পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন
তসলিমা নাসরিন
অ+ অ-প্রিন্ট
স্কুলের পাঠ্যবইয়ে কোন লেখক বা কবির লেখা আমরা পড়ছি, সে লেখক হিন্দু বা মুসলমান- এ নিয়ে কোনো আলোচনা কোনও দিন আমার ছোটবেলায় শুনিনি। লেখাটি ভালো, লেখাটি শিশুদের মানসিক বিকাশে সাহায্য করবে, সেটিই সবাই দেখেছে। আজ একবিংশ শতাব্দীতে যখন পৃথিবীর আরো সভ্য হওয়ার কথা, আরো পরিণত হওয়ার কথা- পাঠ্যবইয়ের লেখা হিন্দুর লেখা নাকি মুসলমানের লেখা- এ নিয়ে মানুষ  কথা বলছে, মুসলমানের দেশে হিন্দুর লেখা কবিতা বা গল্প পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে দিতে হবে, এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশের এসব শিশুতোষ কাণ্ডকারখানা আমাকে বড় আহত করে। না, অবাক করে না। মানুষের অপকর্ম, অত্যাচার, অনাচার, নিষ্ঠুরতা, নির্বুদ্ধিতা জীবনে এত দেখেছি যে কোনও কিছুতে আজকাল আর অবাক হই না। তবে আহত হুই।  

সেদিন আজম খান নামের এক লোক ফেসবুকে লিখেছেন- ‘পাঠ্যপুস্তক থেকে হিন্দু, অজ্ঞেয়বাদী লেখকদের বই বাদ দেয়া হইলে জগদীশ চন্দ্র বসু কেন থাকবে? উচ্চ মাধ্যমিকে ইহুদি বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, নাসারা বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড, নিউটন, হালের স্টিফেন হকিংস এদের আবিষ্কার, লেখালেখিও বাদ দেয়া হোক। এসবের বদলে তাবিজ তুমার, পানি পড়া, জিন প্রেত, শয়তান আত্মা দূর করার সূরা কেরাত পড়ানো হোক। দেশের সমস্ত হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হোক। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ৯৯ ভাগ বই এই হিন্দু, ইহুদি, নাসারা, নাস্তিকদের। হাসপাতালে ডাক্তারদের জায়গায় মাদ্রাসা থেকে মৌলভী নিয়োগ দেয়া হোক। সূরা কেরাতের মাধ্যমে তারা মানুষ সুস্থ করুক। ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি যখন এতই ঘৃণা তখন তাদের আবিষ্কার, পরিশ্রমের সুবিধা ভোগ করার দরকার নাই। ঘৃণা করলে পুরাটা করেন। আধাআধি করার কোন দরকার নাই। ’

আজম খান কিন্তু সঠিক কথা বলেছেন। এর উত্তর কি সরকার দেবেন? হিন্দুদের মেরে মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। ভারত ভাগের সময় ছিল শতকরা তিরিশ ভাগ হিন্দু, আজ সেই সংখ্যা তলানিতে। হিন্দুর ওপর অত্যাচার রোধ করতে সরকার যদি উদ্যোগ নিত, কোনও হিন্দু মাতৃভূমি ত্যাগ করতো না।   সময় আসছে, একজন হিন্দুও বাংলাদেশে বাস করবে না। এ কি কোনও গৌরবের কথা? পাকিস্তান থেকেও হিন্দু সংখ্যা কমছে। মুসলমান হলেই কি হিন্দুবিদ্বেষী, ইহুদিবিদ্বেষী, ক্রিশ্চানবিদ্বেষী বা বিধর্মী বিদ্বেষী হতেই হয়?  তা না হলে ভালো মুসলমান হওয়া যায় না? মুসলমানদের এখন সময় আত্মসমালোচনা করার। তাদের ভাবতে হবে পনেরোশ’ বছর আগের চিন্তাভাবনায় নিজেদের আবদ্ধ রাখবে, নাকি নিজেদের যুগোপযোগী করবে? সব ধর্মকেই সব ধর্মের মানুষই কিছু না কিছু পরিবর্তন করে নিয়েছে। সব কিছুর মতো ধর্মেরও বিবর্তন হয়। ক্রিশ্চানরা এখন আর গির্জার শাসনে চলে না, তাদের সেই কুখ্যাত ইনকুইজিশানও আর নেই, ঈশ্বরকে কটাক্ষ করলে কাউকে আর খুন করা হয় না। ভারতেও হিন্দু নারীদের ওপর ধর্মের যে অত্যাচার ছিল, তা বন্ধ হয়েছে। নারী বিদ্বেষী ইহুদিরাও এখন বদলে গেছে, তারাও নারীর সমানাধিকারের পক্ষে এখন কথা বলে। যে কোনও সভ্য শিক্ষিত সচেতন মানুষই পরিবর্তন বা বিবর্তনের পক্ষে। কিন্তু আমরা সামনের দিকে না হেঁটে পেছনের দিকে হাঁটবো কেন? আমরা কেন সভ্যতার দিকে না এগিয়ে পেছনে বর্বরতার দিকে যাবো? হিন্দু বিদ্বেষ বা বিধর্মী বিদ্বেষ বাংলাদেশে শুধু মৌলবাদীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা ঠিক নয়। সরকারের মধ্যেই এর অস্তিত্ব বহাল তবিয়তে বিরাজ করতে দেখি। বাংলাদেশও কিন্তু ইসলামি আইনের কিছুটা পরিবর্তন করেছে। আরো পরিবর্তন দরকার, অথবা ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের আওতায় রেখে সমানাধিকারের ভিত্তিতে পারিবারিক আইন তৈরি করা উচিত। কত কিছুই তো উচিত। কিন্তু কত কিছুই তো আমরা দেখেও না দেখার, বুঝেও না বোঝার ভান করি। ভানটা, হিপোক্রেসিটা আজকাল বড় বেশি ।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এক সময় রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা যে কতটা ভয়ঙ্কর ছিল এবং ভুল ছিল, তা শাসকগোষ্ঠী অচিরেই অনুধাবন করতে পেরেছিল। আশা করি বাংলাদেশের সরকারও বুঝতে পারবে কোনও কবিকে মুসলমান না হওয়ার অপরাধে বা ইসলামে বিশ্বাস না করার অপরাধে পাঠ্যপুস্তক থেকে বের করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। একজন লেখক, সে যে-ধর্মের, যে-লিঙ্গের, যে-আদর্শের, যে-ভাষার, যে-দেশেরই হোক না কেন, তিনি যদি তাঁর লেখা দিয়ে আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, প্রাণিত করতে পারেন, চেতনাসমৃদ্ধ করতে পারেন, তবে তাঁর লেখা আমি যে করেই হোক পড়বো। তাঁর লেখা শুধু আমার নয়, সবার জন্যই প্রয়োজন। সরকারকে সাম্প্রদায়িক হওয়া মানায় না। যে জিন্নাহ ভারত ভাগের উদ্যোক্তা ছিলেন, মুসলমানদের হিন্দু থেকে আলাদা করেছিলেন, তিনিও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, তিনিও দ্বিজাতিতত্ত্বের বিপক্ষে বলেছিলেন।

