তিনি যে ভাব ধরেছেন তা বুঝবেন কিভাবে?
গোলাম মাওলা রনি
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রকৃতির সব সৃষ্টিই মাঝে মধ্যে ভাব ধরে। স্থান কাল পাত্র ভেদে অনেক সৃষ্টিই তাদের রূপ বদলায়। আকাশের রংধুন, গোধূলিলগ্নের উড়ন্ত পাখিদের কলকাকলি, সকালের শিশিরবিন্দু মাখানো সদ্য প্রস্ফুটিত ফুল কিংবা কিশোরীকন্যার ক্ষণে ক্ষণে হেসে ওঠার মধ্যে যে প্রকৃতিপ্রদত্ত রূপ-মাধুর্য এবং ভাবগাম্ভীর্য ফুটে ওঠে- তা নিয়ে আজ আলোচনা করব না। আজ বলব কিছু মানুষের হঠাৎ বদলে যাওয়ার গতি ও প্রকৃতি নিয়ে। পদ-পদবি, ক্ষমতা এবং অর্থবিত্তের কবলে পড়ে কিছু মানুষ হঠাৎ ভাব ধরেন। তারা সর্বশক্তি নিয়ে নিজেদের এমনভাবে বদলে ফেলার চেষ্টা করেন, যাতে তার আশপাশের লোকজন, প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে শুরু করে আপন আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত বেকুব হয়ে যান।

আজকের নিবন্ধে আমরা সবার আগে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব মানুষজনের হঠাৎ বদলে যাওয়া বা ভাব ধরার কারণ সম্পর্কে। তারপর বলব ভাব দেখানো ভদ্রলোকেরা নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতি এবং তার দ্বারা সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে। ভাব ধরা মানুষটির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়গুলো বলার আগে তিনি যে ভাব ধরেছেন তা বোঝার নিয়ামকগুলোও ব্যাখ্যা করা আবশ্যক। মানুষের মধ্যে একটি অংশ যেমন ভাব ধরেন, তেমনি প্রকৃতির নিকৃষ্ট প্রাণীদের মধ্যেও প্রায়ই ভাবসাবের লক্ষণ দেখা যায়। বিষধর সাপের প্রেম-প্রণয়, আত্ম-অভিমান এবং নির্বুদ্ধিতার ভাবসাব নিয়েও কিছু আলোচনার চেষ্টা করব, যার মাধ্যমে শিরোনামের বিষয়বস্তুর সার্থকতা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।

মানুষ যখন অযাচিতভাবে কোনো কিছু পেয়ে যায়, তখন তার নিজের মধ্যে একধরনের অহংবোধ এবং ছলচাতুরীর নেশা প্রবল হয়ে ওঠে। অনৈতিক অর্থ, পদ-পদবি এবং ক্ষমতা লাভের পর মানুষ সবার আগে নিজের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি আশপাশের সব কিছুর ওপর থেকে ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা হারাতে থাকেন। তিনি কাউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। কৃপণতা, দাম্ভিকতা ও বালখিল্যময় ক্রীড়া-কৌতুক ও আচরণ তার প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে। নিজের অর্জনের পেছনে পর্যাপ্ত শ্রম, মেধা ও বিনিয়োগ না থাকার কারণে দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তিনি নিজেই বিশ্বাস করতে পারেন না যে, তার কিছু একটা অর্জন হয়েছে। পরবর্তীকালে তিনি যখন অনুভব করেন যে, তার অর্জনটি বেশ মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ, তখন তিনি তা হারানোর ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি কিছু লোককে রক্ষক বানিয়ে ফেলেন এবং কিছু লোককে কল্পনাপ্রসূতার আশ্রয় নিয়ে শত্রু বানিয়ে ফেলেন।

