আদি এবং আসল কাউয়ানামা!
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
বসন্তপুর গ্রামের গেদির মা সেদিন সাত সকালে চিৎকার, চেচামেচি এবং গালমন্দ করে পুরো পাড়া অস্থির করে তুলল। তার গালাগালের সুর ও ঘটনার বিবরণ শোনার জন্য উৎসুক ছেলে-বুড়ো জড়ো হয়ে বলতে লাগল, ও গেদির মা! কি হয়েছে চুপা চালাইতেছ ক্যানে। গেদির মায়ের ওসব দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে এক নাগাড়ে বলেই যাচ্ছে, ওরে কাউয়ার বাচ্ছা কাউয়া তোর গুডি অবে, কলেরা অবে, তুই একটা হাড়ে হারামজাদা, তোর বাহে হারামজাদা, তোর মাৃ

গেদির মায়ের কান্নাকাটি থেকে গ্রামবাসী যা জেনেছিল তা হলো সারাদিন ভিক্ষে করে সে যে দু-চার পয়সা উপার্জন করে তা সে একটি পুটলি বেঁধে চোরের ভয়ে নিজের কুঁড়েঘরের খড়ের চালে গুঁজে রাখে। একটি কাউয়া এসে সেই পুটলিটি গেদির মায়ের চোখের সামনে লুট করে নিয়ে যায়। বহু বছরের পুরনো সেই কাউয়া কাহিনীটি আজ হঠাৎ করেই মনে এলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার কাউয়া কাহিনী শোনার পর। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, তার দলে কাউয়া ঢুকে পড়েছে। তিনি অবশ্য কাউয়া আগমনের কার্যকারণ বলেননি। অর্থাৎ কাউয়াগুলোকে কি ভাত-মুড়ি বা অন্য কোনো খাদ্যদ্রব্য ছিটিয়ে প্রলোভন দেখিয়ে আনা হয়েছে, না কি ওরা ওদের স্বভাবমতো নিজেরাই উড়ে এসে জুড়ে বসেছে।

কাউয়ার স্বাভাবিক স্বভাব হলো উচ্চস্বরে কা কা শব্দে সবার মনে বিরক্তি ধরিয়ে দেওয়া। পাখিগুলোকে বলা হয় প্রকৃতির ডাস্টবিন বা আবর্জনা স্তুপ। কাউয়া খায় না এমন কোনো বস্তু নেই কেবল নিজেদের মাংস ছাড়া। সকল ধরনের আবর্জনা, নাড়ি-ভুড়ি, বর্জ্য, ময়লা, খড়কুটা থেকে শুরু করে কয়লা পর্যন্ত অনায়েশে সবকিছু তারা গলধঃকরণ করতে পারে। সকল প্রাণীর বর্জ্য খেতেও তারা অরুচিতে ভোগে না। মানুষের অঙ্গরাগ তারা যে শিল্পসম্মত পদ্ধতিতে খায় তা রীতিমতো কৌতুহল, উদ্দীপক এবং গবেষণার বিষয়।

কাউয়ারা প্রচ- দলবাজ প্রকৃতির পাখি। তারা স্বজাতিকে প্রচ- ভালোবাসে। মানুষ বা প্রকৃতির অন্যকোনো প্রাণী কোনো কাউয়ার প্রতি আক্রমণ চালালে শতশত কাউয়া দল বেঁধে আক্রমণকারীর ওপর হামলা চালায় এবং শত কণ্ঠে কা কা কা আওয়াজ তুলে প্রতিবাদ জানায়। কাউয়ার মলত্যাগের বিষয়টি খুবই নোংরা এবং ভব্যতা বিবর্জিত। তারা গাছের ডালে বসে প্রাকৃতিক কর্মটি সারতে গিয়ে একবারও ভাবে না যে, ওগুলো কার মাথায় পড়ল।

এবার প্রকৃতির কাউয়া এবং আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী কাউয়ার মধ্যে কি কি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তা আলোচনা করা যাক। প্রকৃতির কাউয়ার মতো ওরা বর্জ্য-আবর্জনা, মলমূত্র কিংবা পচা নাড়ি-ভুড়ির পরিবর্তে সবসময় ফুলের মধু, দুধের স্বর, মাখন, বড় মাছের মুড়ো, মুরগীর রান, ইত্যাদি উৎকৃষ্ট জিনিস খেয়ে থাকে। তারা গেদির মায়ের ভিক্ষের ধন চুরি করে না। তারা বড় বড় ডাকাতদের লুটপাটে ভাগ বসায় অথবা সুযোগ পেলে নিজেরাই বড় বড় ডাকাতি করে বসে। প্রকৃতির কাউয়ার মতো তারা মানুষকে ভয় পায় না এবং ঝোঁপে-ঝাড়ে ডাল পালায় বসবাস করে না। বরং বড় বড় অট্টালিকা বানিয়ে এমন রবে কা কা করে যার শব্দে পাগল হয়ে মানুষজন বন-বাঁদাড় বা ঝোঁপ-ঝাড়ে পালানোর কথা ভাবে।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, কাউয়া এলো কিভাবে সেক্ষেত্রে তারা হয়তো বলবেন, আমরা ডাকিনি, ভাত ছিটাইনি। ওরা ওদের চিরায়ত স্বভাব দোষে উড়ে এসেছে বর্জ্য খাওয়ার জন্য। তারপর যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনাদের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, নিজেদের বর্জ্য পরিষ্কার করার মতো অবস্থা নেই এবং কাউয়ারা এসে দিব্যি সেগুলো খেয়ে-দেয়ে আপনাদেরকে মাখিয়ে-মুখিয়ে একাকার করে ছাড়ছে অথচ মুখ দিয়ে বলতে পারছেন না, এই কাউয়া হুস!

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

২৯ মার্চ, ২০১৭ ১১:০৫:১১