নারায়ণগঞ্জই হোক শুভ সূচনার দীপশিখা
মারুফ কামাল খান
অ+ অ-প্রিন্ট
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের জয়-পরাজয় নিয়ে দ্বিবলয়-প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লাস ও বেদনার প্রবাহ এখন তরতাজা। ফলাফলের নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে হলে এই আবেগ কাটিয়ে ওঠার জন্য একটু সময় দিতে হবে। স্থানীয় এই নির্বাচনে জাতীয় প্রতীক থাকলেও এখানে জাতীয় রাজনীতির চাইতে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে স্থানীয় ইস্যুগুলোর সমীকরণ। এই স্থানীয় সমীকরণকে বাদ দিয়ে নাসিক নির্বাচনের ফলাফলকে বিশ্লেষণ করার উপায় নেই। কোন কোন ফ্যাক্টর ও কৌশল এখানে বিজয়ী পক্ষের সাফল্যকে ত্বরান্বিত করেছে এবং বিএনপি মনোনীত বেশির ভাগ কাউন্সিলর জিতলেও কোন কোন দুর্বলতার কারণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন সে মূল্যায়ন নিশ্চয়ই সবাই করবেন। নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করার জন্য ক্ষমতাসীন দল কোনো কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিল কিনা সে সংশয় অনেকের, বিশেষ করে বিজিত পক্ষের মনে থাকতেই পারে। কারণ আমাদের রাজনীতির অঙ্গন পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অনাস্থা এবং কূটকৌশলে বিষিয়ে আছে। তবে এ নির্বাচনে সন্ত্রাস ও বল-প্রয়োগের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটেনি। ফলে পাবলিক পারসেপশন বা জন-ধারণায় নির্বাচন সুন্দর হয়েছে। রাজনীতিতে এই পারসেপশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারণার বিপরীতে কোনো প্রমাণ ছাড়া শুধুই সংশয় ও সন্দেহের কথা বললে কিংবা কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করলে মানুষ তা গ্রহণ করবে না বলেই মনে হয়। স্থানীয় নির্বাচনে ভোট প্রদানের শতকরা হার সচরাচর বেশি হয়। সেই হিসাবে ৬৪ শতাংশ ভোট পড়ায় তাকে খানিকটা কমই বলতে হবে। এতে বোঝা যায় অনেক ভোটার ভোট দিতে সাহসী বা উৎসাহিত হয়নি ভয়ভীতির কারণে। তারপরও নারায়ণগঞ্জের মতন সন্ত্রাসকবলিত শহরে কোনো মারামারি ছাড়াই ভোট হওয়া এবং এত ভোটারের নির্বিঘ্নে ভোট দিতে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। এর সব পক্ষ ও সংশ্লিষ্টরা অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার।

নারায়ণগঞ্জকে আমি একধাপ অগ্রগতি মনে করি। কারণ, এই দেশে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে একতরফা, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া। পাঁচ শতাংশ ভোটারও ভোট দিতে যায়নি। পুলিশরা সিল মেরে বাক্স ভরেছে। নাগরিকরা ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়েছে। ঢাকার বাইরে সারা দেশে নির্বাচন বর্জনকারী রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেক রক্তপাত ও প্রাণসংহারের ঘটনা ঘটেছে। নারায়ণগঞ্জে অবশ্য তেমন কিছু হয়নি। এটাকে আমি বিএনপির একটা বড় সাফল্য হিসেবেও দেখি। ভোটারহীন নির্বাচনী প্রহসনের বিরুদ্ধে বিএনপি ২০১৩ সন থেকে অবিরাম সংগ্রাম করে আসছে। বিএনপির দাবি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। বিএনপি চায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন। বিএনপি চায় সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচনী পরিবেশ। ভোটাররা যেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যাকে খুশি তাকে ভোট দিতে পারে। আর এই ভোটের ফল যেন গণনা বা ঘোষণায় পালটে ফেলা না হয়। নারায়ণগঞ্জে এই চাওয়ার সবটা না হোক, অনেকটাই পূরণ হয়েছে। বিএনপির টানা প্রচারাভিযানের কারণে ক্ষমতাসীন সরকার, প্রশাসন ও নতজানু নির্বাচন কমিশনের একটু হলেও চক্ষুলজ্জা তৈরি হয়েছে। তারা দৃশ্যত একটি সন্ত্রাসমুক্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছে। অনেক মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার ও সাহস ফিরে পেয়েছে। মানুষকে অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এই সাফল্য একটি রাজনৈতিক দলের জন্য অনেক বড় অর্জন। ভোটে কে কে জিতেছে, তাদের দলীয় পরিচয় কী, তার চেয়েও অনেক বড় কথা হচ্ছে জনগণ যাতে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টির পেছনে বিএনপি অবদান রেখেছে। এই সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে বিএনপিকে এগুতে হবে। বিনাভোটের সরকারের জায়গায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার আনতে হবে। জাতীয় নির্বাচনও যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় তার জন্য সঠিক ইলেকশন কমিশন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন নিশ্চিত করতে হবে। নারায়ণগঞ্জের জয় যদি আওয়ামী লীগের হয়ে থাকে, এতে যদি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, তারা যদি নারায়ণগঞ্জকে তাদের জনপ্রিয়তার মাপকাঠি ভাবেন তাহলে আর ভয় কিসের! সমঝোতায় আসুন, জাতীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ফিরিয়ে আনুন, জনগণকে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নিতে দিন—দেশবাসী সেটিই চাইছেন। নারায়ণগঞ্জই হোক শুভ সূচনার দীপশিখা। -বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : প্রেস সচিব, বিএনপি চেয়ারপারসন।

২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০৬:৫৬:২১