নাসিরনগরে এমন বর্বরতা কেন?
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
অ+ অ-প্রিন্ট
কালিহাতী উপনির্বাচন নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের ফুল বেঞ্চে আজ আবার শুনানি হওয়ার কথা। সারা জীবন স্বাধীন বিচারব্যবস্থা চেয়েছি, নিজের জন্যও তাই-ই চাই। একটা উপনির্বাচন নিয়ে রিট। যার গত বছরের ১৯ অক্টোবর শুরু আজও শেষ হলো না। হাইকোর্টে কত রিট হয় তেমন আপিল হয় না। আমার ক্ষেত্রে প্রথম দাপাদাপি করছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল আপিল করবেন। অথচ সরকারের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, এখনো নেই। কালিহাতী উপনির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার আমার মনোনয়নপত্র অন্যায়ভাবে গ্রহণ না করায় কমিশনে আপিল করেছিলাম। সেটা কোনো নির্বাচন কমিশন ছিল না। নির্বাচনী বিধি-বিধানে সেটা ছিল কোর্ট বা আদালত। সেখানে প্রতিকার না পেয়ে হাইকোর্টে গিয়েছিলাম। হাইকোর্ট আমার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করলে রিটার্নিং অফিসার আমাদের দলীয় প্রতীক গামছা বরাদ্দ করেন। নির্বাচনী বিধি অনুসারে মার্কা বরাদ্দের পর নির্বাচনী কার্যক্রমে আর কারও কোনো হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না। অথচ মার্কা বরাদ্দের সাত দিন পর নির্বাচন কমিশন সুপ্রিমকোর্টে আপিল করে। কিন্তু সেই আপিলের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। যে আপিল করার কোনো সুযোগ নির্বাচন কমিশনের ছিল না। আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতিপক্ষ হিসেবে হাইকোর্টে যাইনি। আমি হাইকোর্টে গিয়েছিলাম কমিশন যখন আদালত হিসেবে কাজ করছিল সেই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে। জজকোর্টের কোনো রায়ের বিরুদ্ধে কেউ হাইকোর্টে গেলে কোনো দিন জজকোর্ট হাইকোর্ট প্রতিপক্ষ হয় না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে অনেকটা তেমনই হয়েছে। পরবর্তী হাইকোর্টের রায়ে বলা হয় প্রার্থী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন। যে নির্বাচনে অংশগ্রহণই করতে পারেনি তার নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার বৈধ রাস্তা কোথায়, আমরা মহামান্য হাইকোর্টকে এ কথা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। আজ আবার সুপ্রিমকোর্টে মামলাটি উঠবে। মহামান্য আদালত যা করবেন তাই শিরোধার্য। আমি কখনো ন্যায়, সত্য ও বিচারের ক্ষেত্রে শক্তি বা ক্ষমতা প্রয়োগ যুক্তিযুক্ত মনে করি না। আমার ক্ষেত্রেও নয়। স্রষ্টা আছেন, তার সৃষ্টির সর্বশেষ ন্যায়-অন্যায়ের বিচারের মালিক তিনি। তিনিই তা করবেন, এ বিশ্বাসে বাকি জীবন কাটাতে চাই।

সারা দুনিয়ায় গর্ব করার মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ ছিল আমাদের। পাঠান, মোগল, সুলতানি আমলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান আমরা একসঙ্গে মিলেমিশে বাস করেছি। আপন আত্মীয়ের মতো ছিল আমাদের চলাফেরা। কোনো দিন সম্প্রীতির অভাব ঘটেনি। হিন্দুর পূজা-পার্বণ, খ্রিস্টানের গির্জা, বৌদ্ধের প্যাগোডা, মুসলমানের মসজিদ, হিন্দুর মন্দির যার যার আপন মহিমায় সব সময় সমুজ্জ্বল থেকেছে। ওসব নিয়ে কাউকে কখনো অতিরিক্ত মাথা ঘামাতে হয়নি, চিন্তাও করতে হয়নি। ভারত ছেড়ে যাওয়ার পথে ইংরেজরা সাম্প্রদায়িক হানাহানি-কাটাকাটির যে বীজ বুনে যায় পাকিস্তান তা লালন-পালন করে তরতাজা করে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা দানবটাকে হাঁটু, মাজা অথবা পেটের দিকে কেটে শ্রীকৃষ্ণের হাতে কংসের মতো দ্বিখণ্ডিত করেছিলাম, শিকড় তুলতে পারিনি। ভেবেছিলাম হয়তো এমনিতেই দানবটা মরে যাবে। কিন্তু সুদূর ১২০০ মাইল দূর থেকে পাকিস্তান এবং অন্যরা তাদের দানবীয় পশুশক্তিটাকে নানাভাবে রস জুগিয়েছে, পালন-পোষণ করেছে। যাতে শিকড়গুলো না মরে কুষি দেওয়া, কুঁড়ি ফোটা শুরু করেছে। তা না হলে নাসিরনগরে এমন হবে কেন?