মিথ্যা রক্ষক এবং মিথ্যা শত্রু সৃষ্টির পর তিনি তার আশপাশের সবাইকে এ কথা বিশ্বাস করানোর জন্য পাগল হয়ে ওঠেন যে, তার অর্জনটি ন্যায়সঙ্গতভাবে অর্জিত হয়েছে এবং তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা বা দক্ষতার কাছে অর্জনটি আসলেই তুচ্ছ। তিনি নিজেকে অভিজাত প্রমাণের জন্য সব রকম চেষ্টা-তদবির করার পাশাপাশি নিজেকে হঠাৎ বদলে ফেলেন। তার অত্যন্ত নিকটজন হঠাৎ একদিন লক্ষ করেন, লোকটি কেমন যেন অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। তার মধ্যে সরলতা, স্বাভাবিকতা এবং মানসিক সুস্থতার অকৃত্রিম লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে আরম্ভ করে। তিনি তার দীর্ঘ দিনের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন এবং সমাজ-সংসার ত্যাগ করে সব কিছু নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি তার জন্মদাতা-দাত্রী, স্ত্রী পুত্র-কন্যা বা স্বামী পুত্র-কন্যা এবং জনগণকে নিজের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন এবং হীনতর বলে বিশ্বাস করতে আরম্ভ করেন।

আপন এবং পরিচিত লোকজনকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবে অথবা তাদেরকে ভয় দেখানোর ভাঁওতাবাজি করার জন্য লোকটি ক্ষণে ক্ষণে নানান ধরনের ভণ্ডামিমূলক ভাব ধরার চেষ্টা করেন। কখনো-সখনো তিনি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যান এবং হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে রাগ দেখানোর চেষ্টা করেন। কেউ কেউ অতি মাত্রার ধার্মিক সাজেন, আবার কেউ কেউ সরাসরি নাস্তিক হয়ে নিজেকে আধুনিক প্রমাণের অপচেষ্টা করেন। কেউ কেউ ক্লাব, মদ, জুয়া, আড্ডা, খানা-পিনা- মৌজ-মাস্তি ইত্যাদিতে মেতে ওঠেন। অনেকে মাতৃভাষা রেখে বিদেশী ভাষায় কথাবার্তা বলাসহ বিদেশীদের সাথে বন্ধুত্ব করে নিজের বিশেষত্ব প্রমাণের অপচেষ্টা করেন। তাদের খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা-বিশ্রাম, ভ্রমণ-বিলাসিতা ইত্যাদিতেও বিকৃতি চলে আসে। স্বগৃহ ত্যাগ এবং স্বদেশভূমি ত্যাগ করে বিনা কারণে ভিনদেশে ভ্রমণ এবং পরের বাড়িতে রাতযাপনকে তারা একধরনের সফলতা বলে ধ্যানজ্ঞান করতে থাকেন। 

ভাব দেখানো লোকজন দ্বীন-দুনিয়ার জন্য মস্তবড় এক আপদ এবং ক্ষেত্রবিশেষে বালা-মুসিবতের উপকরণ হিসেবে কাজ করে। তিনি সৃষ্টিকুলের জন্য যতটা না বিপত্তির কারণ হয়ে দাঁড়ান, তার চেয়ে ভয়ঙ্কর বিপত্তি সৃষ্টি করেন নিজের জন্য এবং নিজ পরিবারের জন্য। সব সময় ভাব ধরে থাকার দরুন তার চরিত্রে একধরনের লুকানো-ছাপানো কিংবা পলায়নপর প্রবৃত্তির সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় বেশি দিন চললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আত্মায় পচন ধরে। তার হতাশা, মনোরোগ এবং চারিত্রিক স্খলন একাকার হয়ে তাকে অদ্ভুত এক জটিল প্রাণী বানিয়ে ফেলে। তিনি সমাজ-সংসারের খেলতামাসার বস্তুতে রূপান্তরিত হয়ে পড়েন। তার চিন্তাশক্তি রহিত হয়। হৃদয়-মন ও শরীর অভ্যন্তরে অসংখ্য ক্ষত সৃষ্টি হয়। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তিনি খুব দ্রুত একাকী এবং বন্ধুহীন হয়ে পড়েন। তার চার পাশে নিয়োজিত ভাড়াটিয়া শুভার্থী ও সুখের পায়রাদের কলকাকলিও বেশি দিন থাকে না। 

সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সব প্রাণী, উদ্ভিদ এমনকি জড় পদার্থও ভাব দেখানো লোকজনের কবলে ক্ষতির শিকার হয়ে পড়ে। তারা স্বাভাবিক মানবিক উষ্ণতা নষ্ট করে দেয় এবং সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন আলগা করে ফেলেন। ক্ষেত্রবিশেষে তারা সম্পর্কগুলো ছিন্ন করে দেন। তাদের দুর্ব্যবহার, আক্রমণ ও জুলুম-নির্যাতনে মানুষ হতোদ্যম হয়ে পড়ে। অনেকের জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। কেউ কেউ কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে বৈরাগ্য বরণের জন্য উপায় খুঁজতে থাকেন। আশপাশের মানুষজন-জন্তু-জানোয়ার থেকে শুরু করে বৃক্ষ, লতা কিংবা জড় আসবাবপত্র ইত্যাদির সাথে মেজাজ দেখানো তাদের একধরনের স্টাইলে পরিণত হয়। তারা কোনো কিছু গড়ার চেয়ে তা ধ্বংস করার মধ্যে নিজেদের কৃতিত্ব খুঁজে বেড়ান। তাদের কথা-কর্ম, ওয়াদা, সময়জ্ঞান, শৃঙ্খলাবোধ, নীতি-নৈতিকতাবোধ, মানবিকতা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মধ্যে কোনো সমন্বয় থাকে না। ফলে সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে পড়ে।

ভাবে ধরা লোকজনের কবল থেকে নিজেদের কিভাবে রক্ষা করবেন তা জানার আগে আপনার উচিত লোকটির আচার-আচরণ ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে নেয়া। তিনি যে ভাব ধরেছেন তা বোঝার জন্য একটু মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকান। প্রথমেই আপনি তার পোশাক-আশাক ও অলঙ্কারাদির মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখতে পাবেন। গাদ্দাফির বিশেষ ধরনের পোশাক এবং সাদ্দাম হোসেনের কোমরে সব সময় পিস্তল গুঁজে রাখার অভ্যাসটিকে আপনি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এরপর আপনি তাদের অঙ্গভঙ্গির দিকে লক্ষ করুন। ঘাড় দোলানো, একটু কাত হয়ে কথা বলার অভ্যাসের পাশাপাশি, আঙুল উঁচিয়ে, হাত নেড়ে এবং পা দুলিয়ে তারা সর্বদা একধরনের চঞ্চলতা প্রকাশের চেষ্টা করে থাকেন।

আপনি যদি দুর্ভাগ্যক্রমে নিজের কোনো প্রয়োজনে তার কাছে উপস্থিত হন তাহলে প্রথমেই লক্ষ করবেন, তিনি খুব গম্ভীর হয়ে আছেন। আপনি যদি তার পরিচিত হন এবং আপনার প্রয়োজনটি যদি তার জানা থাকে সে ক্ষেত্রে সে এমন ভাব নেবে যা দেখে আপনার মনে হবে, তিনি আপনাকে কোনোকালে চিনতেনই না। আপনি যখন অনুনয়-বিনয় বা কাঁইকুঁই করে বেহায়ার মতো নিজের প্রয়োজনটির কথা বলবেন, তিনি তখন হঠাৎ করেই ব্যস্ত হওয়ার ভান করে কোনো জরুরি কাগজপত্র খোঁজার চেষ্টা করবেন। অথবা টেলিফোনে কারো সাথে কথা বলার চেষ্টা করবেন। তার ভাবটা যদি একটু বেশি ভণ্ডামির পর্যায়ে পড়ে তবে তিনি আপনাকে কিছু সময়ের জন্য বাইরে যেতে বলবেন। এরপর বহুক্ষণ অপেক্ষার পর আপনি যখন পুনরায় তদবির করে তার সামনে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পাবেন, তখন নতুন করে আপনাকে আপনার বক্তব্য হুজুর সমীপে পেশ করতে হবে।

