হে ঈশ্বর, আমার দাদাকে ফিরিয়ে দাও…
পীর হাবিবুর রহমান
অ+ অ-প্রিন্ট
দাদাকে খুব মনে পড়ছিল। অনেকদিন দেখা হচ্ছিল না। তার রাজনৈতিক উত্থান-পতন, শারীরিক অসুস্থতা সেই সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। এদিকে আমারও পেশাগত জীবনের গুটিয়ে নেয়া অবস্থান, সেই সঙ্গে নানা উত্থান-পতন ঘেরা জীবনের ব্যস্ততা মিলিয়ে দেখা করা হচ্ছিল না। মনের আকুলি বিকুলি ছিল, তবুও যাওয়া হয়ে উঠছিল না। তার এপিএসের অর্থ বিতর্ক, রহস্যময় রাতের ঘটনার দায় নিয়ে তিনি মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেয়ার পর ঝিগাতলার বাসভবনে চিরচেনা বেডরুমসংলগ্ন পিছনের বারান্দায় সেই যে বসে দীর্ঘ আলাপ, তারপর আর দেখা নেই।

শনিবার রাতে হুট করেই ঝিগাতলার বাড়িতে গিয়ে হাজির হই। তিনি গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির বৈঠক থেকে বাড়ি ফিরেছেন। পরেস সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি আর কপাল ব্যান্ডেজে বাধা। মাঝখানে ভেঙে যাওয়া স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। দুর্গাপূজায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে যেতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে কপাল ফাটিয়েছেন। তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে বসতে না বসতেই গৃহকর্মী ছেলেটি ট্রেতে করে সন্দেশ, ফলমূল আর ঘরে বানানো আপেলের জুস নিয়ে এলো। জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে জানতে চাইলাম, বৌদি বাড়িতে নাকি? বৌদি মানে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী জয়া সেনগুপ্ত। বৌদির আন্তরিকতা, আথিতিয়েতা ভুলবার নয়। একসময় নিয়মিত যাওয়া হতো। রিপোর্টার জীবনে সংসদ থেকে বাসা, তার কাছে শিখেছি অনেক। এমন প্রখর চিন্তাশীল পর্যবেক্ষক, বিশ্লেষক এবং তথ্যসমৃদ্ধ জ্ঞানের ভান্ডার নিয়ে বসে থাকা রাজনীতিবিদ কমই দেখেছি। যা জানতে চাইছি বা যা ঘটতে যাচ্ছে তার কিনারে যেতে পারতেন। পঞ্চম সংসদ থেকে সংসদ ও রাজনৈতিক বিট কাভার করতে গিয়ে তার সঙ্গে মাখামাখি সান্নিধ্য হৃদ্যতার গভীরে নিয়েছিল। ড. কামাল হোসেন সেই সময় আমাকে সংবিধান পাঠে মনোযোগী করেছিলেন। আর সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি প্রায় মুখস্ত করেফেলেছিলাম সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের তাগিদে।

সেই সংসদীয় গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি রিপোর্টার হিসেবে আমার সঙ্গেই থাকতো। খুটিয়ে খুটিয়ে সংবাদপত্রই নয়; বইয়ের ভুবনে ডুবে থাকা আর পড়াশুনাকে বিচার বিশ্লেষণের সঙ্গে ফটোজেনিকভাবে মাথায় নিয়ে নেয়ার শক্তি ছিল সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের। সংসদে, আড্ডায়, বক্তব্যে সর্বত্র তার প্রখর হিউমার সেন্স বা উইটি দিয়ে দৃষ্টিকাড়ার ক্ষমতা ছিল তীব্র। তার সঙ্গে আড্ডা দেযা মানেই মতের আদান প্রদান। ভাবনার জগত খুলে খুলে দেওয়া। সাহিত্যের রসবোধ ছিল ভীষণ। কবিতা উপন্যাস জীবনে যেমন পড়েছেন তেমনি তা থেকে উদ্বৃতিদানে নজিরবিহীন উদাহরণ রেখেছেন। স্পষ্টভাষীই নয় তার চাঁচাছোলা মন্তব্য ভঙ্গুর, অস্থির, অসুস্থ রাজনীতির স্রোতধারায় বহমান এই সমাজে মানুষের হৃদয় ও চেতনাকে স্পর্শ করেছে।