ঘটনার পাঁচ-ছয় দিন পর নাসিরনগর গৌরমন্দির, দত্তবাড়ি, হরিণবেড়সহ আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। সবখানেই একই রকম। হিন্দুর মন্দির ভাঙবে, মুসলমানের মসজিদে কেউ আগুন দেবে, গির্জা বা প্যাগোডা ক্ষতবিক্ষত হবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এটা আমাদের কারও কল্পনায়ও ছিল না। যে একেবারেই লেখাপড়া জানে না, কম্পিউটার বা ল্যাপটপের বোতাম টিপতে পারে না, মাছ ধরে খায় সে কাবা শরিফের মাথার ওপর মহাদেবের ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দেয় কী করে? মহাদেবের ধাম তো সীতাকুণ্ডে। তিনি সেখানেই ভালো রয়েছেন। তাকে আবার কাবাঘরের মাথায় তোলার দরকার কী? আর রসরাজের বাবার সাধ্য কী কোনো প্রকৃত মূর্তি সে মহাদেবেরই হোক, শিব, বিষ্ণু বা ইন্দ্র সে যাকেই হোক মক্কার কাবাঘরের ওপর স্থাপন করে? সে ক্ষমতা কারও নেই। বিজ্ঞানের জমানায় কেউ যদি কোনো মসজিদের ওপর কারও ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দেয় কে কী করবে? আর স্ট্যাটাস দেখার লোক একজনও পাইনি, সবাই শুনেছে কেউ দেখেনি। নাসিরনগরে যা হয়েছে তা মোটেই ঠিক হয়নি। আমি খুবই মর্মাহত। নাসিরনগর থানার ১০০ হাতের মধ্যে গৌরমন্দির। ঘণ্টাব্যাপী তছনছ করেছে, পুলিশ কিছু করেনি বা করতে পারেনি। হয় তারা কারও ইঙ্গিতে আড়ালে থেকেছে, না হয় অথর্ব। তাই অমন পুলিশ রেখে লাভ কী? হরিণবেড় অতিহতদরিদ্র জেলে সম্প্রদায়ের বাস। সেখানে মন্দির ও মন্দিরের প্রতিমা ভাঙা হয়েছে? ফেরার পথে মাধবপুর-ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ১০০ গজের মধ্যে যেভাবে মন্দির ভাঙচুর করেছে কল্পনা করা যায় না। আমাকে পেয়ে স্থানীয় লোকজন বলছিলেন, ‘হামলাকারীরা আসার ২-৩ মিনিট আগেও পুলিশ ছিল। কিন্তু হামলার সময় তাদের দেখা যায়নি।’ এতকাল শুনেছি পুলিশ আসার খবর পেয়ে চোর পালায়, মাধবপুর মন্দিরে হামলার আন্দাজ করে তবে কি পুলিশ পালিয়েছে? নাসিরনগর থানার ১০০ হাত মধ্যে মন্দির ভাঙে, মাধবপুরে হামলার কয়েক মিনিট আগে পুলিশ পালায়— এসব কিসের আলামত? সরকার বলছে সবকিছু ঠিকঠাক আছে। এখানে ঠিক কোথায়? সবই তো আমি দেখছি বেঠিক। সবাই বলেছে