ট্রেনিং দেইনি? গুলি চালাতে জান না? দরকার হলে গুলি করবে। কিন্তু অস্ত্র দেবে বাংলাদেশের আর্মির কাছে। অথচ এই লোকটাকে মেরে ফেলা হয়েছে ভারতীয় দালাল বলে। মেরে ফেলা হয়েছে খালেদ মোশাররফকে। ’৭২-২০১৭ কতজন মুক্তিযোদ্ধা মারা গেছেন, কীভাবে মারা গেছেন আদৌ কি প্রকৃত তদন্ত হয়েছে? নাকি রাজনীতির জটিল ঘোরপ্যাঁচে ধামাচাপা পড়ে আছে? লুবনা মরিয়মের মতে, এসব জটিল রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি রাজনীতি থেকে বিযুক্ত থাকতে চান। কিন্তু সবই কি জটিল রাজনীতি? সবই কি ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ? জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধ শক্তি সব একসূত্রে গাঁথা না প্রতিটির গাঁথুনি আলাদা তা আমরা জানি না। সাধারণ মানুষ আমরা, এত শত বুঝি না। শুধু বুঝি দেশটাকে একটু একটু করে পোকায় কাটছে আবারও। সে পোকা ঘুণপোকার মতো অতীতে ঘাঁটি গেড়ে চুপটি করে লুকিয়ে ছিল, নাকি বাইরের হাওয়ার ঝাপটায় ছড়িয়ে পড়ছে তা জানি না। শুধু জানি, একটা ওষুধ চাই। যে ওষুধ ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্ব্বরের মতো বিজয় এনে দেবে। পোকামুক্ত করবে বাংলাদেশকে। আত্মঘাতী নয়, বোমা হামলা নয়, ভালোবাসার বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। একসময় পাকিস্তান আমাদের নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। আমরা যুদ্ধ করে ওদের নিকৃষ্টতা দেখিয়ে দিয়েছি। এখন কি পারব না আমরা সংখ্যায় নগণ্য কিছু মানুষের হামলাকে রুখতে, ওদের নিকৃষ্টতা তুলে ধরতে? কেন যেন আজ খুব বলতে ইচ্ছা করছে গেরিলা যোদ্ধা এ টি এম মুনিরউদ্দীনের কবিতাটি—

ভালোবাসি সাগরের পানি

স্নান অবিরাম ঢেউয়ের মাথায়।

ভালোবাসি নদীর পানি

নৌ বিহারে যখন যেথায়।

ভালোবাসি পুকুরের পানি

বড়শিতে মাছ ধরা।

ভালোবাসি কুয়োর পানি

প্রতিচ্ছবি দেখা।

ভালোবাসি বন্যার পানি

ঝঞ্ঝার মাঝে বাঁচতে।

ভালোবাসি বৃষ্টির পানি

পিয়াকে বুকে আঁকড়ে।

ভালোবাসি ঝর্ণার পানি

গতির সুখের ধ্বনি,

ভালোবাসি কিনা আজো জানি না

নিজের চোখের পানি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, নিউজটোয়েন্টি ফোর। 

-বাংলাদেশ প্রতিদিন

০৩ এপ্রিল, ২০১৭ ০৮:১৭:৩৪