সশস্ত্র বাহিনী দিবসে ঘাটাইল সেনানিবাসে
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
অ+ অ-প্রিন্ট
বিশ্বের সংগ্রামী মানুষের ভরসা কিউবার হৃদয়, চিরবিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো আর নেই। আগামী শতবর্ষে বিশ্ববাসী আর অমন আস্থাভাজন প্রিয় বিপ্লবী নেতা পাবে কিনা কেউ বলতে পারে না। আমাদের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে দেখে কাস্ত্রো বড় খুশি হয়েছিলেন। পাকিস্তানি প্রশাসনের অভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে তিনি দেশ চালাচ্ছেন শুনে বলেছিলেন, ‘কী অবাক কাণ্ড! তুমি এখনো বেঁচে আছো?’ বলেছিলেন, ‘তোমার অনভিজ্ঞ ছেলেদের সঙ্গে যারা যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে তাদের আবার অভিজ্ঞতা কী?’ সত্যিই বঙ্গবন্ধুকে ধ্বংসের অভিজ্ঞতা তাদের থাকলেও দেশ গড়ার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ফিদেল কাস্ত্রোই একমাত্র নেতা যাকে হত্যা করতে চেয়ে সিআইএ বার বার, ছয়শ-সাতশ বার ব্যর্থ হয়েছে। তার মহাপ্রয়াণে সারা বিশ্বে দরদি বিপ্লবী নেতার যে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি।

বেশ কয়েক বছর পর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে ঘাটাইল শহীদ সালাউদ্দিন সেনানিবাসে গিয়েছিলাম। চারদিকে প্রাণবন্ত লোকজন দেখে ভীষণ ভালো লেগেছে। তাদের আতিথেয়তা এক হৃদয়কাড়া উপাদান। একসময় কয়েকজন কর্নেল ব্রিগেডিয়ারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাহিনীর সবার কি আপনাদের মতো ব্যবহার? দেশবাসীর প্রতি এমন মধুর ব্যবহার করলে এটা তো স্বর্গরাজ্য হতো। তারা মুচকি হেসেছিলেন। তাতেই তাদের জবাব পেতে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি। আগে আমার ধারণা ছিল শহীদ সালাউদ্দিন সেনানিবাসে যেসব অনুষ্ঠান হয় তা মোটামুটি টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহভিত্তিক। এবার নিখুঁতভাবে লক্ষ্য করে বুঝলাম ব্যাপারটা তা নয়। মোটামুটি বৃহত্তর ময়মনসিংহের সব কটি জেলাকে নিয়ে। বিশেষ করে সালাউদ্দিন সেনানিবাস মনে হয় ১৯ পদাতিক ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার। তাই কোনো জাতীয় অনুষ্ঠানে তারা সব জেলার লোকজনকে দাওয়াত করেন। সরকারি দলকেই বেশি করেন, যা সব সময় হয়ে এসেছে। কোনো রাজনৈতিক রংচং না থাকলে অন্যদেরও করেন। আমাদের নিয়ে সুবিধা, না সমস্যা বুঝি না। কিন্তু এবার সশস্ত্র বাহিনী দিবসে ঘাটাইল সালাউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট থেকে দাওয়াত করেছিল। গত বেশ কয়েক বছর যাইনি, এবারও যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। মনে হয় না গেলেই ভালো করতাম। অনুষ্ঠানে গিয়ে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুরের কতজনকে দেখলাম তারা সবাই সেই আগের মতোই আছেন। টাঙ্গাইলের দু-চার জন কিছুটা বদলে গেছেন। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারাও একটু-আধটু যে বদল হননি তা নয়। তারাও কিছুটা বদলেছেন। তবে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনায় ছোট ছোট অনেক মেয়ে দেখলাম। খুব ভালো লাগল। ওরা যখন বড় হবে ব্রিগেডিয়ার, কর্নেল, জেনারেল হবে কতই— না ভালো হবে। আমার দিঘলকান্দির মকসুদা ফুফুর ছেলে ব্রিগেডিয়ার হামিদকে দেখলাম। প্রথমে তাকে চিনতে পারিনি। কাদেরিয়া বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার নবী নেওয়াজের মেয়ের জামাই যে একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাকে দেখে বুক ভরে গেল। স্বাধীনতা কত বড়, পাকিস্তান থাকলে, মুক্তিযুদ্ধ না হলে, স্বাধীনতা না এলে সুবেদারের মেয়ের জামাই আবার কর্নেল! পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে গেলে সিপাই-টিপাই একটা কিছু হয়তো হতো।