হাজার হাজার মানুষ হামলা, ভাঙচুর করেছে। হাজার হাজার মানুষকে ওভাবে খেপিয়ে তুলল কারা? সরকার বলবে বিএনপি-জামায়াত সরকারকে হেয় করতে ওভাবে লোকজনকে খেপিয়ে তুলেছে। তা যদি হয় সরকারের রক্ষাকবচ কোথায়? যারা ওভাবে মানুষ খেপিয়ে তুলে মন্দির ভাঙাতে পারে, হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করতে পারে, তারা কি সরকারের ওপর কখনো ওভাবে একটা আক্রমণ করতে পারে না? নাসিরনগরের ঘটনা প্রত্যক্ষ করে আমার তেমনটাই মনে হয়েছে।

বিএনপি নেতা মেজর হাফিজ বীরবিক্রম বলেছেন, ‘যেহেতু আওয়ামী লীগ এ ঘটনার জন্য তাদের তিন নেতাকে বহিষ্কার করেছে সেহেতু এ থেকে প্রমাণ হয় আওয়ামী লীগ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।’ আমার কাছে তেমন মনে হয়নি। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার শুভলক্ষণ। দুষ্ট লোকের রাজনীতিতে থাকা উচিত নয়। আওয়ামী লীগ প্রকৃত বিশুদ্ধ রাজনীতির দিকে এগোতে চাচ্ছে মনে করে আমি একে সাধুবাদ জানাব। যে কোনো ঘটনা ঘটলেই আওয়ামী লীগ বলবে বিএনপি-জামায়াত করেছে, বিএনপি-জামায়াত বলবে আওয়ামী লীগ করেছে। হয়তো ১০ ভাগ তারা করতে পারে কিন্তু শতকরা ৯০ ভাগ কুকর্ম যারা করে তারা এসব কথায় উৎসাহিত হয়, নিরাপদে থাকে। তাই সময় থাকতে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা দরকার। ভারতের মোদি সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের এত সুসম্পর্ক তার পরও হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এত শঙ্কা কেন? তাদের ঘরদুয়ার ভেঙেছে, মন্দির ভেঙেছে, বিষয়-সম্পদ লুট হয়েছে। তার চেয়ে বড় ক্ষতি তারা সব সময় শঙ্কায় আছে। কখন কী হয় কী হয় করে দিন কাটাচ্ছে। আমার ভাগ্নি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা পুতুল প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করে। পুতুলের কাজের আগে আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সাধারণ মানুষের এত সহানুভূতি ছিল না। হরিণবেড়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শেফালীকে নির্যাতন করা হয়েছে। মামণি পুতুল কি সেখানে যাবে, তার পাশে দাঁড়াবে?