তিনি যে ভাবে আছেন তা আপনি বুঝতে পারবেন তার অফিস বা বাসস্থানের দর্শনার্থীদের দুরবস্থা দেখে। টেবিলের ওপর সারি সারি ফাইল, বাইরে দর্শনার্থীদের তুমুল লাইন এবং তার পিয়ন-ড্রাইভার ও দারোয়ানের নবাবী ভাবসাব। নিষ্ঠুর আচরণ এবং দুর্নীতি ও লোভের জিহ্বা বিষাক্ত সাপের মতো বারবার বের করার দৃশ্য দেখে আপনি বুঝে নেবেন যে, সেখানে বিরাট এক ভাবের হাট বসেছে। ভাবে ধরা লোকটি কখন অফিসে আসবেন কিংবা কখন চলে যাবেন তা যেমন আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারেন না, তেমনি তার বাসস্থানে উপস্থিতি ও অবস্থানের খবর আসমানে থাকে। তিনি সর্বদা হাতি-ঘোড়া, বাঘ-সিংহ শিকারের ধান্ধায় থাকেন এবং রাজা-বাদশাহ-আমির-ওমরাহদের সাথে বাক বা টেলিফোনে আলাপে ব্যস্ত থাকেন। তার কাছে উপস্থিত হলে আপনি বড় বড় মানুষের সাথে তার কিছু ছবি দেয়ালে ঝুলানো দেখবেন। কথার ফাঁকে তিনি হাত নাড়িয়ে নিজের দামি হাতঘড়ি, আঙুলে পরিহিত বড় পাথরের অঙ্গুরি, শার্ট-প্যান্ট, স্যুট ও টাই ওলটপালট বা নাড়াচাড়া করে ওগুলোর ব্র্যান্ড প্রদর্শনের চেষ্টা করবেন।

ভাবের কবলে পড়ে তিনি খুব বেশি স্ত্রীপ্রেমিক অথবা স্বামীপ্রেমিক হয়ে পড়বেন। স্ত্রী যদি গ্রাম্যমনা হন এবং তার নাম যদি শেফালি থাকে তবে- তিনি আদর করে স্ত্রীকে শেলী বলে ডাকবেন। তারা আধুনিকতার নামে প্রচুর বন্ধু ও বান্ধবীর সমাবেশ ঘটাবেন এবং তদসংক্রান্ত লজ্জা-শরম-হায়া ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেবেন। নিজেদেরকে অভিজাত, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী প্রমাণ করার জন্য এমনসব আকাশ কুসুম গল্প ফেঁদে লোকজনকে শোনাবেন, যার সাথে সব কিছুর সংযোগ থাকবে কেবল সত্যবাদিতা ছাড়া। তারা নিজেদের দম্ভ অত্যাচার করার ক্ষমতা এবং অন্যের অনিষ্ট সাধনে দক্ষতা প্রমাণের জন্য এমন সব কুকর্ম করবেন যা দেখে স্বয়ং ইবলিসও তাদের থেকে এক শত হাত দূরে বসে গালে হাত দিয়ে কান্না শুরু করে দেবে।

ভাব দেখানো লোকদের কথা হবে এলোমেলো। তারা সকালে এক কথা বলবেন তো বিকেলে অন্য কথা। তারা কাজের চেয়ে কথা বলবেন বেশি- আবার কথার চেয়ে ফোঁসফাঁস করবেন আরো বেশি। তারা তুচ্ছ ঘটনায় হেসে গড়াগড়ি খাবেন এবং তার চেয়েও তুচ্ছ ঘটনায় অগ্নিমূর্তি ধারণ করে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে বসবেন। তারা স্বার্থের প্রয়োজনে আপনার পায়ে গড়াগড়ি খাবেন এবং রাতবিরাতে আপনার বাসাবাড়িতে ধরনা দেবেন। কাজ ফুরালে আপনাকে একটি আছাড় মারার জন্য তারা এক মিনিট সময়ও নষ্ট করবেন না। প্রতারণা, ছলচাতুরী, বাকচাতুর্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে আপনার অধিকার হরণ, আপনাকে অপমানিত করার এবং আপনার শেষ সম্বল ছিনিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তার দক্ষতা দেখে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না।