আমার দাওয়াতপত্র দিয়েছিল ঢাকায়। আমি ছিলাম টাঙ্গাইলে। একজন লেফটেন্যান্ট বার বার ফোন করছিল। ইদানীং ফোনে ভালো শোনা যায় না। সে বলছিল লেফটেন্যান্ট, আমি শুনছিলাম লেফটেন্যান্ট কর্নেল। জানি না বেঁচে থাকতে থাকতে ছেলেটি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হবে কিনা। কারণ বাধাহীন সুড়সুড় করে উঠতেও ১৫-১৬ বছর লাগবে। আমি কি সুস্থ শরীরে অত দিন বেঁচে থাকব? মনে হয় না। ঘাটাইলের অনুষ্ঠানে সরকারি অতিথি ছিলেন বেগম মতিয়া চৌধুরী। তাকে আমি পছন্দ করি না, আমার জন্য নয়, বঙ্গবন্ধুকে গালাগাল করার জন্য। তিনিও আমাকে পছন্দ করেন না। কিন্তু তবুও মন্ত্রী হিসেবে অনুষ্ঠানের অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে সম্মান জানানো কর্তব্য। তা যথাযথভাবেই জানিয়েছিলাম। তিনি সব সময় মুখ বেজার করে থাকেন, সেদিনও ছিলেন। আমি কাছে গেলে অনেক কষ্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেজন্য তাকে ধন্যবাদ। এবার সশস্ত্র বাহিনী দিবসে খেতাবপ্রাপ্তদের চায়ের কাপ, পাঞ্জাবি ও চাদর উপহার দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে ৩ হাজার টাকা। যারা সকালে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়েছিলেন তাদের নাকি ৩৫ হাজার দেওয়া হয়েছে।

এগুলো কেন দেওয়া হয়েছে, কেন দেওয়া হয় বুঝতে পারিনি। বেঁচে থেকে বড় অশান্তি বোধ করি। সালাউদ্দিন সেনানিবাসে খেতাবপ্রাপ্ত যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের অর্ধেক কাদেরিয়া বাহিনীর। আমরা যেভাবে চলেছি— শতবর্ষ পর মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন করেছিলাম, সাধারণ মানুষের সেখানে ভূমিকা ছিল, তা কেউ বলবে না। কারণ বলার মতো কোনো দলিল-দস্তাবেজ থাকবে না। পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী থেকে বেরিয়ে আসা ৬-৭ হাজার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তারাই দেশ স্বাধীন করেছে। তা না হলে সাত শতাধিক খেতাবের মধ্যে ৪০-৪২টি বাদে সেনা, বিমান, নৌ, ইপিআর, আনসার তারাই সব ভাগাভাগি করে নিয়েছে। জনগণের কোনো জায়গা নেই। কারণ মুক্তিযুদ্ধটা যেন মাছের মায়ের পুত্রশোক। সশস্ত্র বাহিনী দিবসের উপহার বাড়িতে এসে খুলেছিলাম। খাকি রঙের একটি ইনভেলাপ গাড়িতে খুলে ৩ হাজার টাকা দেখে রাস্তায় ফেলে দিতে চেয়েছিলাম। এসব কী? রাস্তাঘাটে ফকির-মিসকিনকেও তো এখন মানুষ অমন করে না। আমি একবার খামারবাড়ির পাশে এক ফকিরকে ১০ টাকা, আরেকজনকে ২০ টাকা দিয়েছিলাম। ১০ টাকা পাওয়া ফকির আমায় যে কী তিরস্কার করেছিল বলার মতো নয়। বাংলাদেশে আর কিছু সমান না হলেও সব মুক্তিযোদ্ধা সমান। সবার এক দাম। যোদ্ধাদের আর দোষ কী! সরকার যখন আমার হাতে ৩ হাজার, ওদের হাতেও ৩ হাজার দেয় তখন সমান সমান ভাবতে ওদের দোষ কী। অনেকে সমানের চেয়েও বেশি ভাবে।