এসব দেখার জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি, রক্ত দিইনি। কিছু পত্রিকা লিখেছে মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে নির্মম-ভয়াবহ অত্যাচার হয়েছে। দুপুরে মাধবপুর সড়ক ও জনপথের রেস্ট হাউসের সামনে বসে ছিলাম। কয়েকজন তেমনই বলছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম এসব ঘটনায় কজন মারা গেছে। না, একজনও না। তাদের বলার চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের সব ঘরদোর, রাস্তাঘাট যদি ধ্বংস হয়ে যায়, কারও জীবনহানি না ঘটে আমি মনে করব কোনো ক্ষতি হয়নি। আর যদি একটি প্রাণ বিনষ্ট হয় তাহলে ভাবব সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদাররা রাস্তাঘাটে যেভাবে যখন তখন শত শত, হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে তার কোনো হিসাব নেই। কেন যেন একশ্রেণির মানুষ সবকিছুতেই মুক্তিযুদ্ধের উপমা দেয়। মুক্তিযুদ্ধকে ছোট ও খাটো করতে পারলেই যেন তারা একমুঠো ভাত বেশি খায়। সম্প্রতি তেমনটাই হচ্ছে। তাই সরকারকে বলছি, ধ্বংসের হাত থেকে যদি নিজেরা বাঁচতে চান এবং দেশকে বাঁচাতে চান তাহলে অবিলম্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করুন। সংবিধানপ্রণেতা প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর কাছে অনুরোধ, দয়া করে আপনারা এসব ঘটনা কেন ঘটে তার জন্য যৌথভাবে একটা বেসরকারি তদন্ত কমিটি গঠন করুন। সেখানে আ স ম আবদুর রব, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খালেকুজ্জামান, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কিছু সাহিত্যিক, কিছু সাংবাদিক, কয়েকজন সাবেক বিচারপতি, দু-এক জন ভদ্র ব্যবসায়ী, কয়েকজন ছাত্র-যুবক, কিছু কিছু হিন্দু পণ্ডিত ও মুসলিম আলেম নিয়ে একটি অর্থবহ তদন্ত কমিটি গঠন করুন। সেখানে যদি মনে করেন আমাকে নেবেন। একজন সাধারণ কর্মীর মতো কাজ করব। কিন্তু আর বসে থাকা নয়, দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সবাইকে এক হয়ে নামতে হবে। এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করা উচিত সরকারের এবং সরকারপ্রধানের। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে জননেত্রী তা যদি না করেন তার বাপের নেতৃত্বে আমাদের জন্ম দেওয়া দেশকে তো আর তার খামখেয়ালির জন্য ধ্বংস হতে দিতে পারি না। আমাদের দেশ আমাদেরই বাঁচাতে হবে।

নাসিরনগরের ছয়-সাত বারের এমপি বর্তমান মন্ত্রী ছায়েদুল হক একজন সাদামাটা মানুষ। আমরা অনেক দিন একসঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু তিনি সাদামাটা নির্বিবাদী হলে কী হবে, পোষ্যদের যদি সামাল দিতে না পারেন সে ব্যর্থতা তো তাকে বইতে হবে। দুর্যোধন দুঃশাসনদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি বলেই মহাভারতের অন্ধ নৃপতি ধৃতরাষ্ট্রের পতন হয়েছিল। ছায়েদুল হকও যদি তার দুঃশাসনদের নিয়ন্ত্রণ না করেন অবশ্যই তারও পতন হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনসহ মাননীয় মন্ত্রীর ব্যর্থতা আড়াল করার কোনো পথ নেই। এক সপ্তাহেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেতে পারেননি। তিনি গেলে মানুষ সান্ত্বনা পেত, সাহস পেত। প্রবাদ আছে, বনের বাঘের চেয়ে মনের বাঘ বেশি খায়।