ভাবে ধরা মানুষের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবার আগে আপনার দরকার পড়বে একটি উন্নত চরিত্র, মেধাবী মস্তিষ্ক এবং নির্লোভ সাহসী মন। আপনি যদি প্রতিজ্ঞা করেন যে নীতি-নৈতিকতার স্বার্থে আপনি কোনো অবস্থাতেই ভাব দেখানো লোকজনকে পাত্তা দেবেন না এবং তাদের অন্যায় কর্মকে ঘৃণা করবেন, সে ক্ষেত্রে এই শ্রেণীর মানুষেরা সমাজে তেমন সুবিধা করে উঠতে পারবে না। আপনার বিরক্তিভরা চোখের চাহনি, ঘৃণায় ভরা অন্তর এবং অসহযোগিতার কারণে ওইসব লোকের ভাবসাব মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যাবে। তাদের অহঙ্কার ফুটা বেলুনের মতো চুপসে যাবে। আপনার প্রতিবাদের সামনে তারা ভেজা বিড়াল অথবা পানিতে চুবানো মুরগির মতো একদম কাহিল হয়ে পড়বে।

আপনি কেবল নিজের স্বার্থে ভাবে ধরা মানুষজনের বিরুদ্ধাচরণ করবেন না। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, দেশ-জাতি এবং তামাম মাখলুকাতের স্বার্থে আপনার উচিত সর্বশক্তি দিয়ে তাদেরকে প্রতিহত করা। আপনার এ ধরনের কর্ম জমিনে খোদায়ি বরকতের দ্বার খুলে দেবে এবং আপনি আল্লাহর রহমতের চাদর দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আচ্ছাদিত হয়ে পড়বেন। মানুষের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হলো প্রকৃতি। সে দিকে তাকালে আপনি ভাব দেখানো কয়েকটি নিকৃষ্ট প্রাণী দেখতে পারেন। এগুলোর মধ্যে বিষধর সাপ হলো অন্যতম। সাপের চরিত্র নিয়ে দুই-চারটি কথা বললেই আপনি আজকের শিরোনামের যথার্থতা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন।

প্রকৃতির সবচেয়ে বন্ধুহীন প্রাণীদের মধ্যে সাপ অন্যতম। এরা সব সময় অন্য প্রাণীদের তুলনায় স্বজাতিদের ভক্ষণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এরা কারণে-অকারণে ফোঁসফাঁস করে এবং বিনা কারণে কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়ে আক্রমণ করে বসে। এরা চোখে দেখে না বললেই চলে এবং জিহ্বা দ্বারা সব কিছু বিচার-বিবেচনা করে। এদের ক্ষুধা যেমন সীমাহীন তেমনি অভুক্ত থাকার ক্ষমতাও অতুলনীয়। প্রকৃতির কোনো প্রাণী তাদের সাথে খাতির করতে যেমন যায় না, তেমনি তাদেরকে তোয়াজও করে না। বরং সবাই তাদের এড়িয়ে চলে এবং সুযোগমতো তাড়িয়ে দেয়। ফলে তারা বনে-বাদাড়ে, ঝোপ-ঝাড়ে কিংবা গর্তের মধ্যে লুকিয়ে বড়ই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে।

সাপেরা প্রায়ই খোলস পাল্টিয়ে ফেলে। তাদের খোলসগুলোও কিন্তু বিষাক্ত। সব সাপই তাদের খাবার আস্ত গিলে খায়। এরা ভরা পূর্ণিমার উজ্জ্বল চন্দ্রালোকে নিজেদের ছায়ার আবছা মূর্তির ওপর ক্রমাগত দংশন করতে থাকে। তারা দীর্ঘ সময় নিয়ে সঙ্গম করে এবং সঙ্গমপূর্ব সময়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে উল্লাসনৃত্য করে। এরা প্রায়ই একা একা সম্পূর্ণ বিনা কারণে নিজের ওপর অভিমান করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকে এবং কখনো-সখনো অভিমান করে ছয় মাস পর্যন্ত অভুক্ত থাকে। সাপদের চলার গতি কখনো সরল হয় না। আঁকাবাঁকা গতিতে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে চলতে-ফিরতে গিয়ে সাপেরা যে কী সব চিন্তা করে তা আজ অবধি কোনো বিজ্ঞান আবিষ্কার করতে পারেনি। আর এসব কারণেই সাপকে সবাই ভয় পায়- এড়িয়ে চলে অথবা পরিহার করে এবং সামনাসামনি পড়ে গেলে মেরে ফেলে।

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৫২:১২