এক সপ্তাহ পর ঢাকা ফিরছিলাম। কুশিমণির জন্য মন ছিল ব্যাকুল। ওকে না দেখলে এখন আর আমার চলে না। বিশেষ করে কুঁড়ি বিলেত যাওয়ার পর ব্যাপারটা আরও জোরালো হয়েছে। কুশি আমার জিয়নকাঠি। ও যখন জড়িয়ে ধরে কেন যেন মার স্পর্শ পাই। আমার বিশুষ্ক বুক শীতলতায় জুড়িয়ে যায়। তাই কিছুটা তন্ময় ছিলাম কখন কুশিকে পাব, বুকে জড়াব। দীপ বেশ বড় হয়েছে। চুলগুলো কেন যেন আস্তে আস্তে সাদা হয়ে চলেছে। ছেলেটি বিয়ে করেনি। নাতি-নাতকুর থাকলে বাইরের কষ্ট যাই থাকুক বাড়িতে মহা আনন্দে থাকতাম। কিন্তু কেন যেন ছেলে আমার বিয়ের কথা শুনতে চায় না। আমাদের বাবা রাগ করলে আমাদের গলায় পাড়া দিতেন, তার পরও বাবার জন্য ব্যাকুল থাকতাম। কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের জোরে কথা বলতে পারি না। আমি শ্বশুর-শাশুড়ি পাইনি, আমার বিয়ের আগেই তারা চলে গেছেন। শ্বশুরবাড়ির জামাই আদর আমার ভাগ্যে জোটেনি। স্ত্রী হিসেবে যাকে পেয়েছি খুবই সাধারণ, সাদামাটা মুখচোরা মানুষ। বাইরের কারও সঙ্গে কথা বলেন না, বলতে পারেন না। কিন্তু পরিচিত বন্ধুদের কাছে সবার ওপরে। চোখমুখ বন্ধ করে সংসারের জন্য খুব একটা ভাবেন না। আগে আরও ছিল না। কুশিমণি এসে তাকে মা বানিয়েছে, স্ত্রী বানিয়েছে। সর্বোপরি তিনি নারী হয়েছেন। তার একমাত্র চাচা ৯০-এর ওপরে বয়স। কদিন আগে স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী। মাসখানেক নিউরোসাইয়েন্সের অধ্যাপক দীন মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে থেকে বাড়ি এসেছেন। জ্ঞান আছে কিন্তু সাড়া নেই। নল দিয়ে খাওয়ানো হয়। রক্তের সম্পর্কই যে সব নয়, তা প্রমাণ করেছে সুরুজ আহম্মদ ও আমার খালাতো ভাই নাসির। ওরা দিন-রাত তার কাছে। কিন্তু আপনজনেরা কেউ নেই। বেগম মাঝেমধ্যে রাগ করতে চান, ‘চাচা কি শুধু আমাকেই পেলেছেন, ওদের পালেননি?’ আমি বোঝাতে চাই, ভুলে যাও ওসব। বাড়িতে এনে বেগম ভাবছিলেন নিচতলায় রাখবেন। আমার মত ছিল না। তাই আমার পাশের ঘরে তাকে রাখা হয়েছে। বেগমকে বলেছি, আমার মাকে শেষ সময় যেমন দেখাশোনা করেছ, চাচা তোমাদের সবাইকে গোসল-আসল করিয়েছেন, পায়খানা-পেশাব করিয়েছেন তার শেষ সময় যতটা পার কর। আমি তো আছিই তোমার পাশে। চিন্তা কী? আমার কথা শুনে কেঁদেছেন। তার কান্না ভালো লাগেনি। মায়ের কান্না যেমন সইতে পারতাম না, স্ত্রীর কান্নাও না। মার কান্নার প্রতিকারের ক্ষমতা আমার ছিল না। চাইবার আগেই স্ত্রীর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা আল্লাহ আমায় দিয়েছেন। কোনো কারণে দীপ-কুঁড়ি-কুশির চোখে পানি এলে আকাশ ভেঙে পড়ে, স্ত্রীর ব্যাপারও একই রকম।