যাক- যে কথা বলছিলাম। জুসের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতেই বৌদি এসে কুশল বিনিময় করলেন। আমি বললাম- ঘরে বানানো জুস দেখে দাদার কাছে জানতে চাইছিলাম বৌদি ঘরে কিনা? বৌদি স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি হিয়ে বললেন-মনে আছে আপনার? বললাম, মনে থাকবে না! বৌদি ঘরে থাকা মানেই আমার জন্য ভালো রান্না থাকলে খাবার টেবিলে জোর করে নিয়ে যাওয়া। বৌদি ঘরে থাকা মানেই গুছানো ঘরে গৃহলক্ষীর হাত ধরে যেকোনো ফলের বানানো জুস পাঠিয়ে দেওয়া। যাক বৌদির জুস, জল আর সন্দেশ খেতে খেতে দাদার সঙ্গে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রবাহ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। একটি নতুন বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেই তিনি বললেন, ‌’এই তো তুই লাইনটা পেয়ে গেছিস। বহুদিন আসিস না, কথাবার্তাও হয় না। লেখাপড়া জানা যেসব সাংবাদিক একসময় নিয়মিত আসতো তাদেরও এখন পাইনা।’ আমিও বললাম- দেশ যে রাজনৈতিক গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসছে তাতে আমাদেরও যাবার জায়গা কমে এসেছে। দীর্ঘ আড্ডা শেষে আসার সময় তিনি ডাইনিং টেবিল থেকে একটি কলা ছিড়ে বললেন, ‘এটি খা, এটি খা।’ না করতে পারিনি; এটি হাতে নিয়েই খেতে খেতে গাড়িতে উঠলাম। ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম- তার মানসিক শক্তি কতটাই না শক্ত। স্মৃতিশক্তি কতটাই না প্রখর। এখনো দৃঢ়তার সঙ্গে রাজনীতির কথাই ভাবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্র সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার আগে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্র থাকাকালে শেক্সপিয়রের নাটকে অভিনয় করেছেন। উত্তাল ষাটের ছাত্র আন্দোলনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের অগ্রভাগে ছিলেন। জগন্নাথ হল ছাত্র ইউনিয়ন তাকে ভিপি পদে মনোনয়ন দিয়েছিল। তখন ছাত্র ইউনিয়নের জয়জয়াকার। কিন্তু স্কুটিনিতে তার মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়ে গেলে ভোটের লড়াই থেকে তিনি ছিটকে পড়েন। কিন্তু ৭০ এর নির্বাচনে যখন বঙ্গবন্ধুর ইমেজে নৌকার পক্ষে গণজোয়ার সেই সময়ে সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা নির্বাচনী এলাকায় আসাম প্রাদেশিক পরিষদের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী অক্ষয় কুমার দাসকে পরাজিত করে সারা দেশবাসীর নজর কাড়েন।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই এই অকুতোভয় নেতা সম্মুখ সমরের যোদ্ধা ও সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে কিংবদন্তীর আলোচনায় আসেন। স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে তিনি একমাত্র বিরোধীদলের সদস্য। স্বাধীন বাংলাদেশে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য। একসময় খ্যাতিমান আইনজীবী ছিলেন, পরে ফুলটাইম রাজনীতিবিদ। মস্কোপন্থী ন্যাপের ভাঙনে কখনো একতা, কখনো বা এনএপি হয়ে ১৯৯৪ সালে তার সমর্থকদের নিয়ে আওয়ামী লীগে একীভূত হন। একজন তুখোড় পার্লামেন্টিরিয়ান হিসেবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন। তার রাজনীতি গণমানুষের হৃদয়ে লালিত ভাষাকে লালন করার রাজনীতি। মানুষের হৃদয়ের ভাষাকে ধারণ করে গণমুখী চরিত্র নিয়ে নিজস্ব ভাব ভঙ্গিমা, আত্ন অহংকার নিয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। সমকালীন রাজনীতিতে তার মতো পার্লামেন্টিরিয়ান বিরল।

এক সন্তানের জনক সুরঞ্জিত সেনের বাড়িতে দেখলাম নাতি ও নাতনি নিয়ে মহাসুখেই আছেন। স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত করুণাশ্রিত রাজনীতির পথে হাঁটেননি। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে পড়ে একবার তিনি যে রোডমার্চ কর্মসূচি করেছিলেন তখনো একজন সাহসী রাজনীতিবিদের পাশে ছিলাম।

পেশাদারিত্বের জায়গায় তার সঙ্গে সম্পর্ক গভীরে পৌঁছালেও শুরুটা কলেজ জীবনের শুরুতে। ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ড. কামাল হোসেন। একতা পার্টি আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছিল। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে বিশাল নির্বাচনী জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। সৈয়দ আলতাফ হোসনকে নিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেই জনসভায় অংশগ্রহণ করতে গেলেন। মরহুম আলফাত মোক্তার তখন জেলা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতা। সেই জনসভায় তিনিও আমাকে সফরসঙ্গী করলেন। তাদের সঙ্গে জামালগঞ্জে গিয়ে জনসভায় বক্তৃতা করার পর নেমে দেখি আমার নতুন স্যান্ডেল নেই। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অনুসারী পরবর্তীতে আমেরিকা গিয়ে ইন্তেকাল করা মাহবুব ভাই গ্রামীণ হাট থেকে একজোড়া বাটার ট্রপিকেল স্পঞ্জের স্লিপার কিনে দিলেন।

