বিমান বেইমানি করে না, মেননরাও পদত্যাগ করেন না
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রপরিচালক তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক-চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর যখন নিহত হলেন তখন টকশোতে ও লেখায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ চেয়েছিলাম। সৈয়দ আবুল হোসেন এখন মন্ত্রিসভা ও সংসদে নেই।
তার পদত্যাগ করার দাবিটি ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রতিদিন ঘুম ভাঙলেই আমরা একেক ধরনের সমস্যা ও সংকটের মুখোমুখি হই। আজকেরটা ভাবতে না ভাবতেই আগামীকালেরটা এসে যায়। সৈয়দ আবুল হোসেনের সঙ্গে দেখা নেই অনেক দিন। আমি ভুলে গেলেও সৈয়দ আবুল হোসেন আমার সেদিনের দাবিটি ভুলেননি। কয়েক দিন আগে সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে অতিথি হয়ে কুয়ালালামপুর গিয়েছিলাম। কাজী এনায়েত উল্লাহর নেতৃত্বাধীন ইউরোপ প্রবাসীদের দুই দিনব্যাপী এক সামিটে। ইউরোপের বাইরের বিভিন্ন দেশের প্রায় দুই শতাধিক বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। প্রবাসীদের মৃতদেহ দেশে আনা নির্বিঘ্ন করা, জেনারেশন বাই জেনারেশন দ্বৈত নাগরিকত্ব ভোগ করা, বিমানবন্দরের হয়রানির সমাধানসহ তাদের বেদনাগুলো উচ্চারিত হয়েছে। দেশে দেশে বাংলাদেশি অভিবাসীদের বৈধতা দান, কমিউনিটির উন্নয়ন ও বাংলাদেশের উন্নয়নে নিরন্তর ভূমিকা রাখাই এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য।
যাক, ইমিগ্রেশন শেষ করে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্কাইলঞ্জে সাইফুল আলম ও নঈম নিজামের সঙ্গে যখন আড্ডা দিচ্ছিলাম তখন হঠাৎ চিরচেনা হাস্যোজ্জ্বল মুখে একদা গণমাধ্যমের সমালোচনার তীরে সর্বোচ্চ ক্ষতবিক্ষত মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এসে প্রবেশ করলেন। হাসতে হাসতে উষ্ণ করমর্দন করে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় যেমন করলেন, তেমনি আমার সেই পদত্যাগের দাবিটিও স্মরণ করিয়ে দিলেন। আমিও বিনয়ের সঙ্গে তাকে এটি আর মনে না রাখার অনুরোধ জানালাম। তিনি গেলেন সিঙ্গাপুর, আমরা মালয়েশিয়ায়। রাজনীতির অঙ্গনে অনেকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। পেশাদারী জীবন রাজনীতি ও সংসদ ঘিরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো ছিল বলেই কতজনের কত রূপ দেখেছি! কখনো মুগ্ধ হয়েছি, কখনো বিস্মিত হয়েছি। অনেক বড় দলের বড় নেতা দেখেছি, অনেক ছোট দলেরও বড় নেতা দেখেছি। অনেক বড় দলের ছোট নেতাও দেখেছি। কখনো সখনো সূর্যের চেয়ে বালির তাপ যেমন টের পেয়েছি, তেমনি বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হতে দেখেছি। তাই বলে অবাক হইনি।
রাজনীতিবিদদের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্কটা নিবিড়। গণমাধ্যম বা সংবাদকর্মীর কাছ থেকে রাজনীতিবিদরা যতটা কাভারেজ নিতে অভ্যস্ত, তার কিঞ্চিৎ পরিমাণ সমালোচনা সইতে পারেন না। এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জীবনে-মরণে দুনিয়া কাঁপানো বিশ্বনন্দিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই সর্বোচ্চ সমালোচনা সহ্য করেছেন। অথচ তিনি দেশ ও মানুষের কল্যাণে জীবন, যৌবন উৎসর্গ করা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যদিয়ে জাতিকে স্বাধীনতাই দেননি; পরিবার-পরিজনসহ জীবনটাও দিয়ে গেছেন। এই মহাকাব্যযুগের নায়কের পর আশির দশক থেকে আজকের বাংলাদেশে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সমালোচনার তীর হজম করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেনাশাসক এরশাদের কথা বাদই দিলাম। দুই নেত্রীর সিকি পরিমাণ সমালোচনা সইবার ক্ষমতা সমকালীন রাজনীতিতে কোনো রাজনীতিবিদের আছে এমনটি কেউ বলতে পারবেন না।
ছোট দলের বড় নেতারা সমালোচনার তীরে বেশি যন্ত্রণাবিদ্ধ হন। জবাই করা মুরগির মতো ছটফট করেন। গণমাধ্যম আর গণতন্ত্র যেহেতু পায়ে পায়ে পথ হাঁটে, তাই রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংবাদকর্মীদের সম্পর্ক সব সময়ই উষ্ণ থাকে। মাঝে-মধ্যে অম্লমধুর হয় বটে, কিন্তু তা কখনো তিক্ততা বা শত্রুতায় যায় না।
