শিক্ষকই শিক্ষক পেটায়!
জাহিদুল হক
অ+ অ-প্রিন্ট
সকাল বেলায় লালমনিরহাটে আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মীর হাতে একজন প্রধান শিক্ষকের মার খাওয়ার অভিযোগ সংক্রান্ত খবর পড়ে কিছু লিখব ভাবছিলাম৷ এরই মধ্যে চোখে পড়ল দু’দিনের পুরনো আরেকটি খবর৷ সেটি আরও দুঃখজনক৷

সোমবার প্রকাশিত ঐ খবর বলছে, ঠাকুরগাঁওয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে নাকি গাছে বেঁধে পিটিয়েছেন তাঁরই স্কুলের প্রধান শিক্ষক! সংবাদটি পড়ে প্রথমে বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ তাই আবার পড়েছি৷ কারণ আমি নিজে একজন শিক্ষকের সন্তান হওয়ায় একজন শিক্ষক তাঁর সহকর্মীকে পেটাতে পারেন, তা আমার কল্পনাতেও ছিল না৷ হয়ত এই ‘ট্রেন্ড’ আগেই চালু হয়েছে৷ আমি জানতাম না৷

ঠাকুরগাঁওয়ে যে শিক্ষককে পেটানো হয়েছে তাঁর দোষ ছিল যে, তিনি নাকি চলতি শিক্ষাবর্ষের ক্লাস রুটিন তৈরির সময় প্রধান শিক্ষককে (যাঁর বিরুদ্ধে ঐ শিক্ষককে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে) ইংরেজির ক্লাস দিয়েছিলেন৷ এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন ঐ প্রধান শিক্ষক৷ কী অদ্ভুত কারণ রে বাবা!

এই কারণে যদি একজন শিক্ষককে প্রহার করা যায় তাহলে, সেই তুলনায় লালমনিরহাটে পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে না চাওয়ায় আওয়ামী লীগের কর্মীরা যে প্রধান শিক্ষককে পিটিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেটাতো বরং অন্তত যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে৷

এর আগে পুলিশ, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, সাংসদ সহ অনেকের বিরুদ্ধে শিক্ষক প্রহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে৷ এছাড়া নারায়ণগঞ্জের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে উঠবস করাতে বাধ্য করেছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান৷

এতক্ষণ লেখার পর ভাবছি কীভাবে শিক্ষকদের অবস্থা এই পর্যায়ে নেমে এল৷ একমাত্র শ্যামল কান্তি স্যারের ঘটনায় নাগরিকদের দেখেছি সোচ্চার হতে, অন্তত সামাজিক মাধ্যমে৷ কিন্তু অন্য ঘটনাগুলো শুধু খবর হয়েই শেষ হয়েছে৷ হয়ত এর একটি কারণ হতে পারে, শ্যামল স্যারের ঘটনার ভিডিও দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যমে৷ আর অন্যগুলোর কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে শুধু স্থিরচিত্রই পাওয়া গেছে৷ সংবাদের বাইরেও নিশ্চয় শিক্ষক পেটানোর ঘটনা ঘটেছে, যা আমরা জানতে পারি না৷

এই সব ঘটনায় মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, শিক্ষক পেটানো আসলে তেমন কোনো বিষয় নয়৷ এটা আর অন্য দশটা ঘটনার মতোই ‘মামুলি’ ব্যাপার৷ কিন্তু একটা সময় ছিল, শিক্ষক মানেই ছিলেন অসম্ভব সম্মানিত কেউ একজন৷ এখন সেই ব্যাপারটি আর নেই৷

কেন এমন হলো? কারণ অনেকগুলো৷ এর জন্য শিক্ষকরাও কিছুটা দায়ী৷ কেননা বর্তমানে শিক্ষকরা শিক্ষা দান ছাড়াও সরাসরি রাজনীতি করেন, নয়ত রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন৷ বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য হয়ত এসব প্রয়োজন৷ কিন্তু এতে করে যা হচ্ছে তাতে শিক্ষকের সম্মান দিন দিন কমে যাচ্ছে৷ আগে যেখানে রাজনীতিবিদরা শিক্ষকদের সম্মান করতেন, এখন শিক্ষকরাই যেহেতু বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন, তাই রাজনীতিকরাও আর আগের মতন শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ কেউ মনে করছেন না৷

এছাড়া রাজনৈতিক কর্মীরাও এখন ক্ষমতার জোরে শিক্ষক হচ্ছেন, অযোগ্য লোকরাও টাকা দিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসছেন৷ অর্থাৎ শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও অনেকে এখন শিক্ষক হচ্ছেন৷ ফলে তাঁরা শিক্ষকতা পেশার যে ‘ওজন' তা ধরে রাখতে পারছেন না৷ উপরন্তু নিজেরা নিজেরা মারামারি করে শিক্ষার্থীদের সামনে খারাপ উদাহরণ তুলে ধরছেন৷ এছাড়া কোনো শিক্ষককে পেটানো হলে যে প্রতিবাদ করতে হবে, সেটিও করতে দেখা যায় না বিভিন্ন দলের অনুসারী এসব শিক্ষকদের৷

এবার আসি শিরোনামের কথায়৷ আপনার কী মনে হচ্ছে যে, এমন শিরোনাম দিয়ে আমি ‘অন্যদের’ দোষ ঢাকার চেষ্টা করছি? আসলে খুব দুঃখ পেয়ে কথাটি লিখেছি৷ চোখের সামনে শিক্ষকদের সম্মানিত হতে দেখেছি এই মাত্র কয়েক বছর আগেও (নির্দিষ্ট করে বললে নব্বইয়ের দশকে)৷ কিন্তু এখন তাঁদের এই অবস্থায় দেখতে কষ্টই লাগছে৷ আমি চাই, যেভাবেই হোক শিক্ষকরা আবার তাঁদের সেই আগের মর্যাদাকর অবস্থানে ফিরে যান৷ সেটা সম্ভব কিনা, তা অবশ্য জানা নেই৷ -ডয়েচেভেলে

২৭ জানুয়ারি, ২০১৭ ০৭:৪০:৩৮