পাপ বাপকে ছাড়ে না, বাংলাদেশকেও ছাড়ছে না
আশীষ চক্রবর্ত্তী
অ+ অ-প্রিন্ট
কথায় বলে, ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না৷’ বহু আগেই অন্যায়কারীকে প্রশ্রয় এবং বাহবা দিয়ে অবিচারের পথ ধরা বাংলাদেশে এখন বিচারহীনতাই নাকি সংস্কৃতি৷ এই সংস্কৃতির ভিত্তিমূলে আছে এক ‘জাতীয় পাপ৷’ সেই পাপ যেন কিছুতেই ছাড়ছে না৷ বিচারহীনতার সংস্কৃতি৷ বাংলাদেশে অতি চর্চিত এক জোড়া শব্দ৷ কোথায়, কার মুখে শোনা যায় না এই শব্দগুচ্ছ, বলুন তো? বিরোধী দল বলে, সরকারী দল বলে, সাংবাদিক বলেন, বিশ্লেষক বলেন, আইনজীবী বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বলেন, এমনকি রাজাকার এবং তাদের দোসররাও বলে৷

তবে বিচারহীনতার চেয়ে অনেক বেশি ‘জনপ্রিয়' দায় অস্বীকার এবং দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর সংস্কৃতি৷ তাই বিচারহীনতা নিয়ে কথা হলেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের নেতাদের ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে শুনি, ‘‘আমরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছি, আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি৷ এভাবে আমরা বরং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি৷ বিচারহীনতা এখন নেই, বিচারহীনতা ছিল বিএনপির আমলে৷'' আবার বিএনপি এবং সমমনারা খুব জোর গলায় বলেন, ‘‘এ সরকারের আমলে আমাদের হাজার হাজার নেতা-কর্মী গুম হয়েছে৷ অসংখ্য নেতা কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে৷''

সরকারবিরোধীদের কথা শুনে মনে হয় যেন হত্যা আর গুম হঠাৎ করে শুরু হয়েছে, তাদের আমলে দেশটি যেন একেবারে বেহেশত ছিল৷ আবার আওয়ামী লীগ নেতারা বোঝাতে চান, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলেই বুঝি ‘সাত খুন মাফ' হয়ে যায়৷ যেন সাগর-রুনির জীবন, তনুর জীবন, ক্রসফায়ারে নিহত মানুষদের জীবন, অসংখ্য ধর্ষিতার জীবন, সংখ্যালঘুদের জীবনের কোনো দাম নেই৷ যেন আজ বেছে বেছে কয়েকটি বিচার করলেই কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যাবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে৷

কিন্তু আইনের শাসন কোনোদিন কোনো দেশেই হঠাৎ প্রতিষ্ঠিত হয়নি৷ জোড়াতালি দিয়ে বা শর্টকাটে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়৷ কোনো সংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতিও হঠাৎ ‘নাজিল' হয় না৷ চর্চাটা দীর্ঘদিন ধরে অনেকের মাঝে হতে হয়৷

বাংলাদেশে বিচারহীনতা সেই নিয়মেই আজ প্রায় ‘সংস্কৃতি' হয়ে দাঁড়িয়েছে৷এই পর্যায়টা হঠাৎ শুরু হয়নি৷ দেশে বিচারহীনতার আদর্শ পরিবেশ ছিল বলেই ৪৫ বছর পর কোনো সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করলে সেই সরকারের প্রশংসা করতে হয়৷ দীর্ঘদিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ারই তো সুযোগ ছিল না৷ হরণ করা হয়েছিল সেই অধিকার৷ তা না হলে তো কবেই বিচার হয়ে যেতো৷

তা কিন্তু হয়নি৷ বরং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর সংসদে আইন পাশ করে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, একজন রাষ্ট্রপতি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার কোনো বিচার এ দেশে করা যাবে না৷ সভ্য দুনিয়ায় কুকুর-বিড়াল মারলেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়৷ অথচ ৪১ বছর আগে যারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে এক রাতে নারী-শিশুসহ ২৬ জনকে হত্যা করেছিল, যারা জেলখানায় ঢুকে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করেছিল- বিচার করে শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা, তাদের প্রকারান্তরে বরং পুরস্কৃত করা হয়েছিল৷

বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কী খেলাটা চলেছে তা-ও তো সবাই জানি৷ বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করা হলো ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট৷ জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী এবং আবু হেনা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে কারাবন্দি করে কারাগারে ঢুকেই হত্যা করা হলো সে বছরের ৩ নভেম্বর৷ তারপর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথই রুদ্ধ করা হলো৷ ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রমও বন্ধ করে দেয়া হলো৷ এসবের মানেটা কী দাঁড়ায়, যুদ্ধাপরাধ করলে, স্বাধীনতার স্থপতি, তাঁর স্বজনদের এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলে মাফ? আইন পাশ আর আইন বাতিল করে বিচারপ্রার্থনার পথ রুদ্ধ করে কোন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল তখন?