মন্ত্রী বলেছেন, তিনি যে হিন্দু সম্প্রদায়কে জঘন্য গালাগাল করেছেন কেউ প্রমাণ করতে পারলে পদত্যাগ করবেন। কেউ যদি প্রশ্ন তোলে এতবার নির্বাচিত হয়েছেন মানুষ তাকে কত ভালোবাসা দিয়েছে গালাগাল না করলে এতদিন যে প্রশ্ন এলো না আজ তা এলো কেন? গালাগাল যে করেননি তা তিনিই প্রমাণ করুন। ইতিমধ্যে চেষ্টা যে শুরু করেননি তা তো নয়। কিছু হিন্দু নেতা দিয়ে বলানোর চেষ্টা করেছেন তিনি ‘হিন্দু সম্প্রদায়কে মালাউনের বাচ্চা’ বলেননি। অমন কথা না বলাই ভালো। কিন্তু ওর চেয়ে অনেক অনেক কঠিন কথা শুনে এলাম অজপাড়াগাঁয় ভাঙা মন্দির, মূর্তির পাশে আহাজারি করা মানুষের মুখে। অবস্থা যা তাতে মাননীয় মন্ত্রী ছায়েদুল হককে পদত্যাগের কথা বলতে হবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং আওয়ামী লীগের জন্য জনাব লতিফ সিদ্দিকীর অবদান ছায়েদুল হকের চেয়ে লাখো গুণ বেশি। দেশে নয়, বিদেশে ১০-১৫ জন লোকের সামনে আলাপ করতে গিয়ে তিনি এর থেকে অনেক কম বলেছিলেন। তাও তাকে মন্ত্রিত্ব, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব ও আওয়ামী লীগের সদস্যপদ হারাতে হয়েছে। সে বিবেচনায় ভদ্রলোককে হাজারবার মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দিলেও সমান হবে না। যে তিন নেতাকে আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করেছে তাদের সাফাই গাইতে গিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগ না জেনেই ওসব করেছে। কেন্দ্রকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের কোনো ব্যর্থতা নেই।’ এসব কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে আমি যে ছায়েদুল হককে চিনতাম এ ছায়েদুল হক তিনি নন। প্রশাসন ব্যর্থ না হলে ওসিকে সরানো হলো কেন? ইউএনওকে নিয়ে আসা হলো কেন? এবং তাকেও হয়তো মন্ত্রিসভা থেকে বের করে দেওয়া হবে— এসবই কি সফলতা? হরিণবেড় গ্রামে যেখানে মন্দিরে ভাঙা প্রতিমা দেখছিলাম সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডিসি ছিলেন। মনে হয় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করছিলেন। যেখানে স্বয়ং ডিসি তালিকা করেন সেখানে ব্যাপার যে গুরুতর তা বুঝতে হবে। হরিণবেড়ে একেবারে হতদরিদ্র জেলেদের বাস। গরিব মানুষের সঙ্গে আগাগোড়াই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, সেখানেও করেছি। বেলা তখন ১টা কয়েক মিনিট। সাধারণত জোহরের নামাজের পর পৌনে ২-২টার মধ্যে দুপুরের খাবার খাই। তাই ক্ষুধা অনুভব করছিলাম। কেউ আমার হাত-পা কেটে নিলে হয়তো সইতে পারব কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা তেমন সইতে পারি না। আমার পরিবারে ওটা মা-বাবা সইতে পারতেন। আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে তা তারা অনেক সহ্য করেছেন। গত ৩০-৪০ বছর খুব সহজে অচেনা বাড়িতে খাওয়া আমার স্বভাব হয়ে গেছে। অনুন্নত এলাকা হলে আরও সুবিধা। মন্দিরের কাছে যখন যাই তখন সুখদেব নামে এক বলিষ্ঠ যুবকের সঙ্গে দেখা। তার হাত ধরে প্রায় ৫০ গজ গিয়েছিলাম। ওতেই বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। এক ফাঁকে বলেছিলাম কেউ আমাকে দুই মুঠো ভাত দেবে। সবাই বিব্রতবোধ করছিল। যখন জোর দিয়ে বললাম বিশেষ করে সুখদেবকে। সে তখন বাড়ি ছুটে গেল। একটু পরে প্রাক্তন মেম্বার রমাকান্ত দাসকে নিয়ে সুখদেবের বাড়ি গেলাম। গিয়ে দেখি ঘরের ভিতর টি টেবিলে সুন্দর করে খাবার সাজানো। বললাম, পাটি আছে? আসলে কারও ঘরে পাটি নেই। আধুনিক জমানা। গরিব হোক ধনী হোক সবার ঘরে আধুনিকতা। অনেক  খোঁজাখুঁজি করে পলিথিনের টেবিলক্লথ এনে উঠানে বিছিয়ে দিল। তাতে বসে ১০-১২ বাড়ি থেকে আনা খাবার কয়েকজনকে নিয়ে খেলাম। সঙ্গে দি এশিয়ান এইজের সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা জীবন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক, যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার ও অন্যরা। বড় ভালো লেগেছে হতদরিদ্র পরিবারটিকে। আসার পথে বলে এসেছি দাওয়াত পেলে সুখদেবের বিয়েতে যাব। সত্যিই যাব। -বাংলাদেশ প্রতিদিন

০৮ নভেম্বর, ২০১৬ ১৮:০৭:৩৭