মালয়েশিয়া সফর শেষে ঢাকায় ফিরেই কোল্ড অ্যাটাকে ফুসফুসের প্রদাহে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল ও শয্যা দুটোতেই যেতে হয়। হাই ডোজ এন্টিবায়োটিকে শরীর কাহিল। যেদিন অসুস্থ হই, সেদিনই বাংলাদেশ বিমানে ভিভিআইপি ফ্লাইটে সফরসঙ্গীদের নিয়ে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে পানি সম্মেলনে যোগ দিতে আকাশে উড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুদাপেস্ট পৌঁছার আগেই খবর আসে, আল্লাহর অশেষ রহমতে তাকে বহনকারী বিমানটি দুর্ঘটনার মুখ থেকে রক্ষা পায়। আর পনেরো মিনিট আকাশে উড়লেই বিমানটি বিধ্বস্ত হতো। বাংলাদেশ হতো নেতৃত্বহীন, জাতির জীবনে ঘোর অন্ধকার শোক নেমে আসত। অনেকে হারাতেন তাদের প্রিয়জন। আমরা কতটা দায়িত্বহীন, কতটা অযোগ্য ও ব্যর্থতার জ্বলন্ত উদাহরণ নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করি প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বিমানের অবস্থা দেখলেই উপলব্ধি করা যায়।
সেই কবে পঞ্চাশের দশকে পণ্ডিত নেহেরুর রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ট্রেন দুর্ঘটনার দায় কাঁধে নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, সেটি এখন ইতিহাস। বাংলাদেশেও ’৯১ শাসনামলে বিএনপির মন্ত্রিসভা থেকে জহির উদ্দিন খান পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু তারপর বহুবার বহু ব্যর্থতায়, বহু বিতর্কে আমাদের রাজনীতিতে বহু মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি উঠলেও কেউ পদত্যাগ করেননি। বরখাস্ত হন, অপসারিত হন এবং পদত্যাগে বাধ্য হন কিন্তু যে কোনো ব্যর্থতার নৈতিক দায় নিয়ে পদত্যাগ করার নজির কেউ স্থাপন করেন না।
আমাদের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ। চীনাপন্থি বাম রাজনীতির পথ হাঁটা রাশেদ খান মেননের অতীত গৌরবের, পারিবারিক ঐতিহ্যও রয়েছে। বাবা কনভেনশন মুসলিম লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা আবদুল জব্বার খান ছিলেন পাকিস্তানের স্পিকার। আরেক ভাই ছিলেন জাঁদরেল আমলা, কবি ও সেনাশাসক এরশাদের মন্ত্রী। আরেক ভাই ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা। আরেক ভাই ছিলেন বিএনপি-জামায়াত ঘরানার বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়া রাশেদ খান মেনন ইসলামের পাঁচটি ফরজের একটি হজও আদায় করেছেন। ষাটের ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনীতির দুর্গম পথ হেঁটে আসা রাশেদ খান মেননের বোন বিএনপির বড় নেত্রী হলেও তিনি তার আদর্শে অবিচল। ১৪ দলের অন্যতম রূপকার হিসেবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিশাল গণরায় নিয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা শুরুতে যে সরকার গঠন করেছিলেন, সেখানে চীনাপন্থি সাম্যবাদী দলের দীলিপ বড়ুয়ার ঠাঁই হলেও মেননের ঠাঁই হয়নি। পরবর্তীতে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে যখন কয়েক নেতার ডাক পড়ে বঙ্গভবনে তখন আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন তা গ্রহণ করেননি। প্রচলিত আছে, তোফায়েল গ্রহণ করেননি ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি থেকে। আর রাশেদ খান মেনন গ্রহণ করতে পারেননি পার্টির পলিটব্যুরোর আপত্তির কারণে।
’৭৯ ও ’৯১ সালের নির্বাচনে রাশেদ খান মেনন নিজের ক্ষমতায় বরিশালের নিজের নির্বাচনী এলাকা থেকে বিজয়ী হয়ে এসেছিলেন। ’৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন জাতীয় পার্টির গোলাম ফারুক অভির কাছে। ২০০৮ সাল থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে তিনি ঢাকার রমনা-মতিঝিল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তার সময়ে ভিকারুননিসা ও আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভর্তির সমস্যার শুরুতে সুষ্ঠু সমাধান দিতে পারেননি। বিতর্কের ঝড়ে পড়েছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি ওয়াকওভার দেওয়ায় তিনি সংসদে পার্টির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়েছেন। নিজে দায়িত্ব পেয়েছেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের।