এসব নিয়ে তন্ময় ছিলাম, কিছুটা এলোমেলো। হঠাৎ মোবাইল বাজল। তাকিয়ে দেখি বড় ভাই। হ্যালো বলতেই, ‘বজ, তোর লেখা পড়লাম। তথ্যে ভুল আছে।’ রাস্তায় চারদিকে আওয়াজ, বোঝা যাচ্ছিল না। বলেছিলাম বাসায় গিয়ে ফোন করি। বললেন, ‘বেশ, তাই কর।’ আমিনবাজারের কাছাকাছি ছিলাম। ভেবেছিলাম ১৫-২০ মিনিটে বাড়ি ফিরব। কিন্তু ফোন ছেড়ে বিরাট যানজট। দেড় ঘণ্টায় ফিরলাম। ঘরে ফিরে কুশিকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বড় ভাইকে ফোন করলাম। কারণ ততক্ষণে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। তাতে তিনি অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কারণ আমিই বলেছিলাম ২০-৩০ মিনিটের মধ্যেই ফোন করছি। এখন কেউ কাউকে মানে না, কেউ কাউকে গোনে না। কিন্তু ভীতু মানুষ হিসেবে এখনো আমি বড়দের সমীহ করি। তাই দেরির জন্য বিব্রতবোধ করছিলাম। ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে বড় ভাই বললেন, ‘তুমি লিখেছ মওলানা ভাসানীর রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধুর জন্ম। তথ্যটা পুরোপুরি ঠিক নয়, আংশিক সত্য।’ বড় ভাই কী বলবেন এ ব্যাপারে ফোন পাওয়ার পর থেকেই তটস্থ ছিলাম। নানাভাবে নিজেকে তৈরি করছিলাম। তাই ছেলেবেলায় পড়াতে বসিয়ে আচ্ছারকম মার দিতে পারলেও এবার মনে হয় তেমন পারেননি। তিনি ভীষণ জ্ঞানী মানুষ। সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেন। তার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি কথাও ভুল বা অযৌক্তিক নয়। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে আমার কথাও শতভাগ সত্য। লিখেছিলাম, ‘বীজ থেকে যেমন বৃক্ষ জন্মে, হুজুর মওলানা ভাসানীর রাজনীতি থেকে তেমন বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের কারণে আমি কাদের সিদ্দিকী, ওদিকে জিয়াউর রহমান। এ সবই হুজুর মওলানা ভাসানীর অঙ্কুরিত রাজনীতির সৃষ্টি বা ফসল। হুজুর মওলানা ভাসানী না জন্মালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতা হতেন না। তিনি নেতা না হলে বাংলাদেশ হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হুজুর মওলানা ভাসানীর আবিষ্কার, আর আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। সবই লতায় পাতায় জড়িত। কাউকে বাদ দিয়ে কেউ নই।’ বঙ্গবন্ধু হুজুর মওলানা ভাসানীর অঙ্কুরিত রাজনীতির ফসল— এখানেই বড় ভাইয়ের যত আপত্তি। তার আপত্তি নিরর্থক নয়। শতভাগ যথার্থ। আগে তো একেবারেই লেখাপড়া করতাম না, শত সহস্রভাগ গাধা ছিলাম। এখনো তেমন লেখাপড়া করি না। কিন্তু যেখানে যা পাই কুড়িয়ে নিই, হৃদয়ে গেঁথে রাখি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুলে থাকতে শেরেবাংলা ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে গোপালগঞ্জে দেখা, তারপর কলকাতায়। শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর ছায়াতলে তিনি বেড়ে উঠেছেন, বহুদিন কাজ করেছেন। ইল্লি-দিল্লি করেছেন। একজন উল্লেখযোগ্য ছাত্রনেতা হয়েছেন। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে যেমন ওঠাবসা করেছেন, বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গেও করেছেন। পাকিস্তান হওয়ার আগে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর তেমন একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। বর্ধমানে এক যুগ থেকেছি। বর্ধমানের জনাব আবুল হাশিমকে অবলম্বন করে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি শুরু। পাকিস্তান হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারতীয় মুসলমানদের জন্য সেখানে থেকে যান। তারপর যান করাচিতে। ’৫৩ সালের আগে তার পূর্ব পাকিস্তানে যাতায়াত খুব বেশি ছিল না। ’৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্মের সময় তিনি ঢাকায় আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে তাকে নারায়ণগঞ্জের লঞ্চঘাট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ গঠন, ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, তারপর পাকিস্তানে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১২ সদস্যের ১৩ মাসের মন্ত্রিসভা এবং সেই সময় পররাষ্ট্রনীতি ‘সেন্টো সিয়াটো’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হুজুর মওলানা ভাসানীর বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে পলাশীর পরাজয়ের ২০০ বছর পর ১৯৫৭ সালে কাগমারী মহাসম্মেলনে চরম বিরোধের বহিঃপ্রকাশ— এসব জানা থাকার পরও সোজা-সরল রেখায় যাওয়ার জন্য ওভাবে বলেছি। আমি কোনো বিশ্লেষক নই, কোনো বিজ্ঞানী নই। আইয়ুব খানের প্রতিনিধি হয়ে মাও সে তুংয়ের সঙ্গে হুজুর মওলানা ভাসানীর দেখা করতে যাওয়াকে অনেকেই বিশ্বাসঘাতকতা বা দালালি হিসেবে বিবেচনা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হুজুর মওলানা ভাসানী বলেছেন, ‘পাটের ন্যায্য মূল্য, পূর্ব পাকিস্তানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং মোহাজের সমস্যার সমাধান হলে আইয়ুব খান কেন, আমি শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলাতে রাজি।’