পাঠ্যপুস্তকে, শুনেছি, ঢোকানো হয়েছে মুসলিম ধর্মগুরুদের জীবনী। এসব জীবনী পড়ে কিশোর-কিশোরীরা ইসলাম ধর্মে আকৃষ্ট হবে, নিশ্চিত। মানুষকে ধার্মিক বানানোই কি মূল উদ্দেশ্য, নাকি মানুষকে সৎ, নিষ্ঠ, আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাটাই প্রধান? ধর্ম সম্পর্কে সবারই জানা উচিত, শুধু নিজের ধর্ম নয়, অন্যের ধর্ম সম্পর্কেও। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কোনও রকম চেষ্টা কি আমরা করবো না? শুধু ধর্মগুরু ও তাদের বিবিদের জীবনী কেন, নিউটন, কোপারনিকাস, গ্যালিলিও, আইনস্টাইন, ভার্জিনিয়া উলফ, মেরি ওলস্টনঙ্ক্রাফট, সিমোন দ্য বোভোয়া- এদের জীবনী পড়াও তো দরকার। শুধু বাঙালি মনীষী কেন, বিশ্বের বড় বড় মনীষীর কথাও, তাঁরা কী বলেছেন, কী লিখেছেন, কী রকমভাবে জীবনযাপন করেছেন- সে সবও তো জানতে হবে। ছোট গণ্ডি থেকে বেরিয়ে পড়তে হবে বিরাট পরিসরে, শুধু বাংলাদেশের নয়,  হতে হবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সন্তান।

সারা পৃথিবীতে কট্টর মুসলমান আর সন্ত্রাসী মুসলমানের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষেপে উঠেছে। সাধারণ নিরীহ মুসলমানও মানুষের ঘৃণার শিকার হচ্ছে। এখন বাংলাদেশের মুসলমানকে কট্টর বা সন্ত্রাসী হওয়ার প্রেরণা না দিয়ে দিতে হবে সহিষ্ণু মানুষ হওয়ার প্রেরণা। বিশ্বের সবাইকে নিয়ে আমাদের বাস করতে হবে, বিধর্মীদের নিয়েও; শুধু মুসলমানদের নিয়ে বাস করার ইচ্ছে করাটা বোকামো। মুসলমানরা বিপদে পড়লে মুসলমানরা এগিয়ে আসে না, নিজের চোখেই তো দেখা হলো, সিরিয়ার শরণার্থীদের কোনও মুসলমান দেশ আশ্রয় দেয়নি, দিয়েছে বিধর্মীদের দেশ। মুসলমানদের দেশগুলোতে কী দেখছি? মুসলমানরা মুসলমানদের হত্যা করছে। এই হত্যাযজ্ঞ থেকে যেন দূরে থাকি। আমরা যেন সন্ত্রাসী না হই, সন্ত্রাসীদের শিকার না হই।

দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করা, সহনশীল করা, মানুষকে মানবিক করা, মানুষের প্রতি মানুষকে সমমর্মী করা ছাড়া আর কোনও বড় কাজ আপাতত নেই। সমাজকে সুস্থ এবং সুন্দর করতে চাইলে শিশুদের সত্যিকার শিক্ষিত করা সবার আগে দরকার। শিশুদের পাঠ্যপুস্তকগুলোকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত করলে শিশুদেরও অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

 

১২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০৮:২২:০৪