দুই বছরে বাংলাদেশ বিমানের ভাগ্য বদল হয়নি। পর্যটন খাতেও মেনন চোখে পড়ার মতো কিছু করেছেন— সেটিও বলা যাচ্ছে না। বেশ কিছু দিন আগে বিমানের একটি ফ্লাইটে সিলেট গিয়েছিলাম। বড়সড় বিমান আকাশে উড়ার আগেই এসি নেই, যাত্রীদের দম বন্ধ ঘর্মাক্ত অবস্থা। শিশুদের সেকি কান্না! বিমান থেকে নেমেই স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম— ‘বিমানযাত্রী শিশুর কান্না, মেনন কেন শুনেন না?’ বিমান ক্রুদের যখন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল— এসি কেন নেই? তারা টেকনিক্যাল জ্ঞান দিয়ে বুঝাচ্ছিলেন, বিমান আকাশে উড়লেই আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হতে থাকবে। ত্রিশ মিনিটের যাত্রাপথে এমন খোঁড়া যুক্তি শুনে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ। বিমানের যাত্রীসেবার মান বাড়েনি। কিন্তু তাই বলে কেউ বলেন না যে, এখানে দুর্নীতি কমেছে। বিমানের সঙ্গে জীবন বেঁধে থাকা মানেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনলেও ব্যক্তিগত লাভের পাল্লা ভারী হয়।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেননরা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সরকারের সময় বিভিন্ন মন্ত্রীর দিকে আঙ্গুল তুলে ভারতের রেল দুর্ঘটনায় পদত্যাগ করা লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু দেশকে ভালোবেসে, দেশের প্রতিষ্ঠানকে ভালোবেসে প্রবাসীসহ যারা বিমানে যাতায়াত করেন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে তাদের দুর্ভোগ, দুঃখ, দীর্ঘশ্বাস না হয় ভুলেই গেলাম। কিন্তু একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিমানের ভিভিআইপি ফ্লাইট যেখানে ঝুঁকিমুক্ত নয় সেখানে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দুই বছরে রাশেদ খান মেনন রাজনৈতিক জীবনের এত বড় অভিজ্ঞতা নিয়ে কী পরিবর্তন আনলেন? প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির খবরে উদ্বিগ্ন, ক্ষুব্ধ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে টকশোতে তার পদত্যাগ চেয়েছেন। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি। রবিবার সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বিমানে ত্রুটি মনুষ্যসৃষ্ট। তার আগে ঘটনার পরই তিনি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তদন্ত কমিটি করেছেন এবং কয়েকজনকে বরখাস্ত করেছেন।
সেদিন প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ভিভিআইপি ফ্লাইট (বিজি ১০১১) রাঙা প্রভাত সকাল ৯টা ১৪ মিনিটে ঢাকা থেকে বুদাপেস্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। আকাশপথে ত্রুটি দেখা দিলে ফ্লাইটটির গতিপথ পরিবর্তন করে বাংলাদেশ সময় সোয়া ২টায় তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে অবতরণ করে। ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গী ৯৯ জন যাত্রী ছাড়াও ৪ জন ককপিট ক্রু, ২০ জন কেবিন ক্রু এবং ৪ জন এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বিমানটির ত্রুটি মেরামত করার পর প্রধানমন্ত্রী সেটিতে উড়েই বুদাপেস্ট যান। তিনি আস্থা হারাতে চাননি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির ওপর মানুষের আস্থা রক্ষার জন্যই প্রধানমন্ত্রী সেই বিমানেই বুদাপেস্ট যান। তিনি সেখানে থাকতেই দেশে সর্বত্র আলোচনা ওঠে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিশেষ এয়ারক্রাফট কেনার। রাষ্ট্রনায়ককে এতটা ঝুঁকিবহুল জীবনের মুখোমুখি হতে কোনো গরিব দেশের নাগরিকরাও দিতে চান না। শেখ হাসিনা শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাও। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনকে জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পথে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করা হয়। ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনাও ২১ বারের বেশি মৃত্যু ঝুঁকিতে পতিত হয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের একটি বুলেট তাকে যে তাড়া করে ফিরছে এটি সর্বজনবিদিত। তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলেই সবার ভয়।