অনেকেই সে কথা বিশ্বাস করেননি। কিন্তু আমি করেছি। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছি তখন ধরে নিতে পারেন পূর্ব পাকিস্তানের ৯৮ ভাগ স্বায়ত্বশাসন হয়ে গেছে। আর মওলানা সাহেব যখন আছেন, শেখ মুজিব, আতাউর রহমান, সালাম খান, আবুল মনসুর আহমদরা আছে তখন বাকি ২ ভাগও আদায় হবে।’ প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর কথায় সবাই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন।

বড় ভাই আমার লেখা পড়েন, ভুল ধরেন এতে আনন্দে বুক ভরে যায়। প্রকৃত হিতৈষী তিনিই যিনি ত্রুটি ধরেন, প্রকৃত ত্রুটি ধরতে পারেন। নির্বোধ লাখো বন্ধুর চেয়ে জ্ঞানী শত্রু অনেক ভালো— এটাই তার প্রমাণ। আমি লেখাটি ঐতিহাসিক তথ্যের বিচারে লিখিনি, লিখেছি অন্তরের সব পবিত্র আবেগ দিয়ে চোখের সামনে দেখা ঘটনা ও ভূমিকা তুলে ধরার জন্য।

লেখক : রাজনীতিক।

 

২৯ নভেম্বর, ২০১৬ ২২:০৬:৩৯