একসময় আমার ফ্লাটে সাংবাদিক, রাজনীতিবিদদের আড্ডা ও মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করতাম। সেখানে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও থাকতেন। তিনি সুনামগঞ্জে আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আমার বন্ধন আত্নার। এটা বুঝাবার মতো নয়। একাবর তার বাসায় খাবার টেবিলে ঝিঙ্গে দিয়ে রান্না করা শৈল মাচের ঝোল তরকারি তিনি আমার প্লেটে তুলে দিতে দিতে বললেন-এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। আমার অবস্থা বৌদি বুঝতে পেরে তাকে থামিয়ে বললেন, ‘ এটা তোমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।’ আমাকে বললেন, ‘ আপনার বয়সে আপনার দাদা একবেলায় দু’টো মোরগ খেয়ে নিত।’ বৌদি যতটা গোছানো, সংসার জীবনে দাদা ততটাই অগোছালো। হাওরের রাজনীতির এই রাজপুত্র সেই যে উত্তাল ঢেউয়ের বিপরীতে সাঁতার কেটে রাজনীতিতে উঠে এসেছিলেন, লড়াই করে করেই জীবনের পঞ্চাশটি বছর রাজনীতিতে দাপটের সঙ্গে কাটিয়েছেন। তাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে না হলে অবহেলিত সুনামগঞ্জের উন্নয়ন অন্যদৃশ্য নিতে পারতো।

শনিবার রাতের আড্ডায়ও বলছিলেন, ‘তিনি সিরিয়াস। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ককে জাতীয় মহাসড়কে যুক্ত করতে অর্থমন্ত্রীকে বলেছেন। এনিয়ে তিনি সুনামগঞ্জের এমপিদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবেন। আমাকে বলেছিলেন, সঙ্গে থাকিস। এটা আদায় করতেই হবে।’ তার সঙ্গে জীবনের দীর্ঘ পথ অতিক্রমকালে সখ্যতা, হৃদ্যতা, শ্রদ্ধা যতই তীব্র হোক না কেন বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। কখনো সখনো দুজনের উত্তেজনাকর বাক্য বিনিময় হয়েছে। কখনো সম্পর্ক শেষ হয়নি। আস্থা, বিশ্বাস ও আবেগের উচ্চতায় উঠেছে।

আমার অর্ধেক জীবন ঘিরে যে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছিল সেখানে তিনি তার লেখায় লিখেছেন, ‘ পীর হাবিরের পঞ্চাশ বছর অতিক্রমের সময়ে বলবো, সে সুখে আছে। সে কলম ধরলেই অনেক কিছু লিখে ফেলে। আজ সে একজন পরিণত সাংবাদিক। হাবিব আবেগ দিয়ে লেখে, তবে হৃদয় যত বাড়ে লেখার সেন্সরশিপবোধ ততই কমে। মানুষের সঙ্গে মাথা দিয়ে নয়; হৃদয় দিয়েই চলে। হাবিবের কাছে একমুহূর্তের আনন্দই অনেক অমূল্য সম্পদ ছিল। এটা কোনো বৈভবের নয়, আত্নগরিমার নয়…।’

‘সুনামগঞ্জের প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠা পীর হাবিবের একখানি কবিমন আছে। গভীর আবেগ আছে। প্রেম আছে। দীর্ঘ সম্পর্কের সূত্রে আমি দেখেছি তার মধ্যে কবি নজরুলের দ্রোহ আছে। আজ তার লেখা পড়লে মনে হয়- সে আমার, কাল পড়লে বুঝা যায়, সে আমার নয়।’

রোববার যখন খবর পেলাম ক্যান্সারের পাশাপাশি হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে আমি চলে আসার পর ঐ রাতেই সুরঞ্জিত সেনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে-মনটা ঢুকরে কেঁদে উঠেছে। তাকে এভাবে শয্যাশায়ী মানায় না। কথনো সংসদে, কখনো মঞ্চে, কখনো বা আড্ডার আসর জমিয়ে তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় কথা বলবেন।

আজকের সমাজে, আজকের রাজনীতিতে যেখানে দাসত্বের স্বর্ণযুগ চলছে সেখানে একজন সাহসী, স্পষ্টভাষী, তির্যক মন্তব্যের জন্য খ্যাত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বেঁচে থাকা, সরব থাকা বড় প্রয়োজন। ঈশ্বর, সুরঞ্জিত সেনকে মানুষের জন্য ফিরিয়ে দিন। পৃথিবীতে সুরঞ্জিত সেনের বাইশ বছর পর এসে সময়কে আমি অতিক্রম করেছিলাম। একজন পার্লামেন্টেরিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের হৃদয় ও চিন্তার জগত যেমন স্পর্শ করেছিলাম, তেমনি আমায় বুঝতে পেরেছিলেন। আবেগাপ্লুত হৃদয় নিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা, ‘ হে ঈশ্বর, আমার দাদাকে ফিরিয়ে দাও…।’ -পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ

১৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০৭:১৬:৫৬