দেশে ফেরার পর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ এয়ারক্রাফট কেনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন এয়ারক্রাফট কেনার বিলাসিতার সময় আমাদের এখনো হয়নি। গরিবের ঘোড়ারোগ না হওয়াই ভালো। ঘোড়ার লালন-পালনে যথেষ্ট খরচ। এর প্রয়োজন নেই, আমি চাইও না।
বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের ভাষায়, কর্মকর্তাদের গাফিলতিতেই প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এ ঘটনায় বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পাঁচ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিমানের তেল সঞ্চালন পাইপের ‘নাট ঢিলা’ হয়ে যাওয়ায় বিমানে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশ বিমানের চেয়ারম্যানের ভাষায়, তিনটি ফ্যাক্টর বিবেচনায় আনা হয়— ১. যান্ত্রিক ত্রুটি কিনা? ২. পরিবেশগত ব্যাপার কিনা? ৩. হিউম্যান ফ্যাক্টর কিনা? শেষটিকেই তারা চিহ্নিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী কোনো জায়গায় গেলে অনেক আগেই সেই জায়গা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে নিয়ে আসা হয়। অথচ প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিশেষ ভিভিআইপি ফ্লাইটের বিমানটির নাট-বল্টু ঢিলে থেকে যায় এটা রহস্যময়ই নয়; চূড়ান্ত দায়িত্বহীনতা ও গাফিলতির নজির মাত্র। বিমানমন্ত্রীও এটিকে বিমানের অদক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। পাশাপাশি বিমানের আইনের উল্লেখ করে কোম্পানির ওপর দায় চাপিয়ে মন্ত্রণালয় ও নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রেল দুর্ঘটনার জন্য রেলমন্ত্রী, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যোগাযোগমন্ত্রী, নৌ দুর্ঘটনার জন্য যদি নৌ-পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া গণতন্ত্রসম্মত হয় তাহলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিশেষ বিমানের এত বড় ত্রুটি ধরা পড়ার পর বা এত বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার পর নৈতিক দায় থেকে রাশেদ খান মেনন কেন পদত্যাগ করবেন না? নৈতিক দায় শব্দটি এদেশের রাজনীতিতে বামপন্থিরাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন। আর নৈতিক জায়গা বামরাই বেশি লঙ্ঘিত করেছেন। নিজেদের রাজনৈতিক শক্তিতে ব্যর্থ হলেও সামরিক ও গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে যোগ দিয়ে বামরাই বেশি ক্ষমতায় এসেছেন। এই ঘটনার নৈতিক দায় রাশেদ খান মেনন এড়াতে পারেন না। নেতৃত্ব যত দক্ষ, তার মন্ত্রণালয়, সংস্থা ততটাই দক্ষ হয়ে ওঠে। এখানে নেতৃত্ব যেখানে ঢিলেঢালা বিমানের নাট-বল্টু সেখানে নড়বড়ে হওয়াই স্বাভাবিক।
’৯৯ সালের দিকে একবার লন্ডন থেকে ঢাকাগামী বিমানের চাকাই খুলে গিয়েছিল। ওই অবস্থায় পাইলট যাত্রীদের বুঝতে না দিয়ে দক্ষতার সঙ্গে বিমান অবতরণ করিয়েছিলেন। বিমান অবতরণের পর যাত্রীরা দেখতে পান চতুর্দিকে নিরাপত্তাই নয়, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল টিম প্রস্তুত। বিমানের আরেকটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট একবার সিলেটে রানওয়ে থেকে ছিটকে জমিনে বিধ্বস্ত হয়েছিল। অনেকে রসিকতা করে বলেছিলেন, যাত্রীদের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও জমিনের ধান নষ্ট হয়েছে। প্রবাসীরা সব সময় বলেন, বিমানে এত দুর্নীতি হয়, এত অনিয়ম হয়, কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনে এত গাফিলতি হয় তবুও বিমান বেইমানি করে না। আল্লাহ ভরসা বলে বিমানে ওঠা লন্ডনযাত্রীদের মুখে অনেকবার শুনেছি, ‘বিমান চালায় আল্লায়। ’
নৈতিক দায় নিয়ে রাশেদ খান মেননের পদত্যাগের দাবি যতই উঠুক, তিনি পদত্যাগ করবেন না। পদত্যাগ করলে তিনি ইতিহাস হতেন। আর বিমান ও মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সবাই ঝাঁকুনি খেতেন। সময়ের দাবি অনুযায়ী ঢেলে সাজানোসহ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসত। কেউ সরে দাঁড়াতে পারেন না বলে দায়িত্বশীলরা কুম্ভকর্ণের ঘুম ঘুমান। বিমান বেইমানি করে না, মেননরাও পদত্যাগ করেন না।
লেখক : প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ।
০৭ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৪:২৬:৫৯