এসব বললে আওয়ামী লীগ খুব খুশি হয়ে যায়৷ ভাবে, তাদের পক্ষে কথা বলা হচ্ছে, ভালোই তো! অন্যদিকে বিএনপি আর জামায়াতসহ তাদের রাজনৈতিক সহচররা ভাবে, ‘‘শুরু হয়ে গেল আওয়ামী লীগের পক্ষে দালালি৷''

নিজের বা দলের পক্ষে বললে ‘বেশ, বেশ, বেশ' আর বিপক্ষে বললেই রাজাকার বা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি'র দালাল বলে দেয়ার এই যে প্রবণতা, এটিও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ৷ তবে এভাবে সমালোচককে হয়ত বিব্রত করার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সত্যকে মিথ্যের আড়ালে চাপা দেয়া যায় না৷ তথ্যপূর্ণ, যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা তাতে  খারিজ হয়ে যায় না৷

যে ব্যক্তি বা যে দল যা-ই বলুক, ঐতিহাসিক সত্যি হলো, '৭৫-এর ১৫ আগস্ট এবং ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের পর আইনের শাসনকে সবচেয়ে নির্লজ্জভাবে বুড়ো আঙুলই দেখানো হয়েছিল৷ তাই হত্যাকাণ্ডের বিচার আইন করে ‘নিষিদ্ধ' করা হয়৷ ১৯৯৬-এর আগ পর্যন্ত এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে মামলা  করা যায়নি৷

বঙ্গবন্ধু হত্যার চার মাস পর, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ‘দালাল আইন' বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও বন্ধ করে ৩০ লক্ষ শহীদের স্বজনদের বিচার চাওয়ার অধিকারও খর্ব করা হয়েছিল৷ একাত্তরের কোনো হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের বিচার দীর্ঘদিন কেউ চাইতেই পারেনি৷

তো এভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বজন ও তাঁর আদর্শিক অনুসারীদের, মুক্তিযোদ্ধাদের, শহীদদের এবং ধর্ষিতা মা-বোনদের বিচার পাওয়ার অধিকার কে কেড়ে নিয়েছিল? রাষ্ট্র৷ কীভাবে? বিচার করা যাবে না এমন আইন (ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ) করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য যে আইনটি কার্যকর ছিল, সেটি বাতিল করে৷ বিশ্বের আর কোন দেশে এমন হয়েছে?

ওই দুটো বর্বরোচিত রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে স্বাধীন দেশের সবচেয়ে বড় কলঙ্ক৷ ২১ বছর পর আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না ফেরা পর্যন্ত কোনো সরকারই বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও চার নেতা হত্যার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগই নেয়নি৷ উল্টো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি এবং আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে৷ ফলে দিনে দিনে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে শিকড় গেড়ে বসেছে তারা, একাত্তরে যারা গণহত্যা, গণধর্ষণ, ব্যাপক লুটপাটে অংশ নিয়েছিল কিংবা সেইসব অপকর্ম সমর্থন করেছিল৷

অথচ অপরাধীকুলে সবচেয়ে ‘জঘণ্য' অপরাধী নাকি যুদ্ধাপরাধী৷ তাদের পালন-পোষন-তোষণ করে যে সমাজ এগিয়ে চলার চেষ্টা করে সেই সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সত্যিই কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ৷ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাও তাই সুদূর পরাহত৷ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও তাই ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি' নিয়ে চর্চা হয় সব মহলে৷ হত্যা, গুম, ধর্ষণ এখনো চলছে৷ অনেকের বিচারের বাণী এখনো নিভৃতেই কাঁদে৷ পাশাপাশি চলছে দায় অস্বীকার আর সব দায় প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপানোর প্রতিযোগিতা৷ এই প্রতিযোগিতায় কেউ কোনোদিন জিতবে না৷ বরং মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নগুলো ভেঙেচুরে যাবে৷ তা-ই তো যাচ্ছে!

ক্ষমতায় ফিরতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কিছুটা জলাঞ্জলি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ৷ ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে জলাঞ্জলিপর্বই চলছে৷ হ্যাঁ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তারা করছে৷ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ এখন সংখ্যালঘুদের কী দিচ্ছে? ৪৫ বছরে কত হাজার মন্দির ভাঙা হয়েছে? একটারও সুষ্ঠু বিচার হয়েছে? রামু, নাসির নগরে ধর্ম অবমাননার সাজানো অভিযোগে মন্দির, বাড়িঘরে ব্যাপক হামলায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাও জড়িত৷ সুবিচার পেয়েছে কেউ? ৪৫ বছরে কয় লক্ষ সংখ্যালঘু দেশ ছেড়েছে? বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট'-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু করেছিল, সেই সরকারের বিদায়ের এত বছর পরও তো ‘ক্রসফায়ার' চলছে৷ এ-ও তো বিচারবহির্ভূত হত্যা৷ এসব ক্ষেত্রেও বিচার প্রার্থনা এবং বিচার প্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধা সীমিত৷ তাহলে ইতিহাস থেকে কী শিক্ষা নেয়া হলো? -ডচভেলে

২২ নভেম্বর, ২০১৬ ০৭:০২:৪৫